১১ ডিসেম্বর ২০১৮
ক্লাস-পরীক্ষায় অংশ নেয়ার ঘোষণা শিক্ষার্থীদের

ভিকারুননিসার শ্রেণী শিক্ষিকা হাসনা হেনা কারাগারে

হাসনা হেনা -

ভিকারুননিসার শ্রেণী শিক্ষিকা হাসনা হেনার জামিন নাকচ করে তাকে কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। গতকাল দুপুর ডিবি পুলিশ এসআই কামরুল ইসলাম তাকে ঢাকার সিএমএম আদালতে হাজির করে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কারাগারে আটক রাখার জন্য আবেদন করেন।
আসামিপক্ষে জামিন চেয়ে আবেদন করা হয়। ঢাকার মহানগর হাকিম আবু সাইদ উভয়পক্ষের বক্তব্য শুনে জামিন আবেদন নাকচ করে কারাগারে পাঠানোর এই নির্দেশ দেন।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা তার প্রতিবেদনে উল্লেখ্য করেন : ঘটনার পর গত মঙ্গলবার রাত ১০টায় ঢাকার পল্টন থানায় ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌস, প্রভাতী শাখার প্রধান জিনাত আক্তার ও শ্রেণী শিক্ষিকা হাসনা হেনার বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচণার মামলা করেন অরিত্রীর বাবা।
জামিন শুনানিকালে আইনজীবী আদালতে উল্লেখ্য করেনÑ যে উদ্দেশে পুলিশ শিক্ষকা হাসনা হেনাকে গ্রেফতার করেছে সে ঘটনায় তিনি জড়িত নন। হাসনাকে জামিন দিলে তিনি পালাবেন না।
প্রধান শিক্ষক ওই শিক্ষার্থীর (অরিত্রী) অভিভাবককে ডাকতে বলায় উনি ডেকেছেন। এর বেশি কিছু তিনি জানেন না। আসামিপক্ষে মামলা পরিচালনা করেন আইনজীবী জাহাঙ্গীর হোসেন।
উল্লেখ্য, সোমবার দুপুরে রাজধানীর শান্তিনগরের নিজ বাসায় ফ্যানের সাথে ফাঁস দেয় অরিত্রী। মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল (ঢামেক) কলেজ হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক অরিত্রীকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে ভিকারুননিসার বিুব্ধ শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করে। ঘটনার পর মঙ্গলবার রাত ১০টায় ঢাকার পল্টন থানায় ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌস, প্রভাতী শাখার প্রধান জিনাত আক্তার ও শ্রেণী শিক্ষিকা হাসনা হেনার বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা করেন অরিত্রীর বাবা।
কাস-পরীায় অংশ নেয়ার ঘোষণা ভিকারুননিসার শিার্থীদের
নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণীর ছাত্রী অরিত্রী অধিকারীর আত্মহত্যার ঘটনায় গতকাল তৃতীয় দিনের মতো বিােভ করেন শিার্থীরা। তবে বিকেলে শিক্ষকদের সাথে শিক্ষার্থীদের দেড় ঘণ্টা বৈঠকের পর বিকেল পৌনে ৫টায় ছাত্রীদের আন্দোলনের নেত্রী অনুশকা রায় তাদের কর্মসূচি স্থগিতের ঘোষণা দেন। গত তিন দিনের আন্দোলনের নেত্রী অনুশকা রায় ঘোষণা করেন, আমরা আন্দোলন স্থগিত করছি, কাল (শুক্রবার) থেকে আমরা পরীক্ষায় অংশ নেবো। তিনি বলেন, আমাদের বেশির ভাগ দাবি স্কুল কর্তৃপক্ষ মেনে নিয়েছে। বাকি দাবিগুলো মেনে নেয়ার ব্যাপারে আমাদের আশ্বাস দেয়া হয়েছে এবং সময়ও লাগবে।
শিার্থীদের মুখপাত্র আনুশকা রায় শুক্রবার থেকে পরীা ও কাসে ফিরে যেতে সব শিার্থীকে আহ্বান জানান। তিনি বলেন, আমাদের প্রায় সব দাবি মেনে নেয়া হয়েছে। তবে আমাদের ছয় দফার মধ্যে ১ ও ৫ নম্বর দফা তদন্তের বিষয় স্কুল কর্তৃপরে হাতে নেই। এগুলো মন্ত্রণালয় ও সরকারের ব্যাপার, তদন্তের ব্যাপার। তবে ২, ৩, ৪ ও ৬ দফা স্কুল কর্তৃপ মেনে নিয়েছে। এ জন্য সময় দিতে হবে।
