১১ ডিসেম্বর ২০১৮

ভারতের আসন্ন নির্বাচন ও নির্বাচনী ইস্যু

-

ভারতের কেন্দ্রীয় বা লোকসভার সম্ভাব্য নির্বাচন আগামী বছর ২০১৯ সালের মে মাসের মধ্যে, অর্থাৎ প্রায় পাঁচ মাসের মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে। গতবার মানে ২০১৪ সালের নির্বাচনের সাথে তুলনায় এবারের বিজেপির মোদি একেবারেই উল্টো- অর্থনীতি নিয়ে কোনো আলাপ না উঠলেই কেবল তিনি ভালো বোধ করছেন। অথচ গতবার ‘কাজ সৃষ্টি করতে পারার অর্থনীতি’ একমাত্র তিনিই দিতে পারবেন। অথবা সেই মন ভোলানো শব্দ ‘মোদি মডেল’ বা ‘গুজরাট মডেলের’ অর্থনীতি তিনি গড়বেন- এসব প্রতিশ্রুতি ছিল গতবার মোদির নির্বাচনে জেতার মূল স্লোগান। এখন বাস্তব মোদি জমানার গত প্রায় পাঁচ বছরের বাস্তবতা হলো পুরো উল্টো। সোজাসাপ্টা আঙুলে গুনে বলা কথা হিসেবে, মোদিকে তার দেয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হলে অর্থনীতিতে জিডিপি নিরন্তর ৮.২ শতাংশের ওপরে নিতে হতো এবং সেখানেই ধরে রাখতে হতো। মোদি জমানায় কেবল এক কোয়ার্টারে (তিন মাসে) তা ধরা সম্ভব হয়েছিল। আর আজ প্রকাশিত রয়টার্সের রিপোর্ট হলোÑ এটা আর সম্ভব নয়, আগামীতে এটা নিম্নগামী অভিমুখে ৭ শতাংশের আশপাশেই যাবে।

অর্থনীতি চাকরি বা কাজ সৃষ্টি করতে পারছে কতটুকু- এই প্রেক্ষিত থেকে ভারতে অর্থনীতিকে বিচারে ধারা একেবারেই একালের ২০০৪ সালের পর থেকে। মূলত ১৯৯১ সালের আগের ভারতের সরকারগুলোর এ ব্যাপারে পারফরম্যান্স ন্যূনতম আমলযোগ্যই নয়। তা প্রায় সবাই মানে। ১৯৯১ সালের আগে সেটাকে আজকাল অনেকে ‘কোটা-লাইসেন্স-ইন্সপেক্টরদের’ রাজরাজত্বের যুগ বলছেন। সুবিধা ছিল সেকালে কোনো সরকারের অর্থনীতিক নীতি-পলিসি ‘কাজ সৃষ্টি করতে পারার সক্ষমতার’ দিক থেকে বিচার করাই হতো না। কারণ তখনো সবকিছুর ওপরে সমাজতন্ত্রের মুলা আর বোলচাল আধিপত্য করে টিকে ছিল। কিন্তু ১৯৯১ সালে ভারতের অর্থনীতি চরমতম ক্রাইসিসে পড়ে সব ফাঁপা বোলচাল উদোম ভেঙে পড়ে। মূল কারণ ভারতের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রায় আয়ব্যয়ের (ব্যালেন্স অব পেমেন্টে) অ্যাকাউন্ট ঘাটতির মুখে পড়েছিল। আর তা মেটাতে আইএমএফের ঋণ নিয়ে তা মোকাবেলা করতে গিয়ে সমাজতন্ত্রের ভূত আর ভুয়া বোলচাল ছেড়ে বাস্তব অর্থনীতিতে সংস্কার করতেই হয়েছিল। ১৯৯১ সালের জুন মাসে নতুন নির্বাচিত নরসীমা রাওয়ের সরকারের অর্থমন্ত্রী হয়ে মনমোহন সিং সেই প্রথম সংস্কারে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

