১২ ডিসেম্বর ২০১৮

ঋণখেলাপিদের সেবা দিতে গিয়ে ব্যাংকের কমছে আয়

৮৮ ভাগই আদায় অযোগ্য; কেন্দ্রীভূত হয়ে যাচ্ছে ব্যাংকঋণ
-

তারা ব্যাংকের খাতায় মন্দ মানের ঋণখেলাপি। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে আর পরিশোধ করছেন না। ব্যাংক মামলাও করেছে। কিন্তু বছরের পর বছর এ মামলা চলছে; নিষ্পত্তি হচ্ছে না। ফি বছরই পুরনো ঋণের সাথে সুদ যোগ হচ্ছে। ফলে বাড়ছে পুঞ্জীভূত মন্দ মানের ঋণ। আর ব্যাংকের আয় দিয়ে এ মন্দ ঋণের প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হচ্ছে। এভাবে কমে যাচ্ছে ব্যাংকের নিট আয়। ব্যাংকের আয় কমে যাওয়ায় অনেক ব্যাংকেরই নিট লোকসান বেড়ে গেছে। ঋণ মুষ্টিমেয় কিছু ঋণখেলাপির কাছে আটকে যাওয়ায় কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ছে ব্যাংকঋণ। নতুন করে ঋণ বিতরণ করতে পারছে না, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে অর্থনীতিতে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বেশির ভাগ ব্যাংক ক্ষুদ্র ও মাঝারি ঋণের পরিবর্তে বড় অঙ্কের ঋণ দিতে ব্যতিব্যস্ত। বলা চলে ব্যাংকের ঋণ কেন্দ্রীভূত হয়ে যাচ্ছে। আর এর অন্যতম কারণ হলো ভাগবাটোয়ারা। বেশির ভাগ ব্যাংকের পরিচালক ব্যবসায়ী। আবার তাদের কেউ কেউ আইনপ্রণেতাও। আইনের বেড়াজালে পড়ে নিজ ব্যাংক থেকে বাড়তি ঋণ নিতে পারেন না। ফলে যোগসাজশ করে এক ব্যাংকের পরিচালক অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছেন। নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করায় ঋণের একটি বড় অংশই চলে যাচ্ছে ব্যাংক পরিচালকদের পকেটে। আর যেটুকু থাকছে তারও বড় একটি অংশ যাচ্ছে সুবিধাভোগীদের কাছে। ফলে ব্যাংকের ঋণ এক দিকে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ছে, অপর দিকে তা আদায় না হওয়ায় মন্দ ঋণে পরিণত হচ্ছে। আর মন্দ ঋণের বিপরীতে শতভাগ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে গিয়ে কমে যাচ্ছে ব্যাংকের আয়। আর আয় কমায় সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদেরকে কাক্সিত হারে মুনাফা বিতরণ করতে পারছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকগুলো মোট ঋণ বিতরণ করেছে ৮ লাখ ৬৮ হাজার ৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে অবলোপন বাদেই খেলাপি ঋণ বেড়ে হয়েছে ৯৯ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। যদিও প্রকৃতপক্ষে খেলাপি ঋণ আরো অনেক বেশি বলে ব্যাংকাররা জানিয়েছেন। অনেক বড় বড় গ্রুপ ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে আর পরিশোধ করছেন না। আবার তাদের ঋণখেলাপিও বলা যাবে না। কারণ, ঋণখেলাপি হলে আর নতুন করে ঋণ নিতে পারেন না। নানা প্রভাব খাটিয়ে তারা বছরের পর বছর ঋণ পরিশোধ না করেও কগজে-কলমে নিজেদের কিন রাখছেন। কেউ ডাউন পেমেন্ট না দিয়ে ঋণ নবায়ন করছেন। কেউবা কাগজে কলমে পরিশোধ দেখিয়ে ঋণ নিয়মিত রাখছেন। এভাবে প্রকৃত খেলাপি ঋণ আড়াল করা হচ্ছে। আবার যেটুকু খেলাপি ঋণ দেখানো হচ্ছে তার মধ্যে প্রায় ৮৮ ভাগই মন্দ ঋণ বা আদায় অযোগ্য ঋণ। এর মধ্যে সরকারি ব্যাংকগুলোর আদায় অযোগ্য ঋণের পরিমাণ প্রায় ৯২ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, সেপ্টেম্বর শেষে সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ১ লাখ ৫৩ হাজার ৯৩৩ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে ৪৮ হাজার ৮০ কোটি টাকাই খেলাপি ঋণ। এ খেলাপি ঋণের মধ্যে প্রায় ৯২ শতাংশই কুঋণ বা মন্দ ঋণে পরিণত হয়েছে। আলোচ্য সময়ে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ৬ লাখ ৫৬ হাজার ৩১৫ কোটি টাকার ঋণের মধ্যে ৪৩ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ দেখানো হয়েছে। যার প্রায় ৮৪ শতাংশ মন্দ ঋণে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক বা রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের বিতরণ করা ২৪ হাজার ১৭৬ কোটি টাকার ঋণের মধ্যে খেলাপি ঋণ দেখানো হয়েছে ৫ হাজার ২৪১ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৯৩ শতাংশই মন্দ ঋণে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মন্দ মানের খেলাপি ঋণ আদায় হয় না। আগে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতেই মন্দ ঋণের পরিমাণ বেশি ছিল। সেই তুলনায় বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে কম ছিল। কিন্তু এখন সরকারি ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি বেসরকারি ব্যাংকগুলোতেও মন্দ ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ যে ঋণ একবার খেলাপি হচ্ছে ওই ঋণ আর সহজেই আদায় হচ্ছে না। ফলে তাদের মন্দ ঋণ বা আদায় অযোগ্য ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে।
ব্যাংকগুলোর মন্দ ঋণ বেড়ে যাওয়ায় আয় কমে যাচ্ছে। কারণ মন্দ ঋণের বিপরীতে শতভাগ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। আর প্রভিশন সংরক্ষণ করা হয় ব্যাংকগুলোর আয় খাতের অর্থ থেকে। একই সাথে কমে যাচ্ছে বিনিয়োগসক্ষমতা। কারণ, আমানতের অর্থ ঋণ হিসেবে বিতরণ করা হয়। কম হারে আমানত নিয়ে বেশি মুনাফায় ঋণ বিতরণ করা হয়। ঋণ আদায় না হলেও শর্তানুযায়ী নির্ধারিত মেয়াদ শেষে সুদে আসলে আমানতকারীদের পরিশোধ করতে হয়। এভাবে এখন অনেক ক্ষেত্রেই ঋণ আদায় না হওয়ায় নতুন আমানতের অর্থ থেকে মেয়াদপূর্তির আমানত পরিশোধ করতে হচ্ছে। যেখানে ঋণ আদায় হলে ব্যাংকগুলো বেশি হারে বিনিয়োগ করতে পারত। এভাবেই ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগসক্ষমতা কমে যাচ্ছে। সেই সাথে বাড়ছে না ব্যাংকগুলোর প্রকৃত মুনাফা। ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতি চলতে থাকলে সামনে ব্যাংকগুলোকে কঠিন মূল্য দিতে হবে।


আরো সংবাদ