১৬ জানুয়ারি ২০১৯

সুদান পরিস্থিতি কোন পথে

-

আফ্রিকার দেশ সুদানে খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলছে। সুদানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ইতোমধ্যেই সহিংস রূপ ধারণ করেছে। বিক্ষোভ দমনে সরকার জরুরি অবস্থা ঘোষণা করলে বিক্ষোভকারীরা জরুরি অবস্থা অমান্য করেই বিক্ষোভ অব্যাহত রাখলে পুলিশের সাথে সংঘর্ষে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে বলে জানা গেছে। চলতি বছর রুটির ওপর ভর্তুকি কমানোর সিদ্ধান্ত নেয় সুদান সরকার। এ ঘোষণার পর রুটির মূল্য দ্বিগুণ হয়ে গেলে দেশটিতে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়।

নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি অর্থসঙ্কটের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৯ ডিসেম্বর থেকে রাজধানী খার্তুমসহ বিভিন্ন শহরের রাস্তায় বিক্ষোভ করছে সুদানের হাজার হাজার নাগরিক। এসব বিক্ষোভে পুলশের হামলা ও দমনাভিযানে বহু হতাহতের ঘটনা ঘটলেও সরকারের পক্ষ থেকে ১৯ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছে বলে স্বীকার করা হয়েছে। কিন্তু মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বিক্ষোভে এ পর্যন্ত ৩৭ জন নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ওমর আল বশিরের সরকার কি বর্বর নির্যাতন ও দমনাভিযানের মাধ্যমে গণ-আন্দোলনকে ব্যর্থ করে দিতে পারবে?

আমরা জানি, ওমর আল বশির ১৯৮৯ সালের জুন মাসে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন। তিনি ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তাহীনতা ও গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার পরিপ্রেক্ষিতে খাদ্য ঘাটতি ও অর্থনৈতিক মন্দা পরিস্থিতির অবসান ঘটানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তার সরকার তখন অর্থনৈতিক দুর্দশাকে অতিরঞ্জিত করে এবং গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে বলে বাগাড়ম্বর করেছিল। এরপর বশিরের সরকার কুয়েতে সাদ্দাম হোসেনের আকস্মিক হামলা এবং আঞ্চলিক ক্ষমতার সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন দানের অভিযোগের মুখে পড়ে। ফলে সুদান আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং দেশের অর্থনীতিতে এর বিরূপ প্রভাব পড়তে থাকে। তবে তিনি বেশ কিছু উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সরকারকে রক্ষা করতে সক্ষম হন। ১৯৯৯ সালে দক্ষিণ সুদানে তেল উৎপাদন শুরু হলে ক্রমান্বয়ে মানুষের অর্থনৈতিক দৈন্যদশা হ্রাস পেতে থাকে। একই বছর সরকারের মধ্যে বিভাজন দেখা দিলেও তাদের অবস্থা আরো মজবুত হয়।

ধর্মীয় নেতা হাসান তুরাবি ক্ষমতার দ্বন্দ্বে হেরে গেলে বর্তমানে ক্ষমতাসীন ইসলামপন্থীদের মধ্যে অধিকতর উদারপন্থীরাই ক্ষমতায় রয়েছে বলে একটি ধারণা সৃষ্টি হয়। যুক্তরাষ্ট্রের বিচক্ষণ গোয়েন্দা সহায়তা নিয়ে গৃহযুদ্ধকে সামাল দেয়া হয়। পরিশেষে আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত একটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ২০১৫ সালে সরকারের সাথে একত্রে একটি নতুন সংবিধান প্রণয়নের ঘোষণা দেয়া হয়, সেখানে সুদানের দক্ষিণাঞ্চলের সাবেক বিদ্রোহীদের সাথে কিছু ক্ষমতা ভাগাভাগি করা হয়। বিরোধী দলগুলোকে খোলামেলা ও স্বাধীনভাবে তাদের তৎপরতা চালানোর অনুমতি দেয়া হয় এবং পার্লামেন্টেও তাদের আসন দেয়া হয়।

