১২ ডিসেম্বর ২০১৮

নির্বাচন কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষ হওয়া বাঞ্ছনীয়

-

নির্বাচনের কাজের সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তিকে নির্বাচন কর্মকর্তা বলা হয়। এরূপ ব্যক্তিদের অনেকে নির্বাচনের কাজের সাথে প্রত্যক্ষভাবে, আবার অনেকে পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত। জাতীয় সংসদের নির্বাচন একটি বৃহৎ কর্মযজ্ঞ। এ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনকে সরকারের বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তাদের সহায়তা নিতে হয়। এ ধরনের সহায়তা নেয়ার বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিকভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত। সংবিধানের সংশ্লিষ্ট বিধানে নির্বাচন কমিশনকে ক্ষমতায়ন করে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনের ওপর ন্যস্ত দায়িত্ব পালনের জন্য যেরূপ কর্মচারীর প্রয়োজন হবে, নির্বাচন কমিশন অনুরোধ করলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কমিশনকে সেরূপ কর্মচারী প্রদানের ব্যবস্থা করবেন।

জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানকালে মাঠপর্যায়ে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে রিটার্নিং অফিসার, সহকারী রিটার্নিং অফিসার, প্রিজাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার এবং পোলিং অফিসারগণ নির্বাচনের দায়িত্ব পালন করেন। নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলাবাহিনী তাদের সহায়তা করে।

নির্বাচন কমিশন এক বা একাধিক আসনের জন্য একজন রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ দিতে পারে। সচরাচর দেখা যায়, সাধারণ নির্বাচনের ক্ষেত্রে একটি জেলার বিপরীতে একাধিক আসনের জন্য একজন রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ দেয়া হয় এবং প্রতিটি আসনের জন্য একজন করে সহকারী রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ দেয়া হয়। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রের জন্য একজন করে প্রিজাইডিং অফিসার এবং প্রতিটি ভোটকক্ষের জন্য একজন সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ও দুইজন পোলিং অফিসার নিয়োগ দেয়া হয়।

রিটার্নিং অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার নিয়োগের বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে সরকারের কোন বিভাগের কোন ধরনের পদধারীদের নিয়োগ দেয়া হবে, এ বিষয়ে এতদসংক্রান্ত সংশ্লিষ্ট আইন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এ কোনো কিছু উল্লেখ নেই। আজ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত প্রতিটি সাধারণ নির্বাচনের ক্ষেত্রে দেখা গেছে বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের বিভাগীয় কমিশনার বা জেলা প্রশাসক পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের রিটার্নিং অফিসার এবং অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক বা উপজেলা নির্বাহী অফিসার পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের সহকারী রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। আসন্ন একাদশ সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম পরিলক্ষিত হয়নি।

বিভিন্ন সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে রিটার্নিং অফিসারের যাচনা মোতাবেক সংশ্লিষ্ট সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান প্রিজাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসারদের তালিকা দিয়ে থাকে। এ তালিকা থেকে রিটার্নিং অফিসার নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে এসব কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেন।

নির্বাচন অনুষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্ত এরূপ নির্বাচন কর্মকর্তা কমিশন বা ক্ষেত্রমতে রিটার্নিং অফিসারের কাছে গ্রহণযোগ্য কারণ ছাড়া তার দায়িত্ব গ্রহণে বা পালনে অপারগতা বা অস্বীকৃতি প্রকাশ করতে পারেন না। নির্বাচন কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত এরূপ ব্যক্তিকে তার নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ নির্বাচন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে কোনোরূপ বাধা দিতে পারেন না। নির্বাচন কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি তার এরূপ নিয়োগের তারিখ থেকে নির্বাচনী দায়িত্ব হতে অব্যাহতি না পাওয়া পর্যন্ত তার চাকরির অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে কমিশনের অধীন প্রেষণে চাকরিরত আছেন বলে গণ্য হন। এরূপ প্রেষণে চাকরিতে থাকাকালে নির্বাচন কর্মকর্তা নির্বাচনসংক্রান্ত দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে কমিশন এবং ক্ষেত্রমতে রিটার্নিং অফিসারের নিয়ন্ত্রণে থাকেন এবং তিনি তাদের যাবতীয় আইনানুগ আদেশ বা নির্দেশ পালনে বাধ্য থাকেন। একজন নির্বাচন কর্মকর্তার কাছে এরূপ প্রেষণে চাকরিরত অবস্থায় নির্বাচনসংক্রান্ত দায়িত্ব প্রাধান্য পায় এবং এ দায়িত্বের সাথে সাংঘর্ষিক বা অসামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে তিনি তার অন্যান্য দায়িত্ব পালন করতে পারেন।

একজন নির্বাচন কর্মকর্তা নির্বাচনসংক্রান্ত ব্যাপারে প্রদত্ত কমিশন বা ক্ষেত্রমতে রিটার্নিং অফিসারের কোনো আদেশ বা নির্দেশ পালনে ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যর্থ হলে বা অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করলে বা নির্বাচনসংক্রান্ত কোনো আইনের বিধান ইচ্ছাকৃতভাবে লঙ্ঘন করলে এরূপ কাজ অসদাচরণ হিসেবে গণ্য হবে এবং উক্তরূপ অসদাচরণ তার চাকরিবিধি অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। এরূপ অসদাচরণের জন্য অভিযুক্ত কর্মকর্তার নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ তাকে চাকরি থেকে অপসারণ বা বরখাস্ত করতে পারবে বা বাধ্যতামূলক অবসর দিতে পারবে বা পদাবনতি করতে পারবে বা পদোন্নতি বা বেতন বাড়ানো অনধিক দুই বছরের জন্য স্থগিত করতে পারবে।

