১২ ডিসেম্বর ২০১৮

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রতিবন্ধক ধারাগুলো পরিবর্তন জরুরি : টিআইবি

-

সমাজের মঙ্গল ও সাংবাদিকতার স্বার্থেই অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা জরুরি। তাই অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্য প্রতিবন্ধক হয় এমন আইন প্রয়োজনে পরিবর্তন, পরিবর্ধন বা পরিমার্জন করতে হবে। দরকার হলে পুরনো আইন বাতিল করে নতুন করে গণমাধ্যমবান্ধব আইন প্রণয়ন করতে হবে। গতকাল সকালে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) ধানমন্ডির কার্যালয়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা পুরস্কার-২০১৮ ঘোষণা উপলে আয়োজিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের পরিপ্রেেিত অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার চ্যালেঞ্জ বিষয়ক আলোচনায় বক্তারা এ অভিমত ব্যক্ত করেন।
জাতিসঙ্ঘ ঘোষিত ৯ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবস পালনে টিআইবির সপ্তাহব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচির অংশ হিসেবে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন টিআইবির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল। এ সময় উপস্থিত ছিলেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের পরিপ্রেেিত অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার চ্যালেঞ্জবিষয়ক আলোচনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন টিআইবির আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক শেখ মনজুর-ই-আলম। প্রবন্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের যেসব ধারা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে, সেসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন তিনি।
পরে এ বিষয়ে আলোচনায় অংশ নেন বিশিষ্ট লেখক ও সাংবাদিক আবুল মোমেন, দৈনিক প্রথম আলোর ফিচার সম্পাদক সুমনা শারমীন, ঢাকা বাংলা চ্যানেলের (ডিবিসি) সম্পাদক জায়েদুল আহসান পিন্টু এবং ইউএনবির সাবেক নির্বাহী সম্পাদক রিয়াজ আহমদ। এ ছাড়াও বিভিন্ন গণমাধ্যমের সিনিয়র সাংবাদিকেরা আলোচনায় অংশ নেন।
লেখক ও সাংবাদিক আবুল মোমেন তার বক্তব্যে বলেন, আমরা নাগরিকের অধিকার ও গণতান্ত্রিক অধিকার সুরতি করতে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিভিন্ন ধারা সেই সংগ্রামের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেেিত সরকারের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, আইন করে সব বন্ধ করে দিতে হবে। এতে মনে হচ্ছে সরকার কিছুটা ছাড় দিলে আবার কিছুটা কঠিন হচ্ছে। আমরা চাই সাংবাদিকদের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন আরো বৃদ্ধি পাক। এ জন্য নাগরিক সমাজকে নেতৃত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে এ আইনটি কতটা তথ্যপ্রকাশ বান্ধব হবে, তা নির্ভর করবে নাগরিক সমাজের ভূমিকার ওপর।
সাংবাদিক রিয়াজ আহমদ বলেন, আইন তো পাথরে খোদাই করা কোনো বিষয় নয় যে তা পরিবর্তন করা যাবে না। সরকার চাইলেই তা পরিবর্তন করতে পারে। তাই হয় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পরিবর্তন করতে হবে অথবা আইনের অস্পষ্ট বিষয়গুলো সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়নে বিধি প্রণয়ন করতে হবে।
আইন প্রণয়নের আগে অংশীজনদের সাথে সরকারের আলোচনার প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, সরকার আলোচনা করে ঠিকই কিন্তু অংশীজনদের সুপারিশ আমলে নেয় না। তার মানে তারা বিশ্বকে দেখাতে চায় যে আমরা সবার সাথে কথা বলেই আইন করি। কিন্তু আসলে তা বাস্তবায়ন হয় না।
প্রথম আলোর ফিচার সম্পাদক সুমনা শারমীন বলেন, সমাজকে টিকিয়ে রাখার জন্যই অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাকে টিকিয়ে রাখতে হবে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাকে উৎসাহিত করে আমাদের উচিত, এ ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে সাড়া দেয়া। কারণ অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এমনিতেই অনেক ঝুঁকিপূর্ণ, তাই এ পেশাকে আরো কতটা সহজ করা যায় সে চেষ্টাই করা উচিত।
