১৬ জানুয়ারি ২০১৯

পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক জ্ঞান

-

বিজ্ঞান হচ্ছে বিশেষ জ্ঞান, নির্ভুল জ্ঞান। এটাও বলা হয়, বিজ্ঞান হচ্ছে পদ্ধতিগত ও বিধিবদ্ধ জ্ঞানের সমষ্টি, যা তীক্ষè পর্যবেক্ষণ, গভীর গবেষণা ও বারবার পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে অর্জন করতে হয়। যেমন অতীতকালে মনে করা হতো পানি একটি মৌলিক পদার্থ। অতঃপর গবেষণা করে জানা গেল, পানি হচ্ছে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন পরমাণু নিয়ে গঠিত একটি যৌগিক পদার্থ। এটিই হচ্ছে পানি সম্পর্কে নির্ভুল জ্ঞান। কোনো বিষয়ে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান বারবার পরীক্ষা করে একই ফল অর্জিত হয়।

আরো বলা হয়, বিজ্ঞান হচ্ছে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কী? কেন? কিভাবে? ইত্যাদি প্রশ্নের সঠিক উত্তরের সমষ্টি। কোনো বিষয়ে যদি সুর্নিষ্টি যৌক্তিক সব প্রশ্নের সঠিক উত্তর সংগ্রহ করা সম্ভব না হয়, তাহলে বুঝতে হবে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জ্ঞান অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। তাই পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান অর্জনের জন্য আমাদের যথাসাধ্য চেষ্টা করতে হবে।

আধুনিক বিজ্ঞান বস্তুজগতে সীমাবদ্ধ। মহান স্রষ্টা, তাঁর ক্ষমতা এবং অলৌকিক বিষয়ের সাথে আধুনিক বিজ্ঞানের দৃশ্যত সংশ্লিষ্টতা নেই। স্রষ্টার অস্তিত্ব ও তাঁর ক্ষমতা প্রসঙ্গে জ্ঞান অর্জনের কোনো পদ্ধতিগত ব্যবস্থা আধুনিক বিজ্ঞানে নেই। বাস্তবে বস্তুজগতের বাইরে মহাবিশ্বে দেহাতীত, অতীন্দ্রিয় ও অলৌকিক জগৎ রয়েছে। তাই পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক জ্ঞান অর্জনের লক্ষ্যে বস্তুজগতের জ্ঞান এবং ঐশী ও অতীন্দ্রিয় জগতের জ্ঞানের সমন্বয় অপরিহার্য। পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের জন্য অনেক ক্ষেত্রে বস্তুজগতের জ্ঞান ও অলৌকিক জ্ঞান পরস্পর পরিপূরক।

একজন চিত্র সমালোচকের আলোচনা চিত্রের অবয়ব, চিত্রের বিষয়, মাধ্যম, অঙ্কনরীতি ইত্যাদির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। চিত্র সমালোচক চিত্রকরের নাম ও তার বিশদ পরিচয় আবশ্যিকভাবে উল্লেখ করে থাকেন। চিত্র সমালোচনার পূর্ণতার জন্য তা অত্যাবশ্যক। কিন্তু দুর্ভাগ্য, প্রকৃতি বিজ্ঞানীগণ আকাশের গ্রহ-নক্ষত্র ও অন্যান্য জ্যোতিষ্ক, বৈচিত্র্যমণ্ডিত উদ্ভিদ ও প্রাণীর বর্ণনা করেন ও এগুলোর চিত্র অঙ্কন করেন; এসব নিয়ে টিভি সিরিয়াল নির্মাণ করেন। কিন্তু ঘুণাক্ষরেও এসবের স্রষ্টার নাম উল্লেখ করেন না।

কিছু মানুষ মনে করেন- মহাবিশ্ব, চন্দ্র-সূর্য, পৃথিবী, উদ্ভিদকুল, মানুষসহ সব প্রাণী, ইত্যাদি স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রকৃতিতে সৃষ্টি লাভ করেছে। সত্যি যদি তা-ই হয়ে থাকবে, তাহলে স্বীকার করতেই হবে-

