১২ ডিসেম্বর ২০১৮

ডিসির ‘ছোট রুমে’ কী হয় কী হবে

-

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদা বৃহস্পতিবার বীরদর্পে ঘোষণা করেছেন, সারা দেশে কোথাও নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘিত হচ্ছে না। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের তার আগের দিন ঘোষণা করেছেন, এই যে তিনি পতাকা ছাড়া গাড়িতে করে এসেছেন, এটাই হলো লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড। তবে সিইসি সাহেবের আচরণবিধি লঙ্ঘনের তথ্য হালে খুব একটা পানি পাবে বলে মনে হলো না। কারণ, তফসিল ঘোষণার পর কিংবা তফসিল ঘোষণার আগে থেকে আওয়ামী লীগ রাস্তাঘাট দখল করে রাস্তার ওপর গেট বানিয়ে বড় বড় নৌকা টানিয়ে রেখেছে। মহাসড়কে টানিয়েছে বিশাল বিশাল বিলবোর্ড।

নির্বাচন কমিশন নির্দেশ দিয়েছিল, এসব নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। সরিয়ে নিতে হবে সব নির্বাচনী প্রচারসামগ্রী; কিন্তু তাদের এই ঘোষণার পরও পরিস্থিতির উনিশ-বিশ কিছুই হয়নি। দেশের প্রধান প্রধান সংবাদপত্র নির্বাচন কমিশনকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণা কিভাবে চলেছে? কিছু কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার কর্তৃপক্ষ পোস্টার ছিঁড়ে ফেলেছে বটে, কিন্তু নৌকায় হাত দিতে কেউ সাহস পায়নি। গেটের ওপর বিশাল আকৃতির নৌকা ঝুলেই আছে। সে ক্ষেত্রে ইসি কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি। এ দিকে নির্বাচন কমিশন আরো ঘোষণা করেছিল, রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার সময় ছয়জনের বেশি লোক সেখানে যেতে পারবে না।

কোনো শোডাউন চলবে না; কিন্তু আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের ক্ষেত্রে এ বিধানের কোনো বালাই ছিল না। আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা শত শত নেতাকর্মী নিয়ে বিশাল শোডাউনের মাধ্যমে রিটার্নিং কর্মকর্তার অফিসে হাজির হয়েছেন। কেউ কোনো বাধা দিতে পারেনি। তারপরও সিইসি বলছেন, কোথাও আচরণবিধি লঙ্ঘিত হয়নি। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ আচরণবিধি লঙ্ঘন কিংবা যত বেআইনি কাজই করুক না কেন, নির্বাচন কমিশন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তারা সে দিকে চোখ বন্ধ করে রাখবে। এই যদি পরিস্থিতি হয় তাহলে কিভাবে যে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, সেটি ভবিতব্যই বলতে পারে। আরো অনেক ভুতুড়ে কাণ্ড ঘটছে। এসব কর্মকাণ্ডের ভেতরে পক্ষপাত স্পষ্ট হয়ে গেছে।

আসলে এই নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বে নিযুক্ত প্রায় সবাই সরকারের পক্ষাবলম্বন করছে। নির্বাচন কমিশন, পুলিশ প্রশাসন এবং আদালত- সব কিছুর ওপরই সরকার যেন সওয়ার হয়ে বসেছে। আমরা দেখলাম, আওয়ামী লীগের এক নেতা মনোনয়নপত্র জমা দিতে গেছেন; তার মনোনয়নপত্র দু’পাশ থেকে ধরে আছেন দু’জন ওসি। এখানে ওসি গেলেন কেন? অর্থাৎ পুলিশের কর্মকর্তারা নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা শুরু হওয়ার আগে থেকেই নিজেরা কোন পক্ষে আছেন, তা স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দিলেন। ভেতরে ভেতরে কে কোন পক্ষ তা হয়তো জানা যাবে না; কিন্তু এই যে দু’জন ওসি আওয়ামী লীগ প্রার্থীর মনোনয়নপত্র ধরে আছেন, তাদের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশন কী ব্যবস্থা নেয়, সেটা দেখার বিষয়।

এর আগেও তফসিল ঘোষণার পর গাজীপুরের ওসি আওয়ামী যুবলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে পোশাক পরে হাজির হয়েছিলেন এবং বক্তৃতা দিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশন কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে বলে জানা নেই। এ যদি পরিস্থিতি হয়, ওসি বা এসপি লেভেলের কর্মকর্তারা যদি আওয়ামী লীগকে এখনই এভাবে সমর্থন করতে থাকেন এবং নির্বাচন কমিশন যদি সে দিকে চোখ বন্ধ করে রাখে তাহলে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কিভাবে হবে? আমরা বলতে চাই, নির্বাচন কমিশন শুরুতেই এর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেবে। তা না হলে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হতে বাধ্য এবং শেষ পর্যন্ত এই নির্বাচন কমিশন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করতে পারবে কি না সে প্রশ্নও উঠবে।

