১১ ডিসেম্বর ২০১৮

আসন্ন জাতীয় নির্বাচন

-

আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র, নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে প্রকাশিত ‘কাঠমান্ডু ট্রিবিউন’ নামের একটি ইংরেজি পত্রিকার বেশ খ্যাতি আছে। এতে বেনজামিন মেনদেজ নামে এক ব্যক্তি একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন ৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ তারিখে। মেনদেজ একসময় ছিলেন একটি ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। এখন তিনি গবেষণা করে চলেছেন দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে। তিনি তার লেখায় বলেছিলেন, বাংলাদেশে নির্বাচন হবে না। বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে সেনাশাসনের দিকে। তার মতে, ‘শেখ হাসিনা ভাবছেন, দেশের শাসনভার সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দিয়ে দেশত্যাগ করার কথা। কারণ তিনি বুঝছেন, নির্বাচনে তার পক্ষে বিজয়ী হওয়া সম্ভব হবে না।’

কাঠমান্ডু ট্রিবিউনে প্রকাশিত এই লেখাটির ওপর নির্ভর করে বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত একটি অনলাইন পত্রিকা ‘দৈনিক দাবানল২৪ ডটকম’ একই রকম মন্তব্য করেছে। ফলে গুজব রটে যায়, বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন হবে না। কিন্তু এই গুজব সত্য হয়নি। নির্বাচন হবে বলেই এখন মনে হচ্ছে। নির্বাচন হোক, সেটা চাচ্ছে বিশেষভাবে যুক্তরাষ্ট্র। সে দেশ থেকে আসছেন সরকারিভাবে নির্বাচন পরিদর্শক। অবশ্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন পর্যবেক্ষক পাঠাবে বলেও এখন আর আসতে ইচ্ছুক হচ্ছে না।

কিন্তু ইইউর চেয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছাই এ ক্ষেত্রে যে প্রাধান্য পাবে, সেটা অনুমান করা চলে। চীনের রেমল্যান্ডে অবস্থিত বাংলাদেশ। তাই চীনের সাথে উদ্ভব হতে পেরেছে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ প্রতিযোগিতা। যুক্তরাষ্ট্র চাচ্ছে বাংলাদেশকে আপন প্রভাব বলয়ে রাখতে। অর্থাৎ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কেবল তার ভেতরের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হতে যাচ্ছে না, নিয়ন্ত্রিত হতে যাচ্ছে বর্তমান বিশ্বের সাধারণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির দ্বারাও। এ ক্ষেত্রে জড়িত হয়ে পড়ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের স্বার্থ। বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনকে বিচার করতে হলে বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানকেও বিশেষ বিবেচনায় নিতে হবে।

ভারতের একটি গবেষণা সংস্থাকে সংক্ষেপে বলে ORF (Observer Research Foundtion)। এতে গবেষণা করেন পিনাকরঞ্জন চক্রবর্তী। ইনি একসময় ছিলেন বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার। তিনি তার একটি গবেষণামূলক লেখায় (৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮) বলেছেন, বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী হলো পাকিস্তানের পঞ্চম বাহিনী, Fifth column. তার এই উক্তি থেকে এ রকম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যায়, যেহেতু বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে জামায়াত, তাই বিএনপিও আসলে হলো একটা ‘পাকিস্তানপন্থী’ দল। তবে পিনাক সরাসরি এটা বলেননি। জামায়াত সাইডবোর্ডসর্বস্ব দল নয়। দলটি হয়ে উঠেছে খুবই সুসংগঠিত। জামায়াত হয়ে উঠেছে ভারতের ভাবনার বিষয়।

বিলেতের নাম করা পাক্ষিক পত্রিকা The Economist-এর একটি সংখ্যায় তিন বছর আগে (৫ মার্চ, ২০১৫) বলা হয়েছে যে, জামায়াতে ইসলামী হলো বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল। The Economist পত্রিকা সাধারণত হালকাভাবে কিছু বলে না। বরং যথেষ্ট খোঁজখবর নিয়েই বলে। কখনো আইন পড়িনি। আইন আদালত আমি ভালো বুঝি না। কিন্তু বাংলাদেশে সুপ্রিম কোর্ট আদেশ দিয়েছেন যে, এই দল নিবন্ধিত হওয়ার যোগ্য নয়। কারণ দলটি করেছিল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগিতা। উল্লেখ্য, সাবেক পাকিস্তান ছিল আন্তর্জাতিকভাবে একটি স্বীকৃত রাষ্ট্র। আমরা সে সময় সবাই ছিলাম রাষ্ট্রনৈতিকভাবে সাবেক পাকিস্তানের নাগরিক। পাকিস্তানকে ‘টিকিয়ে রাখা’র জন্য যুদ্ধ করাটা অপরাধ বলে কেন গণ্য হবে, সেটা অনেকের উপলব্ধিতে আসে না। তা ছাড়া, কেবল জামায়াতই যে চেয়েছিল সাবেক পাকিস্তান টিকে থাকুক, তা নয়।

