১২ ডিসেম্বর ২০১৮

নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা ও সেনাবাহিনী মোতায়েন-১

-

এই কলাম এখন কেন?
নির্বাচনকালীন যেকোনো সরকারের সাফল্য নির্ভর করবে একটি সুন্দর নির্বাচন অনুষ্ঠান করানোর ওপর। নির্বাচনের সংজ্ঞা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ডিকশনারিতে বা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পাঠ্যবইয়ে যত বিস্তারিত ও স্পষ্টভাবে দেয়া আছে, অনুরূপ বিস্তারিত ব্যাখ্যামূলক আলোচনা আছে সুন্দর নির্বাচন প্রসঙ্গে, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন প্রসঙ্গে। ইংরেজি পরিভাষায় শব্দগুলো হলো ক্রেডিবল ইলেকশন, একসেপ্টেবল ইলেকশন। কোনো একটি নির্বাচন যদি সুন্দর হতে হয়, ক্রেডিবল হতে হয়, গ্রহণযোগ্য হতে হয়, বিশ্বাসযোগ্য হতে হয়; তাহলে সেখানে অনেক উপাত্ত কাজ করবে। আমার বিবেচনায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাত্ত হলো নিরাপত্তা; ইংরেজি পরিভাষায় যাকে বলা যায় সিকিউরিটি। একটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে। অতএব, জননিরাপত্তা প্রসঙ্গে জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি আমাদের কামনা।

জাতির গৌরব, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভূমিকা বা তাদেরকে সরকার কোন দায়িত্ব দেয়, এ নিয়েও মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। তাই আজকের কলামটি। কলামটি দীর্ঘ, আজকে ২৮ নভেম্বর অর্ধেক এবং আগামীকাল ২৯ নভেম্বর বাকি অর্ধেক পড়বেন। নিপীড়িত ও অত্যাচারিত রাজনৈতিক কর্মীগণের মধ্যে যাদের দ্বারা সম্ভব, তারা এটা (মানে আজকের ও কালকের অংশ) কপি বা কাটিং করে রাখবেন, অন্যদেরকে নিয়ে সমবেতভাবে পড়ে হৃদয়ঙ্গমের জন্য চেষ্টা করবেন। এই আবেদন করছি।

নির্বাচনের সাথে আমার সম্পৃক্ততা
আমি ব্যক্তিজীবনে ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরের বিখ্যাত ঐতিহাসিক নির্বাচনে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট র‌্যাংকধারী অফিসার ছিলাম এবং তৎকালীন ময়মনসিংহ জেলার জামালপুর মহকুমার শেরপুর থানায় নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করেছিলাম, দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ‘সি’ কোম্পানির একটি অংশ নিয়ে। ১৯৭৩ সালের মার্চ মাসে, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পার্লামেন্ট নির্বাচনে ক্যাপ্টেন র‌্যাংকধারী অফিসার ছিলাম এবং তৎকালীন ঢাকা জেলার মানিকগঞ্জ মহকুমায় দায়িত্ব পালন করেছিলাম, দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের পুরো ‘সি’ কোম্পানি নিয়ে। এরপর থেকে (১৯৮৬ সাল ব্যতীত) ১৯৯৬ সালের জুন পর্যন্ত সব নির্বাচনে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলাম বা ভূমিকা রেখেছি। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিশেষ ভূমিকা ছিল, সরকারি দায়িত্বের অংশ হিসেবে (সে প্রসঙ্গে আগামী সপ্তাহে আবার লিখব)। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের নির্বাচন চলাকালে যশোর অঞ্চলের জিওসি ছিলাম।