কিন্তু কংগ্রেস সরকার পরেরবার (১৯৯৬ বা ’৯৮ সালে) তবু জিততে পারেনি। আরো পরের ২০০৪ সালের নির্বাচনের বিজয়ী কংগ্রেস কোয়ালিশন সরকার প্রথম অর্থনৈতিক সফলতার মুখ দেখাতে সক্ষম হয়। সেই সফলতাকে দেখিয়ে তাই ওর পরের ২০০৯ সালের নির্বাচন হয়েছিল অর্থনীতির এ সাফল্যের স্লোগানের ওপর। তাতে প্রবল উৎসাহ তুলে কংগ্রেস কোয়ালিশন দ্বিতীয়বার ২০০৯ সালেও নির্বাচনে জিতে যায়। কিন্তু এবার অর্থনীতি আবার পরাজিত হতে পথ ধরে। বৈদেশিক বিনিয়োগ এফডিআই, আবার ফিরে যাওয়া শুরু হয়। হতাশা দেখা দেয়। আর সেই হতাশার সময়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখানোর সুযোগটা নরেন্দ্র মোদি ঠিকঠাক নিতে পেরেছিলেন। মানুষ আবার আশার বুক বেঁধেছিল মোদির পেছনে; ফলে মোদি নির্বাচনে জিতে এসেছিলেন।

এটাকেই মোদি-জ্বর বা মোদি-ঝড় বলা হতো তখন। কিন্তু আজ সেসব আশা ভরসা শেষে একদম তলানিতে আবার। বিশেষত ২০১৬ সালের নভেম্বরে মোদির ডি-মনিটাইজেশন (রুপির বড় দুই নোট, পাঁচশ ও এক হাজার রুপির নোট বাতিল ও নোট বদলে দেয়া) সিদ্ধান্ত নেয়ার পর থেকে অর্থনীতি একেবারে এলোমেলো হয়ে যায়। এখন রয়টার্সের জরিপের ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার পর সেটা এখন একেবারেই পরিষ্কার যে, এবারের ২০১৯ সালের নির্বাচনে বিজেপির মোদি তো নয়ই, অন্য কোনো দলের কাছেও আর ‘চাকরি বা কাজ সৃষ্টি করতে পারার অর্থনীতি’- এটা আবার মূল ইস্যু হচ্ছে না। বরং অর্থনীতির ইস্যু খুব সম্ভবত সব দল এবং ভোটারের কাছেও এক চরম ‘হতাশার ইস্যু’ হয়ে দূরে লটকে থাকবে।

ব্যাপারটা মোদি আঁচ করে অন্তত ছয় মাস আগে থেকেই আসন্ন নির্বাচনের মূল ইস্যু ফোকাস আবার করেছেন ‘হিন্দুত্ব’কে। যা মূলত মুসলমানবিদ্বেষ বা ঘৃণা ছড়িয়ে ভোট জোগাড়ের বুদ্ধি ছাড়া আর কিছুই নয়। তবে এবারের ‘হিন্দুত্বের’ বাড়তি ব্যাখ্যা হলো আসাম; মানে আসামের এনআরসিকে (নাগরিকত্ব যাচাই) বোঝানো হচ্ছে। বিজেপি বলছে- ‘প্রত্যেক রাজ্যে গুনে গুনে আসামের মতো মুসলমান অনুপ্রবেশকারী (তেলাপোকা) খুঁজে বের করার কর্মসূচি নেয়া হবে।’ রাজস্থান বা ছত্তিশগড়ের প্রাদেশিক রাজ্য নির্বাচন এখন চলছে। এই নির্বাচন ‘মুসলমান অনুপ্রবেশকারী’ এই নতুনে স্লোগান বক্তৃতায় হাজির করা হয়েছে। অবশ্য অন্য আরেক ইস্যু হাজির করার চেষ্টাও আছেÑ সেটা হলো, বাবরি মসজিদের জায়গায় রামমন্দির নির্মাণ।

বিগত ১৯৯২ সালের সেই ঘটনার মামলা এখনো আদালতে ঝুলে আছে। তাই রামমন্দির নির্মাণের সপক্ষে আসন্ন নির্বাচনের আগে আদালতের কোনো রায় আসার সম্ভাবনা কম। এ অবস্থায় আদালতের কোনো নির্দেশের বদলে অধ্যাদেশ জারি করে মোদি রামমন্দির নির্বাচন করুক, এমন দাবি অনেকে তুলছেন- যার মানে হবে সে ক্ষেত্রে এটাই নির্বাচনের মুখ্য ইস্যু হয়ে যাবে- এমন একটা চিন্তা বাজারে আছে। কিন্তু মোদির ভাব এখনো স্পষ্ট নয়। এর চেয়ে বরং এবার বিজেপি-আরএসএস-এর আরো যেসব সহযোগী সংগঠন আছে এরা কেউই এবার মোদির সাথে এক লাইনে সমন্বয়ে নেই- এটাই স্পষ্ট হয়েছে। ফলে শেষ ঠিক কী হবে এখনই বলা মুশকিল।

