১৭ নভেম্বর ২০১৮

সৌদি-ইসরাইল সম্পর্কের অন্তরালে

সৌদি-ইসরাইল সম্পর্কের অন্তরালে - ছবি : সংগৃহীত

মুসলিম বিশ্বের ‘ইমাম’ দাবিকারী সৌদি আরব এবং ইহুদিবাদী রাষ্ট্র ইসরাইল পরস্পরের প্রতি প্রকাশ্যে খুব বেশি ঘনিষ্ঠ ছিল না। কিন্তু বৈশ্বিক পররাষ্ট্রনীতিতে একটি কথা প্রচলিত আছে, শত্রুর শত্রু আমার বন্ধু অর্থাৎ অভিন্ন স্বার্থ প্রবল শত্রুকেও খুব কাছের দোস্তে পরিণত করে। তাই সময়ের এক অনিবার্য ধারাবাহিকতায় বিশ্ব মুসলিম সেন্টিমেন্ট উপেক্ষা করে সৌদি আরব এখন মৈত্রী গড়েছে মুসলিম নিধনকারী অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইলের সাথে। ২০১৭ সালের জুনে মোহাম্মদ বিন সালমান সৌদির যুবরাজ নিযুক্ত হওয়ার পর এ দু’টি দেশের এক কাতারে এসে দাঁড়ানোর পেছনে সিরিয়া ও ইয়েমেনের রাজনৈতিক গোলযোগ সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখলেও তাদের একে অন্যের প্রতি দরদের বিষয়টি সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ডের পর বিশ্বের কাছে আরো ভালোভাবে উন্মোচিত হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইসরাইল সরকারের এক কর্মকর্তা অস্ট্রেলীয় সংবাদমাধ্যম দ্য সিডনি মর্নিং হেরাল্ডকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মতো করেই খাশোগি হত্যার দায় থেকে সৌদি আরবকে নিষ্কৃতি দিতে চাইছে ইসরাইল। ওই সংবাদমাধ্যম তাই ‘খাশোগি হত্যাকাণ্ড সত্ত্বেও সৌদি যুবরাজের পাশে ইসরাইল’ শিরোনামে খবর প্রকাশ করেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তীব্র ক্ষোভ আর নিন্দা তোয়াক্কা না করে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, খাশোগির হত্যারহস্য উন্মোচনের সমান্তরালে সৌদি আরবের স্থিতিশীলতা তার দেশের জন্য জরুরি। ওই হত্যাকাণ্ডে যখন সৌদি সরকারের উচ্চপর্যায়ের ইন্ধন এবং যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ঘুরেফিরে আসছে, ঠিক সে সময় সৌদি স্থিতিশীলতার ওপর জোর দিলেন নেতানিয়াহু। ২ অক্টোবর তুরস্কের ইস্তাম্বুলে সৌদি কন্স্যুলেট ভবনে প্রবেশের পর নিখোঁজ হন সৌদি সরকার এবং মোহাম্মদ বিন সালমানের গৃহীত বিভিন্ন নীতির কঠোর সমালোচক ও অনুসন্ধানী সাংবাদিক জামাল খাশোগি। কন্স্যুলেট ভবনে তার হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার কথা স্বীকার করলেও এর সাথে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান কিংবা অন্য কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ নাকচ করে আসছে দেশটি। তবে সৌদি আরবের এমন দাবি মানছে না তুরস্কসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বড় অংশ।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানবিরোধী রাজনীতির স্বার্থে সৌদি-ইসরাইল সম্পর্ককে যুক্তরাষ্ট্র যেমন দেখতে চায়, নেতানিয়াহুর মন্তব্য তারই প্রতিফলন। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নিজেও বলেছেন, ইরানবিরোধী অবস্থান সমুন্নত রাখা তার জন্য খাশোগি হত্যা রহস্য উন্মোচনের মতোই জরুরি। সৌদি যুবরাজের দিকে ইঙ্গিত করে তুরস্কের অভিযোগ, সৌদি রাজতন্ত্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে খাশোগিকে হত্যা করা হয়েছে। এ দিকে ইরান ও তুরস্কের বিরুদ্ধে মোহাম্মদ বিন সালমানকে অপরিহার্য উপাদান হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু। এ কারণে সব অভিযোগ ও নিন্দা এড়িয়ে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে রক্ষা করা এ দু’টি দেশের জন্য খুবই জরুরি।

সৌদি আরব ও ইসরাইল মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ দিনের পরীক্ষিত ও ঘনিষ্ঠ মিত্র। গত কয়েক দশকে যুক্তরাষ্ট্র যখনই কোনো রাষ্ট্রের ওপরে আক্রমণ শুরু করেছে, তখন আর কেউ না হোক এ রাষ্ট্র দু’টি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ইন্ধন দিয়েছে। এর পেছনে ইসরাইলের অস্ত্রবাণিজ্যের প্রসার আর সৌদি বাদশাদের রাজত্ব জারি রাখার অভিপ্রায় পূর্ণিমার চাঁদের মতোই পরিষ্কার। গত এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক সাময়িকী দ্য আটলান্টিককে দেয়া সাক্ষাৎকারে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান স্পষ্ট করে বলেছেন, বহু বিষয়ে ইসরাইলের সাথে সৌদি আরবের অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে।

