১১ ডিসেম্বর ২০১৮

‘যা চাই’-এর বাছাই

-

একাদশ সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের কাজ শেষ হয়েছে। ২ ডিসেম্বর ছিল এর শেষ দিন। সারা দেশের রিটার্নিং অফিসারদের সিদ্ধান্তে দেখা যাচ্ছে, এ ক্ষেত্রেও সরকারি দল ‘বিশ্বরেকর্ড’ সৃষ্টি করেছে। এর আগে তারা হামলা ও মামলার ক্ষেত্রে বিশ্বরেকর্ডের অধিকারী হয়েছেন। বাছাইয়ের পর সারা দেশে ৭৮৬ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়ে গেছে। শতকরা হিসাবে এর হার ২৫.৬৪ শতাংশ। নির্বাচনের কার্যক্রমের শুরু থেকে সরকারের নিপীড়নমূলক আচরণের পরিপ্রেক্ষিতে ধারণা ছিল, বাছাইপ্রক্রিয়ায় সরকার যা চায় তাই হবে। বাস্তবে হলোও তাই। এই উদ্দেশ্যে সরকার সম্প্রতি জেলায় জেলায় দলের বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের বসিয়ে দেয়। বাতিলপ্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করলে একজন সাধারণ লোকও বুঝতে পারবেন- সরকার কী খেলায় নেমেছে। হাস্যকর হলেও সত্য, আওয়ামী লীগের শত শত প্রার্থীর একজনের গায়ে আঁচড়ও পড়েনি। অথচ বিএনপির ৮১ জনের প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে। ছয়টি আসনে বিএনপির কোনো প্রার্থীরই নাকি মনোনয়নপত্র টেকেনি। সুতরাং ছয়টি আসন তো নির্বাচনের আগেই ক্ষমতাসীনদের হাতে এসে গেল! তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বেগম খালেদা জিয়ার মনোনয়নপত্র তিন আসনে বাতিল করে আসলে রাজনৈতিক ইচ্ছাই চরিতার্থ করা হয়েছে।

এই সরকার আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও যে দ্বৈত অবস্থানে রয়েছে, বেগম জিয়ার জামিন না হওয়া এবং তাকে নির্বাচন করতে না দেয়ার মাধ্যমে তা নগ্নভাবে প্রমাণ হয়েছে। তার জামিনের পথে নানা কূটকৌশলে সরকার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে চলেছে। অনর্থক অন্যায়ভাবে দেশের বিভিন্ন জায়গায় মামলা দায়ের করে তাকে হয়রানি করা হচ্ছে। অযাচিতভাবে সময়ক্ষেপণ করে তার কারাজীবন দীর্ঘায়িত করা হচ্ছে। তাকে যথার্থ চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে না। এসবই হচ্ছে রাজনৈতিক নীচতা। অথচ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সাথে যে মহৎ আচরণ করেছেন, তার অসংখ্য উদাহরণ বিভিন্ন স্মৃতিকথায় সমুজ্জ্বল। একই আইনের দুই ব্যাখ্যা কী করে হয়? সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ একজন দণ্ডিত আসামি। তার নামে ২২টি মামলা ছিল। ক্ষমতাসীন সরকারের ধামাধরার কারণে তার ২১টি মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে। এখন বাকি আছে মঞ্জুর হত্যা মামলা।

যখনই এরশাদ ‘এদিক ওদিক’ করেন, তখন ওই অচল মামলা সচল হয়ে যায়। এরশাদ ‘অসুস্থ’ হয়ে পড়েন। ইদানীং শোনা যাচ্ছে মহাজোটের মহাজটে তিনি দেশ ছাড়বেন! আরেকজন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হচ্ছেন মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া। শাসক দলে আরো উদাহরণ আছে। অন্যরা এই নির্বাচনে অংশগ্রহণে কোনো বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন না। তাহলে সহজেই বোঝা যায়, একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে, আইনের দুই রকম ব্যাখ্যা দেয়া হচ্ছে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, সংলাপের একপর্যায়ে বেগম খালেদা জিয়ার জামিনের ব্যাপারে কথা উঠেছিল। অবশেষে, প্রধানমন্ত্রী সরকারের তরফ থেকে জামিন পেতে বাধা দেয়া হবে না- এ রকম একটি নীরব সম্মতি ড. কামাল হোসেন টিমকে জ্ঞাপন করেন। এখন দেখা যাচ্ছে, অন্য সব প্রতিশ্রুতির মতোই এটিও আর রক্ষা করা হচ্ছে না। এ বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমকে সাংবাদিকেরা জিজ্ঞেস করলে তিনি এটাকে ‘স্বাভাবিক সৌজন্য মাত্র’ বলে ব্যাখ্যা করেন।