আরো বিভিন্ন ধরনের ঘটনা ঘটছে। সংবাদপত্রে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে, রংপুর-৫ আসনে জামায়াত প্রার্থীর মনোনয়ন গ্রহণ করেননি রিটার্নিং কর্মকর্তা। তিনি ধানের শীষ থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন। একইভাবে সময়ের অজুহাত দেখিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের মনোনয়নপত্র গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন কমিশন কর্মকর্তারা।

জামায়াত প্রার্থীর মনোনয়ন বিষয়টি বেশ ইন্টারেস্টিং। তিনি নির্বাচন করবেন ধানের শীষ প্রতীকে; কিন্তু এই প্রার্থী অধ্যাপক গোলাম রব্বানীর মনোনয়নপত্রও গ্রহণ করেননি রিটার্নিং কর্মকর্তা ও রংপুরের ডিসি এনামুল হাবিব। গত বুধবার মনোনয়ন দাখিলের শেষ দিনে ৫ ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রেখে রিটার্নিং কর্মকর্তা মনোনয়ন গ্রহণে তার অপারগতার কথা জানান। মনোনয়নপত্রটি জমা দিতে গিয়েছিলেন গোলাম রব্বানীর আইনজীবী অ্যাডভোকেট বায়েজিদ ওসমানী। জনাব ওসমানী আরো কয়েকজন জুনিয়র আইনজীবী নিয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তা এনামুল হাবিবের কাছে যান বেলা ২টায়। সেখানে গিয়ে তারা সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে মনোনয়নপত্র জমা দিতে চাইলে তিনি তা গ্রহণ করেননি। এ সময় তারা দরজার পাশেই দাঁড়িয়ে থাকেন। আইনজীবী ওসমানী জানান, ঘটনার কিছুক্ষণের মধ্যেই রংপুর জেলা পুলিশের বি সার্কেলসহ মেট্রোপলিটন পুলিশের কর্মকর্তা, ডিএসবি ও ডিবির লোকজন তাকে ঘিরে জেরা করতে থাকেন।

কেন প্রার্থী এলেন না, প্রস্তাবক সমর্থনকারীরা কেন এলেন না, তারা গোলাম রব্বানীর কাগজপত্র পরীক্ষা করতে থাকেন। আইনজীবী ওসমানী জানান, তিনি পুলিশ কর্মকর্তাদের বলেন, অধ্যাপক গোলাম রব্বানী উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই সাড়ে চার বছরে বিভিন্ন মিথ্যা মামলায় জেলে ছিলেন। সর্বশেষ মামলায় জামিন নিয়ে বের হয়ে আসেন। এরই মধ্যে তার বিরুদ্ধে আবারো একটি গায়েবি মামলা দেয়া হয়। ওই মামলায়ও তিনি গত বৃহস্পতিবার হাইকোর্ট থেকে জামিন নেন। জামিন আগামী ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত বহাল আছে। নির্বাচন কমিশনের আইন অনুযায়ী প্রার্থী, প্রস্তাবক, সমর্থক ছাড়াও প্রার্থীর পক্ষে অন্য কেউ মনোনয়নপত্র দাখিল করতে পারেন। এ বিষয়ে নথিপত্র বি সার্কেলকে দেয়ার পর তিনি বলেন, মনোনয়ন দাখিল করতে কোনো অসুবিধা নেই।

আইনজীবী ওসমানী জানান, পুলিশ কর্মকর্তা এ কথা বলার পর তিনি মনোনয়নপত্র দাখিল করতে গেলে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা আবারো তাকে রিটার্নিং কর্মকর্তার সাথে কথা বলতে বলেন। অনেক অনুরোধের পর তিনি রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে যাওয়ার অনুমতি পান। সেখানে গিয়ে তিনি আইনের ব্যাখ্যা দিয়ে মনোনয়নপত্রটি নেয়ার অনুরোধ জানান। এ সময় সেখানে আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা, এডিসি, মেট্রোপলিটন কোতোয়ালির এসি, কোতোয়ালি থানার ওসিসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এরই মধ্যে রিটার্নিং কর্মকর্তা আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তাকে ডিসির ‘ছোট রুমে’ গিয়ে ঢাকায় কথা বলতে বলেন।

তিনি ওই ছোট রুমে যাওয়ার পর রিটার্নিং কর্মকর্তাসহ সব কর্মকর্তা সেখানে যান। অনেকক্ষণ পর ফিরে এসে রিটার্নিং কর্মকর্তা ওই আইনজীবীকে বলেন, আমরা তার মনোনয়ন গ্রহণ করতে পারব না। ওপর থেকে ‘না’ বলা হয়েছে। আইনজীবী ওসমানী বলেন, আপনি এখন নির্বাচন কমিশনের রিটার্নিং কর্মকর্তা। আপনি আইন অনুযায়ী এটা নিতে বাধ্য। কেন নেবেন না, সেটাও বলতে বাধ্য; কিন্তু তিনি কোনো কারণ ব্যাখ্যা না দিয়েই মনোনয়ন ফরম নিতে অপারগতা প্রকাশ করে আইনজীবী ওসমানীকে বিদায় দেন।