অতঃপর নির্বাচনের আট দিন আগে আমি যশোর থেকে বদলি হয়ে ঢাকায় চলে আসি; কিন্তু জিওসি হিসেবে নির্বাচনকালীন সৈন্য মোতায়েন পরিকল্পনা ও দায়িত্ব বণ্টন করে আসি। আমি চলে আসার পরও পরবর্তী জিওসি ওই পরিকল্পনার কোনো ব্যত্যয় ঘটাননি। ১৯৯৬ সালের জুন মাসের ১৫ তারিখ আমি বাধ্যতামূলক অবসরে যাই। ১৯৯৭ সালের জুন মাসের ১৫ তারিখ আমার এলপিআর শেষ হয় এবং আমি সেনাবাহিনীর জনবল থেকে চূড়ান্তভাবে বিয়োগ হই। আমার অবসর জীবনে, ২০০১ সালের নির্বাচনকালে নিজেদের একটি এনজিও (যার নাম ছিল সোহাক) নিয়ে, এশিয়া ফাউন্ডেশনের সার্বিক সহযোগিতায় ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপের সাথে যুক্ত হয়ে কয়েকটি উপজেলায় ইলেকশন মনিটরিংয়ের দায়িত্ব পালন করেছি।

২০০৭ সালের ডিসেম্বরের ৪ তারিখে বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির আত্মপ্রকাশ ঘটে এবং ১৭ নভেম্বর ২০০৮ তারিখে নির্বাচন কমিশন থেকে নিবন্ধন পাই। আমাদের নিবন্ধন নম্বর ০৩১। আমাদের দলীয় পরিচয়ে এবং দলীয় মার্কা নিয়ে ২০০৮ সালের নির্বাচনে নিজে অংশগ্রহণকারী প্রার্থী ছিলাম এবং বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির পক্ষ থেকে ৩৬টি আসনে প্রার্থী ছিল। এই অনুচ্ছেদে প্রেক্ষাপট বর্ণনার উদ্দেশ্য হলো, সম্মানিত পাঠকের সামনে তুলে ধরা যে, নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা নিয়ে আমরা অতীতেও চিন্তা করেছি এবং বর্তমানেও করছি। তার থেকেও বড় কথা, ওই রূপ চিন্তা করার জন্য আমরা যথেষ্ট অভিজ্ঞতা পেয়েছি। কারণ, নির্বাচন নামক প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত ছিলাম।

নির্বাচন, সেনাবাহিনী ও আওয়ামী চিন্তা
নির্বাচনকালে নিরাপত্তার সাথে সেনাবাহিনীর ভূমিকা জড়িত। ২০০০ সালের প্রথমাংশে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার, একটি ধারণা বা কথা রাজনৈতিক বাজারে ছেড়ে দেয়। ধারণা বা কথাটি ছিল : নির্বাচনকালে সেনাবাহিনী মোতায়েনের কোনো প্রয়োজন নেই। তৎকালীন বাংলাদেশের নাগরিক সমাজের সচেতন অংশ সরকারের ওই ধারণা বা মনোভাবকে সিরিয়াসলি গ্রহণ করেছিল। আমি তখনো একজন রাজনৈতিক কর্মী হইনি। সচেতন নাগরিক সমাজের একজন সক্রিয় সদস্য ছিলাম। অতএব, এ বিষয়টি আমার বা আমার সাথে ঘনিষ্ঠ যারা তাদের দৃষ্টি এড়াতে পারেনি। আমি তখন যেমন মনে করতাম, এখনো মনে করি, বাংলাদেশের পার্লামেন্ট নির্বাচনকালে জনমনে শান্তি, স্বস্তি ও আস্থা প্রদানের জন্য তথা সার্বিক নিরাপত্তা প্রদানের জন্য বাংলাদেশ সামরিক বাহিনী তথা সেনাবাহিনীর ভূমিকা অপরিহার্য।

