১৭ নভেম্বর ২০১৮

চীন-রাশিয়া-ভারত : ভূ-রাজনীতির ডিগবাজি

চীন-রাশিয়া-ভারত : ভূ-রাজনীতির ডিগবাজি - ছবি : সংগ্রহ

এস-৪০০ ট্রায়াম্ফ (Mobile Surface to air Missile system) নিয়ে আলোচনা চলছে। গত ৪ অক্টোবর রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন ভারত সফরের সময় ৫০০ কোটি ডলারের অস্ত্রক্রয়ের চুক্তির আওতায় পাঁচটি এস-৪০০ ট্রায়াম্ফ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা বিক্রির খবরে আলোচনাটি হাওয়া পায়।

এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাটি ক্রয়ের ব্যাপারে স্পষ্ট ঘোষণা- যে দেশই ক্রয় করবে, তার বিরুদ্ধেই মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে। ভারত ওই নিষেধাজ্ঞার খড়গে মাথা পেতে অনেকটা ভ্রুক্ষেপহীনভাবে ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা (এস-৪০০) কিনতে গেল কেন সে বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
চুক্তি সইয়ের আগের দিন মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র ভারতীয় গণমাধ্যমকে জানান, ওয়াশিংটনের নজর থাকবে ‘এস-৪০০’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিষয়ক চুক্তির দিকে।

সেপ্টেম্বরে রাশিয়ার কাছ থেকে একই অস্ত্র কেনার ব্যাপারে, চীনের সামরিক বাহিনীর ওপর পূর্বাহ্নেই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। চীনের সাথে তার বাণিজ্য বিরোধ চলছে বেশ অনেক দিন থেকেই। আর ট্রাম্প প্রশাসন ইরান, তুরস্ক, রাশিয়া, উত্তর কোরিয়াসহ অনেক দেশের বিরুদ্ধেই নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এখন দেখার অপেক্ষা, ভারতের মতো মিত্র দেশের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র আসলে কী করে। কারণ ভারতের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ‘মধু চন্দ্রিমা’ চলছে। নয়াদিল্লির ওপর তার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা তাই বিব্রতকর বটে। যুক্তরাষ্ট্রের মূল টার্গেট চীনকে ধরা। এ ক্ষেত্রে ভারতের লজিস্টিক সাপোর্টসহ অনেক ক্ষেত্রেই সহযোগিতা দরকার। সেপ্টেম্বর মাসেই দু’দেশ ঘোষণা দিয়েছে, আগামী বছর তারা যৌথ সামরিক মহড়া চালাবে। স্পর্শকাতর সামরিক নথিপত্র আদান-প্রদানেও তাদের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে। ভারতের কাছে অস্ত্র বিক্রির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান দ্বিতীয়, রাশিয়া প্রথম। রাশিয়ার সাথে যৌথ উদ্যোগে সর্বাধুনিক হাই পারসনিক ক্রুজ মিসাইল ‘ব্রাহ্মস’ ভারত তৈরি করেছে।

এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাটির ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র এত বেশি উদ্বিগ্ন কেন? স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষক সাইমন ওয়াইজেমান বলেন, ‘এস-৪০০ হচ্ছে এখন পর্যন্ত সর্বাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং পশ্চিমা দেশগুলোর হাতে অনুরূপ সমকক্ষ অস্ত্র নেই।’

এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাটি ১৯৯০ সালে তৈরি করা এস-৩০০ পিএসইউ-৩-এর উন্নত সংস্করণ। রাশিয়ার তৈরি এই সমরাস্ত্রকে বিবেচনা করা হচ্ছে ক্ষেপণাস্ত্র অঙ্গনের ‘সর্বাধুনিক সংস্করণ’ হিসেবে। যেহেতু আগামী বিশ্বের যুদ্ধের প্রক্রিয়া অনেকটাই মিসাইলনির্ভর হয়ে পড়ছে, সেহেতু এর আঘাতের জবাবে যারা যত বেশি পাল্টা প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবে, তারাই যুদ্ধে নিজেদের প্রতিরক্ষায় খানিকটা এগিয়ে থাকবে। নতুন এই অস্ত্রটি কিনতে তাই আগ্রহ প্রকাশ করেছে তুরস্ক, সৌদি আরব, কাতারসহ বেশ কয়েকটি। ইরানও কিনতে আগ্রহী, তবে তাদের ব্যাপারে রাশিয়ার নীতি এখনো খুব অনুকূল নয়।

