১৭ নভেম্বর ২০১৮

ইসির খায়েশ! ১৫০ আসনেই কি ইভিএম?

ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) - ছবি : সংগ্রহ

খান মোহাম্মদ নুরুল হুদা, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের গুরু দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭। আরো চারজন কমিশনারও একই দিন শপথ গ্রহণের মাধ্যমে নতুন কর্মস্থলে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। শুরু থেকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) বেশ ভালো ভালো শব্দ চয়নে নিরপেক্ষ, অবাধ এবং সর্বজনের তথা দেশবাসীর কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দেয়ার আশাবাদ অদ্যাবধি প্রকাশ করে চলেছেন। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বিষয়ে তার অতিরিক্ত জজবা এবং অতি কথনের কারণে জটিল পরিস্থিতির উদ্ভব যে হয়নি, তা বলা যাবে না।

সর্বশেষ, গত ২১ অক্টোবর ঢাকার আগারগাঁওয়ে নির্বাচন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে নির্বাচনী কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ কর্মশালার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে সিইসি নির্বাচন কমিশন বা ইসির সিদ্ধান্ত এ মর্মে জানান দেন যে, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারে কোনো জীবন্ত প্রাণী ব্যবহার করা যাবে না। প্রচারে জীবন্ত প্রাণীর ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার বাইরে পোস্টারের সাথে ‘কাপড়’ বাদ দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ নির্বাচনে কেউ কাপড়ের তৈরি পোস্টার ব্যবহার করতে পারবেন না। অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ, তবে আচানক সিদ্ধান্ত বটে।

ওই অনুষ্ঠানে সিইসি বলেন, বিভিন্ন জেলায় ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) প্রদর্শনের পর ইতিবাচক মূল্যায়ন পাওয়া গেছে। আগের ব্যবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। ব্যালট বাক্স রাত থেকে পাহারা দিতে হয়। ইভিএম হলে এর প্রয়োজন হয় না। অবশ্য ইভিএম মেশিনের নিরাপত্তা কিভাবে নিশ্চিত করা হবে সে বিষয়ে সিইসি কোনো বক্তব্য দেননি।

এখানে প্রণিধানযোগ্য, সাধারণ নির্বাচনে সারা দেশে অন্যূন চুয়াল্লিশ হাজার ভোটকেন্দ্র এবং দুই লাখ বিশ হাজার বুথ/কক্ষ। এর মধ্যে দুই শতাংশ কেন্দ্র বা বুথ/কক্ষ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং অনধিক ০.১ শতাংশ ভোটারকেও ইভিএম বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া এখন পর্যন্ত হয়ে ওঠেনি। তবে গত ২৪ অক্টোবর দেশের কমপক্ষে আটটি অঞ্চলে ইসির কমিশনারদের উপস্থিতি ও সঞ্চালনায় ইভিএমে ভোট প্রদান হাতে কলমে শেখানোর জোর উদ্যোগ নেয়ার কথা দেশবাসী টিভি এবং পত্রপত্রিকার সুবাদে জানতে পেরেছে। ইসির কমিশনারেরা ছাড়াও (কমিশনার মাহবুব তালুকদার বাদে যিনি এখন দেশের বাইরে) কমিশনের অত্যন্ত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বেশ জোশের সাথে ওইসব মেলায় উপস্থিত ছিলেন সক্রিয়ভাবে।

১৫ অক্টোবর ঢাকার এক প্রতিষ্ঠিত পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় ভারতের চেয়ে ১১ গুণ বেশি দামে ‘ইভিএম মেশিন কিনছে বাংলাদেশ’ শীর্ষক খবরটি শীর্ষ খবর হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। ইভিএম তৈরির জন্য ইতঃপূর্বে কারিগরি পরামর্শ কমিটি গঠন করেছিল ইসি। কিন্তু কমিটির সুপারিশ পুরোপুরি আমলে নেয়া হয়নি। এতদবিষয়ে প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ ও প্রকৌশলী শিক্ষাবিদ প্রফেসর জামিলুর রেজা চৌধুরীর মন্তব্য বড় কালো অক্ষরে ওই প্রতিষ্ঠিত পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় এক জায়গায় নিম্নে বর্ণিতভাবে ছাপা হয়েছে :
‘কারিগরি কমিটিকে জিজ্ঞাসা না করে ইসি সামনের দিকে এগিয়ে গেছে, সাব-কমিটি বৈঠক করে কারিগরি কমিটির সুপারিশ বাদ দিয়েছে। আমার নাম ব্যবহার করা ইসির ঠিক হচ্ছে না।’

