১৭ নভেম্বর ২০১৮

জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়া

জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়া - ফাইল ছবি

একটি বিষয় নিয়ে রাজনৈতিক ও সচেতন মহলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা ও বিশ্লেষণ চলছে, তা হলো, জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়া। এ উদ্যোগটি সাধারণ মানুষকে আশার আলো দেখাচ্ছে। সত্যিকার অর্থে এ উদ্যোগ একটি সময়োচিত দাবির জবাব। বর্তমান আওয়ামী জোট সরকার ক্ষমতাসীন হয়ে গণমানুষের ভোটের অধিকার হরণ করেছে। পাঁচ বছর ধরে বিরোধী দলকে নিপীড়নে কোণঠাসা করে রেখেছে। বিএনপি ও জামায়াতের হাজার হাজার নেতাকর্মীকে লাখ লাখ মামলা দিয়ে কারাবন্দী করে রেখেছে। একেকজন নেতাকর্মী ৫০-৬০টি মামলা নিয়ে হয় কারাগারে, না হয় ফেরারি হয়ে দিন কাটাচ্ছেন।

আন্দোলন, সংগ্রাম, জনসভা ও মিছিল দূরের কথা, মানববন্ধনের মতো কর্মসূচিও পালন করতে দেয়া হচ্ছে না। ঘরোয়া বৈঠক থেকে ‘নাশকতার ষড়যন্ত্র করছে’ অভিযোগে গ্রেফতার করে নিয়ে যাচ্ছে। আসন্ন একাদশ সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আবার ধরপাকড়ের মহোৎসব শুরু হয়েছে। কেবল সেপ্টেম্বর মাসেই সারা দেশ থেকে বিএনপি-জামায়াতের কয়েক হাজার নেতাকর্মী গ্রেফতার হয়েছেন এবং ধরপাকড় আরো হবে। অন্য দিকে, কোটা সংস্কার আন্দোলন ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে সরকার যে নির্যাতন-নিপীড়ন চালিয়েছে তাতে সরকারের ফ্যাসিবাদী রূপ আরেকবার উন্মোচিত হয়। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থাও নাজুক। ব্যাংকগুলোতে হরিলুট চলছে। প্রশাসনকে দলীয়করণ করে ফেলা হয়েছে। বিচার বিভাগের ব্যাপারে যে হস্তক্ষেপ করেছে, তা নিয়ে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার সম্প্রতি প্রকাশিত বই অ ইৎড়শবহ উৎবধস এবং তার সাক্ষাৎকারে দেশ-বিদেশে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠে।

সব কিছু মিলিয়ে দেশের মানুষের এখন নাভিশ্বাস উঠেছে। মানুষ এ মুহূর্তে মুক্তির পথ খুঁজছে। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ জনগণ যখন দেখতে পেল, গরিষ্ঠ নাগরিকদের একটি অংশ ২০ দলীয় জোটসহ একটি কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করছেন, তখন তারা আশায় বুক বাঁধতে শুরু করেছে। বেগম খালেদা জিয়া কারাবন্দী হওয়ার আগ পর্যন্ত জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে সরকারকে অপসারণের আহ্বান জানালেও কোনো কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। সে জন্য গত বছরের মাঝামাঝি নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না এগিয়ে এসেছেন। এক সময়ের ডাকসাইটে ছাত্রনেতা মান্নার রাজনীতিবিদ হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। তিনি ড. কামাল হোসেন, ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন প্রমুখ সিনিয়র সিটিজেনকে (দেশপ্রেমিক আরো অনেককে এ প্রক্রিয়ায় দেশের মানুষ দেখতে চায়) ঐক্যবদ্ধ করে ২০ দলীয় জোটের প্রতিনিধিসহ ২২ সেপ্টেম্বর ফ্রন্টের পাঁচ দফা দাবি পেশ করেন।

ঐক্যবদ্ধভাবে যেকোনো মহৎ কাজে মানুষ আশান্বিত হয়। আবার ফাটল ধরলে ব্যথিতও হয়। তারা গভীরভাবে লক্ষ করে, কারা ফাটল ধরাচ্ছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এই ঐক্যপ্রচেষ্টা। এখানে নির্বাচন তথা ভোটের ব্যাপারটি মুখ্য। ভোটের মাধ্যমে বিজয়ী হয়ে স্বেচ্ছাচারী শাসনের পতন ঘটাতে হবে। এই অভিযাত্রায় কেউ কেউ জামায়াতে ইসলামীকে দূরে রাখার পক্ষে অভিমত ব্যক্ত করেন। ফলে জাতীয় ঐক্যের সুফল নিয়ে জনমনে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। কারণ অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই, সারা দেশে জামায়াতের লাখ লাখ ভোট রয়েছে। এখানে হিসাবের কোনো জটিলতা নেই। এর সাথে খ্যাতনামা সিনিয়র সিটিজেনরা যুক্ত হলে আর শঙ্কাই থাকে না।

তাদের দলীয় ভোট তেমন না থাকলেও ইমেজ আছে। ভোটের রাজনীতিতে এটিও কাজে আসে। সত্যিকার অর্থে দুঃশাসন থেকে জনগণকে মুক্ত করার অভিপ্রায় থাকলে আবেগনির্ভর সিদ্ধান্ত নিলে চলবে না। দেশের মানুষ উপজেলা ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রত্যক্ষ করেছে, দেশজুড়ে কী পরিমাণ জামায়াতের ভোট রয়েছে। বর্তমানে তাদের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান রয়েছেন। অনেক উপজেলায় তাদের চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী দ্বিতীয় বা তৃতীয় পজিশনে আছেন। তারা বিএনপির প্রার্থীর সাথে লড়াই করেই এ পজিশনে এসেছেন। এ আসনগুলোতে বিএনপি-জামায়াতের জোট এক হলে যে সংসদ নির্বাচনে বিজয় সুনিশ্চিত তা বোঝার জন্য বেশি মেধার প্রয়োজন হয় না। এ ছাড়া, তাদের রয়েছে সুশৃঙ্খল কর্মী বাহিনী।

যেখানে ভোটাধিকার লুণ্ঠিত, মানবাধিকার পদদলিত, প্রশাসন দলীয় ক্যাডার দ্বারা কুক্ষিগত, স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব বিপন্ন; সেখানে দলীয় ও ব্যক্তি স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে, দলমত নির্বিশেষে জনতার ঐক্য গড়ে তুলে সংসদ নির্বাচনে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। এ ক্ষেত্রে বর্ণচোরা, স্বার্থবাদী ও অনভিজ্ঞ রাজনীতিকদের চাইতে বলিষ্ঠ ও অভিজ্ঞ রাজনীতিবদরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করলে ঐক্যের উদ্যোগ নস্যাৎ হয়ে যেতে পারে।হ
লেখক : বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা


আরো সংবাদ