১৭ নভেম্বর ২০১৮

চাঙ্গা আওয়ামী লীগ, মাঠে নামতে পারছেনা বিএনপি-জামায়াত

-

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণের তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে আগামী ২৩ ডিসেম্বর। এ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন ১৯ নভেম্বর। মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের দিন ২২ নভেম্বর। আর প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন ২৯ নভেম্বর। বৃহস্পতিবার (৮ নভেম্বর) প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নরুল হুদা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন। নির্বাচনে তারিখ ঘোষণার পর চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার ১৬ ইউনিয়ন ও ২ পৌরসভায় আনন্দ মিছিল বের করে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠন।

জানা গেছে, আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে গত কয়েক মাস ধরে ব্যস্ত সময় পার করছে মিরসরাই উপজেলা আওয়ামী লীগ। প্রতিদিন উপজেলার ১৬ ইউনিয়ন ও ২ পৌরসভার কোথাও না কোথাও বর্ধিত সভা, উঠান বৈঠকসহ নানা কর্মসুচি পালন করছে। শুক্রবার খাঁন সিটি সেন্টারে তৃণমূলের বর্ধিত সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ইতমধ্যে উপজেলার সকল ভোট কেন্দ্রের কেন্দ্র কমিটিও প্রায় চুড়ান্ত। নির্বাচনকে ঘিরে দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে চাঙ্গাভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

অন্যদিকে বিপরিত চিত্র মিরসরাই উপজেলা বিএনপি ও ২০ দলীয় জোটের প্রধান শরীক দল জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীদের। মামলা, হামলা গ্রেপ্তারের ভয়ে বাড়ি ছাড়া শত শত নেতা-কর্মী। মিরসরাই ও জোরারগঞ্জ থানায় প্রায় প্রতিদিনই গ্রেপ্তার হচ্ছে নেতা-কর্মীরা। অনেকে কারাগারে রয়েছে। অনেকে আদালতে হাজিরা দিতে ব্যস্ত রয়েছে। তৃণমুল কর্মী সমর্থকেরাও ঝিমিয়ে পড়েছে। তবে কেন্দ্র থেকে নির্দেশনা পাওয়া মাত্র তারা মাঠে অবস্থান করবেন বলে উপজেলা বিএনপির এক সিনিয়র নেতা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) আবাস দিয়েছেন।

জানা গেছে, সারা দেশের ৩শ সংসদীয় আসনের মধ্যে অন্যতম একটি চট্টগ্রাম ১ (মিরসরাই) আসন ভৌগলিক দিক থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় সংসদের ২৭৮তম আসনটি ১৬ টি ইউনিয়ন, ২টি থানা ২টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত। মোট ভোট কেন্দ্র রয়েছে ১০৩টি। পূর্বে পাহাড় আর পশ্চিমে সমুদ্র বেষ্টিত উপজেলাটি প্রচুর পর্যটন সম্ভাবনাময় এলাকা।

জানা গেছে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দ্বিতীয় মেয়াদে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে বেশ শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছেন তারা। প্রতিনিয়িত মিছিল মিটিং আর সমাবেশের মাধ্যমে দলের নেতা-কর্মীদের চাঙ্গা রেখেছেন। তবে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী আলহাজ্ব গিয়াস উদ্দিনের অনুসারীরা দীর্ঘদিন ধরে কোনঠাসা রয়েছেন।

জানা যায়, গত ২ বছর আগে থেকে নেওয়া নির্বাচনী প্রস্তুতি হিসেবে প্রতিটি ইউনিয়নে জনসভা, বর্ধিত সভা, উপকারভোগী সভা, পথসভা করেছে উপজেলা আওয়ামী লীগ। এখন পাড়ায় পাড়ায় নির্বাচনী উঠান বৈঠক করছে দলটি। গত ২৯ সেপ্টেম্বর উপজেলার ১১ টি স্পটে পথসভাও সম্পন্ন করেছেন বর্তমান সাংসদ, গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ করছেন তিনি। ইতিমধ্যে আগামী নির্বাচনে বর্তমান সাংসদের এই আসন থেকে মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে অনেকটা নিশ্চিত বলে জানান নেতৃবৃন্দ। বসে নেই আওয়ামী লীগের ভাতৃপ্রতিম ও সহযোগী সংগঠন গুলো। মাঠের রাজনীতি সক্রিয় রেখেছে ছাত্রলীগ।

গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দশ বছরের উন্নয়নের কর্মকান্ড তুলে ধরছেন ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ। গঠিত হয়েছে বিভিন্ন ইউনিয়ন ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি। যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও শ্রমিক লীগের নেতৃবৃন্দ ব্যানার আর ফেস্টুনে নির্বাচনী প্রচারণায় মহাব্যস্ত। ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে বিভিন্ন ওয়ার্ডের কেন্দ্র কমিটি। নিয়মিত চলছে কর্মসূচি।

অন্যদিকে নির্বাচনী দিনক্ষণ যত ঘনিয়ে আসছে ততই মিরসরাই উপজেলা বিএনপিতে সংকট ঘনিভূত হচ্ছে। এতদিন মাঠের রাজনীতিতে সোচ্চার থাকা প্রথম সারির নেতাদের অনেকেই এখন মামলায় জড়িয়ে চৌদ্দ শিকের (কারাগার) ভেতর আটকে আছেন। তবে নির্বাচনী প্রস্তুতিতে আপাতত স্থানীয় বিএনপির শীর্ষ দুই নেতার ওপর ভরসা রাখছেন দলটির তৃণমূল পর্যায়ের নেতারা।

