১৭ নভেম্বর ২০১৮

গাজায় এখনো যুদ্ধ পরিস্থিতি

গাজায় এখনো যুদ্ধ পরিস্থিতি - ফাইল ছবি

ডাক্তার হিসেবে যত দিন ধরে এখানে বসবাস করছি ও কাজ করছি, আমার মনে হয়, গাজার কোনো কিছুই দেখার বাকি নেই। আমি বেশ ভালোই বুঝতে পারি যে, গাজা কতটুকু সহ্য করতে পারে। বেসরকারি মানবিক সাহায্য সংস্থা মেদসাঁ সঁ ফ্রোঁতিয়ের বা এমএসএফের সাথে কাজ করছি ১৫ বছর ধরে। প্রত্যক্ষ করেছি ২০০৮, ২০১২ এবং ২০১৪ সালে তিনটি যুদ্ধ। তবে আমার মনে হয়েছে, বিগত ছয় মাস গাজা সবচেয়ে কঠিন সময় পার করেছে।

এই কয়েক মাসে মানুষের যে ভোগান্তি আর ধ্বংসযজ্ঞ আমি দেখেছি, তা পরিমাপ করার মতো নয়। আহতদের আর্তচিৎকার অবর্ণনীয়।
বিশেষ করে ১৪ মে’র যে ঘটনা তা কখনোই ভুলব না। স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগ মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে দুই হাজার ২৭১ জনের আহত হওয়ার ঘটনা রেকর্ড করেছে। এদের এক হাজার ৩৫৯ জনই আহত হয়েছেন প্রাণঘাতী মারণাস্ত্রের আঘাতে। আমার সেদিন কাজ ছিল দিনের বেলায়। গাজার আল আকসা হাসপাতালের অস্ত্রোপচার দলের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলাম।

বেলা ৩টার দিকে বিক্ষোভে আহতদের হাসপাতালে ভর্তি করা শুরু করি। চার ঘণ্টার মধ্যেই ৬০০ জন আহত হয়ে হাসপাতালে এলেন। জীবনে একসঙ্গে এত আহত মানুষ আমি দেখিনি।
প্রায় ১০০ জনকে অপরেশন থিয়েটারে নেয়ার জন্য সারি করে রাখা হলো। বারান্দা ভর্তি হয়ে গিয়েছিল, প্রত্যেকের রক্তক্ষরণ হচ্ছিল আর তারা চিৎকার করে কাঁদছিলেন।

আমরা কতটা পরিশ্রম করছিলাম সেটা বিবেচ্য বিষয় নয়। সত্যিকার অর্থে, এত বিপুল সংখ্যক আহত মানুষের যথাযথ সেবা আমরা দিতে পারছিলাম না। একের পর এক বন্দুকের গুলি হচ্ছিল। আমাদের পুরো চিকিৎসক দলটি জীবন বাঁচাতে প্রায় ৫০ ঘণ্টা একটানা কাজ করেছিলাম।
এই দৃশ্যটি আমাকে ২০১৪ সালের যুদ্ধের ঘটনা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ১৪ মে যা ঘটেছে, আমরা এর কোনো কিছুর জন্যই প্রস্তুত ছিলাম না। এখনো যা ঘটে চলেছে তার জন্যও আমরা প্রস্তুত নই।

প্রতি সপ্তাহেই মানসিক আঘাতপ্রাপ্ত রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। তাদের বেশির ভাগই পায়ে গুলি লাগা আহত তরুণ। তাদের জীবন হুমকির মুখে ছিল এবং পঙ্গু হওয়ার আশঙ্কাও ছিল। এমএসএফের অধীনে এমন রোগীর সংখ্যা বাড়ছিল। এখনো আমরা যেসব রোগীর চিকিৎসা দিচ্ছি তাদের শতকরা ৪০ শতাংশ গাজায় গুলিতে আহত এবং এদের সংখ্যা পাঁচ হাজারের বেশি।

কিন্তু আমরা যতই গুলিতে আহতদের চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছিলাম, ততই দেখছিলাম, জটিলতা বাড়ছে, আমাদের কী করা উচিত বুঝতে কষ্ট হচ্ছিল। চিকিৎসার সুযোগ ও সরঞ্জামাদির দিক দিয়ে সেই পরিস্থিতি ছিল অবর্ণনীয়। গাজার স্বাস্থ্য খাতের অবস্থা আসলে বড়ই নাজুক। মানুষের স্বাস্থ্যসেবার ব্যাপক চাহিদা এবং এর বিপরীতে ‘বিপুল ঘাটতি’ পরিস্থিতিকে আরো তীব্র করে তুলেছে। বিশেষ করে বেশির ভাগ রোগী এমন যাদের বিভিন্ন অঙ্গের প্রতিস্থাপন বিষয়ক চিকিৎসা দরকার এবং এই চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন কয়েক দফা অস্ত্রোপচার। এসব চিকিৎসার অনেকগুলোই এখন আর গাজায় সম্ভব নয়।