২০০০ সালের বাংলাদেশ সরকার যেমন আওয়ামী লীগ দলীয় ছিল, ২০১৩-১৪ সালের এবং ২০১৮ সালের বাংলাদেশ সরকারও আওয়ামী লীগ দলীয়। ২০০০ সালে বা ২০০১ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ দলীয় সরকার এবং তৎকালীন আওয়ামী লীগ যে ধারণাটিকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরে ওঠেনি, তারা সেই ধারণাটিকে ২০১৩-১৪ সালে প্রায়ই প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছিল। অর্থাৎ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে তারা নির্বাচন থেকে অনেক দূরে রাখবে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কম্বোডিয়া বা লাইবেরিয়া বা বসনিয়া বা কঙ্গো নামক দেশগুলোতে নির্বাচনে ওতপ্রোত সহায়তা করুক, এতে আওয়ামী লীগ দলীয় রাজনৈতিক সরকারের কোনো আপত্তি নেই; কিন্তু বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বাংলাদেশে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান করানোর কাজে কোনো ভূমিকা রাখুক, এতে তাদের যথেষ্ট আপত্তি। বিষয়টি বিদঘুটে। বিষয়টি আলোচনার দাবি রাখে। তবে আজকের কলামে এর বেশি এ প্রসঙ্গে নয়। আজকের আলোচনাটি অসমাপ্ত আলোচনা। অর্থাৎ আগামীকালও চলবে।

সুষ্ঠু নির্বাচনের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা
বাংলাদেশে ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ এবং ২০১৪-এর নির্বাচনের আগে প্রচণ্ড রাজনৈতিক আন্দোলন বিরাজমান ছিল। ওই রকম প্রচণ্ড রাজনৈতিক আন্দোলন এ মুহূর্তে বাংলাদেশে না থাকলেও কোনো-না-কোনো কারণে সেটি যে আবার দানা বেঁধে উঠবে না, সে সম্পর্কে হ্যাঁ বা না কোনোটিই বলা যায় না। ১৯৯১, ’৯৬ এবং ২০০৮ এসব ক্ষেত্রে সুষ্ঠু নির্বাচনই দেশের শাসনতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক শাসনের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রেখেছে। ওই প্রেক্ষাপটে আমার মূল্যায়নে ভবিষ্যতেও শাসনতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার জন্য সুষ্ঠু নির্বাচন অপরিহার্য। সুষ্ঠু নির্বাচনের অনেকগুলো বৈশিষ্ট্য আছে। যথা- নির্বাচনের আগে কম বিশৃঙ্খলা, নির্বাচনের দিন ভোটারগণের নির্ভয়ে ভোট প্রদান করা, নির্বাচন পরিচালনা বা নির্বাচন কেন্দ্র পরিচালনার সাথে জড়িত কর্মকাণ্ডগুলো শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করা এবং সব পক্ষ কর্তৃক নির্বাচনের ফলাফলকে গ্রহণ করা বা তা মেনে নেয়া।

এগুলোর সাথে অনেক আইন জড়িত এবং ৩০-৪০ বছর ধরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোর ধীরে ধীরে সুষ্ঠুতা অধিক হারে প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছে। আমার মতে, নির্বাচনের অব্যবহিত আগে এবং নির্বাচন চলাকালে সমাজে ও জনপদে শান্তি-শৃঙ্খলা বহাল রাখতে না পারলে সুষ্ঠু নির্বাচনের অনেকগুলো বৈশিষ্ট্যই লঙ্ঘিত হয়। ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচন ছিল একটি বিপুল উদ্দীপনাময় নির্বাচন। নতুন আঙ্গিকে ১৯৯১ সালের নির্বাচন একটি নব দিগন্ত উন্মোচন করেছিল। তারই ধারাবাহিকতায় ছিল ১৯৯৬ সালের নির্বাচন। আমরা বলব, উভয়টিই ভালো ছিল। অনুরূপ ধারাবাহিকতায় ২০০১ এবং ২০০৮-এর নির্বাচনটিও গ্রহণযোগ্য ছিল। সুতরাং আমাদের এ মুহূর্তে প্রয়োজন সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করা। গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি করতে গেলে সুষ্ঠু নির্বাচন অপরিহার্য। আগামী নির্বাচন যদি সুষ্ঠু না হয় তথা আগামী নির্বাচনে যদি ভোটারগণ ভোট দিতে না পারে, তাহলে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা সাংঘাতিকভাবে, মারাত্মকভাবে হ্রাস পাবে। সে ক্ষেত্রে শিগগিরই রাজনৈতিক আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠার সম্ভাবনা আছে। অপরপক্ষে, যদি নির্বাচন সুষ্ঠু হয় তাহলে যুক্তিসঙ্গত সম্ভাবনা আছে, সব মহল ওই নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেবে। সে ক্ষেত্রে দেশে শান্তিপূর্ণ প্রশাসন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও চলতে পারবে।

