১২ ডিসেম্বর ২০১৮

ক্যাঙ্গারু কোর্ট ও নতজানু নির্বাচন কমিশন

-

১/১১ সরকার, এর কোনো সাংবিধানিক স্বীকৃতি ছিল না এবং এখনো নাই। (তবে মাননীয় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তৎসময়ে বলেছিলেন যে, ১/১১ সরকারের অবৈধ সরকারের সব কর্মকাণ্ডের তিনি বৈধতা দেবেন ক্ষমতা এসে) ওই অবৈধ সরকারের আমলে প্রধানমন্ত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী (যিনি ঠুনকো মামলায় বর্তমানে কারারুদ্ধ) গ্রেফতার হয়ে বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত হয়েছিলেন। তখন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাঘা নেতা যারা ১/১১ সরকারের কাছে তখনো নতজানু হননি, তাদের গ্রেফতার করে সংসদ ভবনে কোর্ট বসিয়ে বিচারনামক প্রহসন করা হয়। তখন দুই প্রধানমন্ত্রীকেই কোর্টে সে হাজির করা হতো বিচারের জন্য। তখন ওবায়দুল কাদের এবং আমি নিজেসহ রাজনীতির মাঠে বিদ্যমান অনেকেই কারাগারে একত্রে ছিলাম, একজনের বাড়ির খাবার আরেকজন খেয়ে অনেক তৃপ্তি পেতাম। খোশগল্প এবং কার বিরুদ্ধে কী মামলা তৈরি হচ্ছে, এসব নিয়ে আলাপ-আলোচনা হতো। ওবায়দুল কাদের ও আমি এক সাথেই ছিলাম। তখন দেখেছি কার কতটুকু সাহস, কে কতটুকু হিম্মত নিয়ে পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছেন।

তখন জাতীয় সংসদ ভবনে অবস্থিত আদালতকে আওয়ামী লীগ প্রধান ‘ক্যাঙ্গারু কোর্ট বলে সম্বোধন করতেন এবং সেই কোর্টের রায় দিয়েই প্রধানমন্ত্রী বিরোধীদলীয় প্রার্থীদের এখন ঘায়েল করছেন। আদালতে গিয়েও ভিন্ন মতাবলম্বী মানুষ কোনো আশ্রয় পাচ্ছে না। মনে করা যায়, সেখানেও সরকারের ইশারা-ইঙ্গিতের বাইরে কিছুই হচ্ছে না। উগান্ডার প্রেসিডেন্ট ইদি আমিনের মতের বিরুদ্ধে রায় দেয়ার চার দিন পরে উগান্ডার প্রধান বিচারপতির লাশ ড্রেনে পাওয়া গিয়েছিল। একটি রায় পছন্দ মতো না হওয়ায় বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার ভাগ্যে কী জুটেছে তা ইতিহাসের পাতায় খুঁজতে হবে না, বরং সম্প্রতি চোখের সামনেই ঘটেছে। বিচারপতি সিনহার ভাষ্যমতে, তাকে লাথি মেরে বাংলাদেশ থেকে বিদায় করা হয়েছে।

অথচ তিনি ছিলেন সরকারি ঘরানার একজন পৃষ্ঠপোষক। তার কথায় ও আচরণে প্রধানমন্ত্রীর একজন ভাবশিষ্য হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন। বিদায়ের লগ্নে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর অসন্তোষের কারণে তার এই বিদায়ের সুর। আরো আশ্চর্যের বিষয়, যে রায়ে সিনহার কপাল পুড়ল সেই রায়ে আপিল বিভাগের সব বিচারপতিই স্বাক্ষর করেছেন। কিন্তু সিনহা যখন রক্তচক্ষুর আওতায় আসলেন তখন তারা একযোগেই বলে বসলেন যে, সর্বোচ্চ ক্ষমতাবান সিনহা বাবুর সাথে নৈতিকতার প্রশ্নে আদালতে একত্রে আর বসবেন না। যারা উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত, সমাজ ও জাতির ভাগ্য বিধাতা, তারা অতিসুন্দর বাক্যে মনোভাব প্রকাশ করাই যুক্তিযুক্ত। বিষয়টি যদি খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের সমস্যা হিসেবে দেখা দিতো, তারা হয়তো (অশিক্ষিত খেটে খাওয়া মানুষ) এমনিভাবে বলত যে, ‘চাচা, আপন প্রাণ বাঁচা’। দুদকসহ বিভিন্ন মামলায় বিচারপ্রার্থীদের নিজেকে Defend করার সুযোগ সঙ্কুচিত করে দিয়েছিলেন।

