১১ ডিসেম্বর ২০১৮

জীবন রক্ষার অধিকার

-

‘মানবাধিকারের মহাসনদ’ বিশ্বব্যাপী আলোচিত একটি বিষয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংস তাণ্ডবের পর মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষায় বিশ্বব্যাপী সোচ্চার আওয়াজ এবং উদ্যোগ দু’টিই দেখা যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে যুদ্ধবিগ্রহ একেবারেই হয়নি এ কথা বলা যাবে না। কিন্তু এ সময়ে বিশ্বব্যবস্থায় স্নায়ুযুদ্ধের মধ্যেও এক ধরনের ক্ষমতার ভারসাম্য থাকায় কমিউনিজমবহির্ভূত বিশ্বে নাগরিকদের জীবন ও সম্পদের অনেকটা নিরাপত্তার নিশ্চয়তা বিধান করা হয়েছিল। স্নায়ুযুদ্ধের অবসান-উত্তর বিশ্বে গণতন্ত্র ও মুক্তবাজার ব্যবস্থার এক প্রকার জয়জয়কার অবস্থার মধ্যেও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধ, অস্থিরতা এবং ভয়ানক মানবাধিকার হরণের অবস্থা চলে আসছে।

নব্বইয়ের পর দেড় দশক ধরে গণতন্ত্রচর্চার পর বাংলাদেশও এই দুরবস্থার মধ্য থেকে যেন মুক্ত হতে পারছে না। সমাজতান্ত্রিক বিশ্বে জনগণের নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হলেও রাষ্ট্র বা ক্ষমতাসীন দলের কর্তৃত্ব বজায় রাখতে জনগণের উন্নয়ন ও অধিকারের কথা বেশি বলা হয়। এ দিকে, বাংলাদেশের সংবিধান ও আইনের নানা ধরনের পরিবর্তনের পর এক ধরনের কর্তৃত্বমূলক ব্যবস্থা এখন দেখা যায়। এরপরও জনগণের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় আইনি কাঠামোতে সুরক্ষার অনেক ব্যবস্থা রয়েছে। এসব ব্যবস্থার যথাযথ প্রয়োগ সম্ভব হলে যেখানে-সেখানে নাগরিক বা ভিন্নমতের লোকদের প্রাণহানি ঘটা কিংবা লাশ পড়ে থাকার মতো নিরাপত্তাহীন অবস্থা থাকার কথা নয়। কিন্তু এ সুরক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে জনগণের জ্ঞান বা সচেতনতার মাত্রা বেশ কম। বাংলাদেশের আইন প্রত্যেক নাগরিকের জীবন ও সম্পদ রক্ষাকল্পে তার নিজের এবং তার প্রতি সহমর্মী অন্য যেকোনো নাগরিককে কিছু ক্ষমতা প্রদান করেছে।

কিন্তু সার্বজনীন এ বিষয়টি আমাদের সাধারণ শিক্ষা কারিকুলামে অন্তর্ভুক্ত নেই। ফলে এ ব্যাপারে শুধু আইনজীবী এবং পুলিশ ছাড়া সাধারণ জনগণ কমই জানেন। আর এই কারণে কোনো নাগরিকের জীবন ও সম্পদ কখনো হুমকির মুখে পড়লে তাৎক্ষণিকভাবে তিনি নিজে বা তার নিকটবর্তী অন্য কোনো সহমর্মী এ ব্যাপারে প্রতিরোধ বা প্রতিকারের কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করে সেই পুলিশের প্রত্যাশায় অপেক্ষা করতে থাকেন, যাদের অনেকে এখন নিজেরাই রক্ষক না হয়ে ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ বলে মনে করা হয়।

বাংলাদেশ দণ্ডবিধি ধারা ১০০-এ বলা হয়েছে, ৯৯ ধারার শর্তসাপেক্ষে যেকোনো ব্যক্তি নি¤œলিখিত ক্ষেত্রগুলোতে নিজেকে এবং অন্যকে রক্ষার অধিকার প্রয়োগ করতে গিয়ে আক্রমণকারী, সে যেই হোক, তার মৃত্যু পর্যন্ত ঘটাতে পারেন- সেই আক্রমণ যদি এমন হয়, তার ফলে আক্রান্ত ব্যক্তি নিহত বা গুরুতর আহত হতে পারেন মর্মে যুক্তিসঙ্গত আতঙ্ক সৃষ্টি হয়।