বলা হয়, এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাটি ৮০টি টার্গেটে ফায়ার করতে সক্ষম। এর রাডার, ক্ষেপণাস্ত্র কিংবা অন্যান্য সেন্সরের ক্ষমতা অনেক বেশি। রাডার ৬০০ কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকার ওপর নজরদারি করতে পারে। এর ফায়ারিং রেঞ্জ সর্বোচ্চ ৪০০ কিলোমিটার (২৪৮ মাইল) পর্যন্ত। এটি লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণেও অনেক নির্ভুল। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই অস্ত্রটি স্থাপন, প্রস্তুত ও ফায়ার করা যায়। এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নেয়া যায় সহজেই। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের সামরিক বিশেষজ্ঞ কেভিন ব্র্যান্ড বলেন, ‘এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাটি হলো একের মধ্যে অনেকগুণ সমৃদ্ধ। এটি দিয়ে দূরপাল্লা, মাঝারি পাল্লার এমনকি স্বল্প পাল্লার রকেট ছোঁড়া যায়।’

এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে যুক্ত হয় ২০০৭-এর ২৮ এপ্রিল। রাশিয়া ইতোমধ্যে এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা সিরিয়ায় মোতায়েন করেছে। রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের দিল্লি সফরকালে দু’দেশের মধ্যে সামরিক, মহাকাশ ও জ্বালানি খাতসহ ২০টি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ২৪ মাসের মধ্যে ওই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাগুলো ভারতকে সরবরাহ শুরু করার কথা। ভারত কেন এস-৪০০ কিনতে গেল?

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিগত বছরে দুইবার রাশিয়া সফর করেন। উদ্দেশ্য ছিল, মূলত এস-৪০০ হাতে পাওয়া। সে সময় রাশিয়া জানিয়েছিল, আপাতত ওই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা কোনো দেশের কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না। যদি সিদ্ধান্ত বদলে যায়, তবে ভারতকে দেয়ার ব্যাপারে চিন্তা করবে। মোদি রাশিয়ার কাছ থেকে পঞ্চম জেনারেশনের যুদ্ধবিমান সুখোই এসইউ-৩৫ পাওয়ার ব্যাপারেও দেনদরবার করে আসছে। এই যুদ্ধবিমানকে মনে করা হয় যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম জেনারেশনের অত্যাধুনিক এফ-৩৫ অপেক্ষা উন্নত। রাশিয়া এই যুদ্ধবিমান বছরের প্রথম দিনেই চীনকে দু’টি হস্তান্তর করলেও ভারতকে দেয়ার ব্যাপারে এখনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভারতের ক্রমাগত ঘনিষ্ঠতা রাশিয়া মেনে নিতে পারেনি বলেই এর আগের কেনা সুখোই-২৭ ও ৩০ কে উন্নতকরণ এবং বসে যাওয়া বিমানগুলো চালু করতে প্রয়োজনীয় খুচরা যন্ত্রাংশ পর্যন্ত ভারতকে দিতে রাজি হয়নি। অবশেষে ভারত তাদের বিমানপ্রতিরক্ষা শক্তিশালী ও আরো আক্রমণাত্মক করতে বাধ্য হয়ে ছুটে গেছে ফ্রান্সের কাছে। ২০১৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ভারত চতুর্থ জেনারেশনের অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান হিসেবে (৮.৭ বিলিয়ন ডলার মূল্যে) ৩৬টি ‘রাফায়েল’ ক্রয়ের চুক্তি করে। এগুলো তিন থেকে ছয় বছরে সরবরাহ করার কথা।

ভারত তার সেনাবাহিনীকে অত্যাধুনিক সামরিক অস্ত্রে সজ্জিত করার জন্য অনেক বছর ধরে মরিয়া হয়ে ছোটাছুটি করছে। এর প্রমাণ মেলে বিগত কয়েক বছর ভারতের অস্ত্র আমদানিতে শীর্ষ অবস্থান দখলে রাখায়। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট এক সমীক্ষাতে জানিয়েছে, ২০১২-২০১৬ পর্যন্ত পৃথিবীতে মোট যে পরিমাণ অস্ত্র বিক্রি হয়েছে, তার ১৩ শতাংশ কিনেছে একা ভারত, যা শীর্ষস্থানসূচক।