উল্লেখ্য, ভোটারদের আস্থা ও গ্রহণযোগ্যতার জন্য কমিটি ইভিএমে ভোটার ভ্যারিয়েবল পেপার অডিট ট্রেইল বা ভিভিপিএটি (যন্ত্রে ভোট দেয়ার পর তা একটি কাগজে ছাপা হয়ে বের হবে) সুবিধা রাখার পরামর্শ দিলেও তা রাখা হয়নি। এতে ভোট পুনর্গণনার বিষয় এলে ইসিকে সমস্যার মুখে পড়তে হতে পারে।

আমাদের নির্বাচন কমিশন কর্তৃক ভারতের সাথে আমাদের কমিশনের তুলনামূলক যে গড় ক্রয় মূল্য উদ্ধৃত করা হয়েছে তা হলো নিম্নরূপ : বাংলাদেশে একটি ইভিএমের দাম কমবেশি দুই লাখ ৩৪ হাজার টাকা। ভারতে ব্যবহৃত ইভিএমের দাম ২১ হাজার ২৫০ টাকা। মোট ব্যয় হবে তিন হাজার ৮২৫ কোটি টাকা (বাংলাদেশী)।

সেপ্টেম্বর মাসের শুরুতে ইভিএম বিষয়ে ইসি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান নির্বাচন কমিশনার নুরুল হুদা বলেছেন, ‘যদি সরকার আইন প্রণয়ন করে, যদি সেটা ব্যবহার করার মতো পরিবেশ পরিস্থিতি আমাদের থাকে, তখন আমরা র‌্যানডমভিত্তিতে ইভিএম ব্যবহার করার চেষ্টা করব। এখন প্রস্তুতিমূলক অবস্থানে আমরা রয়েছি।’ তিনি দাবি করেন, ইভিএম ব্যবহারে নির্বাচন আয়োজনে আর্থিক সাশ্রয় হবে। একজনের ভোট আরেকজন দিতে পারবে না। তিনি জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ইভিএম সুচারুভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। চার হাজার ৪৭১টি ইউপি, ৩৩২ পৌরসভা, ৪৯১ উপজেলায় পর্যায়ক্রমে ইভিএম ব্যবহার করা হবে। সংবিধান অনুযায়ী, আগামী ৩০ অক্টোবর থেকে ২৮ জানুয়ারির মধ্যে একাদশ সংসদ নির্বাচন আয়োজনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে ইসির।

৪ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকায় ‘ইভিএম নিয়ে উৎকণ্ঠা স্বাভাবিক : সিইসি’ শিরোনামে প্রকাশিত খবরটির এক অংশে সিইসির বক্তব্য যেভাবে উদ্ধৃত করা হয়, তা হলো, সিইসি বলেছেন, ‘সরকার যদি মনে করে, সংসদ যদি মনে করে তাহলেই আইন সংশোধন হবে এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা যাবে। কোনো ত্রুটি থাকলে তা ব্যবহার করা হবে না। এখন প্রস্তুতিমূলক অবস্থানে আমরা রয়েছি, এটাকে মাথায় রাখতে হবে। প্রশিক্ষণ নিতে হবে।’ তিনি বলেন, ইভিএম বিষয়ে প্রশিক্ষণ আর প্রচার ভালো হলেই এর ইতিবাচক প্রভাব গ্রামগঞ্জে, ভোটার, রাজনৈতিক মহল ও প্রার্থীর কাছে পৌঁছে যাবে।’

