১২ ডিসেম্বর ২০১৮

ব্রানসেন কি নির্দোষ ছিলেন?

মার্কিন যাজক ব্রানসেনকে নিয়ে তুরস্ককে অনেক ভুগতে হয়েছে। তবে তুরস্কের মানহানি হয়নি - ছবি : সংগৃহীত

পাদ্রী ব্রানসেনকে নিয়ে কিছু তুর্কি বলছেন, ছেড়ে দিলে কী এমন হবে; অনেকে বলছেন, জেলে সে পচলেই যুক্তরাষ্ট্র বুঝবে কত ধানে কত চাল। তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতির জন্য ব্রানসেন ইস্যু কতটুকু গুরুত্ব বহন করে বা আদৌ কোনো ফ্যাক্টর কি-না (সাথে অন্যান্য কারণও আছে। ব্রানসেন একটি উপলক্ষ মাত্র), লিরা সঙ্কট ও তুরস্কের অর্থনীতি কতটুকু ক্ষতিগ্রস্ত হলো এবং কতটুকু কৌশলগত লাভ হলো সেসব চিন্তা করা তুরস্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির পরমাণু অস্ত্র নেই। তাই পরমাণু অস্ত্রধারী যুক্তরাষ্ট্র কোনো পদক্ষেপ নিলে তুরস্কের এমন কিছু করার নেই, শুধু আত্মরক্ষা ছাড়া। তুর্কি নেতা এরদোগান তো আর উত্তর কোরিয়ার কিম নন, যিনি ট্রাম্পকে লক্ষ করে বলবেন, আমার পকেটে পরমাণু বোতাম থাকে। সুতরাং ‘বেসামাল’ কিছু করলেই মহাবিপদ ঘটতে পারে। ট্রাম্প এই ভয়ে সব যুদ্ধ প্রস্তুতি চূড়ান্ত থাকা সত্ত্বে¡ও, সারা বিশ্ব যখন ভাবছিল কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যুদ্ধ বাধছে, তারপরও কেন যুদ্ধে নামেননি? তুরস্কের বেলায় এমন কোনো বিষয় নেই। তুরস্ক গতানুগতিক বা কনভেনশনাল যুদ্ধে শক্তিশালী দেশ। অপর দিকে, যুক্তরাষ্ট্র এবং ঘরের কাছের ইসরাইল উভয়েরই রয়েছে পরমাণু বোমা, সুপারসনিক যুদ্ধবিমান, শক্তিশালী মিসাইল, বিশ্বসেরা ট্যাংক, স্যাটেলাইট যুদ্ধের প্রস্তুতি বা স্টার ফোর্স ইত্যাদি। তাই তুরস্ক তথা মধ্যপ্রাচ্যসহ ইসলামি বিশ্ব যুক্তরাষ্ট্রের জন্য দৃশ্যত ভীতিকর বিষয় নয়। তাই যখন তখন ধমক দেয়া, অবরোধ আরোপ, সিআইএ কর্তৃক নাশকতা, বিরুদ্ধবাদীদের হাত করে অন্তর্ঘাতমূলক কাজ প্রভৃতি ওয়াশিংটনের কাছে কঠিন ব্যাপার নয়।
চীনে একটি প্রবাদ আছে, ‘ব্যাঙের গোশত খেলে সকালেই খাও’। কেননা সারাদিন কত বাজে কাজ করতে হবে। একটি বাজে কাজ অন্তত সকাল বেলায় শেষ করা যায়, যাতে আসল খাওয়ার সময় আর পস্তাতে না হয়।