আরো বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তিকে অবৈধভাবে আটক করার ইচ্ছা নিয়ে যদি কেউ আক্রমণ করে, যাতে আক্রান্ত ব্যক্তির এ রকম আতঙ্কের সৃষ্টি হয় যে, তিনি সেই আটকাবস্থা থেকে মুক্তির জন্য বৈধ কোনো সরকারি কর্তৃপক্ষের সাহায্য পাবেন না; সে ক্ষেত্রেও একই কাজ করতে পারেন।

‘গুরুতর আহত’ হওয়ার বিষয়টি এখানে গুরুত্বপূর্ণ। দণ্ডবিধি ধারা : ৩২০ অনুযায়ী নিম্নবর্ণিত আহতাবস্থাকে ‘গুরুতর আহত’ হওয়া বলে গণ্য করা হয়- প্রথমত, পুরুষত্বহীনকরণ। দ্বিতীয়ত ও তৃতীয়ত, যেকোনো একটি চোখের দৃষ্টিশক্তি বা কানের শ্রবণশক্তি স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে যাওয়া। চতুর্থত ও পঞ্চমত, শরীরের যেকোনো অঙ্গের কর্মশক্তিসমূহের বিনাশ বা স্থায়ী ক্ষতিসাধন। ষষ্ঠত, মাথা বা মুখমণ্ডলের স্থায়ী বিকৃতি। সপ্তমত, হাড় বা দাঁত ভেঙে ফেলা। অষ্টমত, যে আঘাত আক্রান্ত ব্যক্তিকে কমপক্ষে ২০ দিনের জন্য সাধারণ কাজকর্ম করতে অক্ষম করে ফেলে।

দণ্ডবিধির ধারা : ৯৯-এ যেসব কার্যের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত প্রতিরক্ষার অধিকার নেই, তার উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বৈধ কোনো সরকারি কর্মচারীর সরল বিশ্বাসে কৃত কোনো কার্য, তা যদি আইনের দৃষ্টিতে যথাযথরূপে যুক্তিযুক্ত মনে না-ও হয় এবং সেই কার্যের ফলে যদি যুক্তিসঙ্গতভাবে মৃত্যু বা গুরুতর আঘাতের আশঙ্কা সৃষ্টি না হয়, তবে সেই সরকারি কর্মচারীর উক্তরূপ কার্যের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার ব্যক্তিগত অধিকার থাকবে না।

এ ছাড়া, যেসব ক্ষেত্রে দায়ী সরকারি কর্মচারীর কোনো কার্যের বিরুদ্ধে তার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ থাকে, সেসব ক্ষেত্রেও সরকারি কর্মচারীর উক্তরূপ কার্যের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার ব্যক্তিগত অধিকার প্রয়োগ করা যাবে না। তবে আত্মরক্ষার ব্যক্তিগত অধিকার প্রয়োগের সময় অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে, যাতে তা প্রয়োগের জন্য যতটুকু শক্তি প্রয়োগ করা বাঞ্ছনীয়, তার অধিক কোনো শক্তি প্রয়োগ করা না হয়। অর্থাৎ যে মুহূর্তে ধারা ১০০-এ বর্ণিত আশঙ্কা দূর হয়ে যায়, তখন আর আত্মরক্ষার ব্যক্তিগত অধিকার প্রয়োগ করা যায় না।

একটি বিষয় উল্লেখ করা যায়, যদি কোনো ব্যক্তি দায়িত্ব পালনকারীকে সরকারি কর্মচারী বলে চিনতে, বুঝতে বা বিশ্বাস করতে না পারে; তাহলে অন্যান্য স্বাভাবিক নিয়মের মতোই সে তার আত্মরক্ষার ব্যক্তিগত অধিকার প্রয়োগ করতে পারবে।