উপরোল্লিখিত অসদাচরণের কারণে কমিশন বা ক্ষেত্রমতে কমিশনের সম্মতিক্রমে রিটার্নিং অফিসার অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তার চাকরিবিধি অনুযায়ী শৃঙ্খলামূলক কার্যধারা গ্রহণ সাপেক্ষে তাকে অনধিক দুই মাসের জন্য সাময়িকভাবে চাকরি থেকে বরখাস্তের আদেশ দিতে পারেন এবং এরূপ বরখাস্তের আদেশ তার নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ কর্তৃক তার চাকরিবিধি অনুযায়ী প্রদত্ত হয়েছে বলে গণ্য হবে এবং তদনুযায়ী তা কার্যকর হবে। কমিশন বা ক্ষেত্রমতে রিটার্নিং অফিসার অসদাচরণের জন্য কোনো নির্বাচন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক কার্যধারা গ্রহণের জন্য কোনো নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করলে ওই কর্তৃপক্ষ উক্তরূপ অনুরোধ পাওয়ার এক মাসের মধ্যে উপযুক্ত কার্যধারা গ্রহণ করে কমিশনকে অবহিত করবে।

এরূপ অসদাচরণের জন্য অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় শৃঙ্খলামূলক কার্যধারা ছাড়াও কমিশন বা কমিশন থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তির লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে আদালতে অসদাচরণজনিত অপরাধের বিচারের প্রার্থনা করে প্রতিকার চাওয়া যাবে। এ ধরনের অসদাচরণের সাজা অনধিক এক বছর কারাদণ্ড অথবা অনধিক পাঁচ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড।

রিটার্নিং অফিসার, সহকারী রিটার্নিং অফিসার, প্রিজাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার, পোলিং অফিসার এবং নির্বাচনের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত বাহিনীগুলোর সদস্যরা প্রত্যক্ষভাবে নির্বাচনের কাজের সাথে সম্পৃক্ত। অপর দিকে, উপরোল্লিখিত কর্মকর্তাদের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও নিয়ন্ত্রণকারী কর্র্তৃপক্ষ পরোক্ষভাবে নির্বাচনের কাজের সাথে সম্পৃক্ত।

নির্বাচন কমিশন প্রত্যক্ষভাবে নির্বাচনের কাজের সাথে সম্পৃক্ত কোনো নির্বাচনী কর্মকর্তা নির্বাচন সংশ্লিষ্ট অনিয়ম করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে পারে। অপর দিকে, পরোক্ষভাবে যারা নির্বাচনের দায়িত্বের সাথে সম্পৃক্ত, নির্বাচন কমিশন তাদের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়ার আদেশ দিতে পারে।

সম্প্রতি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্বাচনের কাজের সাথে সম্পৃক্ত জনপ্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও বিচার প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ দেশের একটি অন্যতম দল পক্ষপাতিত্ব ও নিরপেক্ষতা ক্ষুণেœর অভিযোগ কমিশন বরাবর দাখিল করেছে। কমিশন এ ব্যাপারে কোন ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে, কমিশনের পক্ষ থেকে অদ্যাবধি এমন কিছু ব্যক্ত করা হয়নি।

দেশের সর্বোচ্চ আইন সংবিধান অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত প্রত্যেক ব্যক্তি বা জনসাধারণকে নিঃস্বার্থ সেবাদান অত্যাবশ্যক। প্রজাতন্ত্রের কর্ম বলতে অসামরিক বা সামরিক ক্ষমতায় বাংলাদেশ সরকারসংক্রান্ত যেকোনো কর্ম, চাকরি বা পদকে বুঝায়। নির্বাচন কমিশনসহ নির্বাচনী কাজের সাথে সম্পৃক্ত সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার সব ধরনের অসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত ব্যক্তি। এরূপ ব্যক্তিদের বেতনভাতা ও সুযোগ-সুবিধা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে রক্ষিত জনসাধারণের প্রদত্ত কর থেকে নির্বাহ করা হয়। এদের কাছে দেশের সাধারণ মানুষ নিরপেক্ষতার পাশাপাশি সততা, বিশ্বস্ততা, একাগ্রতা ও আন্তরিকতা প্রত্যাশা করে।

এদের কারো মধ্যে প্রত্যাশিত গুণাবলির ঘাটতি পরিলক্ষিত হলে তা প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের বিতর্কিত করে তোলে। বিতর্কিত প্রতিষ্ঠান বা বিতর্কিত কর্মকর্তা কখনো দেশের ও দেশের মানুষের জন্য সুখকর, কল্যাণকর ও স্বস্তিদায়ক নয়। আর তাই দেশ ও জনমানুষের কথা ভেবে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিরপেক্ষ থেকে নিজেকে ও নিজ প্রতিষ্ঠানকে বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখা উচিত।
লেখক : সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক
E-mail: [email protected]


আরো সংবাদ