১৭ নভেম্বর ২০১৮

ইরানের ওপর মার্কিন অবরোধ ও এর পরিণতি

ইরানের ওপর মার্কিন অবরোধ ও এর পরিণতি - ছবি : সংগৃহীত

আমেরিকা ইরানের বিরুদ্ধে তার নৃশংস ও নিষ্ঠুর অর্থনৈতিক যুদ্ধ আবার শুরু করেছে। নতুনভাবে ও নতুন পর্যায়ে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপের মাধ্যমে এই যুদ্ধ শুরু করা হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন বলেছে, তাদের লক্ষ্য হলো ইরানের তেল রফতানি কমিয়ে একেবারে শূন্যে নিয়ে আসা। অবশ্য এ ক্ষেত্রে কয়েকটি দেশকে ছাড় দেয়ার ব্যাপারেও আলাপ-আলোচনা চলছে। এ ধরনের উদ্যোগ আয়োজন ইরানকে দেউলিয়া করে দিতে পারে। ফলে সরকার জনগণের সেবা করার সামর্থ্য বা সক্ষমতাও হারাতে পারে। আর সরকার জনগণকে সেবা দিতে ব্যর্থ হলে সেখানে সরকারবিরোধী বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়তে পারে।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোলটন ট্রাম্প প্রশাসনের এই উদ্যোগের পেছনে যুক্তি প্রদর্শন করে বলেন, তিনি ইরানে যুুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুভাবাপন্ন একটি নতুন সরকার প্রতিষ্ঠা করতে চান।

গত বছর প্যারিসে এক সম্মেলনের মাধ্যমে বিরোধী গ্রুপ মুজাহিদিনে খালকের (এমইকি) কাছে এই পরিকল্পনার ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন তিনি। অবশ্য তিনি তার এই বক্তব্য থেকে সরে এসে এটাও বলেছেন, সরকার পরিবর্তন করা ‘আমেরিকার নীতি নয়।’

আমেরিকা ইরানের বিরুদ্ধে কেবল অর্থনৈতিক যুদ্ধ নয়, বরং একটি সামরিক ও কৌশলগত জোট গঠন করে ইরানকে ধ্বংস করতে চায়। গত সপ্তাহে বাহরাইনে অনুষ্ঠিত মানামা সংলাপের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল এটি। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাটিস ইরানকে টার্গেট করে এ বিষয়ে বক্তব্য রাখেন। এ জন্য ম্যাটিস সুন্নি আরব রাষ্ট্রগুলোকে নিয়ে আরব ন্যাটো গঠন এবং মধ্যপ্রাচ্যের এই কৌশলগত জোটের সাথে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ইসরাইলকেও সংযুক্ত করার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। প্রাথমিকভাবে বাইরে থেকে এ জোটকে সমর্থন দিয়ে যাবে ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন। কিন্তু এই দ্বিমুখী সামরিক-অর্থনৈতিক কৌশল ব্যর্থতায় পর্যবসিতও হতে পারে এবং তা ঘটলে সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অবমাননাকরভাবে এর অবসান ঘটবে।

পর্যবেক্ষকদের অভিমত হচ্ছে- এই দ্বিমুখী সামরিক-অর্থনৈতিক কৌশল ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অপমানজনকভাবে এর পরিসমাপ্তি ঘটবে। মাঝারি মেয়াদে তথা মাঝামাঝি পর্যায়ে এসে এটা বুমেরাং হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্ররা ক্রমেই প্রভাব হারিয়ে ফেলবে। অপর দিকে, ইরান আস্থা ও ক্ষমতা অর্জন করবে। সবচেয়ে খারাপ দৃশ্যপট হিসেবে দেখা যাবে একটি যুদ্ধÑ যে যুদ্ধের ফলাফল হবে সুদূরপ্রসারী। তাদের মতে, ট্রাম্পের অবরোধ বা নিষেধাজ্ঞার নীতি নানা অসঙ্গতিতে ভরা। এই অবরোধ নীতি কার্যকর হবে না।