আলোচনায় অংশ নিয়ে ঢাকা বাংলা চ্যানেলের (ডিবিসি) সম্পাদক জায়েদুল আহসান পিন্টু বলেন, এ আইন কোনোভাবেই গণমাধ্যমবান্ধব নয়, এমনকি জনবান্ধবও নয়। এর মাধ্যমে হেরেছে জনগণ, গণতন্ত্র আর হেরেছেন রাজনীতিবিদেরা। তাই অবিলম্বে সরকারকে এ আইন বাতিল করে নতুন করে আইন প্রণয়নের অনুরোধ করছি।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটি সরকারের স্ববিরোধিতার পরিচায়ক। কারণ জাতিসঙ্ঘের যে সনদের ওপর ভিত্তি করে আমরা আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবস উদযাপন করছি তার ১৩ অনুচ্ছেদে দুর্নীতি প্রতিরোধে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে জনগণ, সুশীলসমাজ ও গণমাধ্যমের সম্মিলিত প্রয়াসকে অপরিহার্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাধারণ জনগণ, গণমাধ্যম ও বেসরকারি সংগঠনগুলো যাতে সোচ্চার ভূমিকা পালন করতে পারে, তার উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার দায়িত্বও সরকারের। কিন্তু এ আইন সে ধরনের উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিতে কোনোভাবেই সহায়ক নয়। সুতরাং অবিলম্বে এ আইনটি পরিবর্তন, পরিমার্জন, সংশোধন এমনকি প্রয়োজনে বাতিল করে আবার নতুন করে প্রণয়ন করতে হবে।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতার গুরুত্ব তুলে ধরে ড. গওহর রিজভী বলেন, সভ্যতার শুরু থেকেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিষয়টি প্রাসঙ্গিক। স্বাধীন মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে এটি কোথায় গিয়ে থামবে তা কেউ জানে না। সরকার বা বিরোধী যেই হোক না কেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ছাড়া আমরা যে সমাজ চাই তা সম্ভব নয়। তাই একটা আইন হয়েছে মানে এটা পরিবর্তন করা যাবে না এমন নয়। অনেকবার আইন হয়, আবার তা পরিবর্তনও হয়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে এ ধরনের আলোচনাটা চলতে থাকুক। এটি একসময় অবশ্যই পরিবর্তন হবে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে আইনের পাশাপাশি সামাজিক দণ্ডের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি আরো বলেন, আমরা সামাজিকভাবে দুর্নীতিবাজদের বর্জন করতে পারি না। তাই যতণ পর্যন্ত আমাদের দ্বৈত আচরণ থাকবে ততণ পর্যন্ত নাগরিক সমাজও দুর্নীতির জন্য দায়বদ্ধ থাকবে।
টিআইবির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, একটি সমাজের বাকস্বাধীনতা থাকতে হবে, চিন্তার স্বাধীনতা থাকতে হবে এবং তার সাথে বিবেকের স্বাধীনতাও থাকতে হবে। আর আমাদের সজাগ হওয়ার জন্য বড় ভূমিকা রাখে গণমাধ্যম। যদি এটিই নিয়ন্ত্রণ করা হয় তাহলে আমাদের সজাগ হওয়ার আর সুযোগ নেই। আমরা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সমালোচনা এ জন্যই করছি, কারণ এখানে আশঙ্কা আছে যে, এর মাধ্যমে বিবেক বন্দী আছে। আইনের বিভিন্ন ধারার অপব্যবহার হবে না মানে এই না যে তা কখনোই হবে না। তাই আমরা ‘যদি হয়’ এই ভয়ের মধ্যেই আছি।
আলোচনা পর্বের পর টিআইবির অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা পুরস্কার ২০১৮ এর বিজয়ীদের পুরস্কার দেয়া হয়। প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার ছয়জন সাংবাদিকসহ অনুসন্ধানী অনুষ্ঠান সম্প্রচারের জন্য দু’টি টেলিভিশন প্রামাণ্য অনুষ্ঠান এ বছর টিআইবি’ অনুসন্ধানীমূলক সাংবাদিকতা পুরস্কার অর্জন করেছে।
প্রিন্ট মিডিয়া (জাতীয়) বিভাগে পুরস্কার অর্জন করেছেন প্রথম আলোর সিনিয়র রিপোর্টার মো: আনোয়ার হোসাইন। প্রিন্ট মিডিয়া (আঞ্চলিক) বিভাগে বিজয়ী হয়েছেন খুলনার দৈনিক প্রবাহ পত্রিকার সিনিয়র রিপোর্টার মুহাম্মদ নুরুজ্জামান। এ ছাড়া জলবায়ু অর্থায়নে সুশাসনবিষয়ক প্রতিবেদনের জন্য প্রিন্ট মিডিয়া (জাতীয়) বিভাগে পুরস্কার অর্জন করেন সমকালের বিশেষ প্রতিনিধি রাজিব নুর এবং একই পত্রিকার উপসম্পাদক জাহিদুর রহমান।
ইলেকট্রনিক মিডিয়া (প্রতিবেদন) বিভাগে পুরস্কার অর্জন করেছেন ৭১ টেলিভিশনের বিশেষ প্রতিনিধি মুফতি পারভেজ নাদির রেজা। জলবায়ু অর্থায়নে সুশাসনবিষয়ক প্রতিবেদনের জন্য ইলেকট্রনিক মিডিয়া বিভাগে বিজয়ী হয়েছেন মাছরাঙা টেলিভিশনের পাবনা ব্যুরো অফিসের সিনিয়র রিপোর্টার উৎপল মির্জা। এ ছাড়া টেলিভিশনের অনুসন্ধানী প্রামাণ্য অনুষ্ঠান বিভাগে এ বছর পুরস্কার অর্জন করে ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের তালাশ টিম। অন্য দিক জলবায়ু অর্থায়নে সুশাসনবিষয়ক অনুসন্ধানী টেলিভিশন প্রামাণ্য অনুষ্ঠানের জন্য টিআইবির অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা পুরস্কার অর্জন করে যমুনা টেলিভিশনের ৩৬০ ডিগ্রি টিম।
প্রতিটি বিভাগে বিজয়ী সাংবাদিককে সম্মাননাপত্র, ক্রেস্ট ও এক লাখ ২৫ হাজার টাকার চেক দেয়া হয়। আর প্রামাণ্য অনুষ্ঠানকে সম্মাননাপত্র, ক্রেস্ট ও এক লাখ ৫০ হাজার টাকার চেক দেয়া হয়। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ড. গওহর রিজভী বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন।


আরো সংবাদ