র প্রতিদান তিনি পেয়েছেন। কারণ সিনহাকে গলা ধাক্কা দেয়ার প্রতিবাদে তিনি নিজেকে ডিফেন্ড করার ফুরসতই পাননি। বরং পদত্যাগ করে তার দুর্বলতা প্রকাশ করেছেন। দুদকের মামলাগুলোতে বিরোধীদের তিনি নাজেহাল করেছেন, অথচ দুদকের মামলার ভয়েই তার এই আত্মসমর্পণ। বিচারপতি আবদুল ওহাব মিয়া জীবনভর বিচারপ্রার্থীদের রিলিফ দিয়েছেন, সরকারের তাঁবেদারি করেননি। অনেকে বলে, ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি থেকে স্থায়ী প্রধান বিচারপতি হওয়ার আশায় তিনি নি¤œ আদালতের বিচারকদের সরকারি আমলাদের কাছে দায়বদ্ধ করে গেছেন। তিনি বিদায়লগ্নে তার দীর্ঘদিনের সহকর্মী আইনজীবীদের কোনো সংবর্ধনা পেলেন না। এই বিচারপতিকে চিনি দীর্ঘ দিন। পেশাগত জীবনে তাকে পেয়েছি একজন সহকর্মী হিসেবে, যাকে একজন আদর্শ ও নীতিবান মানুষ হিসেবে জেনেছি। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক হিসেবে তার ভূমিকাকে শ্রদ্ধা করি। আইনজীবী নেতা শামছুল হক চৌধুরীর নেতৃত্বে জনাব ওহাবের সাথে আন্দোলন সংগ্রাম করেছি। বিচারপতি সিনহাকে বিচারপতি ও আইনজীবী হিসেবে পেয়েছি। দুর্নীতি বা সরকারের পক্ষপাতিত্বের বিষয়ে তুলনামূলকভাবে বিচারপতি ওহাবের মান ছিল অনেক ঊর্ধ্বে।

যা হোক, সরকারি বিরোধীদের শায়েস্তা করে সিনহা কতটুকু লাভবান হলেন? যার জন্য করা হলো চুরি, তারাই তো তাকে চোর বললেন। অর্থাৎ লাথি তাদের পায়েই খেয়েছেন যাদের স্বার্থ রক্ষায় সিনহা ছিলেন আবেগাপ্লুত। বিচারপতি সিনহা নিজে সাম্প্রদায়িক না অসাম্প্রদায়িক প্রমাণ করার জন্য সুপ্রিম কোর্টে রাষ্ট্রীয় খরচে একটি মূর্তি স্থাপন করেছেন, যে মূর্তি পাহারা দেয়ার জন্য দু’জন পুলিশ পালাক্রমে নিয়োজিত রয়েছে। অসাম্প্রদায়িক এই বাংলাদেশে কোনো মূর্তি পাহারা দেয়ার জন্য পুলিশ লাগে না। তা হলে সিনহার মূর্তির জন্য রাষ্ট্রীয় খরচে পাহারা কেন? যাদের খুশি করার জন্য ৯২ শতাংশ মুসলমানের দেশের সর্বোচ্চ বিচারাঙ্গনে তিনি মূর্তি স্থাপন করেছিলেন তারাও তো তার করুণ বিদায়লগ্নে অশ্রু ঝরাতে এলেন না। এরই নাম কি কর্মফল?

সংবিধান মোতাবেক জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার জন্য তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। নির্বাচনকালে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকবে বলে নির্বাচন কমিশন বারবার ঘোষণা দিচ্ছে। নির্বাচন পর্যন্ত গ্রেফতার বন্ধ থাকবে বলে কমিশন ঘোষণা দিলেও জামিন নেয়ার জন্য আসা বিএনপি নেতাকর্মীদের বাড়ি ফেরা হয় না। আগাম জামিন নিয়ে বাড়িতে যাওয়া মাত্র আরেকটি মামলা এসে হাজির। আইনি বর্বরতার বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনের কোনো ‘রা’ নেই। তা ছাড়া বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি কি মানুষের এ দুর্দশার কথা জানেন না?

