১৫ নভেম্বর ২০১৮

দশম সংসদের সমাপ্তি, একাদশ সংসদের দিনক্ষণ গণনা শুরু

বহুল আলোচিত দশম সংসদের সমাপ্তি। - সংগৃহীত

বিল পাশে রেকর্ড গড়ে সোমবার শেষ হয়েছে বহুল আলোচিত জাতীয় সংসদের ২৩তম অধিবেশন। রাতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের অধিবেশন সমাপ্তি সংক্রান্ত নোটিশ পাঠ করে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী দশম জাতীয় সংসদের সমাপনী অধিবেশনের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।

এদিকে দশম সংসদের ২২তম অধিবেশনে পাশ হওয়া ১৮টি বিলের রেকর্ড ভেঙে নতুন ১৯টি বিল পাশের রেকর্ড গড়েছে ৮ কার্যদিবসের ২৩তম এ অধিবেশন। এছাড়া এ অধিবেশনে ডজনখানেক বিলের রিপোর্ট উপস্থাপিত হয়েছে। অধিবেশন গত ২১ অক্টোবর শুরু হয়ে শেষ হবার কথা ছিল ২৫ অক্টোবর। সে পর্যন্ত মোট ৯টি বিল পাশ হয়। কিন্তু আরো বেশ কিছু বিল পাশ করতে অধিবেশনের মেয়াদ ৩ দিন বাড়ানো হয়। এর ফলে গত শুক্রবার মুলতবি দিয়ে গত শনিবারও সংসদ অধিবেশন বসে।

সব মিলিয়ে চলতি অধিবেশনের ৮ কার্যদিবসে বিল পাশের হুড়োহুড়ি লক্ষ্য করা গেছে। কোন বিল সংসদে উত্থাপিত হয়ে মাত্র ২৪-৪৮ ঘন্টার মধ্যে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির রিপোর্টের জন্য সময় নির্ধারিত হয়। এছাড়া প্রায় প্রতিদিন রাতে সম্পূরক কার্যসূচি এনে বিলের রিপোর্ট উপস্থাপিত হয়েছে, বা বিল পাশ হতে দেখা গেছে। এমনকি সংসদ অধিবেশন শেষ হবার পরে রাত ১১ টার পরে স্থায়ী কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় বলে জানা গেছে।

শেষ হওয়া সংসদের ২৩তম অধিবেশনে ১৯টি বিল পাশ হয়েছে। এগুলো হলো- শিশু (সংশোধন) বিল-২০১৮, হাউজিং এ- বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউট বিল-২০১৮, ওজন ও পরিমাপ মানদ- বিল-২০১৮, সরকারী চাকরী বিল-২০১৮, বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধণ) বিল-২০১৮, বাংলাদেশ শিশু একাডেমী বিল-২০১৮, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বিল-২০১৮, মানসিক স্বাস্থ্য বিল-২০১৮, সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রন ও নির্মূল)বিল-২০১৮, মানসিক স্বাস্থ্য বিল-২০১৮, মাদক নিয়ন্ত্রন বিল-২০১৮, বাংলাদেশ প্রাণী সম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট বিল-২০১৮, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা বিল-২০১৮, বাংলাদেশ স্টা-ার্ডস এ- টেস্টিং ইনন্সিটিউট বিল-২০১৮, বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড বিল-২০১৮, মৎস সঙ্গনিরোধ বিল-২০১৮ এবং বাংলাদেশ মৎস গবেষণা ইনস্টিটিউট বিল-২০১৮।

এছাড়া সোমবার কস্ট এন্ড ম্যানেমেন্ট একাউন্টস বিল-২০১৮ এবং বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল বিল ২০১৮ সংসদে পাশ হয়। এনিয়ে ১০ম জাতীয় সংসদের ২৩তম ও অন্তিম অধিবেশনে মোট ১৯ টি বিল পাশ হয় এবং ডজনখানেক বিলের রিপোর্ট উপস্থাপিত হয়েছে। এছাড়া বহুল আলোচিত আরপিও সংশোধন বিলটি ক্যাবিনেটে অনুমোদিত হলেও তা সময়ভাবে সংসদে উত্থাপিত হয়নি। যা রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে আইনে পরিনত হবে। এ অধিবেশনে কার্যপ্রণালী বিধির ৭১ বিধিতে ১৫৪টি নোটিশ পাওয়া যায়। এরমধ্যে ৩টি গৃহিত ও ১টি আলোচিত হয়। ৭১ (ক) বিধিতে দুই মিনিটের আলোচনায় নোটিশের সংখ্যা ৪৫টি। প্রধানমন্ত্রীর উত্তরদানের জন্য সর্বমোট ৫৯টি প্রশ্ন পাওযা যায়, তার মধ্যে তিনি ১৫টি প্রশ্নের উত্তর দেন। এ ছাড়া বিভিন্ন মন্ত্রীদের জন্য ৯২৪টি প্রশ্ন আসে। তার মধ্যে ৫৯২টির উত্তর দেন মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রীরা।