‘সরল বিশ্বাসে কৃতকার্য’ বলতে কী বোঝানো হবে, তার উল্লেখও রয়েছে আইনে। দণ্ডবিধি ধারা : ৫২ অনুযায়ী যথাযথ সতর্কতা ও মনোযোগ ব্যতিরেকে সম্পাদিত কোনো কার্যকেই সরল বিশ্বাসে সম্পন্ন কার্য বলে গণ্য করা হবে না। জেনারেল ক্লজেস অ্যাক্ট ১৮৯৭-এর ধারা : ৩ (২২) অনুসারে, শুধু সেই কাজকেই সরল বিশ্বাসে সম্পন্নকৃত কার্য বলে গণ্য করা হবে, যে কার্যটি সততার সাথে সম্পন্ন করা হয়।
আর সাক্ষ্য আইনের ৩৮ ও ৮৪ ধারা মতে, প্রাসঙ্গিক উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী যদি আইনে বর্ণিত বিধানের লঙ্ঘন ঘটিয়ে কোনো কাজ করে, তবে আইন তাকে সরল বিশ্বাসে কৃত কাজ বলে গণ্য করে না।

আমরা জানি, উচ্চতর আদালতের প্রতিটি নির্দেশ বা আদেশ পালন করা দেশের প্রত্যেক নাগরিক ও সংস্থার জন্য বাধ্যতামূলক। এই নির্দেশনার ক্ষমতা এত ব্যাপক যে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা সংবিধানের সংশোধনীকেও রহিত করতে পারে। সাম্প্রতিক এমন নজিরও রয়েছে আমাদের সামনেই। এমনই একটি নির্দেশনা ৫৫ ডিএলআর (২০০৩) ৩৬৩।

এই নির্দেশনার প্রেক্ষাপট ছিল- ২৪ জুলাই ১৯৯৮ তারিখে ঢাকার ইনডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটির ছাত্র শামীম রেজা রুবেলকে ডিএমপির ডিবি পুলিশ প্রথমে আটক এবং পরবর্তীকালে অমানবিক নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করে তার লাশ মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ের পানির ট্যাংকের মধ্যে গুম করে রাখে। পুলিশের বিরুদ্ধে রুজুকৃত সেই মামলায় ২০০৩ সালে এসি আকরাম হোসেনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং জড়িত অন্য ১৩ পুলিশ কর্মকর্তাকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা প্রদান করে বিচারপতি মো: হামিদুল হক এবং বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরীর একটি হাইকোর্ট বেঞ্চ ‘পুলিশের গ্রেফতার এবং ম্যাজিস্ট্রেটের রিমান্ড প্রদান’ বিষয়ক একটি নির্দেশনা জারি করেছেন।

গত ২৪ মে ২০১৬ সালে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে সুপ্রিম কোর্টের একটি পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ এ বিষয়ে হাইকোর্টের দেয়া ১৫ দফা নির্দেশনা অনুমোদন করেন। এই বেঞ্চের সদস্য ছিলেন বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন [বর্তমান প্রধান বিচারপতি]; বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি মির্জা হোসেন হায়দার। এই নির্দেশনার মধ্যে ছিল- ১. ডিটেনশন দেয়ার উদ্দেশ্যে কাউকে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার করা যাবে না। ২. ইউনিফর্মড বা ডিবি পুলিশ, যে-ই হোক না কেন, গ্রেফতারকারী পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করার সময় তার নিজের পরিচয়পত্র প্রদর্শন করতে বাধ্য থাকবে। ৩. জিডির পাশাপাশি একটি পৃথক রেজিস্টার খাতায় গ্রেফতারের কারণ এবং গ্রেফতারকৃত ব্যক্তির বিস্তারিত বিবরণ লিপিবদ্ধ করতে হবে।

৪. গ্রেফতারকৃত ব্যক্তি যদি গ্রেফতারকালীন সময়ে অসুস্থ থাকেন বা আহত হন, তবে সেই অসুস্থতা বা আহত হওয়ার কারণ সবিস্তারে উল্লেখপূর্বক গ্রেফতারকারী পুলিশ কর্মকর্তা তাকে নিকটস্থ হাসপাতাল অথবা সরকারি কোনো ডাক্তারের কাছে হাজির করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও ডাক্তারি সনদ গ্রহণ করবেন। ৫. গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে থানায় নেয়ার তিন ঘণ্টার মধ্যেই ৩-এ বর্ণিত লিপিবদ্ধ করার কাজটি সম্পন্ন করতে হবে। ৬. গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে যদি তার নিজ আবাসস্থল বা ব্যবসা-চাকরিস্থল থেকে গ্রেফতার না করে অন্য যেকোনো স্থান থেকে গ্রেফতার করা হয়, তাহলে গ্রেফতারকারী পুলিশ এমন গ্রেফতারের বিষয়টি এক ঘণ্টার মধ্যে হয় ফোনে অথবা কোনো বাহকের মাধ্যমে গ্রেফতারকৃত ব্যক্তির কাছে আত্মীয়স্বজন কাউকে অবহিত করবেন।