সিইসি আরো বলেন, ‘৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে দৈবচয়ন পদ্ধতিতে কিছু আসন বেছে নিয়ে সেখানে পরীক্ষামূলকভাবে ইভিএম ব্যবহার করতে চাই আমরা, যাতে স্বচ্ছতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন না ওঠে, ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের বিষয় যেন সেখানে না আসে।’ সিইসি বলেন, ‘আমরা যদি মনে করি ২৫টি আসনে ইভিএমে ভোট করব; সেই ২৫টি আমাদের ইচ্ছামতো দেবো না।’ তিনি দাবি করেন, ইভিএম ব্যবহারে নির্বাচন আয়োজনে আর্থিক সাশ্রয় হবে। পাশাপাশি, একজনের ভোট আরেকজন দিতে পারবে না। কিছু মহলের ধারণা, সিইসি আসন্ন সাধারণ নির্বাচনে কমপক্ষে ১৫০টি আসনে ইভিএম ব্যবহারকল্পে জোর প্রস্তুতি নিতে আদাজল খেয়ে প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। সে লক্ষ্যে প্রায় দেড় লাখ ইভিএম ক্রয়ে গভীর মনোনিবেশ সহকারে পরিশ্রম করে সক্রিয় কর্মসাধনে মগ্ন আছেন। কাউকে বা কোনো মহলকে খুশি করার জন্য তিনি ইভিএম সংক্রান্ত গোমর প্রকাশে মনে হয় আরো কয়েক সপ্তাহ মুখে ‘তালা দিয়ে রাখবেন’।

এ দিকে, ১১ সেপ্টেম্বর একই পত্রিকায় প্রকাশিত খবরটিতে ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, ‘সংসদ নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহারে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধনী প্রস্তাব ইসির অনুমোদন পেয়েছে। তা ভেটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তবে ইসি আশা করছে, আরপিওর সংশোধনী পাস হবে। এজন্য সংসদ নির্বাচনে আংশিকভাবে হলেও ইভিএম ব্যবহারের জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছে সাংবিধানিক এই সংস্থাটি।’ হেলালুদ্দীনও ওই ‘আংশিক সংখ্যক’ কত হতে পারে, দেড় শ’ নাকি দুই শ’ আসন, তা স্পষ্ট বলছেন না। কি অদ্ভূত পরিস্থিতি!

ইতোমধ্যে ২৯ জাতীয় সংসদের মেয়াদের শেষ দিনের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে মর্মে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী জানিয়েছেন। এখন আরপিও ইত্যাদির সংশোধন রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে করা হবে মর্মে জোর আশা প্রকাশ করেছেন ইসি সচিব মিডিয়ার সামনে।

এর আগে ১৯ আগস্ট পত্রিকায় ‘ভোটের মূল ব্যয় যাবে ইভিএমে’ শিরোনামে প্রকাশিত খবরটিতে বলা হয়। একাদশ সংসদ নির্বাচনে মূল ব্যয় হবে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) কেনার খাতে। সংসদ নির্বাচনে প্রায় অর্ধেক আসনে প্রাথমিকভাবে ইভিএম ব্যবহারের পরিকল্পনা নিয়ে একটি নতুন প্রকল্প হাতে নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এ প্রকল্পের অধীনে দেড় লাখ ইভিএম কেনা হচ্ছে/হয়েছে। নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় অধিকতর স্বচ্ছতা আনার লক্ষ্যে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ক্রয়, সংরক্ষণ ও ব্যবহার শীর্ষক এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হচ্ছে তিন হাজার ৮২১ কোটি ৪০ লাখ ৬০ হাজার টাকা। এতে প্রতি ইভিএমের দাম পড়বে প্রায় দুই লাখ টাকা বা তার কিছু বেশি। সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের জন্য ইসির মাঠ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। ইভিএমের পরিচিতি বাড়াতে এবং ভোটদানে উৎসাহ দিতে আরো মেলা আয়োজনের পরিকল্পনা নিয়েছে নির্বাচন কমিশন।