১. মহাবিশ্ব সৃষ্টির সূচনালগ্নে প্রকৃতি নিজেই আদি বস্তুপিণ্ড তৈরি করেছিল; ২. অতঃপর প্রকৃতিরই ইচ্ছার আদি বস্তুপিণ্ডে ‘বিগব্যাং’ নামক মহাবিস্ফোরণ ঘটেছিল এবং প্রকৃতির ইচ্ছায় সুসংগঠিত মহাবিশ্বের আবির্ভাব হয়েছিল; ৩. পৃথিবী নামক গ্রহে প্রকৃতি নানা প্রকারের উদ্ভিদ ও প্রাণী সৃষ্টি করেছে; ৪. উন্নত প্রাণীগুলোর দেহে প্রকৃতি মস্তিষ্ক, হৃৎপিণ্ড, চক্ষু ইত্যাদি অসাধারণ অঙ্গ সৃষ্টি করেছে; ৫. প্রকৃতির ইচ্ছায় উদ্ভিদ ও প্রাণী নিয়মিত ও প্রণালীবদ্ধভাবে বংশবিস্তার করে চলেছে এবং আরো অনেক কিছু।

বাস্তবে যদি এটা-ই হয়, তাহলে কথিত প্রকৃতি ও বিশ্বাসী মানুষদের সৃষ্টিকর্তার মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকবে না। কিন্তু বাস্তবে ‘প্রকৃতি’ অসীম ক্ষমতাধর কোনো সত্তা নয় যে, কোনো কিছু সৃষ্টি ও লালনপালন করতে পারে। আসলে সর্বশক্তিমান সৃষ্টিকর্তাকে অস্বীকার করে মানুষ প্রকৃতির দোহাই দিয়ে আত্মপ্রবঞ্চনায় নিমজ্জিত রয়েছে।

অতএব, বলতে হয়- পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক জ্ঞান : বস্তুগত বৈজ্ঞানিক জ্ঞান + সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্রষ্টার কর্তৃত্বের স্বীকৃতি।

নতুন নতুন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার অনেক ক্ষেত্রে পুরনো তত্ত্বকে ভ্রান্ত প্রমাণ করে থাকে। তখন বাধ্য হয়ে পুরনো তত্ত্ব বর্জন করে নতুন তত্ত্ব গ্রহণ করতে হয়। তাই বলা হয়, বিজ্ঞান গতিশীল। সর্বশক্তিমান স্রষ্টার কর্মতৎপরতাকে যারা অস্বীকার করে থাকেন এবং পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক জ্ঞান অর্জনের স্বার্থেও যারা তা স্বীকার করতে নারাজ, তাদের অন্তত ‘বিজ্ঞান গতিশীল’ এ বিবেচনায় স্রষ্টার কর্মতৎপরতাকে স্বীকার করে নেয়া উচিত। সাথে সাথে তারা আশা পোষণ করতে পারেন ভবিষ্যতে কোনো দিন যৌক্তিক প্রশ্নগুলোর জবাবে গতিশীল বিজ্ঞান অন্য কিছু তাদের উপহার দিতে পারে।

সর্বশক্তিমান স্রষ্টার কর্তৃত্ব প্রসঙ্গে, প্রকৃতিতে বিরাজমান অসংখ্য উদাহরণ থেকে মাত্র ক’টি নিম্নে আলোচনা করা হলো। ১. মহাবিশ্বের সৃষ্টি ও পরিণতি : সুপ্রাচীনকাল থেকে মহাবিশ্বের সৃষ্টি প্রসঙ্গে জ্যোতির্বিজ্ঞানীগণ নিজ নিজ ধারণা ব্যক্ত করে আসছেন। ক্যালিফোর্নিয়ার মাউন্ট উইলসন অবজারভেটরির জ্যোতির্বিজ্ঞানী এডউইন পি. হাবল ১৯২৫ সালে তার বিখ্যাত ‘বিগব্যাং থিওরি’ উপস্থাপন করেন। এই থিওরি মতে, সৃষ্টির আদিতে মহাবিশ্বের সব গ্রহ-নক্ষত্র একটি আদি বস্তুপিণ্ডে জমাটবদ্ধ ছিল। পিণ্ডটি অতি ক্ষুদ্র হলেও এর ঘনত্ব ছিল কল্পনাতীত রকমের অধিক। ১৫-২০ বিলিয়ন বছর আগে পিণ্ডটি প্রচণ্ড চাপে পতিত হয় এবং ওই চাপের ফলে তাপ অকল্পনীয়ভাবে বেড়ে যায়, প্রচণ্ড চাপ ও তাপের ফলে পিণ্ডটিতে ঘটে মহাবিস্ফোরণ, যা বিগব্যাং (Big Bang) নামে পরিচিত। বিগব্যাংয়ের ফলে উৎপন্ন, বস্তুকণাগুলো চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং ধাপে ধাপে দীর্ঘ পরিবর্তনের পর গ্রহ, নক্ষত্র, গ্যালাক্সি ইত্যাদি নিয়ে বর্তমান মহাবিশ্ব রূপ লাভ করে। উল্লেখ্য, মহাবিশ্ব এখনো প্রসারমান। মহাবিশ্ব সৃষ্টি প্রসঙ্গে বিশ্বের পণ্ডিতগণ বিগব্যাং থিওরি সমর্থন করেন। কিন্তু তারা নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলোর যথাযথ জবাব পাননি।