যাই হোক না কেন, সরকার বিচ্ছিন্নতা থেকে বেরিয়ে এসে নতুনভাবে বৈধতা অর্জন করার মাধ্যমে তুলনামূলক অর্থনৈতিক অগ্রগতি সাধন করে এবং ২০০৩ সালে সংঘটিত সরকারের নতুন যুদ্ধে ভয়ঙ্কর বর্বরতা প্রদর্শন করে। এতে তারা নজিরবিহীন আন্তর্জাতিক তিরস্কারের মুখে পড়ে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ২০০৮ সালে আল বশিরকে যুদ্ধাপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে।

আরব বসন্তের সময় ২০১১ সালের জানুয়ারিতে দক্ষিণ সুদান বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার জন্য ভোটাভুটির আয়োজন করে। ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে খার্তুমে ব্যাপক প্রতিবাদ বিক্ষোভের সূচনা হয়। কিন্তু সরকারের ব্যাপক দমনাভিযানে ২০০ ব্যক্তি নিহতের পর বিক্ষোভ শান্ত হয়ে আসে। তবে তাতে সরকারবিরোধী ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম হয়। এরপর সরকার ২০১৪ সালে ‘জাতীয় সংলাপ’ প্রক্রিয়া চালু করে। সংলাপে বহু প্রতিশ্রুতি দেয়া হলেও শেষ পর্যন্ত বশির অর্থপূর্ণ কোনো ছাড় দিতে অস্বীকৃতি জানান। সংলাপে অংশগ্রহণকারীরা একটি নতুন সংবিধান এবং ক্ষমতায় সত্যিকারের অংশীদারিত্ব চায়। কিন্তু সরকার ২০১৫ সালে একটি কারচুপির নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য চাপ দেয়, যাতে আল বশির আরো এক মেয়াদ ক্ষমতায় থাকতে পারেন। অথচ বিরোধী দল ২০০৫ সালের সাংবিধানিক নিয়মে বিধি অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট ইতোমধ্যে দুই মেয়াদ অতিক্রম করার পর তৃতীয় মেয়াদে নির্বাচন করার যোগ্য নন বলে যুক্তি প্রদর্শন করা সত্ত্বেও সরকার তাদের দাবিতে অনড় থাকে।

সংবিধান সংশোধন করে প্রেসিডেন্টকে তৃতীয় মেয়াদে নির্বাচনের সুযোগ করে দেয়ার উদ্যোগ নেয়ার পর জনগণ অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে খাদ্যদ্রব্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধির পর জনগণ ফুঁসে ওঠে। এই জাগরণ দেশটির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে। সরকার ২০১৩ সালের মতো আবার দমন অভিযান চালিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে চায়। কিন্তু হুমকি-ধমকি দিয়ে জনমতকে দাবিয়ে রাখা যায় না। এতে বরং হিতে বিপরীত হয়। আল বশিরকে অন্য যেকোনো শাসকের চেয়ে দেশকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ায় সুযোগ দেয়া হলেও তিনি বারবার নিজের স্বার্থকেই প্রাধান্য দিয়েছেন।

লিবীয় নেতা মোম্মার গাদ্দাফির ভাগ্যবরণ করা থেকে নিজেকে বাঁচাতে হলে আল বশিরকে ক্ষমতাচ্যুত তিউনেসীয় প্রেসিডেন্ট জয়নুল আবেদিন বেন আলীর পথে হাঁটতে হবে।
ছাত্রবিক্ষোভের প্রতি ট্রেড ইউনিয়ন এবং পেশাদার সংগঠনগুলো সমর্থন দেয়ার কারণে প্রতিবাদ বিক্ষোভ অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে। এখন যে বিক্ষোভ চলছে তা এলিটদের বিক্ষোভ নয়- এটা সাধারণ মানুষের একটি জনপ্রিয় বিক্ষোভ।

রাজনৈতিক ও সিভিল সোসাইটির নেতারা এবং পেশাদার সংগঠনগুলো সরকার পরিবর্তনের সুনির্দিষ্ট দাবি জানাচ্ছে। গণবিক্ষোভের মুখে সুদানের পরিস্থিতি কোন দিকে যায় তা এখনো অনিশ্চিত। তবে এটা ঠিক, জনগণের বিপরীতে দাঁড়িয়ে এখন পর্যন্ত কোনো স্বৈরাচার টিকে থাকতে পারেনি। জনগণকে প্রতিপক্ষ করলে আল বশিরের ভবিষ্যৎও খুব একটা সুখের হবে না।


আরো সংবাদ