বিশ্বাসযোগ্যতা উন্নয়নে ও নিরপেক্ষতা রক্ষায় নিরাপত্তার ভূমিকা
নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা উন্নয়নে অনেকগুলো চালিকাশক্তি আছে, তার মধ্যে নিরাপত্তার ভূমিকা সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। নিরাপত্তার অনেক আঙ্গিক আছে, তবে নির্বাচনে বিশ্বাসযোগ্যতা উন্নয়নে নিরাপত্তার কার্যকর আঙ্গিকগুলো বিবেচ্য বিষয়। এমনকি বিশ্বাসযোগ্যতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে মানুষের সামগ্রিক নিরাপত্তা বিধানের ব্যাপারটি প্রণিধানযোগ্য, যেখানে ‘নিরাপত্তার সামগ্রিক ভূমিকাই’ বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করতে পারে। সঠিক নিরাপত্তা প্রদানের মধ্যেই বিশ্বাসযোগ্যতা নিহিত আছে। নিরপেক্ষতা বলতে যা বোঝায়, সেটি মনমানসিকতা ও সাহসের সাথে সম্পর্কিত। নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে গেলে সেই কাজের ফলাফল কারো না কারো পক্ষে বা বিপক্ষে যাবে, কিন্তু যেটিই হয় সেটি যুক্তিসঙ্গতভাবে হবে। নিরপেক্ষতা না থাকার পেছনে অন্যতম কারণ ভীতি। ভীতি দূর করতে হলে নিরাপত্তা প্রদান করতে হবে। সাধারণ ভোটারগণের কাছে আবেদন তথা সচেতন রাজনৈতিক কর্মীগণের কাছে আবেদন, আমাদেরকে ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে উঠতেই হবে। কারণ, বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের একটি মহল অবশ্যই চায়, অপর মহল তথা প্রতিপক্ষ যেন ভয় পেয়ে নীরব-নিশ্চুপ থাকে। যদিও এটাও সত্য যে, নিরাপদ পরিবেশ ও পরিস্থিতিতেই দায়িত্ব পালনরত যেকোনো ব্যক্তি নিরপেক্ষ থাকার সাহস পায়।

নির্বাচনকালীন নিরাপত্তার আঙ্গিকগুলো
নিরাপত্তার প্রথম আঙ্গিক। নির্বাচনী প্রচার, মিছিল ইত্যাদি সময়ে নিরাপত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, নির্বাচনের আগে প্রচারাভিযানকালীন অনেক সংঘর্ষ, হাতাহাতি, এমনকি খুনোখুনি পর্যন্ত হয়েছে। সুতরাং এরূপ পরিস্থিতি কোনো সময়ের জন্য কাক্সিক্ষত নয়। নির্বাচনী পরিবেশ সুষ্ঠু রাখতে হলে এই সময়ের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

নিরাপত্তার দ্বিতীয় আঙ্গিক। এ ক্ষেত্রে অনেকটা সামগ্রিক নিরাপত্তার বিষয়টি চলে আসে। কেননা, ভোটের অধিকার মানুষের একটি বড় অধিকার; যা মানবাধিকারের পর্যায়ে পড়ে। কাজেই মানুষ কাকে নির্বাচিত করবে এবং এতদসংক্রান্ত খোলা আলোচনার জন্য সেই ধরনের সময়োপযোগী পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে সুষ্ঠু নিরাপত্তাব্যবস্থা সমুন্নত থাকলে মানুষ তার মতবিনিময়ের সুযোগ পাবে এবং তার সুচিন্তিত মতামত প্রদান করতে পারবে। ফলে গুণ্ডামি, চাপ প্রয়োগ, ভীতি প্রদর্শন প্রভৃতি অশুভ তৎপরতার বিরুদ্ধে নিরাপত্তাব্যবস্থাকে সাজাতে হবে।

