২২ অক্টোবর ২০১৮

স্মৃতিশক্তি বাড়বেন কীভাবে?

খুব মনোযোগের সাথে যা শেখা হয়, স্মৃতিতে তার ছাপ দৃঢ় হয় - সংগৃহীত

যারা অনেক কিছু মনে রাখতে পারেন, তাদের আমরা বুদ্ধিমান বলি। বাস্তবে সে মানুষটি তার কাজের গতি বাড়াতে সক্ষম হন। আমরা সবাই স্মৃতিশক্তি বাড়াতে চাই এবং সেটা যারা সহজে করতে চান তারা প্রথমেই ওষুধের কথা ভাবেন। এলোপ্যাথি কিংবা হোমিওপ্যাথি চিকিৎসকের দ্বারস্থ হন।

বাস্তব বুদ্ধিমত্তার সাথে জন্মগত বা জেনেটিক বিষয় জড়িত আছে ঠিকই, তবে পরিবেশের অবদানও আছে। খুব মনোযোগের সাথে যা শেখা হয়, স্মৃতিতে তার ছাপ দৃঢ় হয়। মস্তিষ্কের লিপিবদ্ধকরণ প্রক্রিয়াটি হয় দীর্ঘস্থায়ী। ফলে সহজে অনেক কিছু দীর্ঘ দিন মনে রাখা সম্ভব হয়। মনোযোগের সাথে মনের সম্পর্কটিই প্রধান। কারণ মন হচ্ছে ব্রেনেরই অংশ, যা চিন্তাচেতনা, অনুভূতি-আচরণ ও বুদ্ধিবৃত্তির সাথে সম্পৃক্ত। বিষয়বস্তুর ওপর মন নিমগ্ন করার অর্থ বা মনোযোগী হওয়ার মূল সূত্রই হচ্ছে শিক্ষণীয় বিষয়ের সাথে ব্রেনের কার্যক্রমকে সুদৃঢ় বন্ধনে রেখে চালিত করা।

স্মৃতি ভিতকে দৃঢ় করতে চোখও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিজ্ঞানের যুগে অডিও-ভিডিও শব্দের সাথে আমাদের পরিচিতি দিন দিন বাড়ছে। কানে শোনা, চোখে দেখা ও শোনার মাধ্যমে যদি মিল ঘটিয়ে কিছু শেখা যায়, তা দীর্ঘ দিন মনে থেকে যায়। চোখের সাথে মস্তিষ্কের রয়েছে সরাসরি সংযোগ। চোখ দৃশ্যমান বস্তুর ছবি ধারণ করে, ইমেজ সৃষ্টি করে, ইমেজকে বিশ্লেষণ করে ব্রেনে। প্রকৃত অর্থে বিশ্লেষণের কারণেই আমরা বস্তুটিকে দেখতে পাই।

দৈনন্দিন জীবনে যদি আমাদের চাওয়া-পাওয়া, ব্যর্থতা, হতাশা বা বন্ধুদের সাথে ঝগড়া কিংবা কথা কাটাকাটি ইত্যাদি সব সময় মনের ভেতর সুড়সুড় করতে থাকে, তাহলে ব্রেন নতুন তথ্য সহজেই ধারণ করতে পারে না। তথ্যই যদি লিপিবদ্ধ না হয়, তবে স্মরণ করার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।

স্মৃতিশক্তি বাড়ানোর প্রক্রিয়া : বিজ্ঞানী উইলিয়াম জেমস বলেছেন, স্মৃতিশক্তি হচ্ছে পেশির মতো। নিয়মিত ব্যায়াম করলে পেশি হয় সুদৃঢ়, স্মৃতিকেও তেমনি ধারালো ও সতেজ রাখা যায় নিয়মিত পরিচর্যার মাধ্যমে। যা শেখা হচ্ছে তা শুধু গড়গড় করে মুখস্থ করে গেলেই চলবে না, একটু নেড়েচেড়ে দেখতে হবে- কী শিখলাম, যা আগেই জেনেছি। তার সাথে নতুন শিক্ষণীয় তথ্যের কোনো মিল আছে কি না এ প্রক্রিয়াকে ইংরেজিতে বলা হয় Elaborative rehearsal।