১. বিগব্যাংয়ের আগে কল্পনাতীত ঘনত্ব বিশিষ্ট আদি বস্তুপিণ্ডটি কোথা থেকে কিভাবে আবির্ভূত হয়েছিল। ২. বিজ্ঞান বলে, কার্যকারণ ছাড়া কোনো ঘটনা ঘটতে পারে না। বিগব্যাংয়ের কার্যকারণ কী? ৩. বিগব্যাং সংঘটনের জন্য কোথা থেকে কিভাবে প্রচণ্ড চাপ ও তাপের উদ্ভব ঘটেছিল? ৪. বিগব্যাং একটি দুর্ঘটনা বলে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু সবাই জানেন, দুর্ঘটনার পরিণতি হয় মূলত ধ্বংস। অথচ বিগব্যাংয়ের পর অত্যন্ত সুসংগঠিত ও সুশৃঙ্খল মহাবিশ্বের উদ্ভব ঘটেছে, যেখানে অসংখ্য গ্যালাক্সি, নক্ষত্র, গ্রহ, উপগ্রহ ও নানা জ্যোতিষ্ক নিজ নিজ অক্ষে ও কক্ষপথে সব সময় গতিশীল রয়েছে সুদূর অতীত কাল থেকে; অথচ কারো সাথে কারো সংঘর্ষ হচ্ছে না। পৃথিবী নামক গ্রহে জীবন্ত উদ্ভিদ ও প্রাণীর উপস্থিতিও বিস্ময়কর ব্যাপার। তাই বিগব্যাং-কে ‘দুর্ঘটনা’ রূপে আখ্যায়িত করা কি যৌক্তিক?

প্রশ্নগুলোর জবাব বস্তুবাদী বিজ্ঞান দিতে পারেনি এবং পারবেও না কখনো। এখানেই বস্তুবাদী বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা। আর বস্তুবাদনির্ভর বিজ্ঞান যে অসম্পূর্ণ, এটি তার এক প্রকৃষ্ট প্রমাণ। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের জন্য উপরি উক্ত প্রশ্নগুলোর জবাব পাওয়া অত্যাবশ্যক। অন্যথায়, আমাদের জ্ঞান অসম্পূর্ণ থাকবে। প্রশ্নগুলোর জবাব পেতে হলে অদৃশ্য সর্বশক্তিমান স্রষ্টার ঐশী ক্ষমতাকে স্বীকার না করে উপায় নেই।

দীর্ঘকালব্যাপী অনেক পরিবর্তনের মাধ্যমে মহাবিশ্ব সৃষ্টির বর্ণনা ধর্ম গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে। এ প্রসঙ্গে পবিত্র বাইবেল ও তাওরাতে আছে- * ‘আদিতে ঈশ্বর আকাশমণ্ডল ও পৃথিবী সৃষ্টি করলেন। পৃথিবী ঘোর ও শূন্য ছিল এবং অন্ধকার জলধির ওপর ছিল, আর ঈশ্বরের আত্মা জলের ওপর অবস্থিতি করছিল।’- আদি পুস্তক ১ : ১, বিত্র বাইবেল/পবিত্র তাওরাত।