এদিকে দশম সংসদে বিল পাস হয়েছে প্রায় দুইশ। সংসদে পাস ও উচ্চ আদালতে বাতিল হওয়া সংবিধানের ১৬তম সংশোধন ছিল এ যাবৎকালে হওয়া সংবিধানের ১৭টি সংশোধনের অন্যতম আলোচিত ঘটনা। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় ১৫৩ সদস্যের নির্বাচিত হওয়ার সঙ্গে ‘অনুগত’ বিরোধীদল নিয়ে সরকার গঠন দশম সংসদের আরেক আলোচিত দিক।

দশম সংসদের সমাপ্তির মাধ্যমে কার্যত একাদশ সংসদ নির্বাচনের ক্ষনগণনা শুরু হয়েছে। সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদের ৩ দফার (ক) উপদফা অনুযায়ী, মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভেঙ্গে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভাঙ্গার পূর্ববর্তী নব্বই দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠান হবে। সেই হিসেবে একাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দশম সংসদের অধিবেশন শেষ হয়েছে। তবে, কোনো বিশেষ কারণে সংসদ বসতে সংবিধান অনুযায়ী কোনো বাধা নেই।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার ’৯৬ সালে ক্ষমতায় থাকাকালে দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল না। ফলে সংবিধানে কোনো পরিবর্তন আসেনি। ২০০৯ সাল থেকে টানা দুই মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা তার সরকার মোট তিন বার সংবিধানে সংশোধন এনেছে। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন সংবিধানের ১৭টি সংশোধনের মধ্যে সাতটি এসেছে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। প্রথম চারটি এসেছিল বঙ্গবন্ধুর আমলে, তিনটি শেখ হাসিনার আমলে।
অধিবেশনের শেষ দিনে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য ও দশম সংসদের আলোচিত পার্লামেন্টারিয়ান ফখরুল ইমাম বলেন, অংশগ্রহণের দৃষ্টিতে দেখতে গেলে দশম জাতীয় সংসদ বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল সংসদ। সরকারে থাকার কারণে হয়তো অনেকে আমাদের সমালোচনা করেন। কিন্তু এটা একটা পরীক্ষামূলক যাত্রা ছিল। তিনি বলেন, সংসদ অধিবেশনে বিরোধীদলীয় নেতার ৭০% উপস্থিতি কেউ কল্পনাই করতে পারতো না। কারণ আগের সংসদগুলোতে বিরোধী দলীয় নেতা তো দূরের কথা, বিরোধীদলই উপস্থিতই থাকতো না।

জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বি মিয়া জাতীয় সংসদে বলেন, আমার দৃষ্টিতে দশম সংসদ একটি ফলপ্রসূ সংসদ। আমি ১৯৮৬ সালের পর থেকে সংসদে আছি, ওই সময়ের পর এবারের সংসদই সবচেয়ে প্রাণবন্ত কার্যক্রম চলেছে। তিনি বলেন, ২০০১ সালে সংসদে বিরোধীদলকে প্রায় কথা বলতেই দেওয়া হয়নি। প্রায় দুইশ আইন প্রণয়নসহ সার্বিক কার্যক্রম বিবেচনায় দশম সংসদ অন্ত্যন্ত সফল।

গণপরিষদ থেকে শুরু করে বেশিরভাগ সংসদেই উপস্থিত আছেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। তিনি গতকাল সংসদ অধিবেশনে দশম সংসদের মূল্যায়ণ করতে গিয়ে বলেন, সরকার ও বিরোধীদলের অংশগ্রহণে দশম সংসদ সফল সংসদ হিসেবে কাজ চালিয়েছে। সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাস হচ্ছে সরকার ও বিরোধীদলের অংশগ্রহণে আন্তরিক পরিবেশে জনগণের কল্যাণে কাজ করা। এ সংসদে সেটাই হয়েছে।


আরো সংবাদ