মার্কিন যাজক ব্রানসেনকে নিয়ে তুরস্ককে অনেক ভুগতে হয়েছে। তবে তুরস্কের মানহানি হয়নি। যাই হোক, ট্রাম্পের নভেম্বর মাস নানা কারণে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে গুরুত্ব বহন করছে। ট্রাম্পের ইভানজেলিক খ্রিষ্টানদের ভোট নাকি রয়েছে ১০০ মিলিয়ন! তাই ট্রাম্পের জন্য এ ইভানজেলিক পাদ্রী কত বেশি গুরত্বপূর্ণ তা সাধারণ পাঠক মাত্রই অনুমান করতে পারেন। ব্রানসেন দুই বছর ধরে তুরস্কে বন্দী। আদালত তাকে দোষী সাব্যস্ত করেছেন। তার পরও তার গুরুত্ব এত বেশি মনে হচ্ছে যে, তাকে মুক্তি দেয়া হলো এবং তিনি আমেরিকায় পাড়ি দিয়ে ট্রাম্পের সাথে দীর্ঘক্ষণ আলাপ করলেন। তাকে আগেভাগেই ছেড়ে না দিয়ে অবশেষে পানি ঘোলা করে ছেড়ে দেয়া হলো কেন? তুরস্কের পণ্ডিতরাই বা বিষয়টি কিভাবে দেখছেন? ব্যাঙের গোশত কি আগেই খাওয়া দরকার ছিল?

ব্রানসেনকে তুরস্কের বিচার বিভাগ দোষী সাব্যস্ত করে জেলে দিয়েছে। তার বিরুদ্ধে আরো অনেক অভিযোগ, যার বিচার হলে ও দোষী সাব্যস্ত হলে ২০ বছরের বেশি জেল হতে পারত। এমন ব্যক্তিকে তুরস্ক ছেড়ে দিলো কি কোনো সাক্ষী-প্রমাণের অভাবে? তা নয়। একটি মামলায় তার সাজা হয়েছে, তিন বছর এক মাস ১৫ দিন কারাদণ্ড। সেটিও পূর্ণ হয়নি। তার বিরুদ্ধে আরো অনেক অভিযোগ। সব প্রমাণ করা কঠিন হলেও অভিযোগে মিথ্যা নাও হতে পারে। আদালতে অনেক সত্য বিষয়ও প্রমাণ করা কঠিন। আদালত কোনো ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী নন। সেখানে সাক্ষী-প্রমাণ দিয়ে বিবেচ্য বিষয় বোঝাতে হয় এবং প্রমাণ করতে হয়।

জানা যায়, গোয়েন্দাদের কিছু বক্তব্য। বলা যায়, রাষ্ট্রীয় গোপন সাক্ষীরা তাদের বক্তব্য পরিবর্তন করেছে। আমরা হয়তো এ বিষয়ের সমালোচনা করতে পারি, রাষ্ট্রযন্ত্র যারা পরিচালনা করেন তাদের জন্য বিষয়টি অনেক কঠিনও। রাষ্ট্রযন্ত্র ও পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনায় অনেক কৌশলী না হলে, সোজা কথায় ম্যাকিয়াভেলির নীতি অনুসরণ না করলে সমস্যায় পড়তে হবে বৈকি। তুরস্কের ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছে বলে প্রতিভাত হয়। ব্রানসেনের বিষয়ে খুব কম আমেরিকান পাওয়া যাবে, যারা তুরস্কের দিকে আঙুল তোলেনি। বিশেষ করে এরদোগানের বিশ্বরাজনীতির অঙ্গনে পদচারণা তাদের গভীর মনোকষ্টের কারণ। দুই বছর ধরে তুরস্ক আমেরিকার বিশ্ব রাজনীতির প্রায় সব অঙ্গনেই উপস্থিত; কোথাও সামরিকভাবে মুখোমুখি। এমন উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে আমেরিকা এরদোগানকে নিয়ে যেন আর পেরে উঠছে না। কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি এর কোনো বিহিত করাও যাচ্ছে না। সুযোগের জন্য সিআইএ কতদিন অপেক্ষা করবে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট ছক কষা কষ্টসাধ্য।