মহাবিশ্ব সৃষ্টি প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনের আয়াত বর্তমান বৈজ্ঞানিক ধারণার সাথে অত্যন্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ। আদি ও একক বস্তুপিণ্ড থেকে মহাবিশ্বের উৎপত্তি, পানি থেকে জীবিত বস্তুর উদ্ভব এবং মহাবিশ্বের প্রতিনিয়ত সম্প্রসারণ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে সুস্পষ্ট আয়াত রয়েছেÑ * ‘আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী মিশেছিল ওতপ্রোতভাবে (আদিপিণ্ডে), অতঃপর আমি উভয়কে পৃথক করে দিলাম; এবং প্রাণবন্ত সব কিছু সৃষ্টি করলাম পানি থেকে। তবুও কি তারা বিশ্বাস করবে না?’ - পবিত্র কুরআন ২১:৩০। * ‘আমি আকাশ নির্মাণ করেছি আমার ক্ষমতাবলে এবং আমি অবশ্যই এর সম্প্রসারণকারী।’ - পবিত্র কুরআন ৫১:৪৭।

আসলে, সর্বশক্তিমান আল্লাহর একান্ত ইচ্ছায় সৃষ্টির প্রারম্ভে আদি বস্তুপিণ্ডের আবির্ভাব, অতঃপর প্রচণ্ড চাপ ও কল্পনাতীত তাপের উদ্ভব, মহাবিস্ফোরণ ও পরবর্তী ধারাবাহিক পরিবর্তনগুলোর মাধ্যমে সুসংগঠিত মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়েছে এবং তা প্রতিনিয়ত প্রসারিত হচ্ছে। মহাবিশ্ব সৃষ্টির ক্ষেত্রে স্রষ্টার কর্তৃত্বের স্বীকৃতি প্রদান এবং তা সংশ্লিষ্ট পুস্তকে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা অপরিহার্য।

মহাবিশ্বের পরিণতি

বিগব্যাংয়ের সময় থেকে মহাবিশ্ব ক্রমেই প্রসারিত হচ্ছে। নিকটস্থ গ্যালাক্সিগুচ্ছ প্রতি সেকেন্ডে ৩৯৫ মাইল বেগে পরস্পর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। জ্যোতির্বিদগণ মনে করেন, বহু বিলিয়ন বছর পর মহাবিশ্বের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। এ প্রসঙ্গে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের চারটি মতবাদ রয়েছে। তা হচ্ছে-১. The Big Crunch : এটি বিগব্যাংয়ের ঠিক উল্টো। এ মতবাদ অনুযায়ী কয়েক বিলিয়ন বছর পর মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ থেমে যাবে এবং সঙ্কোচন শুরু হবে। ক্রমেই ছোট হতে হতে এক সময় মহাবিশ্ব বিলীন হয়ে যাবে। ২. The Nig Chill : ক্রমেই সম্প্রসারণের পর সুদূর ভবিষ্যতে কোনো এক সময় মহাবিশ্বের বস্তু সমুদয় অদৃশ্য হয়ে যাবে। ৩. The Big Freeze : ক্রমেই সম্প্রসারণের পর কোনো এক পর্যায়ে প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় মহাবিশ্বের বস্তুসমুদয় অস্তিত্বহীন হয়ে যাবে। ৪.The Big Rip : মহাবিশ্বের বস্তুগুলো সুদূর ভবিষ্যতে কোনো এক অবস্থায় টুকরো টুকরো হয়ে হারিয়ে যাবে। (উইকিপিডিয়া)

মহাবিশ্ব সৃষ্টির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য একমাত্র মহান স্রষ্টাই জানেন। সুদূর ভবিষ্যতে কোনো একদিন তাঁরই ইচ্ছায় মহাবিশ্ব ধ্বংস হয়ে যাবে। এ প্রসঙ্গে পবিত্র গ্রন্থগুলোয় অনেক বাণী রয়েছে-