অথচ রাজনৈতিকভাবে বিষয়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিরোধী দলের কাছে এর গুরুত্ব অপরিসীম। যশোর-২ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সাবিরা সুলতানা মুন্নি, খালেদা জিয়ার অনুরূপ মামলায় হাইকোর্টের দ্বারস্থ হলে হাইকোর্টের একক বেঞ্চ নির্বাচনে অংশগ্রহণে বাধা নেই বলে রায় দেন। এই রায় অবশ্য পাঁচজন বিএনপি নেতার ক্ষেত্রে প্রদত্ত অন্য রায়ের বিপরীত বলে দৃশ্যমান হয়েছে। ক্ষমতাসীন সরকার যদি সামান্যতম সৌজন্যেরও তোয়াক্কা করত তাহলে ইতিবাচক রায়কে মেনে নিয়ে বেগম জিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বিতার পথ সুগম করে দিত। বরং চেম্বার বিচারককে দিয়ে উল্টো রায় দেয়া হলো। পরে সুপ্রিম কোর্টও চেম্বার বিচারকের পক্ষে সায় দেন।

ক্ষমতাসীন সরকার নির্বাচন নিয়ে যে ফন্দি-ফিকির আঁটছে, তা জনগণের সামনে দিন দিন স্পষ্ট হচ্ছে। মনোনয়ন বাতিল করতে গিয়ে শুধু বিএনপিরই ৮১ জনকে বাদ দেয়া হয়েছে। বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, এর মধ্যে ৫০ জন প্রার্থী রয়েছেন যারা অতীতে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছিলেন। এই তালিকায় মোরশেদ খান, আমান উল্লাহ আমানসহ জাতীয় নেতারাও রয়েছেন। সুতরাং সন্দেহ করা যায়, রিটার্নিং অফিসারদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে। বিস্ময়ের ব্যাপার, আওয়ামী লীগের একজন প্রার্থীর মনোনয়নপত্রও বাতিল হয়নি।

আওয়ামী লীগের লোকদের ভুল করা অসম্ভব! অথচ হাস্যকর সামান্য কারণেও অনেকের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। যেমন- পটুয়াখালী-৩ এর প্রার্থী গোলাম মাওলা রনির দাখিলকৃত কাগজে একটি সত্যায়ন স্বাক্ষর সঠিকভাবে ছিল না। গণফোরামের প্রার্থী ও অর্থনীতিবিদ সাবেক মন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়াপুত্র রেজা কিবরিয়ার মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে সিটি ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডের মাত্র পাঁচ হাজার টাকা পরিশোধিত না হওয়ার কারণে। পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, যেসব ব্যক্তি ও দল আওয়ামী লীগের ঘোরতর বিরোধী অথবা তাদের জন্য বিব্রতকর অবস্থার সৃষ্টি করেছেন, তাদের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। রেজা কিবরিয়া এবং বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী তাদের অন্তর্ভুক্ত। আরো লক্ষণীয় হচ্ছে, আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীদের অধিকাংশের মনোনয়নপত্র বাতিলের ঘটনা।

জনগণ মনে করে, আওয়ামী লীগ যেটা করতে পারছে না, তারা কায়দা করে নির্বাচন কমিশন দিয়ে সে কাজটি করিয়ে নিয়েছে। স্বতন্ত্র প্রার্থীর বেশির ভাগই মনোনয়নপত্র টেকাতে পারেননি। আইন অনুযায়ী, স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে হলে তার নির্বাচনী এলাকার ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর প্রয়োজন। অনেকে এই শর্ত পূরণ করার পরও নানা অজুহাত সৃষ্টি করে তাদের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। বিভিন্ন অভিযোগে জামায়াতে ইসলামীর ১৯ নেতার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। উল্লেখ্য, দলটির প্রার্থী সংখ্যা ছিল ৫৫। ‘গৃহপালিত’ বিরোধী দল জাতীয় পার্টিরও অন্তত ২০ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। পর্যবেক্ষক মহলের ধারণা, বেছে বেছে সরকারি দলের অপ্রিয় প্রার্থীদের ক্ষেত্রে এটা করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে জাতীয় পার্টির তাৎক্ষণিকভাবে বরখাস্ত হওয়া মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদারের কথা উল্লেখ করা যায়। তার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। তিনি নাকি ক্ষমতাসীন দলের বিরোধিতা করে তাদের বিরাগভাজন হয়েছেন বলে বিশ^স্ত সূত্রে জানা গেছে। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, ২০১৪ সালের নির্বাচনে এরশাদের নির্দেশ মোতাবেক মনোনয়নপত্র বাতিল করার পরও সংসদ সদস্য হয়েছিলেন এই নেতা।