ইভিএম প্রকল্পের সাথে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বিভিন্ন সিটি নির্বাচনে নতুন ইভিএমের সফল প্রয়োগের পর নির্বাচন কমিশন একাদশ সংসদ নির্বাচনে ইভিএমে ভোটগ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এমনকি, সদ্য সমাপ্ত পাঁচ সিটি নির্বাচনে ইভিএমে ভোট দেয়ার ধারণা বিষয়ে নাকি ব্যাপক সাড়া পেয়েছে কমিশন। তাই নির্বাচনকে আরো স্বচ্ছ করতে ইভিএমে ভোটগ্রহণের বিকল্প নেই বলে মনে করছেন তারা। ইসির নির্বাচন শাখা জানিয়েছে, স্থানীয় সরকারের নির্বাচন শেষ করেই এখন সংসদ নির্বাচনের কাজ চলছে ইসি সচিবালয়ে। তারা বলছেন, নির্বাচন কমিশনকে ২০১৯ সালের ২৮ জানুয়ারির মধ্যে একাদশ সংসদ নির্বাচন করতে হবে। ডিসেম্বরের শেষ দিকে বা জানুয়ারির শুরুতে নির্বাচন করার জন্য নভেম্বরের মাঝামাঝি তফসিল দিতে হবে।

ইসি কর্মকর্তারা বলছেন, সংসদ নির্বাচন পরিচালনার মোট ব্যয়ের দ্বিগুণ বরাদ্দ রাখা হচ্ছে ইভিএম কেনার জন্য। এজন্য চলতি অর্থবছরে সংসদ নির্বাচন ও অন্যান্য নির্বাচন পরিচালনা ও উন্নয়ন খাতে এক হাজার ৮৯৫ কোটি ২৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হলেও ইভিএম কেনার জন্য হাতে নেয়া হয়েছে নতুন প্রকল্প। তারা বলেছেন, সংসদ নির্বাচনে সম্ভাব্য ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ৪৪ হাজার। প্রায় দুই লাখ দ্ইু হাজার ভোট কক্ষ/বুথ হতে পারে। আর প্রতিটি ভোটকক্ষের জন্য একটি এবং প্রতিটি কেন্দ্রে মোট ভোটকক্ষের অতিরিক্ত একটি ইভিএম রাখা হয়। এ হিসাবে ৩০০ আসনের জন্য নির্বাচনে এর দুই লাখ ৬৪ হাজার ইউনিট দরকার হবে। তাদের কথা, আগামী সংসদ নির্বাচনে অর্ধেকের বেশি আসনে ইভিএমে ভোটগ্রহণ সম্ভব হবে। তবে এর আগে কমিশনকে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ইতোমধ্যে দেড় লাখ নতুন ইভিএম কেনার প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্পন্ন হলো। সূত্র জানিয়েছে, ইভিএমের নতুন প্রকল্পে ছয়টি খাত ধরা হচ্ছে। এর মধ্যে দেড় লাখ ইভিএম কেনা, ভোটারদের মধ্যে সচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ ও বাস্তবায়ন, নির্বাচন কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা বৃদ্ধি, ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত।

ইভিএম কর্মকাণ্ডে এবং আয়োজনে সাম্প্রতিক খরচ
‘ইভিএম নিয়ে বিলাসী আয়োজন : কেন্দ্রপ্রতি ব্যয় তিন লাখ টাকা’ শিরোনামে দৈনিক প্রতিদিন পত্রিকায় প্রকাশিত (০৬/০৬/২০১৮ইং) খবরটি সঙ্গত কারণেই সারা দেশে ব্যাপক জনগোষ্ঠীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বলা হয়, নির্বাচন কমিশন-ইসির ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার নিয়ে নানা আলোচনা সমালোচনা চলছে। ভোটে ইভিএম ব্যবহারের নামে বিলাসী আয়োজন হচ্ছে বলে মনে করছেন ইসির কর্মকর্তারা। তারা বলেছেন, এক-দুই কেন্দ্রে ইভিএম ব্যবহারের জন্য ইসির যুগ্মসচিবসহ অন্যান্য পর্যায়ের প্রায় দুই ডজন কর্মকর্তা পাঠানো হয়। জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগ ও আইসিটি অনুবিভাগের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা ভোটের অন্তত এক সপ্তাহ আগে নির্বাচনী এলাকায় চলে যান। ইসি সচিবালয়ের কর্মকর্তারাও ছোটেন ভোটের আগের দিন।