৭. গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে তার পছন্দমতো আইনজীবীর সাথে পরামর্শ এবং তার নিকটাত্মীয়দের সাথে তার চাহিদানুযায়ী সাক্ষাতের সুযোগ দিতে হবে। ৮. গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে যখন ফৌজদারি কার্যধারা-৬১ মোতাবেক [গ্রেফতারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে] আদালতে প্রেরণ করা হবে, তখন যদি ১৬৭ ধারা মোতাবেক পুলিশ রিমান্ডের আবেদন করে, তাহলে সেই আবেদনে পুলিশ বিপি ফরম নং ৩৮-এ লিখিত কেস ডায়েরিতে বিস্তারিত সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিয়ে বলবে যে, কেন গত ২৪ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের পরও গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আরো সময়ের প্রয়োজন। ৯. উক্তরূপ পুলিশ রিপোর্ট অবলোকনের পর যথার্থতা ও যৌক্তিকতা বিবেচনায় ম্যাজিস্ট্রেট হয় গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে মুক্তি দিয়ে দেবেন, নতুবা জেলহাজতে প্রেরণ করবেন অথবা রিমান্ড দেবেন।

১০. ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে যদি প্রতীয়মান হয়, গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে গ্রেফতার করার মতো যথেষ্ট যৌক্তিক কারণ নেই কিংবা যথার্থ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি, তাহলে ফৌজদারি কার্যধারা-১৯০(১) অনুযায়ী, গ্রেফতারকারী পুলিশের বিরুদ্ধে তিনি দণ্ডবিধি ২২০ ধারা অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। দণ্ডবিধি ২২০ ধারায় বলা হয়েছে, যে পুলিশ কর্মচারী অসাধুভাবে বা বিদ্বেষাত্মকভাবে কোনো ব্যক্তিকে আটক করে, এবং অতঃপর আইনের পরিপন্থী হওয়া সত্ত্বেও তাকে আটক করে রাখে, সেই পুলিশ কর্মচারী এই ধারায় অপরাধী বলে গণ্য হবে; যার শাস্তি সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড। অর্থ আদায় বা অন্য কোনো অসৎ উদ্দেশ্যে মিথ্যা কোনো মামলা বা অভিযোগের ভিত্তিতে যখন কোনো ব্যক্তিকে পুলিশ আটক করে তাকে প্রসিকিউট করার ভয় দেখায়, তখন এ ধরনের অপরাধের কারণে ওই পুলিশ অফিসারের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ধারা : ২২০-এ অভিযোগ আনয়ন করতে হয়। বস্তুত যৌক্তিক কারণ এবং নির্ভেজাল বিশ্বাস ছাড়া কোনো পুলিশ অফিসার যখন কোনো ব্যক্তিকে অন্যায়ভাবে অথবা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে গ্রেফতার করেন, তখন তিনি নিজেকে ধারা দণ্ড-২২০এর অধীনে ‘প্রসিকিউটেবল’ করে ফেলেন।

১১. যদি কোনো ব্যক্তিকে রিমান্ডকালীন জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন হয়, তবে যত দিন পর্যন্ত স্বচ্ছ কাচের দেয়াল নির্মিত কক্ষ [যা এই নির্দেশনার ই(২)(ন) প্যারায় উল্লেখ করা হয়েছে] তৈরি না হয়, তত দিন এমন একটি কক্ষে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে, যে কক্ষটির মধ্যকার কথাবার্তা বাইরে থেকে শোনা না গেলেও দূর থেকে তাদেরকে দেখা যায়।

১২. পুলিশের আবেদন সন্তোষজনক বিবেচিত হওয়ায় ম্যাজিস্ট্রেট যদি রিমান্ড প্রদান করেনও, এর মেয়াদ কোনোক্রমেই তিন দিনের বেশি হবে না।