চীনপন্থী কমিউনিস্টরাও চেয়েছিলেন সাবেক পাকিস্তান ‘অখণ্ড থাকুক’। ১৯৭২ সালে চীনপন্থী কমিউনিস্টরা বাংলাদেশে জামায়াতের চেয়ে ছিলেন অনেক শক্তিশালী। কিন্তু তাদের সম্পর্কে আমাদের সর্বোচ্চ আদালত নীরব থাকা শ্রেয় মনে করেছেন। চীনের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী চৌ-এন-লাই ১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল ঘোষণা করেছিলেন, ‘বহিরাক্রমণ থেকে পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার জন্য গণচীন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’ চীন একপর্যায়ে কাশ্মিরের লাদাখে সৈন্য সমাবেশ করে। অন্য দিকে ভারত যাতে যুদ্ধ থামায়, সেজন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গোপসাগরে পাঠায় সপ্তম নৌবহর। অর্থাৎ ১৯৭১ সালের যুদ্ধের সময় পরিস্থিতি ছিল খুবই জটিল।

জামায়াতে ইসলামী তার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল এমন এক অতিজটিল পরিস্থিতিতে। বাংলাদেশ হওয়ার পর বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় (অর্থাৎ ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ এবং ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল) জামায়াত ছিল বিএনপির সাথে খুবই ঘনিষ্ঠ। এ সময় খালেদা জিয়ার ক্যাবিনেটে জামায়াত থেকে ছিলেন দুইজন মন্ত্রী। তার প্রধানমন্ত্রিত্বের সময় বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট জামায়াতকে ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী’ বলে কোনো মন্তব্য করেননি। কিন্তু এখন জামায়াত চিহ্নিত হচ্ছে ‘দেশদ্রোহী’ হিসেবে। আইনের এই জটিলতা অনেকেরই বোধগম্য নয়। কারণ এর ফলে জামায়াতের রাজনীতি করা বন্ধ করা যায়নি। জামায়াতের খুব কম করে হলেও, এবার ২৪ জন দাঁড়াচ্ছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি থেকে। আর ২২ জন দাঁড়াচ্ছেন নির্দলীয় প্রার্থী হিসেবে।

জামায়াত কেবল একটি রাজনৈতিক দল নয়; তার আছে আর্থ-সামাজিক কার্যক্রম যা তাকে করে তুলেছে জনপ্রিয়। যেমন : তার আছে বিদ্যালয়; আছে মেডিক্যাল কলেজ; আছে হাসপাতাল; আছে বিশেষ ব্যাংক ব্যবস্থা; অন্য কোনো দলের যা নাই। অন্য দল করে কেবলই ভোটকেন্দ্রিক রাজনীতি। জামায়াতকে তাই ভারত ভয় পাওয়াই স্বাভাবিক। তাই চলেছে জামায়াতের বিপক্ষে নানা প্রচারণা। বাংলাদেশের খ্যাতনামা প্রবীণ সাংবাদিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী লন্ডনে বসে লিখেছেন (দৈনিক যুগান্তর, তৃতীয় মত, ২৬ নভেম্বর, ২০১৮) যে, দু’টি প্রতীকের মধ্যে মানুষ কেবল প্রতীক দেখেই ভোট দেবে। কিন্তু আমার মনে হয়, প্রতীকের সাথে আসবে কিছু নীতি আদর্শের কথাও। নীতি ও আদর্শকে বাদ দিয়ে নির্বাচকমণ্ডলী অন্ধভাবে প্রতীক অনুসরণ করতে যাবেন না। কিছু ভাসমান ভোটার হয়তো কেবলই প্রতীক দ্বারা আকৃষ্ট হতে পারেন।

বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট রাজনৈতিক বুদ্ধিজীবী হলেন বদরুদ্দীন উমর। তিনি বলছেন (যুগান্তর, ২৭ নভেম্বর, ২০১৮) যে, আসন্ন নির্বাচন হবে খুবই জটিল। এর এক দিকে থাকবে ক্ষমতাসীন দল, যে দল নির্বাচনে চাইবে নির্বাচন কমিশন, আমলা ও পুলিশের সহায়তায় জয় লাভ করতে। অন্য দিকে থাকবে সর্বসাধারণ। আওয়ামী লীগের জয় জয়কার হবে এমন কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। তা সত্ত্বেও ক্ষমতাসীন দল কিছু আসনে ভোট কারচুপি করে জয় লাভ করতে পারলেও সারা দেশে সে এ কাজ করতে পারবে না। তার মতে, অতীতে দেখা গেছে যে, নির্বাচনে জনগণ বড় সংখ্যায় যখনই ভোটদানের জন্য উদগ্রীব হয়, তখনই এর অর্থ দাঁড়ায়-এরা পরিবর্তন চান। ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হচ্ছে বদরুদ্দীন উমরের এই বক্তব্য খেটে যেতেও পারে। এটা আরো ভাবতে পারছি এই কারণে যে, আওয়ামী লীগের মধ্যে আরম্ভ হয়েছে ‘মারমার কাটকাট’। দল হিসেবে আওয়ামী লীগ যেন নিজের হাতেই নিজেকে চড় মারতে যাচ্ছে।
লেখক : প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট


আরো সংবাদ