যেসব কারণে মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে, তার মধ্যে প্রধান ছিল খেলাপি ঋণ। এটি কারণ হিসেবে দেখিয়ে বিরোধী দলের বেশির ভাগ মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। সরকারি দলের লোকেরা তাদের অযাচিত প্রভাব-প্রতিপত্তি খাটিয়ে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করিয়ে নিচ্ছেন। এ দলের এক নেতা, সাবেক চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ এমন একটি উদাহরণ। তার বিষয়টি উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়ায়। বিরোধী দলের প্রার্থীদের কেউ কেউ পুনঃতফসিল করাতে গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্তৃপক্ষ রাজি হয়নি। তারা ওপরের নির্দেশের দোহাই দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ রকম আরেকটি গুরুতর অভিযোগ রয়েছে রংপুরের রিটার্নিং অফিসারের বিরুদ্ধে। রংপুর-৫ মিঠাপুকুর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম রব্বানী পদত্যাগ করে সংসদ সদস্য পদের জন্য মনোনয়নপত্র দাখিল করতে ডিসি অফিসে গেলেন। তাকে ওই অফিসে ঢুকতেই দেয়া হয়নি। আগের মতোই ওপরের নির্দেশের দোহাই দেয়ার কথা জানা গেছে। একটি বিষয় এখানে উল্লেখ করা যায়, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা চেয়ারম্যান যারা সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চান, তাদের পদত্যাগ করে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হয়। অথচ সংসদ সদস্য যারা বহাল রয়েছেন, তাদের পদত্যাগ করতে হয়নি। এই সদস্য পদ বহাল রেখেই তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারছেন। সত্যিই সেলুকাস, কী বিচিত্র এই দেশ!

ছলে-বলে, কলে-কৌশলে সেই পুরনো রণকৌশলে ফিরে গেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। এ কারণে ২০১৪ সালের নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ। সে রকম কারসাজির একতরফা নির্বাচন করার জন্য মনে হয় আওয়ামী লীগ বদ্ধপরিকর। এই সময়ে সারা দেশে যে নির্বাচনী জাগরণ সৃষ্টি হয়েছে, তাদের ওই কু-বুদ্ধির কারণে সেটি জনগণের জন্য দুঃখ, হতাশা ও ক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও চূড়ান্ত, তা বারবার সরকার পক্ষও বলছে। অথচ তারা নিত্যদিন এর বিপরীত কাজটিই করে যাচ্ছে।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলছেন, ‘আওয়ামী লীগ ফাঁকা মাঠে গোল দিতে চায় না।’ অথচ সারা দেশে তাদের তাণ্ডব প্রমাণ করে, তারা বিএনপিকে নির্বাচন থেকে নির্বাসন দিয়েই ছাড়বেন। সারা দেশে বিএনপি কর্মীদের গ্রেফতার সম্পর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, নির্বাচন কমিশনের অনুমোদনেই অপরাধীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। অথচ কমিশন বলছে উল্টো কথা। তা হলে ঘাপলাটা কোথায়? কারা খালি মাঠে গোল দিতে চায়, তা পরিষ্কার। এর প্রতিকার চাইলে জনসাধারণকে ভোটকেন্দ্র পাহারা দিতে হবে। কেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক অভিজ্ঞ মহল মনে করেন, দেশের সাধারণ ভোটার একটি পরিবর্তনের জন্য উন্মুখ হয়ে আছেন। এটি এমনিতেই পরিবর্তন হবে না। এ জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে ঝুঁকি নিতে হবে। কথায় বলেÑ নো রিস্ক নো গেইন। সুতরাং বিগত ১০ বছরে যারা নিপীড়ন-নির্যাতন, হামলা-মামলা তথা দুঃসহ যাতনার কণ্টকময় পথ পেরিয়েছেন, তাদের সময় এসেছে ঘুরে দাঁড়ানোর। ‘জোর কদম চল রে ফের, দূর নহে পথ মঞ্জিলের।’ 
লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]


আরো সংবাদ