আমাকে সবচেয়ে কষ্ট দিয়েছে রোগীর সংক্রমণের আশঙ্কা। হাড় ও অস্থিমজ্জায় প্রদাহজনিত এমন একটি সমস্যা হলো অস্টিওমাইলিটিস। দ্রুত চিকিৎসা করানো না হলে এ রোগ সারিয়ে তোলা আর সম্ভব হয় না এবং অঙ্গহানির আশঙ্কা ক্রমেই বেড়ে যায়। এ ধরনের সংক্রমণের চিকিৎসা খুব দ্রুত করতে হয়। তা না হলে এটি খুব তাড়াতাড়ি ছড়িয়ে পড়ে আর ওষুধে এসব সংক্রমণ সারানো কঠিন।

তবে সংক্রমণ শনাক্ত করা সহজ নয় এবং গাজায় হাড় ও অস্থিমজ্জায় প্রদাহ বা সংক্রমণ শনাক্ত করার মতো অবকাঠামো নেই। অস্টিওমাইলিটিসের পরীক্ষা করার জন্য বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও প্রশিক্ষণ দেয়ার সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে এখানে অণুজীববিজ্ঞানের একটি গবেষণাগার স্থাপনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এমএসএফ। এরপরও এ সমস্যা একবার শনাক্ত হলেই প্রতিটি রোগীর জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল অ্যান্টিবায়োটিক জাতীয় ওষুধের দরকার পড়ে এবং বারবার অস্ত্রোপচার প্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়ায়।

ডাক্তার হিসেবে পুরো গাজা উপত্যকা ঘুরে দেখেছি। দেখেছি, অসংখ্য তরুণ-যুবক কৃত্রিম পা লাগিয়ে ক্রাচে বা হুইল চেয়ারে করে চলাফেরা করছে। এমন দৃশ্য এখন গাজায় নিত্যনৈমিত্তিক এবং গা সহা ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ধরনের পরিণতি ভোগ করার পরও অনেকেই জীবন সম্পর্কে বেশ আশাবাদী। কিন্তু ডাক্তার হিসেবে আমি জানি, তাদের সামনে শূন্যতা ছাড়া আর কিছু নেই। জানি যে, বুলেট বিদ্ধ হওয়ার কারণে তারা নিশ্চিতভাবেই পা হারাতে যাচ্ছে। এটাও জানি, তাদের হাড়-অস্থিমজ্জার সাথে তাদের ভবিষ্যৎও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমার কাজের সবচেয়ে কঠিন ব্যাপারটি হলো, এসব কিছু জানার পরও বেশির ভাগ তরুণ এসব রোগীর সাথে কথা বলা ও স্বাভাবিক আলাপ চালিয়ে যাওয়া। কেননা তাদের অনেকেই আমার কাছে জানতে চায়, তারা আবার স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারবে কিনা।

এসব প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া আমার জন্য বেশি কঠিন। এমন বিষয় নিয়ে কাজ করার কারণেই জানি যে, তারা আর কখনোই স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করতে পারবে না। আমরা নিজেদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি কিন্তু তাদের পা হারানোর আশঙ্কাই সবচেয়ে বেশি। এই শক্ত কথাটি তাদের বলাও যে আমারই দায়িত্ব। যে ছেলেটির সামনে তার পুরো জীবনটা পড়ে আছে, তাকে এমন কথা বলা সত্যিই সহজ ব্যাপার নয়। আর গত কয়েক মাসে রোগীদের সাথে এমন আলোচনাই হয়েছে সবচেয়ে বেশি।

অবশ্যই সত্যি, শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। নানা প্রতিবন্ধকতায় পরিপূর্ণ হাসপাতাল, অবরোধ, দিনে মাত্র চার ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ, চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি, অভিজ্ঞ অস্ত্রোপচারকারী ও চিকিৎসকের অভাব, অপ্রতুল নার্স, চিকিৎসা সংশ্লিষ্টদের কোনো রকম বেতনভাতা না দেয়া। এসব নিত্যদিনের চিত্র। এতসব অসুবিধার পরও চিকিৎসার জন্য গাজায় আসা রোগীদের নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে এবং এমন হয়রানি ও নিপীড়ন দিন দিন বেড়েই চলেছে।
এসব কার্যক্রম ও আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে প্রতিদিন। এখন আমরা দেখছি, শিশুরা রাস্তায় ভিক্ষা করছে। অথচ এমন চিত্র এক-দুই বছর আগেও দেখা যায়নি।

এমএসএফ কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে যাচ্ছে এবং আমরা একা এর সমাধান করতে পারব না। আমরা বড়জোর চাপ দিতে পারি। তবে আমাদের এ কাজ করে যেতেই হবে। আমার নিজের জন্য এটা মেডিক্যাল নীতির অংশ। এসব আহত মানুষের চিকিৎসা পেতেই হবে।
বর্তমানে গাজার দিকে তাকানোর অর্থই হলো, একটি অন্ধকার গলিপথের দিকে তাকানো এবং নিশ্চিত নই যে, এর শেষ প্রান্তে কোনো আলো দেখতে পাবো।
লেখক : ফিলিস্তিনি ডাক্তার
আলজাজিরা থেকে ভাষান্তর করেছেন মোহাম্মদ সাজেদুল ইসলাম


আরো সংবাদ