১৭ নভেম্বর ২০১৮

ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্র সম্পর্কের পথে ভুটান

ডা: লোটে শেরিং - ছবি : সংগ্রহ

ভুটানের তৃতীয় পার্লামেন্ট নির্বাচনে দ্রুক নিয়ামরুপ শোগপা (ডিএনটি) আনুষ্ঠানিকভাবে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। ডিএনটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিজয়ী ঘোষণা করেছে দেশটির নির্বাচন কমিশন (ইসিবি)। পার্লামেন্টের ৪৭টি আসনের মধ্যে দলটি পায় ৩০টি। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা দ্রুক ফুয়েনসাম শোগপা (ডিপিটি) পায় ১৭টি আসন। তারাই হবে পার্লামেন্টে বিরোধী দল। নতুন সংসদে সাতজন নারী নির্বাচিত হয়েছেন। এ যাবৎকালে দেশটির পার্লামেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী সর্বোচ্চ সংখ্যক নারী সদস্য এটি। নতুন ৪৭ এমপির মধ্যে একজন পিএইচডি ডিগ্রিধারী, ২৬ জন মাস্টার্স এবং বাকিরা স্নাতক। বয়সের ক্ষেত্রে একজন ২০’র, ১৪ জন ৩০’র, ১৩ জন ৫০’র ও দুইজন ৬০’র কোটায়।

ভুটানের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দলের প্রেসিডেন্ট ডা: লোটে শেরিংয়ের মনোনয়ন নিশ্চিত করেছে ডিএনটি। প্রধানমন্ত্রী সংবিধান অনুযায়ী রাজার কাছ থেকে দায়িকেন পাওয়ার পরই মন্ত্রিসভার সদস্যদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। সংবিধানের ১৭ নম্বর ধারা অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মনোনীত ব্যক্তি রাজার কাছ থেকে দাকিয়েন পাওয়ার পর মন্ত্রিসভার সদস্যদের তালিকা তৈরি করে তাদের নিয়োগ দানের সুপারিশ করবেন। প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশের ভিত্তিতে ন্যাশনাল এসেমব্লির সদস্যদের মধ্য থেকে রাজা মন্ত্রীদের নিয়োগ দেবেন।

ভুটানে ডিএনটি দলের বিজয়কে ‘পরিবর্তনের জন্য ভোট’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই ক্ষুদ্র বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী দেশটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যাপক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। সাধারণ নির্বাচনে ডিএনটির পাশাপাশি অংশ নেয়া আরেকটি দল ডিপিটি হবে বিরোধী দল। প্রাথমিক রাউন্ড থেকে বিদায় নেয় সাবেক ক্ষমতাসীন দল, ভারতপন্থী হিসেবে পরিচিত পিপলস ডেমক্র্যাটিক পার্টি (পিডিপি)।

ভুটানে গ্রস ডোমেস্টিক প্রডাক্টের (জিডিপি) চেয়ে গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেসকে (জিএনএইচ) বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হয়। এখানকার নির্বাচনে প্রার্থীরা প্রচারণাকালে জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির মতো স্পর্শকাতর ইস্যুগুলো নিয়ে তেমন একটা আলোচনা করেনি। নির্বাচনে বিজয়ী মধ্য-বামপন্থী দল ডিএনটি মাত্র পাঁচ বছর আগে গঠিত হয়। এর নেতৃত্বে রয়েছেন বাংলাদেশে শিক্ষা গ্রহণকারী পেশাদার চিকিৎসক লোটে শেরিং। তিনি রাজার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। জাতি গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন জোরদারের অঙ্গীকার করেছেন তিনি। বিজয়ী দলটি জলবিদ্যুতের মতো বড় আকারের অবকাঠামো প্রকল্প গ্রহণের ব্যাপারে সতর্ক। কারণ ভুটান ইতোমধ্যে বিপুল অঙ্কের বৈদেশিক ঋণে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। এর বেশির ভাগ ঋণ ভারতের কাছে।