ভুল হিসাব
একটি বিষয় খুবই উল্লেখযোগ্য, ফ্রান্স এবং জার্মানি সাথে সাথে ব্রিটেনও যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ইরানের সাথে তাদের ব্যবসায়-বাণিজ্য অব্যাহত রাখার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছে। তারা একটি ‘স্পেশাল পারপাস ভেহিকল’ সৃষ্টির দিকে তাকিয়ে আছে- যেটা তাদেরকে মার্কিন ডলারের মাধ্যমে ইরানের সাথে ব্যবসায় অব্যাহত রাখার সুযোগ দেবে। ইরানি তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা চীনের বিষয়টিও অধিক গুরুত্বপূর্ণ। চীনের দু’টি বড় রাজ্যের তেল কোম্পানি ইরান থেকে তেল কেনা বন্ধ করে দিলেও প্রকৃতপক্ষে চীন ইরান থেকে বিপুল পরিমাণ তেল কেনা অব্যাহত রাখতে চায়।

এ দিকে ইরান থেকে তেল আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আটটি দেশের ক্ষেত্রে শিথিল করছে যুক্তরাষ্ট্র। ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া এই আটটি দেশের মধ্যে রয়েছে। তেহরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর এসব দেশকে ইরান থেকে তেল কিনতে দিতে রাজি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইউরোপীয় দেশগুলো, রাশিয়া ও চীন ইরানকে তেল ও গ্যাস রফতানি অব্যাহত রাখার অনুমতি দেয় গত ৬ জুলাই। চীনের একজন কর্মকর্তা সম্প্রতি রয়টার্সকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তেল কেনার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে আলোচনা চলছিল এবং কয়েক দিনের মধ্যে এর ফলাফল প্রত্যাশা করছি। একজন চীনা কর্মকর্তা জানান, ‘আমরা মনে করি, ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো চীনকেও কিছু ইরানি তেল আমদানি করতে দিতে সম্মত হবেন ট্রাম্প।’

অবরোধ বা নিষেধাজ্ঞা অথবা অন্য কোনো উপায়ে চীনকে শাস্তি দেয়ার অপশন ট্রাম্পের জন্য খোলা আছে। তবে এমনকি তিনি সম্ভবত চীনের সাথে অর্থনৈতিক যুদ্ধের দ্বিতীয় কোনো ফ্রন্ট খুলবেন না। নরেন্দ্র মোদির ভারতের সাথেও একই বিবেচনায় হয়তো ইরানি তেল আমদানিতে বাধা দেবেন না। ট্রাম্প কি ভারতকে তার শত্রুর দলে ঠেলে দেবেন?
এর অর্থ হচ্ছেÑ ট্রাম্প প্রশাসন ইরানকে নিয়ে হিসাব-নিকাশে ভুল করছে। ট্রাম্প মনে করছেন, তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ইরানকে শায়েস্তা করার জন্য পাশে পাবেন। তার এই ভুল হিসাব যুক্তরাষ্ট্র্রের জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে। ট্রাম্প অত্যন্ত বড় ঝুঁকি নিয়ে খেলছেন। তিনি ব্যর্থ হলে বা হেরে গেলে আমেরিকার আন্তর্জাতিক ক্ষমতা ও প্রভাব-প্রতিপত্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজের দেশের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করেছেন। ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করায় শেষ পর্যন্তÍ তার পরাজয়ই ঘটবে। এক টুইটে গত শনিবার তিনি এ কথা বলেন। তেহরানে শিক্ষার্থীদের এক সভায় দেয়া বক্তৃতার কিছু অংশ খামেনি ওই টুইটে তুলে ধরেন। তিনি লিখেছেন, আমেরিকার নতুন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আমেরিকার মর্যাদার অবশিষ্টাংশও ক্ষুণœ করেছেন। একই সাথে ধ্বংস করেছেন উদার গণতন্ত্রকে।

ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার ঘোষণা দিয়েছে ইরান। গত সোমবার ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি দেশের অর্থনীতিবিদদের সাথে এক আলোচনায় বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র জ্বালানি, ব্যাংকিং খাতসহ ইরানের ওপর যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, তার দেশ সেটি মানবে না। ইরান জ্বালানি তেল বিক্রি অব্যাহত রাখবে।