ধরা যাক শিখলাম, মৌলিক রঙ তিনটি। লাল, নীল, সবুজ। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে হয়তো শব্দ তিনটি মুখস্থ হয়ে গেল। কিন্তু কয়েক দিন পর ওই রঙগুলো বাদে অনেক রঙ মৌলিক মনে হচ্ছে।

কিন্তু এভাবে যদি শেখা হয়- লাল সূর্যের রঙ, নীল আকাশের রঙ, সবুজ গাছগাছালির রঙ; তবে ভুলে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। তাই যদি কোনো অধ্যাপক উদাহরণ দিয়ে পড়ান, সেই উদাহরণের জন্য বিষয়টি মনে থেকে যায়।

এ ছাড়া প্রতিদিন কিছু কিছু বিষয় ঠিক সময়ে করলে তা মনে থাকে বেশি। একসাথে বেশি পড়া শিখতে গেলে স্মৃতিতে ভিত নড়বড়ে হয়ে যায়। কথায় আছে, সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের ১০ ফোঁড়।

এ ছাড়া বারবার পড়া, জানা থাকলেও তা বারবার আবৃত্তি করা, মনে আছে এমন বিষয় পর পর করে কয়েকবার রিহার্সাল দিতে পারলে স্মৃতির ভাণ্ডারে আসন পেতে বসে। এতে মগজের বিশেষ বিশেষ স্থানে গাঠনিক কিছু পরিবর্তন ঘটে, বুদ্ধি বেড়ে যায়, শেখার পর লেখার চর্চা করতে পারলে মনে থাকে বেশি। তাই বোধহয় ‘লেখাপড়া’ শব্দ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

মনে রাখার আরো একটি সহজ উপায় হচ্ছে ছন্দবদ্ধ করে শোনা। এক লাইন মনে আসার সাথে সাথে মিল থাকার কারণে পরবর্তী লাইনও সহজে মনে এসে যায়। ধাপে ধাপে জটিল বিষয়বস্তুকে যদি সুসংগঠিত করে শোনা যায়, তবে অনায়াসে স্মরণ করা সম্ভব।

কিছু শেখার পর ঘুমোতে পারলে ভালো ফল পাওয়া যায়। সবশেষে বলা যায়, সবার ওপরে মন, তাই মনের একাগ্রতা অদম্য ইচ্ছা ও দৃঢ়তা থাকলে স্মৃতির ভিত হবে উন্নত ও সমুজ্জ্বল।

বর্তমানে অনেককেই দেখা যায় স্মৃতিশক্তির দুর্বলতায় ভুগতে। হঠাৎ কিছু একটা মনে করতে চাইলেও হয়তো মনে পড়ছে না। চাবি, মোবাইল, ঘড়ি কোথায় রেখেছেন মনে করতে না পারা, কারো নাম ভুলে যাওয়া, একটি কাজ করেছেন কী করেননি, সেটা চট করে মাথায় না আসা ইত্যাদি। এ ধরনের সমস্যাকে আমরা কেউই তেমন গুরুত্ব দেই না। মনে করি, সাধারণ কিছু কিংবা বেশি চিন্তা করি বলে হঠাৎ মাথায় না-ও আসতে পারে বলে উড়িয়ে দিয়ে থাকি।

অনেকে মনে করেন, এটা তেমন কোনো বড় সমস্যা নয়। এই সামান্য ভুলে যাওয়া থেকে স্মৃতিবিভ্রমের মতো মারাত্মক কিছু হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আমাদের এ নিয়ে অবহেলা না করাই ভালো। আমরা কি জানি, আমাদের এই স্মৃতিশক্তির দুর্বলতার জন্য আমরা নিজেরাই দায়ী? আমাদের বাজে অভ্যাস ও কাজের কারণে প্রতিনিয়ত স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। নিচে স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়ার কিছু কারণ এবং প্রতিকার দেয়া হলো।

বিষন্ন থাকা : নানা কারণে অনেককে বিষন্নতায় পড়তে দেখা যায়। বিষন্নতা আপাতদৃষ্টিতে তেমন ভয়ানক কিছু মনে না হলেও এর রয়েছে সুদূরপ্রসারী প্রতিক্রিয়া। বিষন্নতায় ভোগা মানুষের মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা অনেক কম থাকে। এতে করে ধীরে ধীরে স্মৃতিশক্তি কমে যায়। বিষন্নতার কারণে অনেকের স্মৃতিশক্তি একেবারে নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও থাকে। তাই বিষন্নতায় থাকা বন্ধ করুন এবং প্রয়োজনে ডাক্তারের শরণাপন্ন হোন।