জানা গেছে, জেলার মিরসরাই, জোরারগঞ্জ ও সীতাকুণ্ড থানায় বিভিন্ন সময়ে দায়েরকৃত প্রায় ৩০টির মত মামলায় মিরসরাই উপজেলা বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল ও কৃষকদলের প্রায় পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মীকে আসামী করা হয়। এসব মামলায় অধিকাংশ নেতাকর্মীকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাবন্দি থাকতে হয়েছে।

সর্বশেষ গত ২৩ অক্টোবর রাতে চট্টগ্রাম নগরীর একটি অভিজাত হোটেল থেকে মিরসরাই বিএনপির শীর্ষস্থানীয় দুই নেতাসহ ১২জনকে আটক করে নগরীর কতোয়ালী থানা পুলিশ। গুরুত্বপূর্ণ নেতারা হলেন, উপজেলা বিএনপির সাবেক আহবায়ক আব্দুল আউয়াল চৌধুরী ও যুগ্ম আহবায়ক শাহীদুল ইসলাম চৌধুরী। এর আগে উচ্চ আদালত থেকে জামিন নেয়া একটি মামলায় নিম্ন আদালত জামিন বাতিল করলে গত ১৪ অক্টোবর কারাবন্দি হন উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব সালাউদ্দিন সেলিম। অবশ্য তিনি ইতোমধ্যে জামিনে বেরিয়েছেন।

জানা গেছে, মাঠের রাজনীতি থেকে অনেকটা দুরে জাতীয়তবাদী দল বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠন সহযোগী সংগঠন গুলো। গত এক বছরে উপজেলায় দৃশ্যমান কোন কর্মসূচি পালন করতে পারেনি তারা। একের পর এক মামলার ভারে অনেকটা নিষ্ক্রিয় সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। একে তো উপজেলা বিএনপি কয়েকটি গ্রুপে বিভক্ত,তার উপর সরকারী দলের দমন নিপিড়নে কোনঠাসা। উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বহিস্কৃত উপজেলা চেয়ারম্যান নুরুল আমিনের বিরুদ্ধে ২৮টি মামলা রয়েছে। গত কয়েক বছরে ৩বার কারা বরণ করেছেন তিনি। ১৫টির অধিক মামলা নিয়ে কারাবরণ করেছেন উপজেলা বিএনপির আহবায়ক নুরুল আমিনও। সদস্য সচিব সালাহ উদ্দিন সেলিমের বিরুদ্ধে রয়েছে ১২টির অধিক মামলা। তিনি ৩ বার কারাবরণ করেছেন। উপজেলা বিএনপির যুগ্ম, আহবায়ক গাজী নিজাম, বারইয়ারহাট পৌরসভা বিএনপির আহবায়ক দিদারুল আলম মিয়াজীও ২০টি অধিক মামলা নিয়ে বেশ কয়েক বার কারাবরণ করেছেন। তারপরও আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তফশিল ঘোষণার পর মাঠে নামার প্রস্তুতি রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করেছে।

উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব সালাহ উদ্দিন সেলিম বলেন, মিরসরাই বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল অঙ্গ সংগঠনের শত শত নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের পোষা প্রশাসন মিথ্যা গায়েবী মামলা দিয়ে স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে বাঁধা সৃষ্টি করছে। অনেক নেতা-কর্মী এখনো কারাগারে রয়েছে। এমন কোন দিন নেই যে পুলিশ বাড়ি বাড়ি গিয়ে তল্লাসী করছেন। তারপরও আমরা দলীয় কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছি। আগামীতেও কেন্দ্র ঘোষিত সকল আন্দোলনে বিএনপির সকল নেতা-কর্মীদের সাথে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে রাজপথে থাকবো।

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, খালেদা জিয়াকে ছাড়া বিএনপি নির্বাচনে যাবে না। আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহনের ব্যাপারে আমরা ঐক্যফ্রন্টের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করছি। নির্বাচনের জন্যও আমরা প্রস্তুত রয়েছি। যদিও আওয়ামী লীগে লেভেলপ্লেয়িং এর কথা বলে মিথ্যাচার করছে। মূলত জোর পূর্বক ভোট গ্রহণের সকল প্রস্তুতি তাঁরা সম্পন্ন করেছে। তফসিল ঘোষণার পর কেন্দ্রের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তি রাজনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনা করা হবে। উপজেলা বিএনপির সকল নেত-কর্মী আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত রয়েছে।

উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও করেরহাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এনায়েত হোসেন নয়ন বলেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আমরা সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছি। উপজেলার ১৬ ইউনিয়ন ও ২টি পৌরসভায় দলীয় বর্ধিত সভার পাশপাশি কেন্দ্র কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রতিদিন উপজেলার বিভিন্ন জায়গায় উঠান বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মিরসরাই উপজেলায় রেকর্ড পরিমান উন্নয়ন হয়েছে। আমাদের প্রিয় নেতা, মিরসরাই মাটি ও মানুষের পরম আপনজন মাননীয় গৃহায়ন ও গনপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের নেতৃত্বে বিগত ১০ বছরে মহামায়া, ফায়ার সার্ভিস ষ্টেশন, বিসিক শিল্পনগরী, রাস্তা-ঘাট, পুল-কালভার্ট, বিদ্যুতায়ন, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ভবন নির্মাণ সহ ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকান্ড হয়েছে। এখানে গড়ে উঠছে সর্ববৃহৎ অর্থনৈতিক অঞ্চল। আগামী নির্বাচনে মিরসরাইবাসী নৌকা প্রতিকে ভোট দিয়ে আবারো আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনবে ইনশাআল্লাহ।


আরো সংবাদ