* ‘যখন নক্ষত্ররাজির আলো নির্বাপিত হবে, যখন আকাশ বিদীর্ণ হবে।’ - পবিত্র কুরআন ৭৭ : ৮, ৯। * ‘সেদিন আকাশ হবে গলিত ধাতুর মতো।’ - পবিত্র কুরআন ৭০ : ৮। * ‘বস্তুত আকাশে নক্ষত্ররাজি দীপ্তি দেবে না; সূর্য উদয়কালে নিস্তেজ হবে এবং চন্দ্র আপন জ্যোৎস্না প্রকাশ করবে না। - যিশাইয় ১৩:১০, পবিত্র বাইবেল। * ‘আর আকাশের সমস্ত বাহিনী ক্ষয় পাবে, আকাশমণ্ডল লিপিপত্রের ন্যায় জড়িয়ে যাবে; এবং যেমন দ্রাক্ষালতার জীর্ণ পত্র ও ডুমুর বৃক্ষের জীর্ণ পল্লব, তদ্রুপ তার সমস্ত বাহিনী জীর্ণ হয়ে পড়বে’ -যিশাইয় ৩৪:৪, পবিত্র বাইবেল।

দেখা যাচ্ছে, মহাবিশ্বের সৃষ্টি ও পরিণতি প্রসঙ্গে জ্যোতির্বিজ্ঞান ও পবিত্র ধর্ম গ্রন্থগুলোর মধ্যে চমৎকার সাদৃশ্য রয়েছে। সর্বশক্তিমান স্রষ্টারই ইচ্ছায় মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয়েছে এবং তাঁরই ইচ্ছায় সুদূর ভবিষ্যতে মহাবিশ্ব অস্তিত্বহীন হয়ে পড়বে। আমাদের বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের পূর্ণতার জন্য বিজ্ঞানের সংশ্লিষ্ট পুস্তকে মহান আল্লাহ তা’লার ঐশী কর্তৃত্বের স্বীকৃতি যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ করা অপরিহার্য।

২. পৃথিবীই জীবনের অনুকূলে একমাত্র গ্রহ : (১) সৌরজগতে তো বটেই, সম্ভবত মহাবিশ্বে পৃৃথিবীই একমাত্র গ্রহ যেখানে প্রাণী ও উদ্ভিদের বসবাসের অনুকূল পরিবেশ বিদ্যমান। পৃথিবী ও সূর্যের দূরত্ব বর্তমানে যা রয়েছে, তা থেকে কম বা বেশি হলে পৃথিবীতে প্রাণীকুল টিকে থাকতে পারত না। দূরত্ব যদি কম হতো তাহলে পৃথিবীর তাপমাত্রা এত বেশি হতো যে, এখানে উদ্ভিদ বা প্রাণী বসবাস করতে পারত না। আবার দূরত্ব যদি বেশি হতো তাহলে পৃথিবীর তাপমাত্রা এত কম হতো যে, উদ্ভিদ বা প্রাণীর পক্ষে বেঁচে থাকা সম্ভব হতো না। (২) পৃথিবীর চতুর্পার্শ্বে আকাশে ওজোন গ্যাসের তৈরি একটি স্তর ছাদের মতো রয়েছে। এটি মহাকাশ থেকে আগত এবং জীবকুলের জন্য ক্ষতিকর অতিবেগুনি বা আল্ট্রাভায়োলেট রে ও অন্যান্য রশ্মি চুষে নেয়। ছাদের ন্যায় এ ওজোন স্তর না থাকলে ক্ষতিকর রশ্মির প্রভাবে পৃথিবীতে কোনো উদ্ভিদ ও প্রাণী টিকে থাকতে পারত না। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনের আয়াত- * আল্লাহই তোমাদের জন্য পৃথিবীকে করেছেন বাসোপযোগী এবং আকাশকে করেছেন ছাদ। - পবিত্র কুরআন ৪০:৬৪। * ‘এবং আকাশকে করেছি সুরক্ষিত ছাদ; কিন্তু তারা আকাশস্থিত নিদর্শনাবলি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।’ - পবিত্র কুরআন ২১:৩২।