মানসিক দ্বন্দ্বে থাকা : অনেক সময় বিভিন্ন কারণে আমরা প্রায় প্রত্যেকেই মানসিক দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগে থাকি। কোনো একটি কাজ করা উচিত হবে কি না, কে কী ভাববে ইত্যাদি ধরনের কথা ভেবে আমরা সিদ্ধান্ত নিতে অনেক মানসিক দ্বন্দ্বে পড়ি। এই কাজ আমাদের মস্তিষ্কের জন্য কতটা ক্ষতিকর তা আমরা অনেকেই জানি না। মানসিক দ্বন্দ্বে থাকলে আমাদের মস্তিষ্কের নিউরন ক্ষয়প্রাপ্ত হতে থাকে। এতে করে মস্তিষ্ক স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা হারায়। এভাবে দুর্বল হতে থাকে আমাদের স্মৃতিশক্তি। তাই মানসিক দ্বন্দ্ব থেকে যতটা দূরে থাকা সম্ভব ততটাই ভালো।

আবেগ প্রকাশ করতে না পারা : অনেকেই আছেন, যারা বেশ চাপা স্বভাবের হয়ে থাকেন। সহজে নিজের আবেগ ও মনের ভাব প্রকাশ করতে পারেন না। মনের ভেতর কী হচ্ছে তা কাউকে বলেও বোঝাতে পারেন না। তাদের স্মৃতিশক্তির দুর্বলতা রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি। আমাদের মস্তিষ্কের ডান পাশের অংশ সমান কাজ করলে আমরা স্বাভাবিক থাকি। একটি অংশের কার্যক্ষমতা কম হলে আমাদের মস্তিষ্কে চাপ পড়ে। এতে করে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা হারায়। এভাবেই আমাদের স্মৃতিশক্তি দুর্বল হতে থাকে।

ড্রাগস, ধূমপান ও মদপান : ড্রাগস, ধূমপান ও মদপান এ তিনটিই স্মৃতিশক্তি দুর্বল করে দেয়ার জন্য সমানভাবে দায়ী। নিকোটিন ও অ্যালকোহল আমাদের মস্তিষ্কের সাধারণ কার্যক্ষমতা এবং স্বাভাবিক চিন্তা করার শক্তি নষ্ট করে দেয়। যারা ড্রাগ নেন, তাদের সাধারণ যুক্তি ও চিন্তা করার ক্ষমতা দ্রুত হ্রাস পেতে থাকে। যারা নিয়মিত ধূমপান ও মদপান করেন, তাদের স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে যায়।

থিয়ামিনের অভাব : থিয়ামিনের অভাব হলে আমরা স্মৃতিশক্তি দুর্বলতা রোগে পড়ে থাকি। থিয়ামিন ও ভিটামিন-বি আমাদের নার্ভাস সিস্টেমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এর অভাবে নিউরোলজিক্যাল ডিসঅর্ডারে অনেককে ভুগতে দেখা যায়। তাই স্মৃতিশক্তির দুর্বলতাকে অবহেলা না করে ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।

ইনসোমনিয়া : অনেকেই কাজের ব্যস্ততায় অনেক কম ঘুমান, যা পরবর্তীকালে অনিদ্রা রোগে পরিণত হয়। এ ছাড়া ঘুম কম হওয়া এবং না হওয়ার ওপর একটি মারাত্মক প্রভাব হলো স্মৃতিশক্তি নষ্ট হয়ে যাওয়া। আমরা যখন ঘুমাই তখন আমাদের মস্তিষ্কে নতুন নিউরনের সৃষ্টি হয়, যা আমাদের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে সঠিক রাখে। ঘুম কম বা না হলে মস্তিষ্ক তা করতে পারে না, ফলে আমাদের স্মৃতিশক্তি দিনের পর দিন দুর্বল হতে থাকে, যা পরবর্তীকালে শর্ট টার্ম মেমোরি লসের মতো মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। তাই প্রতিদিন একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের ৬-৮ ঘণ্টা ঘুমানো উচিত।


আরো সংবাদ