নিরাপত্তার তৃতীয় আঙ্গিক। নির্বাচনকালীন নির্বাচনী জনসভা বা পথসভাগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জনসভাতেই বা পথসভাগুলোতেই প্রার্থী তার প্রতিশ্রুতি, প্রতিজ্ঞা ইত্যাদি রাখেন। এই নির্বাচনী জনসভার সময়ও অনেক ধরনের অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটে, যা জনমানসে অনেক ভীতির সঞ্চার করে। জনসভাগুলো সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাহীনতাই এর জন্য দায়ী। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে এ ধরনের জনসভা মানুষকে সর্বক্ষণই ভীতি সৃষ্টি করাবে। অনেক সময় নির্বাচনী জনসভায় বা পথসভায় বোমাবাজি, হুড়োহুড়ি ইত্যাদির জন্য অনেকে চরমভাবে আহত হয়।

এ ক্ষেত্রে নিরাপত্তা বজায় রাখা খুবই জরুরি। যদি এ রকম ঘটেও, সাধারণ নিপীড়িত-অত্যাচারিত জনগণের কাছে আমার আবেদন থাকবে, তারা যেন অস্থির না হন, চঞ্চল না হন, আতঙ্কগ্রস্ত না হন। কারণ, রাজনৈতিক অঙ্গনের একটি মহল অপর মহলকে ভীত ও আতঙ্কিত করার জন্যই এ ধরনের কাজ করতে পারে। সুতরাং আপনি যদি অস্থির, চঞ্চল ও আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েন, তাহলে আপনি আপনার প্রতিপক্ষের ইচ্ছাই পূরণ করলেন।

নিরাপত্তার চতুর্থ আঙ্গিক। মানুষের মধ্যে তার নিজস্ব মতামত সৃষ্টি করার পরিবেশ তৈরি বেশ মূল্যবান বিষয়। এ ক্ষেত্রে কোনো একটি মানুষের মধ্যে তার সুষ্ঠু মানসিকতা সৃষ্টি তখনই সম্ভব যখন তার পারিপার্শ্বিক পরিবেশ স্থিতিশীল থাকবে। উন্নত পরিবেশই তার উন্নত মানসিকতা সৃষ্টিতে সহায়ক। কে ভালো, কে মন্দ বিচার করার মানসিকতা তখনই হবে যখন তার সামগ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকবে। বলপ্রয়োগে ভীতি, বাড়িছাড়া করার ভীতি প্রদর্শন চলতে থাকলে এই পরিবেশ আনয়ন সম্ভব নয়। সুতরাং এই প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তার গুরুত্ব মোটেই কম নয়। রাজনৈতিক অঙ্গনের একটি মহল চাইবে এমন ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হোক, যেন প্রতিপক্ষের মানুষ তথা নিপীড়িত অত্যাচারিত অংশ যেন বাড়িঘর ছেড়ে দূরে থাকে। তাহলে কাগজ-কলমে ভোট চুরি না করেও একজন প্রার্থী জয়ী হতে পারে। কারণ, তার বিরুদ্ধে যারা ভোট দিতেন, তারা তো ভোটই দিতে পারলেন না। কারণ, তারা ভীত হয়ে বাড়িঘর ছেড়ে দূরে চলে গিয়েছিলেন।