এসব সত্ত্বেও তুরস্ক ব্রানসেনকে দোষী সাব্যস্ত করে সাজা দিয়েছে। কিন্তু পরে তার বিষয়টি রাজনৈতিক মঞ্চে চলে আসে এবং ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারণায় প্যাস্টর তাস ছুড়ে দেন। ফলে তুরস্ককেও বিচারের আদালত ছেড়ে ‘তাসের টেবিলে’ হাজির হতে হয়। তুরস্ক সরকার ব্রানসেনের বদলে গুলেনকে চায়। কিন্তু ‘গুলেন’ হলো ফাঁদ আর ব্রানসেন হলো সামান্য ইস্যু। যুক্তরাষ্ট্র গুলেনকে ফেরত দেয়নি। বরং জানায়, তার বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। এর ফলাফল কী এবং কবে শেষ হবে, আদৌ শেষ হবে কিনা- তা কেউ জানে না। প্রমাণ তো তুরস্কের হাতে, আমেরিকা কী তদন্ত করবে? এদিকে অবরোধের কারণে তুরস্কের লিরার এত অবমূল্যায়ন হয় যে, তা ৪০ শতাংশের নিচে নেমে যায়। তুরস্কের মুদ্রাবাজার নিয়ন্ত্রণ কষ্টকর হয়ে পড়ে। অবস্থায় তুরস্ক আইএমএফের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। এটা খুবই সাহসী ও প্রশংসাযোগ্য পদক্ষেপ।
প্যাস্টর ইস্যুতে আমেরিকা তুরস্ককে অস্থিতিশীল করতে চেয়েছে। লিরার অবমূল্যায়ন তুরস্কে এরদোগানের বিপক্ষকে উসকে দিয়েছে। একটি মানুষের কারণে দেশের আর্থিক দুর্দশা নেমে আসবে, এটা তুরস্কের পণ্ডিতরা চান না। যথেষ্ট হয়েছে, তুরস্কের কোনো মান ক্ষুণœœ হয়নি। এমন ভেবে ব্রানসেনকে জেলে না রেখে ছেড়ে দেয়াই উত্তম বলে মনে করছে সবাই। তাই রাজনৈতিক মঞ্চে উঠে আসার ব্রানসেন ইস্যুকে তুরস্ক আর অগ্রসর না হতে দিয়ে তাকে ছেড়ে দেয়া হলো। ফলে এ ইস্যুতে আমেরিকা আর খেলতে পারল না। সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ড নিয়েও তুরস্কের নিন্দাবাদ করার সূত্র পাওয়া গেল না। খাশোগি হত্যাকাণ্ড কোনো বড় দুর্ঘটনার শুরু কি-না তা তুরস্ককে সতর্কতার সাথে ভাবতে হবে। এমবিএস-আমিরাত প্রিন্স-কুশনার-নেতানিয়াহুচক্র কোনো ফাঁদ পেতেছে কি-না তা সাবধানে বিবেচনা করতে হবে। উত্তর কোরিয়া, ইরান, চীন, পাকিস্তান, রাশিয়া-সবখানেই যুক্তরাষ্ট্র অবরোধ দিয়ে চাপ সৃষ্টি করেছে। অবরোধের পর তুরস্কে কী আছে তা দূরদৃষ্টি দিয়ে দেখা উচিত।

তুর্কি অর্থনীতিকে বেকায়দায় ফেলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র একটির পর অন্য একটি বিষয়ে মনোনিবেশ করছে; কিন্তু তুরস্ককে নতজানু করতে পারছে না। বিশ্ব রাজনীতি পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, কোনো দেশ পরমাণু শক্তি অর্জন করতে চাইলে পরাশক্তিগুলো অযৌক্তিক বাধার সৃষ্টি করছে এবং অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হতে চাইলে সেখানে বাধা বা অবরোধ দিচ্ছে। সম্প্রতি চীন, উত্তর কোরিয়া ও ইরানের ওপর অবরোধ আরোপ করা হয়েছে। চীনের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক যুদ্ধ বা বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আমলে। যুক্তরাষ্ট্র এসব সহ্য করতে পারছে না। গত দুই দশক ধরে তুরস্কের প্রবৃদ্ধি রেকর্ড শক্তিধর দেশগুলোকে হকচকিত করেছে। জিডিপি মাথাপিছু পাঁচগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তুরস্কের জনগণের বড় একটি অংশ প্রান্তিক দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পেয়েছে। কয়েক বছরে প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ এফডিআই বেড়েছে অভাবনীয়ভাবে এবং তুরস্কের রফতানি বেড়েছে অনেক। মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে এক সময় ১২.০ শতাংশে পৌঁছালেও তা এখন সিঙ্গেল ডিজিটে নেমে এসেছে। এটা তুরস্কের এক বড় অর্জন। প্রেসিডেন্ট এরদোগান বলেছেন, ‘তারা আমাদের ক্ষতিগ্রস্ত করতে অর্থনীতিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে একটুও দ্বিধা করবে না। কারণ তারা ইতোমধ্যে কূটনৈতিক এবং সামরিকভাবে সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে ব্যর্থ হয়েছে।’

