১৫ নভেম্বর ২০১৮

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি ধর্মীয় সহিংসতা বন্ধ করতে পারবে?

নানা ধর্ম ও বর্ণের হাজার হাজার মানুষের আচরণ বিশ্লেষণ করে ধর্মীয় সহিংসতার পেছনে কারণ বোঝার চেষ্টা করছে সফটওয়্যার - সংগৃহীত

মানব সমাজের আদলে তৈরি করা একটি সফটওয়্যার নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে, সেটি ধর্মীয় সহিংসতা বন্ধ করতে সহায়তা করতে পারে কিনা।

গোত্র বা সম্প্রদায়ের মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে, তার মতো করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অ্যালগরিদম তৈরি করে আচরণ বোঝার চেষ্টা করছেন।

এজন্য নানা গোত্র, বর্ণ এবং ধর্মের হাজার হাজার মানুষের আচরণের অসংখ্য নমুনা তৈরি করা হয়েছে এবং সেগুলো বিশ্লেষণ সফটওয়্যারটি কাজ করছে।

নরওয়ে এবং শ্লোভাকিয়া মতো ক্রিশ্চিয়ান প্রধান দেশগুলোয় মুসলিম অভিবাসীরা বসবাস শুরু করার পর উত্তেজনার পরিবেশ তৈরি হলে, সেটি সামলাতে প্রাথমিকভাবে এই প্রযুক্তির পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা আশা করছেন, লন্ডনের সন্ত্রাসী হামলার মতো কোনো ঘটনা ঘটার সাথে সাথে বিশ্লেষণ করে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে এই পদ্ধতি সরকারকে সহায়তা করবে।

তবে এই প্রকল্পের সাথে জড়িত নন, এমন একজন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক নোয়েল সারকে বলছেন, বাস্তব জীবনের পরিস্থিতি সামলাতে হলে এই প্রযুক্তির পেছনে আরো কাজ করতে হবে।

''এটা সত্যিকার অর্থে একটি উপকারী গবেষণা হবে, যখন এটি মানুষের চিন্তার মতো পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে, যখন ধর্মীয় সহিংসতার নানা উপাদান বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা অর্জন করবে।'' বলছেন অধ্যাপক সারকে।

সম্প্রতি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক একটি সাময়িকীকে এই গবেষণা নিবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছে।

গভীর বিশ্বাস
এই গবেষণায় দেখা গেছে, বড় ধরণের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মতো ঘটনায় নানা ধর্ম বর্ণের মানুষ একত্রে শান্তিপূর্ণভাবে মোকাবেলা করেছে।

আবার কোনো কোনো পরিস্থিতিতে এই মানুষরাই সহিংস হয়ে উঠেছে।

বিশেষ করে যখন অন্য কোনো দলের বা সম্প্রদায়ের মানুষ একদলের মৌলিক বিশ্বাস বা পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, তখনি এ ধরণের ঘটনা ঘটেছে।

ভারতের ২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গার বিষয়টিও উদাহরণ হিসাবে নেয়া হয়েছে এই প্রকল্পে। হিন্দু আর মুসলমানের মধ্যে তিন দিনের দাঙ্গায় দুই হাজার মানুষ নিহত হন।

মনো তত্ত্ব

গবেষক জাস্টিন লেন বলছেন, ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক বিষয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরির জন্য মানুষের মনো তত্ত্বও আমাদের বুঝতে হয়েছে। কারণ ধর্ম বা সংস্কৃতির গোঁড়ায় রয়েছে মানসিক ধ্যানধারণার বিষয়টি।

গবেষকরা দেখতে পেয়েছেন, যখন একদল মানুষের ধর্মবিশ্বাস বা মূল্যবোধের ওপর বারবার আঘাত করা হয়, তখন ধর্মীয় সহিংসতার আশঙ্কা অনেক বেড়ে যায়। তারপরেও যাদের মডেল হিসাবে নেয়া হয়েছে, তার মাত্র ২০ শতাংশ সহিংসতায় জড়িয়েছে।

''ধর্মীয় সহিংসতা আমাদের মৌলিক আচরণ নয়- সত্যিকার অর্থে আমাদের ইতিহাসে এর উদাহরণ খুবই কম'' বলছেন লেন।

''এটা শুধুমাত্র তখনি ঘটে যখন মানুষের গভীর বিশ্বাসকে আঘাত করা হয় অথবা তারা মনে করে, তাদের বিশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তখন সেটি রাগ বা সহিংসতার মধ্য দিয়ে বেরিয়ে আসে। ''

''আমরা হয়তো অন্যদের ধর্মবিশ্বাস সহজেই গ্রহণ করার জন্য আমাদের মানসিকতা বদলাতে সহায়তা করতে পারি।'' তিনি বলছেন।

অন্যদের সম্পর্কে বিরূপ ধারণা

গবেষকরা বলছেন, ধর্মীয় সহিংসতা বা সন্ত্রাস বন্ধ করতে হলে এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে হবে, যাতে অন্য গোত্রের মানুষকে হুমকি হিসাবে ভাবা না হয়।

সবচেয়ে ঝুঁকির তৈরি হয় যখন দুটি সম্প্রদায়ের আকার অনেকটা একই রকমের হয় এবং তারা প্রতিদিনই নানাভাবে একে অপরের মুখোমুখি হন। অথচ একে অপরকে বিপদের বা হুমকির কারণ বলে মনে করেন।

এ ধরণের মুখোমুখি হওয়া সামনাসামনি দেখা হওয়ার মতো নাও হতে পারে। হয়তো সামাজিক মাধ্যমের মাধ্যমে পরস্পর মুখোমুখি হচ্ছে।

লেন বলছেন, ''আমরা হয়তো নিজেদের তথ্য জগতে বসবাস করি, কিন্তু অন্যসব মানুষ সম্পর্কেও আমরা অনেক তথ্য পাচ্ছি, যা নানাভাবে আমাদের মানসিকতাকে প্রভাবিত করছে। কিন্তু হয়তো সেখানে সত্যিকারের মানুষের কোন ভূমিকাই নেই।''

''ফলে শুধুমাত্র হুমকির ধারণাটাই অনেক সময় সত্যিকার হুমকির মতো শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে এবং প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।''


আরো সংবাদ