নিরাপত্তার পঞ্চম আঙ্গিক। ভোটের দিন গ্রামবাসী ও শহরবাসী উভয় এলাকার জনগণের জন্য ভোটকেন্দ্রে যাতে তারা সুষ্ঠুভাবে আসতে পারে এবং ঘরে ফিরতে পারে তার জন্য নিরাপত্তার ভূমিকা অত্যন্ত মুখ্য ব্যাপার। মানুষ যদি আতঙ্কে থাকে যে, রাস্তায় গেলেই বিপদ, সে ক্ষেত্রে মানুষের ভোট দেয়ার ইচ্ছা উবে যায় এবং অনেক ভোটারকে ভোটদান থেকে বিরত থাকতে হয়। ভোটের দিন পক্ষগুলোর মধ্যে একটি পক্ষ বা শক্তিশালী পক্ষ রাস্তায় এমন বাধা বিপত্তি সৃষ্টি করে, যেন প্রতিপক্ষের মানুষ ঘর থেকে বের না হয়। উদাহরণস্বরূপ, পরিকল্পিতভাবে বা পাতানো মারামারি ঘটায়, বোমা ফাটায় যেন সাধারণ নিরীহ মানুষ বলেÑ রাস্তায় গণ্ডগোল, ভোট দিতে বের হতে পারব না। যদি একজন ভোটার না যায়, তাহলে কার ক্ষতি? ক্ষতি ওই প্রার্থীর যে প্রার্থীকে ভোটার পছন্দ করতেন। কাজেই ভোটের দিন যাতায়াতের জন্য উপযুক্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা অপরিহার্য। পূর্বাভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, ভোটকেন্দ্রে যেতে না পারার জন্য জনমানসে অনেক ক্ষোভ ও অতৃপ্তির ছায়া ফুটে ওঠে। জনগণকে তাদের সঠিক নিরাপত্তা প্রদান করতে হবে, যাতে তার মৌলিক অধিকার থেকে সে বঞ্চিত না হয়।

নিরাপত্তার ষষ্ঠ আঙ্গিক। আমাদের দেশে অনেক ক্ষেত্রেই যে ঘটনা ঘটে সেটি হচ্ছে, ভোটকেন্দ্র পর্যন্ত শারীরিকভাবে আসা সত্ত্বেও একজন ভোটারকে ভোট দিতে না দেয়া, বরং তার নামের ব্যালট পেপারটি অন্যকে দিয়ে বাক্সে পুরিয়ে দেয়া। দ্বিতীয় যে ঘটনাটি ঘটে সেটি হচ্ছে, ব্যালট বাক্স ছিনতাই করা এবং বাক্সের ভেতরে বৈধ কাগজগুলোকে ফেলে দিয়ে অবৈধ কাগজ ঢুকিয়ে দেয়া। এটি সম্ভব হয় তখনই যখন সরকার প্রদত্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা দুর্বল থাকে। দুর্বলতার সুযোগে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে অথবা রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করে নির্বাচনী কর্মকর্তা যথা প্রিজাইডিং অফিসার, অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রিজাইডিং অফিসাররা অবৈধ কাজ করেন বা করতে বাধ্য হন।
নির্বাচনের ঠিক তিন-চার দিন আগে থমথমে পরিস্থিতির সাথে নিরাপত্তার সম্পর্ক

নির্বাচনের ঠিক তিন-চার দিন আগে নিরাপত্তাব্যবস্থা নির্ধারণের ওপরই নির্বাচনী সুষ্ঠুতার বৃহদংশ নির্ভর করে। কেননা, ওই ধরনের পরিস্থিতিতে ভোট কেনা-বেচা থেকে শুরু করে অনেক ধরনের অসদুপায় অবলম্বন ইত্যাদি চলতে থাকে। কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা বলবৎ এবং তার সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমেই এই দুরবস্থা, যা ওপরে উল্লিখিত তা নির্মূল করা সম্ভব। তা ছাড়া, নির্বাচন-পূর্ব নিরাপত্তার ওপরই পূর্ণ পরিবেশের চিত্র ফুটে ওঠে এবং তা অনেকাংশে আঁচ করা সম্ভব হয়, কী ধরনের নির্বাচন হবে।