(৩) নিজ অক্ষে পৃথিবীর আবর্তন গতি (আহ্নিক গতি) বর্তমানের চেয়ে কম হলে, সূর্যের দিকের ভূপৃষ্ঠ অত্যন্ত উত্তপ্ত হয়ে উঠত এবং অপর পৃষ্ঠ খুবই শীতল থাকত। ফলে জীবকুলের জন্য পৃথিবী বাসোপযোগী হতে পারবো না। (৪) উত্তর মেরু সব সময় ধ্রুবতারার মুখী থাকায় বার্ষিক গতির সময় পৃথিবীর অক্ষ কাত হয়ে থাকে। ফলে পৃথিবীতে ঋতুবৈচিত্র্য দেখা যায়। পৃথিবীতে বসবাসরত জীবকুলের জীবনচক্রে ঋতুবৈচিত্র্যের প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। (৫) চন্দ্র-সূর্যের আকর্ষণে দিনে দু’বার জোয়ার-ভাটা ঘটে। জীববৈচিত্র্যে জোয়ার-ভাটার গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, পৃথিবীতে বসবাসরত উদ্ভিদ ও প্রাণীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ : পৃথিবী-সূর্যের অনুকূলে দূরত্ব, ওজোন স্তর, আহ্নিক গতি, বার্ষিক গতিজনিত ঋতুবৈচিত্র্য, জোয়ার-ভাটা ইত্যাদি কিভাবে প্রকৃতিতে প্রতিষ্ঠা পেল? জবাবে জড়বাদী বিজ্ঞান বলবে, তা ‘স্বতঃস্ফূর্তভাবে’ প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। কিন্তু কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিমাত্রই স্বীকার করবেন, জীবকুলের অনুকূলে ব্যাপক পরিবেশগত ব্যবস্থা পৃথিবীতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে গড়ে ওঠেনি; বরং মহান স্রষ্টার একান্ত ইচ্ছায়ই তা সৃষ্টি হয়েছে।

(৬) প্রত্যেক পদার্থের সাধারণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- তাপে প্রসারিত হওয়া এবং শৈত্যে সঙ্কুচিত হওয়া। তদনুযায়ী তাপমাত্রা হ্রাসের সাথে সাথে পানি আয়তনে সঙ্কুচিত হতে থাকে এবং ০০ সেলসিয়াস তাপমাত্রায় কঠিন বরফে পরিণত হয়। আশ্চর্যের ব্যাপার, পানি বরফে পরিণত হওয়া মাত্র আয়তনে বেড়ে হালকা হয়ে যায়। তাই বরফ পানির ওপর ভাসতে থাকে। পানির এ ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্যের কারণ কী, তার কোনো ব্যাখ্যা নেই। লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, বরফের নিচের পানি তাপ হারাতে পারে না। ফলে তরল অবস্থায় থাকে। এতে মেরু অঞ্চল ও পৃথিবীর বরফাচ্ছন্ন অন্যান্য জলাশয়ে বসবাসরত জলজ প্রাণী বেঁচে থাকার জন্য যথেষ্ট তরল পানি পেয়ে থাকে। পানির এ ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য না থাকলে ওই সব অঞ্চলে বসবাসরত মাছ ও অন্যান্য প্রাণী তরল পানির অভাবে মারা যেত। পানির এ অনন্য বৈশিষ্ট্য মহান স্রষ্টার বিশেষ দান। (৭) আবার পানি ভূভাগে কোথাও স্থায়ীভাবে আবদ্ধ নয়। পৃথিবীতে পানি চক্রাকারে আবর্তনশীল। মেঘরূপে পানি আকাশে ভেসে বেড়ায়। মেঘ থেকে বিশুদ্ধ পানি বৃষ্টিরূপে ভূপৃষ্ঠে পতিত হয়। ফলে ভূপৃষ্ঠে বসবাসরত সব উদ্ভিদ ও প্রাণীর কাছে বৃষ্টির বিশুদ্ধ পানি পৌঁছে যায়। বৃষ্টিসিক্ত মাটিতে নানা রকম উদ্ভিদ জন্মে। উদ্ভিদের মূল, কাণ্ড, পাতা, ফুল, ফল, বীজ ইত্যাদি তৃণভোজী প্রাণীকুলের খাদ্য জোগায়। মাংসাশী প্রাণী তৃণভোজী প্রাণীর ওপর নির্ভরশীল। নদ-নদী ও সাগর-মহাসাগরের পানি বাষ্পীভূত হয়ে আকাশে আবার মেঘরূপে অবস্থান করে। এই পানিচক্রের ওপর নির্ভর করে পৃথিবীতে জীবকুল টিকে আছে।