ভূ-রাজনীতির নানা সমীকরণে ভারতকে এখন শুধু পাকিস্তান নয়, পরাশক্তি চীনকে মোকাবেলা করার হিসাব কষতে হচ্ছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে তাই বিগত বছরে বিভিন্ন দেশে ছুটতে দেখা গেছে অস্ত্র সংগ্রহের জন্য। তাদের এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা কেনার উদ্দেশ্য চীনকে মোকাবেলা করা। ভারতের জনৈক সামরিক বিশেষজ্ঞ মন্ত্রব্য করেছেন, ওই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ৪২টি প্রয়োজন ভারতের প্রতিরক্ষায়।
প্রধানমন্ত্রী মোদি ২০১৭-এর ২৮ জুন যুক্তরাষ্ট্র সফর করেছেন। এর আগে পাঠানো হয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পারিকরকে। তিনি ‘লজিস্টিক সাপোর্টের’ আড়ালে সামরিক চুক্তি করে আসেন। পরে মোদির সফরে ‘সফলতার শস্য ঘরে ওঠে’। ২২টি গার্ডিয়ান ড্রোন দিতে রাজি হয় যুক্তরাষ্ট্র। ড্রোনগুলোর দাম ২০০-৩০০ কোটি রুপি।

‘ন্যাটো’ জোটের বাইরে কোনো দেশের সাথে এই প্রথম এ ধরনের চুক্তি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ভারত বিগত এক বছরে আরো বিভিন্ন ধরনের ৩০০ কোটি ডলারের যুদ্ধাস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ক্রয় করেছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি ২০১৭-এর ৪-৬ জুলাই ইসরাইল সফর করেছিলেন। ওটা ছিল কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ইসরাইল সফর। সামরিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা, এর উদ্দেশ্য ছিল অস্ত্র সংগ্রহ। মার্কিন অস্ত্র বিক্রির ব্যবসায় কখনো বা ইসরাইলকে বার্গেনিং এজেন্ট হিসেবে কাজে লাগানো হয়। ভারত তাই ইসরাইলের সাথে সরাসরি আলোচনা করতে গিয়েছিল। তা ছাড়া ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা ‘মোসাদ’-এর সাথে ভারতের তথ্য-আদান প্রদানের চুক্তিও রয়েছে, যা আরো জোরালো করার বিষয়ও ছিল।

নব্বই দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের খণ্ড খণ্ড হয়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে ভারত একসময় রাশিয়ানির্ভরতা থেকে সরে আসে। একসময় ভারতের সামরিক অস্ত্রের ৮০ শতাংশ ছিল তাদের নির্মিত। অপর দিকে, চীনাদের ব্যাপারে রাশিয়ার নীতি ভারতকে গুটিয়ে দেয়। চীনা ভীতি থেকে স্বস্তি ও নির্ভরতা পেতে রাশিয়ার চেয়ে মার্কিন অস্ত্রের ওপর বেশি ভরসা করতে চায় ভারত। এ দিকে, যুক্তরাষ্ট্রও চায় চীনকে একটা ‘উচিত শিক্ষা’ দিতে। দু’দেশের লক্ষ্য যখন এক, তখন মিত্রতা ঠেকায় কে? সাউথ চায়না সি’তে (২০১৬) যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চীন যে বিরোধে জড়িয়ে পড়ে, এটা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের জন্য চরম অপমানজনক। আন্তর্জাতিক আদালতের রায় উপেক্ষা করে কৃত্রিম দ্বীপগুলোর পূর্ণ কর্তৃত্ব ধরে রাখতে পারা চীনকে ওই অঞ্চলে মোড়লের মর্যাদায় আসীন করেছে। এতদিন ফিলিপাইন ও তাইওয়ানসহ আসিয়ান এবং সাউথ চায় না সি’র সন্নিহিত দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে অভিভাবক হিসেবে মান্য করত। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের পিছপা হওয়ার উল্লিখিত ঘটনা এবং ভারত, ফ্রান্স, স্পেন ও জাপানের নীরবতায় প্রকাশ্যে কিংবা অপ্রকাশ্যে এসব দেশ এখন চীনের সখ্য কামনা করে।

রাশিয়াও চীনের দিকে ঝুঁকতে; বলা চলে, বাধ্য হয়েছে। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার যখন পড়োপড়ো অবস্থা- ওবামার স্পষ্ট ঘোষণা, বাশারকে চলে যেতে বাধ্য করা হবে- তেমন সঙ্কটাপন্ন পরিস্থিতিতে রাশিয়া সিরিয়ার পাশে দাঁড়িয়ে যায়। বাশারও টিকে গেলেন। তবে অভিযোগ- সিরিয়ায় গত তিন বছরে রুশ বিমান হামলায় ১৮ হাজার সিরীয় নিহত হয়েছে যার অর্ধেকই বেসামরিক নাগরিক। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ চার বছর পার হওয়ার পর ২০১৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের পক্ষে বিমান হামলা শুরু করে রাশিয়া। শুধু তাই নয়, ২০১৪ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে যাওয়া ইউক্রেনের ক্রিমিয়া উপদ্বীপ পুনর্দখল করে নেয় রাশিয়া। এসব ব্যাপারে রাশিয়ার জন্য চীনের সমর্থন প্রয়োজন ছিল। রাশিয়া ক্রিমিয়ায় ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও মোতায়েন করেছে। উত্তর কোরিয়ার সাথে সঙ্ঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের নৈতিক পরাজয় চীন-রাশিয়া অক্ষশক্তির কারণেই ঘটেছে, তা স্পষ্ট। উত্তর কোরিয়ার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নিতে যুক্তরাষ্ট্রকে রাশিয়া-চীন অনুরোধ করেছে তাৎপর্যপূর্ণ কারণে।