সব মিলিয়ে ব্যয়বহুল এ প্রযুক্তিকে নিয়ে ভোট পরিচালনায় বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ রাখতে হয়। এ ছাড়া প্রশিক্ষণের নামেও চলছে অর্থ ব্যয়, যা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেকেই। ইসির সূত্র জানিয়েছে, রংপুরে একটি কেন্দ্রে তিন লাখ ৯৫ হাজার টাকা ও খুলনার দু’টি কেন্দ্রে ছয় লাখ ৬৯ হাজার টাকা ব্যয় হয় ইভিএম ব্যবহারে। গড়ে প্রতি কেন্দ্রে সাড়ে তিন লাখ টাকার বেশি অর্থ ব্যয় করছে নির্বাচন কমিশন। এ ক্ষেত্রে ইভিএম সেটসহ আনুষঙ্গিক মালামাল পরিবহন, টিমের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্মানী ভাতা, গাড়ি ভাড়া, ডেকোরেটরসামগ্রী ভাড়া, স্ক্রিনসহ মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর-শব্দযন্ত্র ভাড়া, মাইকিং, প্রদর্শনীর জন্য কাস্টমাইজড মেশিন পরিবহন, অপ্রত্যাশিত ব্যয় ও ভোটের দিন কেন্দ্রে অবস্থানরত কর্মকর্তাদের সম্মানী বাবদ ব্যয় হয় এ অর্থ। সেই সাথে, ইসির বড় বড় কর্মকর্তাদের ইভিএম ব্যবহারের বিষয়ে সফরসহ অন্যান্য খরচ তো আছেই। ইসি সচিবালয়ে নির্বাচন পরিচালনা শাখার কর্মকর্তারা জানান, ইভিএম দিয়ে ভোটগ্রহণের আগে নানা কর্মযজ্ঞে নামতে হয় ইসিকে। সে ক্ষেত্রে দক্ষ জনবল তৈরি করতে ব্যাপক প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নিতে হয়।

নতুন ইভিএম শুরুর প্রাক্কালে এনআইডি উইং মহাপরিচালক রংপুর ভোটের দিন উপস্থিত ছিলেন। ২১ ডিসেম্বর, ২০১৭ সালে রংপুর সিটি নির্বাচনে একটি কেন্দ্রে এবং ১৫ মে, ২০১৮ খুলনা সিটি ভোটে দু’টি কেন্দ্রে ইভিএম ব্যবহার করা হয়। জানা গেছে, ইসির নির্বাচন পরিচালনা শাখার উপসচিব মাহফুজা আক্তার কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ভোটের আগে ৯ মে খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তার অনুকূলে ছয় লাখ ১৬ হাজার টাকা বরাদ্দ দেন। এর আগে ৫ এপ্রিল, ২০১৮ ইভিএম সেটসহ আনুষঙ্গিক মালামাল পরিবহনের ব্যয়ের জন্য পাঁচ কর্মকর্তার অনুকূলে ৭৩ হাজার টাকা মঞ্জুরি দেয়া হয়। রংপুর সিটি নির্বাচনকে সামনে রেখে ১৪ ডিসেম্বর, ২০১৭ ইভিএম ভোট পরিচালনার সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তাকে বরাদ্দ দেয়া হয় তিন লাখ ৫৭ হাজার ৭০০ টাকা। ইভিএম পরিচিতি ও উদ্বোধন অনুষ্ঠানের ব্যয় বরাদ্দ বাবদ ভোটের পরে ৪ জানুয়ারি, ২০১৮ মঞ্জুরি দেয়া হয় আরো ৩৮ হাজার টাকা। এসব খরচপাতি বিবেচনা করলে ইভিএম নিয়ে সামনে পা বাড়ানোর আগে অন্তত ছয় থেকে ১২ মাস সময় হাতে নিয়ে ইভিএম মেলা প্রদর্শনী ইত্যাদি কর্মকাণ্ড বিষয়ে বিশেষত ইভিএম বিষয়ে সাধারণ ভোটারদের পারসেপশন তথা দৃষ্টিভঙ্গি বিষয়ে আরো সময় দেয়া উচিত ছিল।