তুরস্কের এনার্জি সেক্টর ৭৫ শতাংশ আমদানিনির্ভর। নবায়নযোগ্য জ্বালানি বৃদ্ধির জন্য এরদোগান ২০১৭ সালে প্রচুর বিনিয়োগ করায় এ খাতে সম্পদ তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন জ্বালানি বা এনার্জি খাতের আট শতাংশ সৌরশক্তি ও বায়ুপ্রবাহ থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে। এ বছর বিদ্যুতের জন্য পরমাণু চুল্লি স্থাপনের কাজ হাতে নেয়া হয়েছে। ওই কেন্দ্র উৎপাদন শুরু করলে এনার্জি খাতে বড় ধরনের অগ্রগতি সাধিত হবে। তাই সামনে পথচলার জন্য ব্রানসেন ইস্যুকে তুরস্ক পাত্তা না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। হাইটেক সরঞ্জাম, সিলিকন ভ্যালি, নিজস্ব গোয়েন্দা স্যাটেলাইট, অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান এসব তৈরির কাজ শুরু করা হয়েছে বছর দুই আগে। এরদোগান এগিয়ে যেতে চান। তাই যে সব ইস্যু উঠিয়ে আন্তর্জাতিক ও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি গরম করা হচ্ছে, সেগুলোকে উত্তপ্ত হতে দিতে চাইছে না আঙ্কারা। বড় অর্থনীতির তালিকায় তুরস্ক ১৮তম দেশ। বর্তমান ধারা চলতে থাকলে আরো উপরে উঠে যাবে তুরস্ক। তাই যুক্তরাষ্ট্র ইস্যু তুলে ‘সঠিক’ সময়ে তাকে আঘাত করতে চায়। এরদোগান বলেন, ‘অর্থনৈতিক আক্রমণ চালিয়ে তুরস্ককে খুব বেশি আর্থিক ক্ষতিগ্রস্ত করার সুযোগ নেই। তবে এর পেছনে ‘অন্য কিছু পরিকল্পনা’ রয়েছে।

ক্যু ঘটানোর চেষ্টায় এবং রাজনৈতিকভাবে পরাস্ত করতে না পারায় লিরাকে সঙ্কটে ফেলার নীলনকশা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। হয়তো বা সামনে আরো কিছু অভাবনীয় ঘটনা ঘটতে পারে। নিজেদের মুদ্রার মান পুনরুদ্ধারের লড়াইকে এরদোগান ‘স্বাধীনতা যুদ্ধ’ বলেও আখ্যায়িত করেছেন। তুরস্ক এরই মধ্যে বিশ্ববাণিজ্য এবং বাজার অর্থনীতিকে সংযুক্ত করে চলতে শিখেছে। তুরস্ক বুঝতে পেরেছে, ব্রানসেন তুরুপের তাস মাত্র। ব্রানসেন ইস্যুতে প্রাথমিকভাবে জড়িয়ে পড়লেও তুরস্ক এটাকে ঝেড়ে ফেলে দিয়েছে। এর অর্থ এই নয়, প্যাস্টর ব্রানসেন ধোয়া তুলসীপাতা। তাকে তো সাজা দেয়া হয়েছেই, অন্য অভিযোগগুলো প্রমাণিত হলে আরো অনেক বছর জেলে থাকতে হতো। যাহোক্, তাকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে বিনাশর্তে। ফলে তুর্কি-মার্কিন উত্তপ্ত অবস্থার নিরসন হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিজের স্বার্থে দীর্ঘ ছয় দশকেরও বেশি সময় যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্ক- এই দুই দেশের ঘনিষ্ঠতা ও মিত্রতা কোনো কাজে লাগেনি। তবে চীনা প্রবাদটির মতো আরো আগে ব্যবস্থা নিলে তুরস্কের অর্থনৈতিক অনেক ঝামেলার উদ্ভব হতো না। দেখা যায়, দেরিতে হলেও ট্রাম্প রাজনীতিতে প্রজ্ঞার কিছুটা পরিচয় দিয়েছেন।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব, বাংলাদেশ সরকার ও গ্রন্থকার


আরো সংবাদ