পররাষ্ট্রনীতির ব্যাপারে নির্বাচনের আগে ডিএনটি স্পষ্ট কোনো কথা না বললেও বিজয়ী হওয়ার পর এক সাক্ষাৎকারে হবু প্রধানমন্ত্রী ডা: লোটে শেরিং বলেছেন, নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর থিম্পুতে চীনসহ অন্য কয়েকটি দেশের মিশন খোলার বিষয় বিবেচনা করা হবে। অবশ্য তিনি পররাষ্ট্রনীতি রাজার পরামর্শে গ্রহণ করার কথা জানান। দিল্লির সাথে করা চুক্তির কারণে ভারতের পরামর্শে ভুটানের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনার বাধ্যবাধকতা থাকায় দেশটি জাতিসঙ্ঘের স্থায়ী পরিষদের কোনো সদস্যের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করতে পারেনি। এবার সেই বাধ্যবাধকতা থেকে সরে আসার ইঙ্গিতই কার্যত দিলেন হবু প্রধানমন্ত্রী। এ ব্যাপারে বিরোধী দলেরও কোনো দ্বিমত থাকার কথা নয়।

গত বছর বিতর্কিত দোকলাম এলাকায় ভারত ও চীনা সেনাদের মধ্যে সৃষ্ট অচলাবস্থার পর ভারতীয়রা ভুটানের ব্যাপারে বেশি সক্রিয়। চীন ও ভুটান দুই দেশই দোকলামের ওপর মালিকানা দাবি করছে। যদিও স্থানটি বর্তমানে চীনের নিয়ন্ত্রণে। চীন এই ভূখণ্ডের তিন গুণ এলাকার ওপর দাবি ছেড়ে দিয়ে দোকলামের বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে চায়। ভুটানও এ ব্যাপারে একমত, কিন্তু দিল্লির আপত্তির কারণে থিম্পু বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে পারছে না। ওই এলাকায় চীনা সৈন্যরা সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নিলে ভারতীয় সেনারা গিয়ে বাধা দেয়। ভারতের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ চিকেন নেক শিলিগুড়ি করিডোরের কাছে দোকলামের অবস্থান। এই করিডোরের মাধ্যমে ভারতের মূল ভূখণ্ডের সাথে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো সংযুক্ত। দিল্লির আশঙ্কা দোকলামে বেইজিংয়ের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হলে তা শিলিগুড়ি করিডোরের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিতে পারে।

দিল্লির সাথে চুক্তির কারণে ভুটানকে ভারতের নিরাপত্তা ইস্যুতে সহযোগিতা করতে হয়। বেশ কয়েক বছর আগে ভুটান তার ভূখণ্ডে আশ্রয় নেয়া ভারতবিরোধী বিদ্রোহী গ্রুপগুলোকে তাড়াতে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা করে। এসব গ্রুপের মধ্যে ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব অসমও (উলফা) ছিল। এ দু’টি ঘটনা থেকে বোঝা যায়, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর নিরাপত্তার সাথে ভুটান কতটা ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। অবশ্য, দোকলাম অচলাবস্থার পর থেকে ভুটানে একটি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির গ্রহণের দাবি উঠেছে। তাদের অভিযোগ ভুটানের পররাষ্ট্রনীতি ভারতের দ্বারা খুব বেশি প্রভাবিত। ফলে চীনের সাথে সীমান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি করা যাচ্ছে না। এবার নতুন সরকারের অগ্রাধিকারে বিষয়টি থাকতে পারে।

এক দশকের বেশি সময় আগে রাজা জিগমে সিঙ্ঘে ওয়াংচক ভুটানে গণতান্ত্রিক সংস্কার চালু করার পর থেকে মাত্র আট লাখ জনসংখ্যার দেশটি ধীরে ধীরে উন্মুক্ত হতে শুরু করে। দুই শক্তিশালী প্রতিবেশী ভারত ও চীনের মধ্যে থাকা ভুটানের অবস্থান কী হবে তা নিয়ে দেশটিতে বিতর্ক ক্রমেই বাড়ছে। ভারত এই অঞ্চলে তার নিরাপত্তা উদ্বেগগুলো নিরসনে এমন সব পদক্ষেপ গ্রহণ করছে যাতে ক্ষুদ্র প্রতিবেশী দেশগুলো নিজেরা নিরাপত্তা সঙ্কটে পড়তে পারে বলে আশঙ্কার মধ্যে রয়েছে।

ভুটানের অধিবাসীরা নিজেদের দেশকে মাতৃভাষা জংখা ভাষায় ‘দ্রুক ইয়ুল’ বা ‘বজ্র ড্রাগনের দেশ’ নামে ডাকে। হিমালয় পর্বতমালার পূর্বাংশে অবস্থিত ভুটানের উত্তরে চীনের তিব্বত অঞ্চল, পশ্চিমে ভারতের সিকিম ও তিব্বতের চুম্বি উপত্যকা, পূর্বে অরুণাচল প্রদেশ এবং দক্ষিণে আসাম ও উত্তরবঙ্গ। ভুটান সার্কের একটি সদস্য রাষ্ট্র এবং মালদ্বীপের পর দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে কম জনসংখ্যার দেশ। ভুটানের রাজধানী ও বৃহত্তম শহর থিম্পু। ফুন্টসলিং ভুটানের প্রধান অর্থনৈতিক কেন্দ্র।

