১৭ নভেম্বর ২০১৮

টক তেঁতুল যখন মিষ্টি লাগে

-

নির্বাচনের আগে সংলাপের কোনো প্রয়োজন নেই- মর্মে সরকার অত্যন্ত আপসবিমুখ থাকলেও সম্প্রতি বিএনপিসহ সব দলের সাথেই সংলাপ করেছেন এবং ক্ষুদ্র পরিসরেও আরো আলোচনা হচ্ছে ও হবে বলে জানা যায়। স্বাধীনতা-পূর্ব থেকেই এ দেশের সংলাপের ইতিহাস অনেক রূঢ়, অনেক কণ্টকময়। ব্যর্থ হয়ে ছিল মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠক বা সংলাপ, স্বাধীনতার পর যে কয়টি সংলাপ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে হয়েছে তাহাও সফলকাম হয়নি। জাতি মাঝে মধ্যে ঐক্যবদ্ধ হলেও মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলন ছাড়া এর স্থায়িত্ব ঘটেনি, যেমনটি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের সাংবিধানিক সংশোধনকে আরো একটি সংশোধনে বাতিল করে সরকার বলছে যে, সংবিধান থেকে একচুলও তারা এখন আর ‘নড়বে’ না।

এ ‘নড়ানো’ বা ‘না নড়ানো’ থেকেই জাতির দ্বিধাবিভক্তি, তবে ‘নড়ানোর’ পক্ষেই বেশি ধাবিত হচ্ছে। একসময় সরকার বলত যে, পাকিস্তানপন্থী আগুন সন্ত্রাসী বিএনপি জায়ামাত নির্বাচিত দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন চায় না, কিন্তু এখন দেখা যায় স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে যারা বীর যোদ্ধা ছিল তারাও ৬ নভেম্বর ২০১৮ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিএনপির সভাপতিত্বে জনসভা করেছেন, যাদের প্রধান দাবি ছিল বিএনপি চেয়ারপারসন দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ রাজবন্দীদের মুক্তি, শেখ হাসিনা সরকারের পদত্যাগ, নির্দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন। এখানে জোর গলায় দাবি তুলেছেন জনসভার প্রধান অতিথি ড. কামাল হোসেন, প্রধান বক্তা আ স ম আবদুর রব যারা একসময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ঘনিষ্ঠ ও দক্ষিণহস্ত ছিলেন। যদিও আওয়ামী ঘরানার বিচারপতি সামছুদ্দিন চৌধুরী মানিক ড. কামালকে রাজাকার বলেছেন (সূত্র : জাতীয় পত্রিকা)।

অন্য দিকে সরকারের বিপক্ষে অবস্থান নেয়ায় কাদের সিদ্দিকীকে ইতঃপূর্বেই বহুবার রাজাকার বলে সম্বোধন করা হয়েছে, যা তিনি নিজের মুখেই প্রকাশ করেছেন। যারা শেখ মুজিবকে অশালীন ভাষায় সমালোচনা করেছিল তারাই এখন শেখ হাসিনা সরকারের মন্ত্রিসভায়। এখন মেরুকরণ যা হচ্ছে তাতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সরকারের ‘চেতনা’ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে যখন স্বাধীনতার যোদ্ধারা ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে বিএনপি মঞ্চে অবস্থান নিয়েছে? এখন বিষয়টি সহজেই অনুমেয় যে, ‘স্বাধীনতার চেতনার’ একমাত্র সোল এজেন্ট আওয়ামী ঘরানার বুদ্ধিজীবী ও সরকার এ ‘চেতনার’ কতটুকু বাজারজাত করতে সক্ষম হবেন? ফলে এটাই সাব্যস্ত করা যায় যে, শেখ হাসিনা সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী যারা তাদের পক্ষে থাকবে তারাই ‘স্বাধীনতার চেতনাধারী’ বাকিরা সব পাকিস্তানি রাজাকার।

আগেই বলেছি, এ দেশের সংলাপ সফল হওয়ার ইতিহাস খুবই মলিন আর কালক্ষেপণ। কারণ, যারা ক্ষমতায় থাকে তাদের ক্ষমতাকে ধরে রাখার কামনা বাসনা অনেক তীব্র থেকে তীব্রতর। সে কারণেই সংলাপ সফল না হলেও কিছু কথা বেরিয়ে আসে যা থেকে ক্ষমতাসীনেরা দেশবাসীকে কতটুকু ওজনে মাপে বা কতটুকু জ্ঞানী বা বোকা মনে করে তা অনুমান করা যায়। প্রথম দিন সংলাপ শেষে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিকদের কাছে যে ব্রিফিং করেছেন তাতে বোঝা যায়, সফল রাজনৈতিক মামলার একটি তালিকা তার (ওবায়দুল কাদের) কাছে জমা দেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ করেছেন, যদি তাই হয় তবে এটাই প্রতীয়মান হয়- দেশব্যাপী মৃত ব্যক্তি, বিদেশে অবস্থানরত, অসুস্থ, পঙ্গু এমনকি অন্য মামলায় কারাগারে আছে তাদেরসহ হাজার হাজার মানুষের বিরুদ্ধে যে গায়েবি মামলা হচ্ছে তিনি (প্রধানমন্ত্রী) এ সম্পর্কে কিছুই জানেন না(!)। এখানে উল্লেখ যে, রাজনীতি কোনো সাংবিধানিক বা ফৌজদারি অপরাধ নয়, ফলে রাজনীতি করার অপরাধে কোনো আইন আমাদের দেশে নেই। তবে সরকার প্রতিপক্ষকে দমানোর উদ্দেশ্যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্য দায়ের করা মামলাই রাজনৈতিক মামলা। প্রতি জেলায় প্রতি মাসে সরকার বিরোধীদের বিরুদ্ধে বেশুমার গায়েবি মামলা হচ্ছে, যার সাথে সত্যতার কোনো লেশমাত্র নেই।

