১৭ নভেম্বর ২০১৮

জেরুসালেম রক্ষায় মুসলিম বিশ্বের ঐক্য সময়ের দাবি

মুসলিমদের পবিত্র নগরী জেরুসালেম - ছবি : সংগ্রহ

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নির্বাচনী প্রচারণায় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে যুক্তরাষ্ট্রের ইসরাইলি দূতাবাস তেলআবিব থেকে জেরুসালেমে স্থানান্তর করবেন। বিশ্বসম্প্রদায়কে তোয়াক্কা না করে গত ৬ ডিসেম্বরে জেরুসালেমকে ইহুদিবাদী ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেন ট্রাম্প। আর ২০১৮ সালের ১৪ মে জেরুসালেমে মার্কিন দূতাবাস স্থানান্তর করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় জেরুসালেমে মার্কিন দূতাবাস চালুর দুই দিন পর তেলআবিব থেকে দূতাবাস সরিয়ে জেরুসালেমে স্থানান্তর করেছে গুয়েতেমালা। বিশ্বজুড়ে সমালোচনার মধ্যে জেরুসালেমে দূতাবাস উদ্বোধন করেছে মধ্য আমেরিকার এ দেশ। একইভাবে ২১ মে ফিলিস্তিনিদের আন্দোলন ও দাবি উপেক্ষা করে জেরুসালেমে দূতাবাস স্থানান্তর করে প্যারাগুয়ে। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীও যুক্তরাষ্ট্রের পথে হাঁটার ঘোষণা দিয়েছেন। ১৬ অক্টোবর অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন দূতাবাস জেরুসালেমে স্থানান্তরের ঘোষণা দিয়েছেন। শেষমেশ দেশগুলোর দূতাবাস জেরুসালেমে সরিয়ে নেয়া হলেও মুসলিম জাহানের ‘শক্তিধর’ সরকারগুলোর ভূমিকা বিশ্ব মুসলিম জনগোষ্ঠীর কাছে প্রশ্নবিদ্ধ।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমালোচনা অগ্রাহ্য করে এসব দেশ কার্যত ফিলিস্তিনিদের ঘরছাড়া করতে ইসরাইলকে প্রকাশ্য সমর্থন দিলো। এর বিপরীতে মৌখিক প্রতিবাদ বা বিবৃতি ছাড়া আরব দেশগুলো এবং মুসলিম বিশ্ব প্রকাশ্য কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এ ক্ষেত্রে শুধু ইন্দোনেশিয়া স্পষ্ট করে জানিয়েছে, অস্ট্রেলিয়া যদি দূতাবাস জেরুসালেমে স্থানান্তর করে তবে ক্যানবেরার সাথে নীতির বিষয়ে তারা নতুন করে ভেবে দেখবে। আরব ও মুসলিম বিশ্ব দৃশ্যত শক্তিশালী অবস্থান না নেয়ায় শেষ পর্যন্ত হয়তো ক্যানবেরা তাদের দূতাবাস জেরুসালেমে সরিয়ে নেবে।

জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে ট্রাম্পের স্বীকৃতি প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়ে ২১ ডিসেম্বর জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদে ভোটাভুটি হয়। তাতে ট্রাম্পের ঘোষণা প্রত্যাখ্যাত হয়। ভোটাভুটিতে ১২৮ সদস্য ট্রাম্পের ঘোষণা প্রত্যাহারের পক্ষে ভোট দেয়। বিপক্ষে ভোট দেয় মাত্র ৯টি দেশ। ৩৫টি দেশ ভোট দানে বিরত থাকে। তারপরও নিজের নীতিতে অনড় থেকে জেরুসালেমে দূতাবাস স্থানান্তর করলেন ট্রাম্প। পবিত্র জেরুসালেমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস খোলাকে কেন্দ্র করে দখলদার ইসরাইলি বাহিনী গুলি চালিয়ে ১৪ মে গাজায় অর্ধশতাধিক ফিলিস্তিনিকে হত্যা করে। ২০১৪ সালে গাজায় ইসরাইলি হানাদার বাহিনীর ভয়াবহ হামলার পর সেখানে এত বেশি হতাহতের ঘটনা আর ঘটেনি। সেদিন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেয়ে ইভানকা ট্রাম্প, জামাতা জ্যারেড কুশনারসহ ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ কয়েকজন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। এ দূতাবাস খোলার অর্থ পুরো জেরুসালেমের নিয়ন্ত্রণ নিতে ইসরাইলকে ওয়াশিংটনের স্বীকৃতি এবং ফিলিস্তিনিদের নির্বিচারে হত্যার বৈধতা দেয়া। দূতাবাস স্থানান্তরের দিনকে ট্রাম্প ‘ইসরাইলিদের জন্য বিশেষ দিন’ আখ্যায়িত করে টুইটারে লেখেন, ইসরাইলিদের জন্য বিশেষ একটা দিন!’

শত শত বছর ধরে জেরুসালেমের নিয়ন্ত্রণ নিতে স্থানীয় বাসিন্দা, আঞ্চলিক শক্তি ও আক্রমণকারীরা লড়াই করেছে। এর মধ্যে ছিল মিসরীয়, ব্যাবিলনীয়, রোমান, মুসলিম, ক্রুসেডার, অটোমান, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো। সর্বশেষ ফিলিস্তিনের আদি বাসিন্দাদের উৎখাত করে এই পবিত্র ভূমি দখলে মরিয়া হয়ে উঠেছে দখলদার ইসরাইল। ১৯১৭ সালে ‘বেলফোর ঘোষণার’ পর যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনি ভূমিতে ইহুদিরাষ্ট্র হিসেবে চাপিয়ে দেয়া হয় ইসরাইলকে। ১৯৪৭ সালে জাতিসঙ্ঘ একটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের জন্য যে সীমানা বরাদ্দ রেখেছিল, বর্তমানে তার অর্ধেকও ফিলিস্তিনিদের নিয়ন্ত্রণে নেই। বরং পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুসালেমে ফিলিস্তিনিদের ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দিয়ে তাদের জমির ওপর প্রায় সাড়ে ছয় লাখ ইহুদিবসতি গড়ে তুলেছে দখলদার ইহুদিবাদী ইসরাইল।

জেরুসালেম দখলে ইহুদিবাদীদের চক্রান্তের পেছনে ট্রাম্প প্রশাসনের উসকানি প্রতিহত করা প্রয়োজন। কিন্তু কিভাবে এটা সম্ভব? ‘প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত’ আরব রাষ্ট্রগুলোই এ ব্যাপারে মুখ্য ভূমিকা রাখতে পারে। জেরুসালেমকে ইহুদিবাদী ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আরব ও মুসলিম বিশ্ব ঐক্যবদ্ধ হয়ে কঠোর অবস্থান নিলে অন্য দেশগুলো তাদের মত পরিবর্তন করতে বাধ্য হতো। শুধু জেরুসালেম ইস্যুতেই মুসলিম বিশ্বের নানান মতনৈক্য ও দূরত্ব কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে। আর এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে ওআইসি (অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন), যার ২২ দেশই আরব লিগের সদস্য।


আরো সংবাদ