১৬ জানুয়ারি ২০১৯

রূপকথা নয়

-

এটা এমন এক বাস্তবতা, যা শুনতে রূপকথার মতো মনে হবে। তবে এ রূপকথাই আজকের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা। বিশ্বের মাত্র আটজন ধনকুবের পুরো বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি সম্পদের মালিক। কিছু দিন আগে এ বাস্তবতা অক্সফোর্ড কমিটি (অক্সফাম) ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বার্ষিক সভায় পেশ করলে কয়েকজন বিশ্বনেতা ‘থ’ হয়ে যান। এই প্রতিবেদনে বলা হয়, ধনী আরো ধনী এবং দরিদ্র আরো দরিদ্র হচ্ছে। বর্ধমান এ বৈষম্য যদি রোধ করা না যায়, তাহলে অসম অর্থনীতি বিশ্বে সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যা আরো বৃদ্ধি করবে। বিশ্বে দারিদ্র্য ও বেকারত্ব বাড়ছে, অপর দিকে বিলিয়নপতি লোকের সংখ্যাও দ্রুতগতিতে বাড়ছে। এর অর্থ এই নয় যে, ১০০ কোটি টাকা বা ১০০ কোটি রিয়াল যার কাছে আছে তাকে ‘বিলিয়নপতি’ বলা হবে। বিশ্ব মানদণ্ড অনুযায়ী, যার কাছে ১০০ কোটি ডলার রয়েছে, তাকেই বিলিয়নপতি বলা ন্যায়সঙ্গত হবে। কেননা, বিশ্ব অর্থনীতি ডলারের সাথে সম্পৃক্ত।

২০০৮ সালে বিশ্বে ১১২৫ জন বিলিয়নপতি ছিলেন। অথচ ২০১৮ সালে এমন ধনীর সংখ্যা দুই হাজার ৭৫৪ হয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি বিলিয়নপতি আমেরিকায়, যাদের সংখ্যা প্রায় ৬৮০। দ্বিতীয় স্থানে চীন। সেখানে বিলিয়নপতি ৩৩৮ জন। তৃতীয় স্থানে রয়েছে ভারত। সেখানে বিলিয়নপতির সংখ্যা ১০১ বিলিয়নপতি মানুষের তালিকায় কোনো পাকিস্তানির নাম খুঁজছিলাম, কিন্তু দেখলাম ওই তালিকায় কোনো পাকিস্তানির নাম নেই। তুরস্কে ২৯ জন, সৌদি আরবে ১০ জন, আরব আমিরাতে সাতজন, কুয়েতে চারজন, লেবাননে চারজন আর ওমানে দু’জন বিলিয়নপতি রয়েছেন। এমনকি নেপাল এবং বাংলাদেশেও একজন করে বিলিয়নপতি রয়েছেন, অথচ পাকিস্তানে একজনও নেই। সম্ভবত এখানকার ধনীরা নিজেদের সম্পদ দূরে কোথাও লুকিয়ে রেখেছেন। কারণ, তারা নিজেদের সম্পদ অবৈধ পন্থায় উপার্জন করেছেন।

‘অক্সফোর্ড কমিটি বলছে, বিশ্বের বেশির ভাগ বিলিয়নপতি ট্যাক্স-চোর হয়ে থাকেন। ট্যাক্স যেখানে বেশি চুরি করা হয় বা ফাঁকি দেয়া হয়, সেখানে দুর্নীতি হয় বেশি। যেখানে দুর্নীতি বেশি হয়, সেখানে দুর্নীতিবাজ লোকেরাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার। দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ওপরে রয়েছে- উত্তর কোরিয়া, সোমালিয়া, দক্ষিণ সুদান, সিরিয়া, ইয়েমেন, সুদান, লিবিয়া, আফগানিস্তান, ভেনিজুয়েলা, ইরাক, অ্যাঙ্গোলা ও কঙ্গো। বাংলাদেশ ১৪৫তম, পাকিস্তান ১১৬তম ও ভারত ৭৯তম স্থানে রয়েছে। যেখানে বিলিয়নপতি লোকের সংখ্যা বেশি, সেখানে দুর্নীতিও কম। আর ওইসব দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যাও কম হতে থাকে। এর বড় উদাহরণ ভারত। কয়েক বছর আগ পর্যন্ত বিশ্বে সবচেয়ে বেশি দরিদ্র মানুষ ছিল ভারতে। কিন্তু আজ সবচেয়ে বেশি দরিদ্র মানুষের স্থান নাইজেরিয়াতে।