সৌদি যুবরাজের ইসরাইলপ্রীতি এতটাই বেড়েছে যে, ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসকে ধমক দিতেও ছাড়েননি তিনি। গত মে মাসে টেবিলে বসে আলোচনার মাধ্যমে বিদ্যমান সমস্যার সমাধান করতে ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের প্রতি নির্দেশের সুরে আহ্বান জানান সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। আর তা না করলে অভিযোগ না করে চুপ থাকার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের দেয়া শান্তি প্রস্তাবের শর্তগুলো অবশ্যই ফিলিস্তিনি নেতাদের মানতে হবে। দ্য ফক্স নিউজ ও টাইমস অব ইসরাইলের খবরে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক একটি ইহুদি গোষ্ঠীর নেতাদের সাথে আলাপে ফিলিস্তিনের প্রতি এসব কথা বলেন যুবরাজ সালমান। ফিলিস্তিনের নেতৃত্বের প্রতি মোহাম্মদ বিন সালমান বলেন, ‘সমস্যা সমাধানে আলোচনার জন্য টেবিলে বসুন। আর তা না করলে অভিযোগ জানানো বন্ধ করে চুপচাপ থাকুন।’

সৌদি যুবরাজ বলেন, ‘গত কয়েক দশকে শান্তির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ফিলিস্তিনি নেতারা একের পর এক সুযোগ হাতছাড়া করেছেন। এখন সময় এসেছে ফিলিস্তিনিদের প্রস্তাব গ্রহণ করার এবং আলোচনার টেবিলে আসা অথবা চুপ থেকে অভিযোগ দেয়া বন্ধ করা।’ যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়ে মার্কিন সংবাদ সাময়িকী দ্য আটলান্টিককে সৌদি যুবরাজ এক সাক্ষাৎকার দেন। দ্য আটলান্টিকের প্রধান সম্পাদক জেফরি গোল্ডবার্গ সৌদি প্রিন্সের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, নিজেদের পিতৃপুরুষের ভূমিতে একটি জাতিরাষ্ট্র হিসেবে ইহুদিদের বসবাসের সুযোগ আছে বলে তিনি মনে করেন কি না। জবাবে যুবরাজ বলেন, ‘আমি মনে করি, যেকোনো মানুষের একটি শান্তিপূর্ণ রাষ্ট্রে বসবাসের অধিকার রয়েছে। আমি বিশ্বাস করি, নিজেদের ভূমির ওপর ফিলিস্তিনি ও ইসরাইলিদের অধিকার আছে। কিন্তু আমাদের এখন একটি শান্তিচুক্তি দরকার, যাতে সব পক্ষই স্থিতিশীল ও স্বাভাবিক একটি সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে।’ ২০০২ সাল থেকে চলা আরব শান্তি উদ্যোগের প্রধান পৃষ্ঠপোষক সৌদি আরব। তাদের স্বপ্নÑ দু’টি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনি ও ইসরাইলিদের সঙ্কট সমাধান হবে।

এ দিকে ২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত ইরান পরমাণু চুক্তি থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করার মধ্য দিয়ে এমনিতেই নতুন আঞ্চলিক যুদ্ধরেখা টেনে রেখেছেন ট্রাম্প। ইউরোপীয়, রুশ ও চীনা স্বাক্ষরকারীরা নিজেদের এ চুক্তিতে যুক্ত রেখেছে। আর এ ক্ষেত্রে ইরানবিরোধী যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভরসার জায়গা হয়ে উঠেছে তেহরানের শত্রুদেশ সৌদি আরব। সে কারণেই খাশোগি হত্যার ঘটনা নিয়ে বিশ্বজুড়ে যে নিন্দার ঝড় উঠেছে, তাতে বেকায়দায় রয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও। এরপরও সৌদি আরবের কাছে অস্ত্র বিক্রি বন্ধ রাখতে অস্বীকৃতি জানিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

অন্য দিকে মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোকে সমর্থন দিচ্ছে তুরস্ক এবং মধ্যপ্রাচ্যে শিয়া জনগোষ্ঠীকে শক্তিশালী করতে ভূমিকা অব্যাহত রেখেছে ইরান; যা ইসরাইল তার ভূখণ্ডের জন্য এবং সৌদি আরব তার রাজতন্ত্রের জন্য হুমকি মনে করে। ফলে তুরস্ক ও ইরানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সৗদি আরব এবং ইসরাইলের এক ও অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও তুরস্কের প্রভাব ঠেকানোর প্রচেষ্টায় ৩৩ বছর বয়সী যুবরাজকে নিজেদের পাশে রাখতে চায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল।


আরো সংবাদ