একদিকে সরকার বলছে রাজনৈতিক মামলার তালিকা দেন, অন্যদিকে প্রতি দিনই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মামলা দিয়ে হয়রানি করছে, বিভিন্ন জেলা থেকে হাজার হাজার মানুষ হাইকোর্টে আগাম জামিন নিতে এসে হয়রানি হচ্ছে যা সরকার জানে না, এ দ্বিমুখী কথাবর্তায় কি বোঝা যায় যে, সরকার সত্যিই কোনো সমাধান প্রত্যাশা করেন? রাজনৈতিক মামলার জ্ঞান প্রধানমন্ত্রীকে দেয়া সমীচীন নয়, কারণ তিনি একটি রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম নিয়েছেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাকে প্রধানমন্ত্রী যদি রাজনৈতিক মামলা মনে করেন, তবে গায়েবি মামলাগুলোও রাজনৈতিক। তফাৎ শুধু একটুকুই আগরতলা মামলা সাজিয়ে ছিল পাকিস্তানি পুলিশ, এখন দেশব্যাপী গায়েবি মামলা সৃজন করছেন স্বাধীন দেশের স্বাধীন পুলিশ যারা আইনের ঊর্ধ্বে নিজেকে মনে করে।

সরকার রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করে। অর্থাৎ সরকারের কাজই রাষ্ট্রীয় কর্ম বলে গণ্য হবে। রাষ্ট্র কি জঘন্য মিথ্যার আশ্রয় নিতে পারে? রাষ্ট্র একদিকে বিরোধীদের মামলা দিয়ে অর্থাৎ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিচার বিভাগকে ব্যবহার করে ‘গায়েবি’ মামলা দেবে, অন্যদিকে রাষ্ট্রনায়ক তালিকা চাইবেন তাকি হাস্যস্পদ না এড়িয়ে যাওয়ার উপহাস মাত্র। অনেক সরকারই নিজ অবস্থাকে পাকাপোক্ত করার জন্য সংবিধান বা আইন তাদের মন মতো ব্যাখ্যা করছেন, কিন্তু সম্প্রতি এখন সে ব্যাখ্যা আর বাজারজাত হচ্ছে না। সরকারের মুখপাত্র ভাঙা ভাঙা কণ্ঠে প্রেস ব্রিফিং বা সভা সমাবেশে সরকারবিরোধীদের ‘স্বাধীনতার চেতনাবিরোধী’ বলে প্রমাণের কম চেষ্টা করেননি। ক্ষমতাসীন দলের মুখপাত্র হিসেবে তার চবৎভড়ৎসধহপব জনগণ কতটুকু হজম করছে, তা ক্ষমতা থাকা অবস্থায় বুঝা যাবে না। তবে পুলিশ দিয়ে নাশকতার পরিকল্পনায় দেশবাসীকে যেভাবে জড়ালেন তাতে সরকার কতটুকু সফল হয়েছে? জাতিকে দ্বিখণ্ডিত করে রাখতে পারলে সরকার হয় লাভবান। ব্রিটিশের ‘ডিবাইড অ্যান্ড রুল’ কৌশল এখন স্বাধীন দেশে বাস্তবায়িত হচ্ছে, যা নিশ্চয় স্বাধীনতার চেতনা হতে পারে না।

সরকার জাতিকে বোকা মনে করলেও সরকার যে স্বস্তিতে আছে তাও বোধগম্য নয়। সরকার যদি আরো একটি একতরফা নির্বাচন করে তখন খুনাখুনি মারামারি হবে সরকারদলীয়দের মধ্যে, ইতোমধ্যে যা শুরু হয়ে গেছে। সরকারি দল থেকে ডজনখানেক এমপি প্রার্থী রয়েছে যারা হাল নাগাদ ভোটার হয়েছে। এমনিতেই বাংলাদেশের রাজনীতি ‘মিউজিক্যাল চেয়ার খেলা’ অন্য দিকে বিরোধীদের নির্যাতনের জন্য একটি নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। তা হলে ‘গায়েবি’ মামলা। ‘গায়েব’ থেকে ‘গায়েবি’ শব্দের উৎপত্তি। ভবিষ্যতে বাংলাদেশে যদি কোনো দিন গণতন্ত্র ফিরে আসে, অর্থাৎ গণতান্ত্রিক অবয়বে স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর চেতনার উদ্ভব ও জবাবদিহিতার আওতায় আসে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এই গায়েবি মামলার যুগটি যখন একটি ‘আইনি বর্বরতার’ যুগ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে তখন ভুক্তভোগী গণমানুষ ও পরবর্তী বংশধর শেখ হাসিনা সরকারকেই স্মরণ করবে।