অতীতে ভুটানে পাহাড়ের উপত্যকায় অবস্থিত অনেক আলাদা আলাদা রাজ্য ছিল। ১৬ শ’ শতকে একটি ধর্মীয় রাষ্ট্র হিসেবে এর আবির্ভাব ঘটে। ১৯০৭ সাল থেকে ওয়াংচুক বংশ দেশটি শাসন করে আসছেন। ১৯৫০-এর দশক পর্যন্ত ভুটান একটি বিচ্ছিন্ন দেশ ছিল। ১৯৬০-এর দশকে ভারতের অর্থনৈতিক সাহায্য নিয়ে দেশটি একটি আধুনিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হতে শুরু করে। তবে এখনো এটি বিশ্বের সবচেয়ে অনুন্নত দেশগুলোর একটি।

১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীনতা লাভের পর ভুটানকে একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে গণ্য করে। ১৯৪৯ সালে ভুটান ও ভারত একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে যেখানে ভুটান ভারতের কাছ থেকে বৈদেশিক সম্পর্কের ব্যাপারে পথনির্দেশনা নেয়ার ব্যাপারে সম্মত হয় এবং পরিবর্তে ভারত ভুটানের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করার প্রতিশ্রুতি দেয়। ১৯৫২ সালে জিগমে ওয়াংচুকের ছেলে জিগমে দর্জি ওয়াংচুক ক্ষমতায় আসেন। তার আমলে ভুটান পরিকল্পিত উন্নয়নের পথে এগোতে থাকে এবং ১৯৭১ সালে জাতিসঙ্ঘের একটি সদস্য রাষ্ট্রে পরিণত হয়। তার সময়েই ভুটানে একটি জাতীয় সংসদ, নতুন আইন ব্যবস্থা, রাজকীয় ভুটানি সেনাবাহিনী এবং একটি উচ্চ আদালত প্রতিষ্ঠা করা হয়।

১৯৭২ সালে ১৬ বছর বয়সে জিগমে সিঙ্ঘে ওয়াংচুক ক্ষমতায় আসেন। তার আমলে ধীরে ধীরে ভুটান গণতন্ত্রায়নের পথে এগোতে থাকে। ২০০৬ সালের ডিসেম্বর মাসে তিনি রাজার পদ ছেড়ে দেন এবং তার ছেলে খেসার নামগিয়েল ওয়াংচুক ভুটানের রাজা হন। ২০০৮ সালের ১৮ জুলাই ভুটানের সংসদ একটি নতুন সংবিধান গ্রহণ করে। এই ঐতিহাসিক দিন থেকে ভুটানে পরম রাজতন্ত্রের সমাপ্তি ঘটে এবং ভুটান একটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্র ও সংসদীয় গণতন্ত্রে পরিণত হয়।

ভুটানের আয়তন ৪৬ হাজার ৫০০ বর্গকিলোমিটার। এর রাজধানী থিম্পু দেশের মধ্য-পশ্চিম অংশে অবস্থিত। ভুটানের ভূপ্রকৃতি পর্বতময়। উত্তরে সুউচ্চ হিমালয় পর্বতমালা, মধ্য ও দক্ষিণ ভাগে নিচু পাহাড় ও মালভূমি এবং দক্ষিণ প্রান্তসীমায় সামান্য কিছু সাভানা তৃণভূমি ও সমভূমি আছে। মধ্যভাগের মালভূমির মধ্যকার উপত্যকাগুলোতেই বেশির ভাগ লোকের বাস। স্থলবেষ্টিত দেশ ভুটানের আকার, আকৃতি ও পার্বত্য ভূ-প্রকৃতি সুইজারল্যান্ডের সদৃশ বলে দেশটিকে অনেক সময় এশিয়ার সুইজারল্যান্ড বলা হয়। বহির্বিশ্ব থেকে বহুদিন বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে ভুটান প্রাণী ও উদ্ভিদের এক অভয়ারণ্য। এখানে বহু হাজার দুর্লভ প্রজাতির প্রাণী ও উদ্ভিদ দেখতে পাওয়া যায়। ভুটানের প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা অরণ্যাবৃত। এই অরণ্যই ভুটানের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করে চলেছে যুগ যুগ ধরে।


আরো সংবাদ