পরে ওই ওসমানী বলেন, আসন্ন নির্বাচন যে একটি পাতানো নির্বাচন হবে, সেটাই প্রমাণ করলেন এই রিটার্নিং কর্মকর্তা। তিনি সরকারের ইচ্ছারই প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। তিনি মনোনয়ন জমা না নিয়ে আইন ভঙ্গ করেছেন। ওসমানী বলেন, এ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী এইচ এম আশিকুর রহমান। অধ্যাপক গোলাম রব্বানীর পক্ষে মাঠে জোয়ার দেখে সরকার ভয়ে ভীত হয়ে গোলাম রব্বানীর মনোনয়ন গ্রহণ না করতে নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশ দেয়ার কারণেই তার মনোনয়ন গ্রহণ করা হয়নি। এর আগে মিঠাপুকুর উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে অধ্যাপক গোলাম রব্বানীর পক্ষে রাকিবুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি মনোনয়নপত্র জমা দিতে গেলে তাকে পুরনো মামলায় গ্রেফতার করে জেলহাজতে পাঠায় পুলিশ।

ঘটনার এতটা বিস্তারিত বিবরণ দেয়ার কারণ নির্বাচন কমিশনকে এ বিষয়ে অবহিত করা যে, তাদের রিটার্নিং অফিসাররা ইতোমধ্যে কী ধরনের বেআইনি কার্যকলাপে যুক্ত হচ্ছেন। আমরা দেখতে চাই, নির্বাচন কমিশন এই রিটার্নিং কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। আজ যদি তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা না যায়, তাহলে নির্বাচনে সব প্রক্রিয়ায় এই পক্ষপাতের ধারা অব্যাহত থাকবে বলে আমরা আশঙ্কা করি। সে ক্ষেত্রে এ ধরনের রিটার্নিং কর্মকর্তারা তাদের কৃতকর্মের কারণে কেন্দ্রে সঙ্ঘাতময় পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে। সিইসি বলেছেন, সে ধরনের পরিস্থিতি তিনি দেখতে চান না।

২০ দল বা ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে বারবার অভিযোগ করা হচ্ছে, সরকার নির্বাচনী কার্যক্রমে আদালতকে ব্যবহার করছে। তা না হলে সম্পদের বিবরণী দাখিল না করার মামলায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির রফিকুল ইসলাম মিয়াকে ঝটপট তিন বছরের দণ্ড দিয়ে পরদিনই তাকে গ্রেফতার করা হয়। এখন আদালত বলছে, তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। এই দণ্ড যথার্থ কি না রফিকুল ইসলাম মিয়া নিশ্চয়ই তার জন্য উচ্চ আদালতে যাবেন; কিন্তু তার আগেই তার নির্বাচনে যাওয়ার পথ রুদ্ধ করে দেয়া হলো। আইনজ্ঞরা বলছেন, আদালতের দু’টি রায় হয়েছে। এক হলো নি¤œ আদালতের এ ধরনের শাস্তির বিরুদ্ধে অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি উচ্চ আদালতে আপিল করেন এবং আপিল যদি গৃহীত হয় তাহলে ধরে নিতে হবে মামলা চলমান। অতএব, তার নির্বাচনে অংশ নিতে বাধা নেই।

এভাবেই নির্বাচন করেছেন মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, মহীউদ্দীন খান আলমগীর এবং এখনো এমপি পদে বহাল আছেন কক্সবাজারের বদী। আরেকটি রায়ে বলা হয়েছে, আদালত দণ্ড স্থগিত না করলে তিনি আর নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। সাধারণত বিচারপ্রার্থী আদালতের এ দুই ধরনের রায়ে যেটা তার অনুকূলে যায় সেটাই পেয়ে থাকেন। আমরা সরল বিশ্বাসে, সদুদ্দেশ্যে এ বিষয়ে আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আর রিটার্নিং কর্মকর্তার ‘ছোট ঘরে’র ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে, যাতে তারা গণরায় ওলটপালট করতে না পারেন।

সরকার নির্বাচন নিয়ে নানা অপকৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে এবং এখন পর্যন্ত যা দেখা যাচ্ছে তা হলো, নির্বাচন কমিশন সর্বশক্তি দিয়ে সেসব অপকৌশলকে সমর্থন জানিয়ে যাচ্ছে। এতে নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে না এবং দেশে নতুন ধরনের সঙ্কট সৃষ্টি হতে পারে।
লেখক : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক
[email protected]


আরো সংবাদ