বিএনপির তাগিদে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হলেও বিএনপির লাভবান হওয়ার দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। কারণ, দলীয় চেয়ারপারসন এখনো কারাগারে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। কারণ এতদিন যারা জয় বাংলা বলে বক্তৃতা করত তারা এখন বিএনপির সভাপতিত্বে বক্তৃতা করে প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে বক্তব্য রাখছেন। ফলে বিএনপি-জামায়াত স্বাধীনতাবিরোধী চক্র সরকার উৎখাতের ভাঙা রেকর্ড ‘মিউজিক্যাল চেয়ার’ খেলার মতো। নীতি আদর্শের বালাই নেই, টাকা হলেই হলো। এখন এমপি হওয়ার বড় যোগ্যতা টাকা। টাকা উপার্জনের উৎস্য ব্যাংক লুট না ভূমি দস্যুতা না ঘুষ ও ঘুষের দালালি তা জনগণ বিচার বিবেচনা করে না, যার টাকা আছে (রাজনীতিতে অবদান থাকুক বা না থাকুক) সেই ব্যক্তিই এমপি হতে চায়। অন্য দিকে রাজনৈতিক দলগুলোও টাকা ওয়ালাদের সম্মান করে যারপরনাই। কারণ টাকার অভাবী তারাও। ফলে জাতীয় সংসদ হয়ে ওঠে কোটিপতিদের ক্লাব এবং এ জন্যই এমপি প্রার্থী হওয়ার হিড়িক লেগেছে।

জনমতের চাপে পুলিশ বেষ্টিত সরকার এখন নিশ্চয় বেকায়দায় পড়েছে। ৫ মে শাপলা চত্বরের সমাবেশে হেফাজতের কর্মী হত্যার অভিযোগ তাদের (হেফাজত) পক্ষ থেকেই করা হয়েছিল। নিহতের সংখ্যা ৬৫ দাবি করায় আইসিটি অ্যাক্টে ‘অধিকার’ নামক সংগঠনের কর্মকর্তা একজন আইনজীবী জেলে ছিলেন দীর্ঘ দিন। অল্প কিছু দিন আগেও মন্ত্রী ও আওয়ামী বুদ্ধিজীবীরা তেঁতুল হাজী বলতে হেফাজত প্রধানের সমালোচনায় মুখরিত ছিল, কালের বিবর্তনে তেঁতুল হাজীর সভাপতিত্বে প্রধানমন্ত্রী ‘কওমি জননী’ উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন।

আওয়ামী ঘরানা এখন হেফাজত প্রধানকে আর তেঁতুল হাজী বলবেন না, কারণ টক তেঁতুল এখন মিষ্টি লাগছে। তাই দৃঢ়তার সাথে পুনরায় বলছি, রাজনীতি এখন একটি ‘মিউজিক্যাল চেয়ার’, ক্ষমতার স্বাদ নেয়ার জন্য যেকোনো এক চেয়ারে বসতে পারলেই হলো। কিন্তু জনগণকে এত বোকা ভাবা সমীচীন নয়। তবে জনগণ অসহায় এ কারণে যে, ঘরে বাহিরে কোথাও গণতন্ত্র নেই। অর্থভিত্তিক পরিস্থিতি পরিবেশ সব কিছুই নিয়ন্ত্রণ করে, তাই গানের জলশায় অনেক সময় কোকিল কণ্ঠি পাখিও তার সুর হারিয়ে ফেলে এবং এটাই বাস্তবতা।

ফলে ‘নৈতিকতা’ প্রবেশের দুয়ার বন্ধ হয়ে গেছে আপন ভুবন থেকেই। এর মূল কারণ মূর্খতা ও পরশ্রীকাতরতাসহ দূরদৃষ্টির অভাব এবং ইতিহাসের অবমূল্যায়ন। ইতিহাস না জানা, ইতিহাস বিকৃত করে রচনা করে, নিজের (ক্ষমতাসীন) ইচ্ছামতো ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ থেকে জাতীয় নেতৃত্ব অনেক দূরে। ক্ষমতাকে অপব্যবহার করে ফাঁসি কাষ্ঠে ঝোলার ইতিহাস অগণিত, ইতিহাসের পাতায় অনেক ক্ষমতাধরকে অপমানের অনেক তথ্য থাকলেও ক্ষমতাসীনদের মনোরঞ্জনের জন্য উল্টো ব্যাখ্যা দেয়ার জন্য চাটুকারদের অভাব হয় না।হ
লেখক : কলামিস্ট ও আইনজীবী (অ্যাপিলেট ডিভিশন)
taimuralamkhandaker@gmail.com


আরো সংবাদ