কিন্তু এবার নতুন একটা বিষয় ইতোমধ্যেই দানা বেঁধে গেছে।

প্রত্যেক রাষ্ট্রেই বেশ কিছু স্টাটুটারি স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান থাকে। যেমন বাংলাদেশ ব্যাংক, পাবলিক সার্ভিস কমিশন, দুর্নীতি তদন্ত প্রতিষ্ঠান, ভারতের ক্ষেত্রে তাদের সিবিআই, আরবিআই গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি। এখানে স্টাটুটারি মানে এটার কাজ কী হবে সেই ম্যান্ডেটই এর জন্মের আইনের মধ্যে লেখা থাকে। ফলে নির্বাহী নির্দেশের অধীনস্থ নয় এসব প্রতিষ্ঠান। সাধারণত স্বাধীন এক পরিচালনা বোর্ড থাকে, যা প্রতিষ্ঠানকে পরিচালনা করে। এখানে স্বাধীন মানে নির্বাহী বিভাগ থেকে স্বাধীন থাকা, ফলে প্রভাবাধীন নয়। অনেক সময় এসব প্রতিষ্ঠানের নিয়োগকর্তা নির্বাহী প্রধানমন্ত্রীর বদলে রাষ্ট্রপতির হয়ে থাকে। ভারতের রাষ্ট্রপতির যেখানে বাংলাদেশের মতো ‘প্রধানমন্ত্রীর মুখ চাওয়া রাষ্ট্রপতি’ নয়, তার স্বতন্ত্র বেশ কিছু নিজ-ক্ষমতাও রয়েছে। তবে এমন প্রতিষ্ঠানগুলো কিভাবে পরিচালিত হবে এ মৌলিক দিক নির্দেশনাগুলো ওই জন্ম-আইনেই স্থায়ীভাবে লেখা থাকে।

ভারতের নরেন্দ্র মোদি মানে তার নির্বাহী ক্ষমতার প্রধানমন্ত্রী এ মুহূর্তে ভারতের তিনটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের সাথে সঙ্ঘাতে লিপ্ত। অন্য ভাষায় বললে, এই প্রথম এ স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং রক্ষায় সোচ্চার। সেসব প্রতিষ্ঠান হলোÑ ভারতের সেন্ট্রাল ব্যাংক- রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (আরবিআই), সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (সিবিআই), আর খোদ সুপ্রিম কোর্ট। জন্মের পর থেকে ভারতের এসব প্রতিষ্ঠান কখনো রাষ্ট্রক্ষমতার নির্বাহী বিভাগ বা প্রধানমন্ত্রীর অফিসের সাথে কোনো দ্বন্দ্ব সঙ্ঘাতে লিপ্ত হয়নি। বরং হওয়াটাই রাষ্ট্রের জন্য খুবই খারাপ লক্ষণ।

আরবিআইয়ের ক্ষেত্রে অল্প কথায় ইস্যুটা হলো- আমাদের সরকারি ব্যাংকগুলো যারা ইতোমধ্যেই রুগ্ন স্বাস্থ্যের তাদের আর লোন বিতরণ করতে বাংলাদেশ ব্যাংক যদি সীমারেখা টেনে না করে দিত আর সরকার যদি উল্টো আরো লোন দিতে দাবি জানাত তাহলে যে অবস্থা হতো, এটা তাই। তবে একটু তফাত হলো, সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংকের ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি নজরদারি সীমিত করা হয়েছে, ভারতের বেলায় তা ঘটেনি। আসন্ন নির্বাচনের আগে মোদি চাইছেন কিছু রাজ্যের মালিকানাধীন সরকারি ব্যাংক যারা ডিফল্টার হয়ে গেছে তারা আরো লোন বিতরণ করুক। মোদি নির্বাচন পার হতে ক্ষুদ্র কুটিরশিল্পে আরো ঋণ বিতরণ চায় আর কৃষকেরা ফসলের মূল্য পাচ্ছে না বলে নিরন্তর শহর অভিমুখে মিছিল সমাবেশ নিয়ে আসছে তা মোকাবেলা করতে চায়।

তাই মোদি হুমকি দিয়েছেন ব্যাংকের গভর্নরের স্বাধীন ক্ষমতা খর্ব করতে ‘ফান্ডকে মুক্ত করতে আলাদা নিয়ন্ত্রক বোর্ড’ গঠন করে নেবেন তিনি। বিপরীতে রিজার্ভ ব্যাংক গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নর নিজেদের স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা রক্ষায় সোচ্চার হয়েছেন। শিল্পোক্তাদের এক প্রকাশ্য সভায় ডেপুটি গভর্নর সরকারকে তার সিদ্ধান্তের বিপদ সম্পর্কে হুশিয়ার করে দেন। তিনি বলেন, সরকার নির্বাচন পার হতে যেন ক্রিকেটের টি-২০ খেলতে চাচ্ছে। অথচ রিজার্ভ ব্যাংকের কাজ টেস্ট খেলার মতো, লংটার্মে চিন্তা করে তাকে কাজ করতে হয়, করা উচিত।