ভোট গ্রহণের দিন নিরাপত্তা কোন কোন ক্ষেত্রে প্রয়োজন?
নির্বাচনের দিন নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা অন্যান্য দিন থেকে ভিন্নতর। কেননা, ভোট প্রদান ও ভোট গ্রহণ নিশ্চিত করতে গেলে নির্বাচনের দিনই অধিকতর নিরাপত্তা প্রয়োজন। প্রয়োজনের একটি ক্ষেত্র হলো, ভোটারগণ যেন নিজ বাড়ি থেকে বের হয়ে নিরাপদে ভোটকেন্দ্র পর্যন্ত আসতে পারেন, পথে যেন তাৎক্ষণিক কোনো বাধা না পান বা ভবিষ্যতের জন্য হুমকি না পান। ভোট দেয়ার জন্য লাইনে দাঁড়ানো অবস্থায় কেউ যেন ভোটারগণকে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রার্থীর অনুকূলে ভোট আদায়ের লক্ষ্যে ভয় দেখাতে না পারে। আরেকটি ক্ষেত্র হলো, নির্বাচন কেন্দ্রের ভেতরে যেখানে পোলিং এজেন্টরা বসেন এবং যেখানে ব্যালট পেপার হাতে দেয়া হয়, সেখানে যেন এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয় যে, ভোটারগণ ভোট দিতে এলেন, কিন্তু নিজের ভোট নিজে দিতে পারলেন না, অন্যরা তার ভোট দিয়ে দিলো এবং ভোটার কারো কাছে নালিশও করতে পারবেন না। বিগত নির্বাচনগুলোর ঘটনাবলি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নিরাপত্তার অভাবজনিত সমস্যার জন্যই অনেক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। এ ছাড়া সুষ্ঠুভাবে ভোট গ্রহণ ও প্রদান সম্ভব হয়ে ওঠে না।

প্রচলিত নিরাপত্তা প্রদানের রেওয়াজ
আমাদের দেশের নির্বাচনকালীন যে নিরাপত্তাব্যবস্থার রীতি তা খুবই গতানুগতিক। গত ৪০-৪৫ বছরেও এই ব্যবস্থায় বা রেওয়াজে বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি। বহু বিষয়ে পরিবর্তন সূচিত হলেও নির্বাচনকালীন নিরাপত্তার শৈথিল্য রীতিমতো আশ্চর্যের বিষয়। সুতরাং এই গতানুগতিক নিরাপত্তাব্যবস্থার পরিবর্তন অপরিহার্য। সেনাবাহিনীর ক্ষুদ্র একটি দল (২০-২৫ জনের একটি দল) পরোক্ষভাবে একটি থানা বা উপজেলা এলাকায় নিরাপত্তা প্রদান করবে অথবা সেনাবাহিনীর ক্ষুদ্র একটি দল (১০-১২ জন) কোনো একটি থানার সদর দফতরে আসন গেড়ে বসে ওই থানার সামগ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কষ্টসাধ্য ও প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। সর্বাবস্থায় যেখানে থানা শব্দটি ব্যবহার করছি, সেখানে উপজেলা শব্দটিও মনে করতে পারেন। ১

৪ বছর আগে র‌্যাব নামক একটি বাহিনী সৃষ্টি হয়েছে। তারাও কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিরাপত্তা দেয়। পুলিশবাহিনীর মধ্যেই একটি অঙ্গ আছে যাদেরকে বলা হতো আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন; এরাও কোনো কোনো জায়গায় নিরাপত্তা দেয়। তবে নির্বাচনের আগে সাধারণত নিরাপত্তার দায়িত্বটি পুলিশের হাতে থাকে। শুধু চাইলে বা মোতায়েন করা হলে সেনাবাহিনী সেখানে ভূমিকা রাখে। নির্বাচনের আগের রাত, নির্বাচনের দিন এবং নির্বাচনী দিনের অনুগামী রাত- এ সময়টিতে এলাকার নিরাপত্তার দায়িত্ব থাকে পুলিশ ও আনসার বাহিনীর ওপরে। কেন্দ্রে কেন্দ্রে তাদেরকে সহায়তা করে ভিডিপি। ভিডিপি মানে ভিলেজ ডিফেন্স পার্টি। এ জন্য নির্বাচনী কেন্দ্র বা ভোটকেন্দ্র বা পোলিং সেন্টার অনুযায়ী পুলিশ, আনসার ও ভিডিপি মোতায়েন করা হয়। সামগ্রিকভাবে নির্বাচনের দিনে ভোটকেন্দ্রের বাইরে যে নিরাপত্তা প্রয়োজন, সে প্রসঙ্গে আমাদের সচেতনতা আসলেই কম। আলোচনা আগামীকালও চলবে।
লেখক : মেজর জেনারেল (অব:); চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি


আরো সংবাদ