কয়েক সপ্তাহ আগে সিইসি একাধিকবার সাংবাদিকদের সামনে বলেছিলেন, কিছু ক্ষেত্রে টেস্ট কেস হিসেবে ইভিএম নির্বাচন কমিশন ব্যবহার করলেও করতে পারে। তবে কেউ যদি, ব্যাপকভাবে এর ব্যবহার বিষয়ে জোর জবরদস্তি তথা চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে তবে ইসি তা মানবে না। সিইসি প্রকারান্তরে টিয়া পাখির মতো বলেই যাচ্ছেন, কিছু কিছু ক্ষেত্রে ইভিএম ব্যবহার করা হবে, তবে এ কিছু ক্ষেত্র বলতে তিনি কি এক দেড় শ’ সংসদীয় আসন বুঝাচ্ছেন, নাকি ৬৪টি জেলায় ৬৪টি কেন্দ্রের কথা বুঝাচ্ছেন, তা পরিষ্কার করছেন না। বিষয়টি স্পষ্ট করে বলা আশু জরুরি।

মন্ত্রিসভা অতিসম্প্রতি নির্বাচন কমিশন প্রস্তাবিত ইভিএমের ব্যবস্থা রেখে আরপিও অনুমোদন করেছে এবং এ পরিপ্রেক্ষিতে সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারে ‘যথাসাধ্য’ উদ্যোগ গ্রহণ করবে মর্মে ইসি প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। তবে ২৯ অক্টোবর সাংবাদিকদের সাথে আলাপ প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম বলেন, এখন নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারে অনধিক দশ শতাংশ সক্ষমতা আছে ইসির।

ইভিএম বিষয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের চিন্তাভাবনা তথা চাওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকায় ৮ মে ২০১৭ একটি গুরুত্বপূর্ণ খবর প্রকাশিত হয় যা ছিল এরকম : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটগ্রহণের জন্য ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার করতে চান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। এ ব্যাপারে রাষ্ট্রপতিকে জানিয়েছে দলটি। জানানো হয়েছে নির্বাচন কমিশনকেও। আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা বলেছেন, ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট হলে বিএনপি নির্বাচন নিয়ে যেসব অভিযোগ করে, তা আর করতে পারবে না। নির্বাচনীব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারবেন না বিএনপির নেতারা। এতে ভোটে স্বচ্ছতা আসবে, খরচও কমবে। তারা আরো বলেছেন, একই সাথে এটি তাদের নির্বাচনের একটি কৌশল। বিএনপি যদি এতে নির্বাচন বয়কট করে তাতে সরকারের কিছু করার নেই। জানা যায়, ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী অফিসে এক অনির্ধারিত আলোচনায় আগামী নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের পক্ষে মত দেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়।

এর আগে, ১১ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি মো: আবদুল হামিদের সাথে বৈঠকেও নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের ব্যাপারে দলের আগ্রহের কথা জানান আওয়ামী লীগ নেতারা। দল ও সরকারের নীতিনির্ধারকেরা জানিয়েছেন, ইভিএমে ভোট হলে নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচনে কোটি কোটি ব্যালট পেপার ছাপাতে হবে না। এর ফলে কাগজ খরচ, ছাপা খরচ, পরিবহন খরচ, ভোট গণনার সাথে সংশ্লিষ্ট লোকবলের খরচ সাশ্রয় হবে। ভোট শেষ হলে দ্রুততর সময়ে ফল প্রকাশ করা সম্ভব হবে। তাড়াতাড়ি ফল প্রকাশের কারণে নির্বাচনী সহিংসতাও অনেক কমে আসবে। ভোটের ফল হবে শতভাগ নির্ভুল। ইভিএম পদ্ধতিতে ‘বাতিল ভোট’ দেয়ার কোনো সুযোগ থাকে না। এ ছাড়া ইভিএমের নিরাপত্তায় ‘স্মার্ট’ কার্ড ব্যবহার হওয়ায় প্রিজাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ও সব প্রার্থীর এজেন্ট একজোট হয়ে কেন্দ্র দখল করেও বিশেষ কোনো প্রার্থীর পক্ষে ভোট দেয়া সম্ভব নয়। ভোটগ্রহণ কাজে নিয়োজিত সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার মেশিন থেকে ‘স্মাট’ কার্ড সরিয়ে নিলেই ইভিএম অকার্যকর হয়ে যায়। তবে ‘কাস্টিং’ ভোটের তথ্য মুছে যায় না।