ভারতের বাজারে টেনশন আরো তুঙ্গে উঠে যে, রিজার্ভ ব্যাংকের আইনে ‘আর্টিকেল সাত’ বলে এক অধ্যাদেশ আছে যা কখনো ব্যবহার করা হয়নি। সেটা সরকার চালু করতে যাচ্ছে। এটা স্বাভাবিক অবস্থায় সুপ্ত করে রাখা আছে। যেটা সরকার কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে চাইলে ‘সচল করা হলো’ বলে ঘোষণা দিতে পারে। সে ক্ষেত্রে নির্বাহী বিভাগের কথা মেনে চলা গভর্নরের জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে যাবে।

গভর্নর উরজিত প্যাটেলও পালটা হুশিয়ারি দিয়েছেন বলে গুজব; যে সে ক্ষেত্রে তিনিও পদত্যাগ করতে পারেন বলে পালটা গুজব ছড়িয়ে যায়। আর গভর্নরের পদত্যাগ মানে তৎক্ষণাৎ ভয় পেয়ে আস্থার সঙ্কটে শেয়ারবাজারে ধসনামাসহ এক শ’ মিলিয়নের বেশি মানুষের এক অর্থনীতির চরমতম বিশৃঙ্খলায় ডুবে যাওয়া ঘটে যাবে। যাতে আবার আকস্মিক সরকার পতন ঘটে যেতে পারে। সব মিলিয়ে প্রায় এক মাস ধরে এই টেনশন চলার পর এক আপাত সন্ধি ঘটেছে কিছু নিরপেক্ষ সদস্যের উদ্যোগে, যদিও তাতে সঙ্কটে কেটে গেছে বলা যাবে না। রিজার্ভ ব্যাংক রাজি হয়েছে একটা স্বাধীন কমিটি করতে যারা খতিয়ে দেখবে সরকারি ব্যাংকগুলো আরো কত পরিমাণ অর্থ বাজারে লোন দেয়ার জন্য ছাড়তে পারে। সরকারও ব্যাংকের ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ করার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে। কিন্তু তবুও আন্তর্জাতিক বাজারসহ ভারতের দেশী বাজার এ আপাত সন্ধিতেও বিপদ দেখছেন এই বলে যে, এটা সাময়িক, আগামীতে ব্যাংকের ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ করার উদ্যোগ আবার আসবে।

কিন্তু সেন্ট্রাল ব্যাংককে এমন স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা দেয়া থাকে কেন? কেন তা জায়েজ? এ ব্যাপারটা বিচার করে দেখা দরকার যে, এ ক্ষেত্রে ভেতরের মৌলিক অবস্থান বা যুক্তি কী?

প্রথমত, গভর্নর উরজিত প্যাটেল অবশ্যই জবাবদিহিমুক্ত নন। তিনি ভারতের সংসদীয় কমিটির আহ্বানে ইতোমধ্যেই গত সপ্তাহে সংসদে হাজির হয়েছিলেন। সেখানে তার বক্তব্য ছিল একেবারে ক্লাসিক্যালি মৌলিক। মূল কথায়, তিনি বলেন, ব্যাংকের আমানত যেটার ওপর ব্যাংক তার একক কর্তৃত্ব খাটাতে চায় এর ৯৯ শতাংশের মালিকানা ব্যাংক মালিকেরা নয়; তা আসলে পাবলিক মানি, জনগণের রাখা সঞ্চিত অর্থ। তাই এ অর্থের নিরাপত্তা রক্ষার্থে সেন্ট্রাল ব্যাংককে এমন স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা দেয়া থাকে। পাবলিকের আমানত রক্ষার্থে ব্যাংকিং খাতে নিয়মশৃঙ্খলা আর জবাবদিহিতা বজায় রাখাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ম্যান্ডেটের মূল কথা। এর বোর্ড তাই মূলত অভিজ্ঞ পেশাদার আর টেকনোক্র্যাটদের নিয়ে গঠিত, যাতে তারা স্বাধীনভাবে কথা বলতে, সিদ্ধান্ত ও দায় নিতে পারে।