আমরা জানি, পারমাণবিক কর্মসূচি স্থগিত রাখার শর্তে ২০১৫ সালে ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রসহ ছয় পশ্চিমা দেশের চুক্তি হয়। চলতি বছরের মে সাসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চুক্তি থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেন এবং আগস্ট মাসে ইরানের ওপর প্রথম দফায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্র দেশটির ওপর নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালের ঘোষণা দেয়। ৫ নভেম্বর এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়। তবে চুক্তিতে সই করা বাকি পাঁচ দেশ- যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া ও চীন চুক্তিটি টিকিয়ে রাখার পক্ষে। নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালের পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। জাতিসঙ্ঘের তদন্ত কর্মকর্তারা বলেছেন, ইরান ২০১৫ সালে করা চুক্তির শর্ত মেনে চলছে। আমেরিকার মিত্র দক্ষিণ কোরিয়া বলেছে, তারা ইরানের কাছ থেকে তেল আমদানি অব্যাহত রাখতে পারবে। জাপানও তেল কিনতে পারবে বলে জানিয়েছে। ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার প্রতি সমর্থন জানানো একমাত্র দেশ হলো ইসরাইল।

কয়েক দশক ধরে মার্কিন প্রেসিডেন্টরা তাদের শত্রুদের ঘায়েল করে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য মার্কিন ডলারের রিজার্ভকে ব্যবহার করে আসছেন। অর্থনৈতিক শক্তির কারণে আমেরিকা তার শত্রুদের ওপর হামলা চালিয়েছে এবং মিত্র ও বন্ধুদের পুরস্কৃত করে এসেছে। সামরিক শক্তির চেয়েও এই অর্থনৈতিক প্রতিপত্তি আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে শুরু করা অর্থনৈতিক যুদ্ধে ব্যর্থ হলে পর্যবেক্ষকেরা মনে করেন, মার্কিন ডলার আর বেশি দিন পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে অস্ত্র হিসেবে যে ব্যবহার করা যাবে না বিশ্বের প্রতি এটাই হবে একটি ইঙ্গিত। ইরানের সাথে সই করা পরমাণু চুক্তি বাতিল করে দেয়ার জন্য ট্রাম্পকে অনেক বেশি মূল্য দিতে হবে বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করে। ইরান নিয়ে ট্রাম্পের খেলা ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্র একটি কাগুজে বাঘ বলে প্রমাণিত হবে। ফলে হয়তো বিশ্বব্যাপী মার্কিন আধিপত্যের অবসান আমরা দেখতে পাবো, প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর অর্থনৈতিক উত্থানও হয়তো আমাদের দৃষ্টিগোচরে আসবে এবং মার্কিন অর্থনীতিকে চাপের মুখে পড়তেও হয়তো দেখব। বুদ্ধিবৃত্তিক জল্পনা-কল্পনায় দেখা যাবে, নেতৃস্থানীয় দেশগুলোর সমন্বয়ে গঠিত জি-৭ গ্রুপ শিগগিরই ভেঙে দুই ভাগ হয়ে যেতে পারে।

নতুন বিশ্বব্যবস্থায় এটা স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে, আমেরিকা বিশ্বের স্থিতিশীলতা রক্ষায় বড় কোনো ভূমিকা পালনে আর হয়তো সক্ষম হবে না। আমেরিকা ইরাকে আগ্রাসন চালিয়ে সেখানে ধ্বংস ডেকে এনেছে এবং দেশটিকে নৈরাজ্যের দিকে ঠেলে দিয়েছে। মার্কিন মিত্র সৌদি আরব সাংবাদিক জামাল খাশোগির হত্যাকাণ্ড এবং ইয়েমেন যুদ্ধের মাধ্যমে নিজেদের অন্তঃসারশূন্যতারই প্রমাণ দিয়েছে। ইরানেও নানা ধরনের সঙ্কট ও অভ্যন্তরীণ সমস্যা আছে। তারপরও দেশটিতে স্থিতিশীলতা রয়েছে। ট্রাম্পের আমেরিকা অবিশ্বাস্যভাবে এবং ক্রমবর্ধমানভাবে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অস্থিতিশীলতার দিকে ধাবিত হচ্ছে।


আরো সংবাদ