যে দেশে রাষ্ট্র ব্যবসায়ী সম্প্রদায়কে বিধি মোতাবেক সম্পদ ও অর্থ উপার্জনে সহযোগিতা করে, সেখানে প্রচুর কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি হয় এবং দারিদ্র্য কমে যায়। যেখানে রাষ্ট্র আইনের নামে নিজেই আইনহীনতা ছড়ায়, সেখানে ব্যবসায় উন্নতি লাভ করে না এবং ধীরে ধীরে ব্যবসায়ীরা তাদের পুঁজি অন্যত্র সরিয়ে নেন। জাতির উত্থান-পতনের কারণ জানতে আপনারা অ্যাডওয়ার্ড গ্যাম্বসকে পড়ে নিন, অথবা আর্নল্ড টয়েনবির গবেষণার ওপর চিন্তা করুন। এসব পশ্চিমা চিন্তাবিদ ইবনে খালদুনের সাথে একমত যে, স্বল্পসংখ্যক শক্তিধর ব্যক্তি যখন কোনো দেশের সম্পদ দখল করে নেয়, তখন অন্য শ্রেণীগুলোতে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। আর সরকার এ স্বল্পসংখ্যক ব্যক্তির সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলে। এভাবে এমন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়, যা কোনো জাতির পরাজয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একটু খেয়াল করুন। পাকিস্তানে বিশৃঙ্খলার কারণ কী, আর আজ আমরা কোন কারণে একে অপরের ওপর চড়াও হচ্ছি? পাকিস্তানে কি বিধিবিধান সবার জন্য এক? এ দেশে কি শাসকশ্রেণী জবাবদিহিতার নামে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে প্রতিশোধের টার্গেট বানাচ্ছে না? পাকিস্তানের যে প্রদেশে সবচেয়ে বেশি খনিজসম্পদ রয়েছে, সে প্রদেশ সবচেয়ে বেশি অনগ্রসর কেন?

এ রকম আরো নানা প্রশ্নের জবাব পাওয়া না গেলে বিশৃঙ্খলা ছড়ায়। এ বিশৃঙ্খলা শক্তিধর শাসকগোষ্ঠীর অবিচারের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তারা নিজেদের অবিচারের ওপর আবরণ ফেলার জন্য ইনসাফের দাবিদারদের বিদ্রোহী ও গাদ্দার বলে আখ্যায়িত করে। এভাবেই বিশৃঙ্খলা শুরু হয়ে যায়, যা শাসকগোষ্ঠীর শক্তি প্রতিহত করতে ব্যর্থ। একটু কষ্ট করুন এবং পার্লামেন্টে দৃষ্টি বুলিয়ে নিন। পার্লামেন্ট ভবনে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্যে ধনীরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। এ ধনীরা এক দল থেকে আরেক দলে ডিগবাজি খেতে খেতে সরকারে যুক্ত হতে থাকেন। তাদের বিশ্বস্ততা ক্ষমতার প্রতি, জনগণের প্রতি নয়। রাষ্ট্র বিশ্বস্ততা বদলকারীদের চোখের মণি বানিয়ে রাখে, আর এভাবে জনগণ রাষ্ট্রের দফতরগুলোর প্রতি আস্থা হারাতে থাকে। এ পার্লামেন্টে সরকার ও বিরোধী দলের লড়াই চলে দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে। নির্মম পরিহাস হলো, উভয়ের বিরুদ্ধেই রয়েছে দুর্নীতির অভিযোগ।
পাকিস্তানের জাতীয় পত্রিকা দৈনিক জং ২০ ডিসেম্বর ২০১৮ সংখ্যা থেকে ভাষান্তর  ইমতিয়াজ বিন মাহতাব
হামিদ মীর : পাকিস্তানের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট,
প্রেসিডেন্ট জি নিউজ নেটওয়ার্ক (জিএনএন)
পাকিস্তানের জিও টিভির নির্বাহী সম্পাদক


আরো সংবাদ