এ প্রসঙ্গে সর্বশেষ ঐশী প্রত্যাদেশের বাণী- * ‘তিনিই স্বীয় অনুগ্রহের প্রাক্কালে বায়ুকে সুসংবাদবাহী রূপে প্রেরণ করেন। যখন এটি ঘন মেঘ বহন করে তখন আমি (আল্লাহ) তা নির্জীব ভূখণ্ডের দিকে চালনা করি, পরে তা থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করি, তৎপর এর দ্বারা সর্বপ্রকার ফল উৎপাদন করি। এভাবে আমি মৃতকে জীবিত করি যাতে তোমরা শিক্ষা লাভ করো।’ - পবিত্র কুরআন ৭:৫৭ এবং ৩৯:২১, ৫০:৯-১১ ও অন্যান্য। জীবকুলের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ পানিচক্র পৃথিবীতে আপনা-আপনি প্রতিষ্ঠা পায়নি, তা সর্বশক্তিমান স্রষ্টারই সবিশেষ অনুগ্রহ। (৮) শ্বসন (Respiration) প্রক্রিয়ার জন্য উদ্ভিদ ও প্রাণী দিনরাত বায়ুমণ্ডল থেকে অক্সিজেন গ্রহণ করে এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড ত্যাগ করে। ফলে স্বভাবতই বায়ুমণ্ডলের সমস্ত অক্সিজেন নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার কথা, কিন্তু তা হয়নি। কারণ, সবুজ উদ্ভিদ সালোকসংশ্লেষণ (Photosysthesis) প্রক্রিয়ার জন্য বায়ুমণ্ডল থেকে বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণ এবং উপজাত পদার্থ হিসেবে অক্সিজেন ত্যাগ করে। ফলে বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইডের ভারসাম্য অনাদি অতীতকাল থেকে বজায় রয়েছে।

বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইডের উপস্থিতি, প্রকৃতিতে এগুলোর চমৎকার ব্যবহার, বায়ু পরিশোধন ও অন্যান্য প্রাকৃতিক ব্যবস্থা, যা মানুষসহ অন্যান্য প্রাণী ও উদ্ভিদের জন্য অত্যাবশ্যক, তা ‘দুর্ঘটনাক্রমে আকস্মিকভাবে’ সৃষ্টি হয়নি। চিন্তাশীল ব্যক্তিমাত্রই স্বীকার করবেন, আসলে এসব কিছুই সর্বশক্তিমান স্রষ্টার সুপরিকল্পিত সৃষ্টি এবং সুনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা। এ প্রসঙ্গে মহান স্রষ্টা বলেন- * ‘তিনি (আল্লাহ) পৃথিবীকে স্থাপন করেছেন সৃষ্ট জীবের জন্য।’ - পবিত্র কুরআন ৫৫:১০। * ‘নিশ্চয়ই আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে, রাত্রি ও দিবসের পরিবর্তনে, যা মানুষের হিত সাধন করে তা-সহ সমুদ্রে বিচরণশীল নৌযানগুলো, আল্লাহ আকাশ থেকে যে বারিবর্ষণ দ্বারা ধরিত্রীকে তার মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত করেন তাতে এবং তার মধ্যে যাবতীয় জীবজন্তুর বিস্তারে, বায়ুর দিক পরিবর্তনে, আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যে নিয়ন্ত্রিত মেঘমালাতে জ্ঞানবান জাতির জন্য নিদর্শন রয়েছে।’ - পবিত্র কুরআন ২:১৬৪।

অতএব, পৃথিবীতে মানুষ এবং অন্যান্য প্রাণী ও উদ্ভিদের বসবাসের উপযোগী পরিবেশ সর্বশক্তিমান স্রষ্টার একান্ত ইচ্ছায় সৃষ্টি হয়েছে। তা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে এবং তা আমাদের বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের পূর্ণতার জন্যও আবশ্যক। বিজ্ঞানের সংশ্লিষ্ট পুস্তকে এটা লিপিবদ্ধ করা উচিত।


আরো সংবাদ