‘কাস্টিং’ ভোটের তথ্য সংরক্ষিত থাকে চারটি মেমোরিতে। এ কারণে কেন্দ্র দখল হলে, মেশিন ছিনতাই হলে বা মেশিন ভাঙচুর হলেও ফল পাওয়া সম্ভব। কোনো কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার, পোলিং অফিসার, সব প্রার্থীর এজেন্ট একজোট হয়ে কেন্দ্র দখল করে বিশেষ প্রার্থীর পক্ষে ভোট দিতে চাইলেও ইভিএম মিনিটে ৫টির বেশি ভোট গ্রহণ করে না। ফলে নির্বাচন নিয়ে কেউ অভিযোগ তুলতে পারবে না। এ কারণে আগামী সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করতে চান ক্ষমতাসীন দল। ধানমন্ডিতে ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সংসদ সদস্যের করণীয়’ বিষয়ে দলের এমপিদের প্রশিক্ষণ কর্মশালায় অংশ নেন সজীব ওয়াজেদ জয়। উদ্বোধন অনুষ্ঠান শেষে দলের নির্বাচনী অফিসে কেন্দ্রীয় নেতাদের সাথে এক অনির্ধারিত আলোচনায় বসেন প্রধানমন্ত্রীপুত্র জয়। এ সময় তিনি একাদশ জাতীয় নির্বাচনে ইলেকট্রিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম ব্যবহারের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিশ্বের সাথে আমাদেরও তাল মিলিয়ে চলতে হবে।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইলেকট্রিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম ব্যবহার করতে হবে। এ জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। সেভাবেই দলের নেতাকর্মী ও নির্বাচনী এজেন্টদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। কেউ ব্যালট ছিনতাই ও কারচুপি করতে পারবে না। সার্বিকভাবে নির্বাচনপদ্ধতিতে স্বচ্ছতা ও স্পষ্টতা আসবে। আওয়ামী লীগ নেতাদের ইভিএম পদ্ধতির পক্ষে জনমত গড়ে তোলার আহ্বানও জানান তিনি। অনির্ধারিত বৈঠকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ২০ মে, ২০১৮ অনুষ্ঠেয় তৃণমূল নেতাদের সাথে বৈঠকে উপস্থিত থাকার জন্য জয়কে আমন্ত্রণ জানান। দলের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটগ্রহণে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম ব্যবহারে দলের পক্ষে যে যে প্রস্তুতি গ্রহণ করা দরকার, তা এখন থেকেই শুরু করতে যাচ্ছে।’

‘দৈনিক বণিক বার্তা পত্রিকায় (৩০/০৮/২০১৮) প্রকাশিত খবরে লিখিত বক্তব্যে (সংবাদ সম্মেলনে) নির্বাচন কমিশনের সচিব হেলালুদ্দীন বলেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১০০টি আসনে ইভিএম ব্যবহারের পরিকল্পনা নিয়েছে ইসি। মূলত সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন কাজ করছে।’ এসবই নির্বাচন কমিশনের খোলামেলা কথা ও প্রত্যয়।
ইভিএম নিয়ে এতসব কথাবার্তার ডামাডোলে এবং ঐক্যজোটের সাথে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংলাপে বেশির ভাগ জনগোষ্ঠীর আশা আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটুক- এ আশাবাদ ব্যক্ত করতে চাই। হ
লেখক : সাবেক সচিব, সাবেক এপিডি, ইউএনডিপি সাহায্যপুষ্ট, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন শক্তিশালীকরণ প্রকল্প (২০০১)


আরো সংবাদ