বিভিন্ন সময়ে উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত রয়েছে যে, উচ্চ আদালত কর্তৃক নিষ্পত্তি না হওয়া কোনো বিষয়কে চূড়ান্ত বলে ধরে নেয়া যাবে না, এটাই স্বীকৃত আইন। ক্যাঙ্গারু কোর্টের মামলা থেকে প্রধানমন্ত্রী ও তার সহকর্মীরা খালাস পেয়ে গেলেন, অথচ সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও তার সহকর্মীদের বিরুদ্ধে দুদক কর্তৃক একই আইনে দায়ের করা মামলা চলমান রইল, এ কেমন বিচারের ব্যবস্থা? সার্চ লাইট দিয়ে খোঁজ করে যুগ্মসচিব পদমর্যাদার একজন সাবেক রাজকর্মচারীকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, যেখানে সিনিয়র বিচারপতিরা সে দায়িত্ব পালন করতেও যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে। সরকারের চাহিদা/পছন্দমতো নিয়োগকৃত প্রধান নির্বাচন কমিশনার তার মেরুদণ্ড কতটুকু সোজা রাখতে পারছেন, তা জাতি অবশ্যই পর্যবেক্ষণ করছে। সব কিছুর পরও, বিচার বিভাগই মানুষের শেষ ভরসা। সে ভরসা থেকে যদি মানুষের মন উঠে যায়, তবে বুক ভরা বেদনাময় নিঃশ্বাস ত্যাগ করার জন্য মানুষের আর জায়গা থাকে না।

ক্যাঙ্গারু আদালত থেকে নির্বিচারে যারা সাজাপ্রাপ্ত হয়েছেন, উচ্চ আদালতে সরকারি ঘরানার লোকজন খালাস পেলেও বিরোধীদের ললাট থেকে সেই সিলমোহর মোছা যায়নি। হাইকোর্ট যাদের সাজা স্থগিত করেছে, তারাও নাকি নির্বাচন করতে পারবেন না। যদি তাই হয় তবে সাজা স্থগিত করার জন্য ফৌজদারি কার্যবিধির ৪২৬ ধারা মোতাবেক সাজা স্থগিত করার জন্য হাইকোর্টের যে রায় রয়েছে, সেই ক্ষমতা খর্ব করার জন্য আইন সংশোধন করতে হবে। হাইকোর্টের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সাজা স্থগিত হওয়া ব্যক্তি নির্বাচনে অযোগ্য হবেন না।

বাংলাদেশের আইন এখন দুই ভাবে প্রযোজ্য। নির্বাচন কমিশনের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের আইনও এখন দুইভাগে প্রবাহিত হচ্ছে। সরকারি দলের আইন ভঙ্গে যেন কোনো অপরাধ হয় না। আইনকে ব্যবহার করে চলছে নিপীড়ন এবং বিরোধীদের ওপর যে পুলিশ-আমলা যত বেশি নির্যাতন করতে পারবে তার সৌভাগ্য তত বেশি, এটাই এখন নাকি প্রমোশনের যোগ্যতা।

দেশবাসী অবশ্যই বিরোধী দলের ওপর এ নির্যাতনের খোঁজখবর রাখেন। বিষয়টি অবশ্যই সত্য যে, হাইকোর্ট আগাম জামিন দেয় বলেই নির্যাতিত দেশবাসী এখনো কিছুটা নিঃশ্বাস নিতে পারে। বিচার বিভাগ যদি তাদের বিচারিক সিদ্ধান্তে দু’পক্ষকে (সরকার-বিরোধী দল) সমভাবে দেখেন তবে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। দুদকের যে মামলায় মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া খালাস পেয়েছেন, একই মামলায় তিনি বিএনপির আমলে মন্ত্রী হলে খালাস পেতেন কি-না তা জনমনে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। বিচার বিভাগ সব প্রশ্নের ঊর্ধ্বে থাকবে, এটাই জাতির প্রত্যাশা। জনগণের নিঃশ্বাস নেয়ার সুযোগ সম্মানিত বিচার বিভাগ করবেন, এটাই জাতির প্রত্যাশা।
লেখক : কলামিস্ট ও আইনজীবী (অ্যাপিলেট ডিভিশন)
E-mail: [email protected]


আরো সংবাদ