এদিকে প্রায় একই ধরনের সরকারি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে শেষে আদালতে গিয়েছে ভারতের সিবিআই। এর তুল্য প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে নেই, তবে খুব সীমিত আর দুর্বল এক ভার্সন হলো দুদক। সিবিআইয়ের প্রধানকে বলা হয় ডিরেক্টর। এই ডিরেক্টরের নিয়োগকর্তা হলেন তিনজনের এক কমিটিÑ প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলের নেতা আর চিফ জাস্টিসকে নিয়ে যা গঠিত। সংক্ষেপে ঘটনা হলো, ডেপুটি ডিরেক্টরকে নিয়ে। সার অভিযোগ হলো, মোদির ঘনিষ্ঠ গুজরাটের সরকারি কর্তা ছিলেন এ ডেপুটি ডিরেক্টর।

তিনি মোদির হয়ে সিবিআইয়ের কাজ ও সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতেন। তাই তার কাজ তৎপরতা তদন্ত করতে ডিরেক্টরের এক অফিসার নিয়োগ করা থেকে জটিলতা শুরু। মোদি ডিরেক্টরকে তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সাথে দেখা করতে বলেন, যিনি তাকে পদত্যাগপত্র দিয়ে সরে যেতে বলেন। ডিরেক্টর তা না করাতে রাতারাতি মোদি এবার ডিরেক্টর আর ডেপুটি ডিরেক্টর দু’জনকেই সরিয়ে তৃতীয় একজনকে দায়িতে দেন। এতে সংক্ষুব্ধ ডিরেক্টর অলোক ভার্মা আদালতে নালিশ করেন যে, তাকে অপসারণের কর্তৃত্ব প্রধানমন্ত্রীর একার নয়, নিয়োগকারী তিনজনের কমিটির। এ ছাড়া তার নিয়োগ এক ফিক্সড টার্ম ন্যূনতম দুই বছরের। ফলে মাঝপথে তাকে কেউ বাধাগ্রস্ত করতে পারে না।

ডেপুটি ডিরেক্টর রাকেশ আস্থানার ব্যাপারে খোদ তদন্ত কর্তাকেই শাস্তিমূলক বদলির বিরুদ্ধে সেই তদন্তকর্তাও আদালতে এসে পুরা ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনাসহ খোদ অজিত দোভাল, অপর এক মন্ত্রী এমনকি খোদ গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর এক বড় কর্তাসহ সবার সংশ্লিষ্টতার বিরুদ্ধে তিনি তার অভিযোগ দায়ের করেন। কংগ্রেসের রাহুল গান্ধীর অভিযোগ ফ্রান্স থেকে সামরিক বিমান রাফায়েল কেনার ঘুষের তদন্ত বন্ধ করতেই রাকেশ আস্থানা কাজ করছিলেন। এককথায় এখন পুরো সিবিআই সুপ্রিম কোর্টের নজরদারি আর নির্দেশের আওতায় চলে গেছে, মামলার কার্যক্রম চলছে। এটা শেষ পর্যন্ত মোদি সিবিআইয়ের স্বাধীন কাজে হস্তক্ষেপ করেছেন কি না এরই বিচার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারতে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর এক বড় সুবিধা হলো যে, তাদের কর্মকর্তারা আদালতের প্রটেকশন চাইতে পারেন বা নালিশ জানাতে পারেন।

ভারতের নির্বাহী ক্ষমতার বিরুদ্ধে হস্তক্ষেপের প্রায় একই রকম অভিযোগ আদালতের। ভারতের ‘কন্সটিটিউশন দিবস’ উপলক্ষে প্রেসিডেন্ট ও আইনমন্ত্রীর সাথে মঞ্চ শেয়ার করা এক আলোচনা সভায় প্রধান বিচারপতি বলেন, হয় কন্সটিটিউশনের স্থায়ী নির্দেশগুলো অনুসরণ করেন নইলে চরম এক বিশৃঙ্খলতার মুখে পড়তে রেডি হন। এ কাজে তিনি জ্ঞানবুদ্ধির ব্যবহার আর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন হতে পরামর্শ রাখেন।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অবস্থা শোচনীয় আমরা জানি। যেখানে কোনটা রাষ্ট্র, কোনটা সরকার বা কোনটা ব্যক্তির না প্রধানমন্ত্রীর অথবা বিরোধী দলের নেতার নাকি আদালতের- ইত্যাদি সব কিছুতে এখানে একাকার এক ব্যক্তির। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে ক্রমেই প্রধানমন্ত্রী মোদির শিক্ষক হয়ে উঠছে বাংলাদেশ! ভারতের নির্বাহী ক্ষমতার বিরুদ্ধে হস্তক্ষেপের একই অভিযোগ আদালতের।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]


আরো সংবাদ