মোবাইল পাওয়ার অভিযোগে পরীক্ষার হল থেকে বের করে দেয়া এবং স্কুলে ডেকে নিয়ে বাবা-মাকে অপমানের পর গত সোমবার আত্মহত্যা করে নবম শ্রেণীর শিার্থী অরিত্রী অধিকারী। এর প্রতিবাদে মঙ্গলবার স্কুলের সামনে অবস্থান নিয়ে বিােভ শুরু করেন শিার্থী-অভিভাবকেরা, যা তিন দিন ধরে চলছিল। গতকাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি বন্ধ ঘোষণা করা হলেও সকাল থেকেই শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা স্কুলের মূল ফটকের সামনে জড়ো হয়ে অবস্থান নেন। বেলা বাড়ার সাথে সাথে মূল ফটকে অবস্থান বাড়তে থাকে। এরই মধ্যে গভর্নিং বডির পদত্যাগ এবং অরিত্রীর মা-বাবার সাথে দুর্ব্যবহারের জন্য বিদ্যালয় কর্তৃপকে প্রকাশ্যে মা চাওয়ার শর্ত দেন আন্দোলনকারীরা। বেলা দেড়টায় স্কুলের গভর্নিং বডির সভাপতি গোলাম আশরাফ তালুকদার সাংবাদিকদের মাধ্যমে অরিত্রীর বাবা-মায়ের কাছে মা প্রার্থনা করেন। প্রতিষ্ঠানের বৃহত্তর স্বার্থে প্রয়োজন হলে পদত্যাগ করতেও রাজি আছেন বলে জানান তিনি।
অরিত্রীর মৃত্যুর পর শিা মন্ত্রণালয় অতিদ্রুত তৎপর হয়ে তদন্ত কমিটি গঠন, স্কুলের ভারপ্রাপ্ত অধ্যসহ তিন শিককে বরখাস্ত ও এমপিও বাতিল করে। শিার্থীদের আন্দোলনের মুখে বুধবার বিদ্যালয় কর্তৃপ ভিকারুননিসার সব শাখার কাস-পরীা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে।
স্কুলের গভর্নিং বডির সভাপতি মা প্রার্থনার পর পরই পরিস্থিতি দ্রুতই উন্নতি ঘটে এবং শিক্ষার্থীরা অনেকটাই নমনীয় হন। এর আগে শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের একটি প্রতিনিধিদল সচিবালয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে গিয়ে তাদের ৬ দফা দাবি সংবলিত একটি স্মারকলিপি সচিবের কাছে পেশ করেন।
শিার্থীরা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ায় ঘোষণার একপর্যায়ে বেলা আড়াইটার দিকে কয়েকজন শিক এসে শিার্থীদের সাথে কথা বলেন। এ সময় শিকদের কয়েকজনকেও ছাত্রীদের সাথে কাঁদতে দেখা যায়। একপর্যায়ে প্রধান ফটকের সামনে আন্দোলনরত শিার্থীদের ভেতরে নিয়ে যেতে সম হন তারা। এ সময় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের নেতৃস্থানীয় ১০-১২ জনকে নিয়ে শিক্ষকরা অধ্যক্ষের সম্মেলন কক্ষে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। তবে কোনো অভিভাবক ও সাংবাদিকদের এ বৈঠকে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। শিকদের সাথে আলোচনা শেষে করে এসে আন্দোলন স্থগিতের ঘোষণা দেন শিার্থীরা।
পরে পরিচালনা পর্ষদের সভায় চলমান বার্ষিক সমাপনীর দুই দিনের পরীার সময় নতুন করে নির্ধারণ করার কথা জানান পর্ষদের শিক প্রতিনিধি মুশতারি সুলতানা। নতুন সূচি অনুযায়ী, বৃহস্পতিবারের পরীা শুক্রবার এবং ৫ তারিখের পরীা ১১ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হবে।
অপর দিকে, অরিত্রীকে আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগের মামলায় আগের দিন রাতে আটক শিক হাসনা হেনাকে গতকাল দুপুরের পর আদালতে নেয়া হয়। আদালত জামিন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
ভিকারুননিসার শিার্থীদের ছয় দফা
১. অধ্যরে পদত্যাগ এবং ৩০৫ ও ৩০৬ ধারায় আত্মহত্যার প্ররোচনার অপরাধে অধ্যরে শাস্তি নিশ্চিত করা।
২. প্রত্যেক শিার্থীর আচরণ ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে মানসিক স্বাস্থ্যের বিবেচনা করে আলাদা যতœ নিতে হবে। কোনোভাবেই শারীরিক ও মানসিক চাপ ও অত্যাচার করা যাবে না।
৩. কথায় কথায় বহিষ্কারের হুমকি দেয়া বন্ধ করে অন্যায় ডিটেনশন পলিসি বন্ধ করতে হবে।
৪. বিদ্যালয়ের শিার্থী, অভিভাবক, শিক এবং কর্মরত সবার মানসিক সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে মানসিক পরামর্শদাতা নিয়োগ। শৃঙ্খলাভঙ্গকারী শিার্থীকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতে হবে।
৫. গভর্নিং বডির সবাইকে পদত্যাগ করতে হবে।
৬. অরিত্রীর মা-বাবার সাথে দুর্ব্যবহারের জন্য অধ্য ও বিদ্যালয় কর্তৃপকে প্রকাশ্যে মা চাইতে হবে।
শিার্থীদের আন্দোলন স্থগিতের ঘোষণা আসার পর শিক হাসনা হেনাকে ‘নির্দোষ’ দাবি করে তার মুক্তি চেয়ে বিােভ করেন আরেক দল শিার্থী।


আরো সংবাদ