১৩. রিমান্ড আদেশ প্রদানের আগে ম্যাজিস্ট্রেট গ্রেফতারকৃত ব্যক্তি এবং তার আইনজীবীর বক্তব্য গুরুত্বসহকারে শুনে তা বিবেচনায় নেবেন। তারপরও যদি তিনি রিমান্ড প্রদানের আদেশ দেন, তবে পুলিশ হেফাজতে পুনরায় দেয়ার আগে গ্রেফতারকৃত ব্যক্তির মেডিক্যাল চেকআপ করিয়ে নেয়ার আদেশ দেবেন। অতঃপর সেই মেডিক্যাল চেকআপ রিপোর্ট ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দাখিল করে পুলিশ সেই ব্যক্তিকে রিমান্ডে নেবেন। রিমান্ডে নেয়ার পর শুধু মামলার তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তাই তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবেন, অন্য কেউ নয়। রিমান্ডের সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই তাকে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে উপস্থাপন করতে হবে। এই উপস্থিতির পর যদি গ্রেফতারকৃত ব্যক্তি রিমান্ডকালে তার ওপর কোনো শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ পেশ করেন, তবে ম্যাজিস্ট্রেট ওই ব্যক্তিকে সেই ডাক্তারের কাছে পরীক্ষার জন্য প্রেরণ করবেন, যিনি রিমান্ড প্রদানের আগে তাকে পরীক্ষা করেছিলেন। এরপর সেই ডাক্তারি রিপোর্টে যদি রিমান্ডকালীন নির্যাতনের কোনো প্রমাণ বা চিহ্নের বিবরণ পাওয়া যায়, তাহলে ম্যাজিস্ট্রেট বিলম্ব না করে, তৎক্ষণাৎ ফৌ:কা: ধারা-১৯০(১) অনুযায়ী গ্রেফতারকারী পুলিশের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি ৩৩০ ধারা অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। দণ্ডবিধি ৩৩০ ধারায় উল্লেখ রয়েছে, কোনো অপরাধ অনুষ্ঠান করেছে মর্মে স্বীকারোক্তি আদায় করার উদ্দেশ্যে যদি কোনো পুলিশ কর্মকর্তা অপর কোনো ব্যক্তিকে নির্যাতন করেন, তাহলে তিনি এই ধারায় অপরাধী বলে গণ্য হয়ে যান। এর শাস্তি সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড।

১৪. গ্রেফতারকৃত অবস্থায়, হোক তা জেলখানায় কিংবা পুলিশ রিমান্ডে, কোনো ব্যক্তির মৃত্যু ঘটলে জেল কর্তৃপক্ষ বা তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তা অবিলম্বে নিকটস্থ ম্যাজিস্ট্রেটকে তা অবহিত করবেন। ১৫. অতঃপর সংবাদপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট সেই মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেবেন।

এটা বলার কোনো অবকাশই রাখে না যে, গত ২৫ মে ২০১৬ থেকেই বর্ণিত ১৫টি দফা আইনে [ধারায়] পরিণত হয়ে গেছে। এর বরখেলাপকারী পুলিশ-ম্যাজিস্ট্রেট বা অন্য যেকোনো সরকারি কর্মচারীর কার্য সম্পূর্ণভাবে বেআইনি বা অপরাধকর্ম হিসেবে গণ্য হবে। আর আইনের বিধান মতে, যেকোনো বেআইনি বা অপরাধকর্মের বিরুদ্ধে মানুষের আত্মরক্ষার ব্যক্তিগত অধিকার প্রয়োগ কোনো অপরাধ নয়। বরং প্রত্যেক নাগরিকের তা অবশ্যকরণীয় কর্তব্য। আইনের স্বাভাবিক প্রয়োগ সব নাগরিককে সুরক্ষা দেয়; আর এর যেকোনো অপপ্রয়োগ যিনি এই অপপ্রয়োগের সাথে যুক্ত, তার জীবনকেও বিপন্ন করতে পারে। এ কারণে রাষ্ট্রের স্থিতি এবং অগ্রগতির জন্যও নাগরিকের সুরক্ষার্থে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
[email protected]


আরো সংবাদ