প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, রাশিয়া কেন এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা চীনের প্রতিপক্ষ ভারতের হাতে তুলে দিলো? এতে চীন খানিকটা চাপের মধ্যে কি পড়বে না? যুক্তরাষ্ট্র যে কারণে ভারতকে গুরুত্ব দেয়, রাশিয়াও কি অনুরূপ উদ্দেশ্যে ভারতকে শক্তিশালী করতে চায়? যদি চীনের সঙ্গে রাশিয়ার দূরত্ব তৈরি হয়, তাহলে পাকিস্তানের ব্যাপারে রাশিয়ার মনোভাব কী হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। অথচ বিগত বছরগুলোতে কাশ্মির রাশিয়াকে পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিতে দেখা গেছে। এমনকি পাকিস্তানের সাথে যৌথ সামরিক মহড়ার অভিপ্রায়ও প্রকাশ করেছে রাশিয়া।

চীন কিন্তু এসব বিষয়ে এখনো নীরবতা পালন করছে। তবে গত মাসে চীনের রাষ্ট্রদূত সিরিয়া সফরে গিয়ে ইঙ্গিত দেন, সিরিয়াতে সরাসরি সামরিক সাহায্য দেয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে বেইজিং। এটা চীনের এ যাবৎকালের অনুসৃত নীতির সুস্পষ্ট ব্যতিক্রম। চীন কোনো দেশকে সরাসরি সামরিক সাহায্য দেয়ার দীর্ঘদিনেও নজির নেই। এটা নিশ্চয়ই রাশিয়ার নীতির প্রতি সমর্থন তাদের। অন্য দিকে, পাকিস্তানের সঙ্গে রাশিয়া এই মর্মে চুক্তি করেছে যে, রাশিয়া এখন থেকে পাকিস্তানের সেনা কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেবে। রাশিয়া অন্তর্র্ভুক্ত সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্যরা পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করবে বলে চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে, ভারত রাশিয়া থেকে এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা পাওয়ার পরপর চীন ৪৮টি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সামরিক ড্রোন পাকিস্তানকে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। সামরিক এক পর্যবেক্ষক বলেছেন, পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে এটি হবে সবচেয়ে বড় চুক্তি। ‘উইং লুং-২’ নামে মানবহীন ওই সামরিক ড্রোন উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন এবং শত্রুর অবস্থান শনাক্ত করে আঘাত হানতে সক্ষম। চীন বলছে, পাকিস্তানকে ড্রোনগুলো দেয়ার সিদ্ধান্ত রাশিয়ার এস-৪০০ বিক্রির পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবেই।

মনে হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়া উভয়ই চীনকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। এ জন্য প্রয়োজন ভারতের মতো একটি শক্তিশালী দেশ। কিন্তু রাশিয়া কেন চীনকে প্রতিপক্ষ বানাচ্ছে? প্রাচীনকালের দ্বন্দ্ব রয়েছে দু’টি দেশের মধ্যে। রাশিয়া সমাজতান্ত্রিক দেশ যখন ছিল, তাদের চলে আসছিল আদর্শিক বিরোধ। অন্য দিকে, রাশিয়া চীনের কাছ থেকে নব্বইর পর থেকে বিরাট অঙ্কের ঋণ গ্রহণ করে আসছে এবং এখনো ঋণ পেতে আগ্রহী। কিন্তু চীন এখন রাশিয়াকে আগের মতো সহজ শর্তে ঋণ দিতে আগ্রহী নয়। তা নিয়ে দ্বন্দ্ব জোরালো হচ্ছে। তা হলে চীন-রাশিয়া অক্ষশক্তির দিন কি শেষ? ভূ-রাজনীতির এই ডিগবাজিতে বাংলাদেশকে সাবধানে পা মেলাতে হবে। চীন চাইবে তার প্রভাব দক্ষিণ এশিয়ায় আরো বাড়াতে। বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনে ভূ-রাজনীতির এ পালাবদল প্রভাব ফেলতে পারে।
লেখক : কবি ও কথাসাহিত্যিক


আরো সংবাদ