১৬ জানুয়ারি ২০১৯

উত্তেজনা কমছে না গার্মেন্ট সেক্টরে

আশুলিয়ায় বিক্ষুব্ধ গার্মেন্টশ্রমিকদের তোপের মুখে পুলিশ  - নয়া দিগন্ত

মজুরি কাঠামো সংশোধনের আশ্বাস দেয়া হলেও উত্তেজনা কমছে না গার্মেন্ট সেক্টরে। আগের দাবিগুলোর সাথে যুক্ত হয়েছে শ্রমিক সুমন হত্যার বিচারের দাবি। গতকাল বুধবার এই দাবিতে বিক্ষোভ করতে নেমে সাভারে বেশ কয়েকটি গার্মেন্ট ভাঙচুর করেছেন শ্রমিকেরা। এ নিয়ে পুলিশের সাথে শ্রমিকদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, টিয়ার শেল নিক্ষেপ ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে।

শ্রমিকদের কেউ কেউ বলেছেন, গত মঙ্গলবার সাভারে এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি, যাতে শ্রমিকদের ওপর গুলি চালানোর প্রয়োজন ছিল। পুলিশ সম্পূর্ণ বিনা উসকানিতে গুলি চালায়, যাতে সুমন নিহত হয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে উত্তরা, সাভার ও আশুলিয়া এলাকায় আট প্লাটুন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে। এ দিকে নতুন করে গতকাল টঙ্গিতে বিক্ষোভ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ হয়েছে।

পঞ্চম দিনে সকাল ৮টার দিকে মিরপুরের কালশী, উত্তরার আব্দুল্লাহপুর, আজমপুর ও দক্ষিণখান এলাকার সড়কে অবস্থান নেন শ্রমিকেরা। পরে পুলিশ ও কারখানার মালিকেরা মজুরি কাঠামোর অসঙ্গতি সংশোধনের আশ্বাস দিলে উত্তরা, দক্ষিণখান ও আশপাশের এলাকায় সড়ক অবরোধ না করে শ্রমিকেরা নিজ নিজ কারখানায় কাজে ফিরে যান। তবে কালশী এলাকায় ২২ তলা গার্মেন্ট খ্যাত স্টান্ডার্ড গার্মেন্টের সামনে থেমে থেমে বিক্ষোভ এবং সেখানকার সড়ক অবরোধ করে রাখেন শ্রমিকেরা। পরে বেলা ১টার দিকে তারা কাজে যোগ দেন বলে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ জানায়।

গত বছরের ২৯ নভেম্বর ঘোষিত ন্যূনতম মজুরি কাঠামোর অসঙ্গতি সংশোধন ও বেতনভাতা বাড়ানোসহ বিভিন্ন দাবিতে শ্রমিকেরা গত শনিবার থেকে আন্দোলন করে আসছেন। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, গাজীপুরে এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। মঙ্গলবার সাভারে এক শ্রমিক নিহত হয়। এ ছাড়া শ্রমিকেরা বাস, মোটরসাইকেলসহ যানবাহনে আগুন ও বিভিন্ন স্থানে যানবাহনে ভাঙচুর করেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গতকাল সকাল থেকে রাজধানীর মিরপুর, পল্লবী, রামপুরা, বাড্ডা, উত্তরা, আব্দুল্লাপুর, উত্তরখান, দক্ষিণখান, আশুলিয়া, সাভারসহ বিভিন্ন এলাকার তৈরী পোশাক কারখানাগুলোর সামনে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন ছিল। শিল্প পুলিশের পাশপাশি আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) ও থানা পুলিশ মোতায়েন থাকতে দেখা গেছে। সকালের দিকে শ্রমিকদের মধ্যে কিছু অস্থিরতা থাকলেও প্রায় সব ক’টি পোশাক কারখানাতেই শান্তিপূর্ণভাবে কাজ হয়েছে।

রাজধানীতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটলেও ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে আশুলিয়া ও সাভারে। সকাল ৭টায় আব্দুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়কের পাশের পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা কাজে যোগদান না করে আন্দোলনে নেমে পড়েন। দুপুর ১২টা পর্যন্ত ওই সড়কে রিকশা থেকে শুরু করে কোনো পরিবহন চলতে দেননি শ্রমিকেরা।

সকাল ৯টায় নিশ্চিন্তপুর ও নরসিংহপুর এলাকার হা-মীম গ্রুপ, শারমিন গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, অনন্ত গ্রুপ, সোনিয়া গার্মেন্ট, নিট এশিয়া, ট্রাউজার লাইনস, জনরণ লিমিটেড, ম্যাগপাইসহ প্রায় ২০টি পোশাক কারখানার শ্রমিক সড়কে নেমে পড়েন। এ সময় ওই সড়কে পরিবহন চলাচলে তারা বাধা দেন। ঘটনায় ৮-১০টি পরিবহন ভাঙচুর করেন তারা। তাদের ঠেকাতে পুলিশ-শ্রমিক ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় পুলিশ টিয়ার শেল ও ব্যাপক লাঠিচার্জ করে সড়ক থেকে শ্রমিকদের সরিয়ে দেয়। প্রায় ঘণ্টাব্যাপী ওই এলাকায় এ ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলে।

সকাল সাড়ে ১০টায় বেরন সরকার মার্কেট, ছয়তলা, জামগড়া, শিমুলতলা ও ইউনিক এলাকার ৩০টিরও বেশি পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা উৎপাদন বন্ধ রেখে রাস্তায় নেমে পড়েন। এ সময় শ্রমিকেরা পুলিশের সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। এতে ওই সড়কে চলাচলরত দূরপাল্লার যাত্রী পরিবহন শাহ ফতেহ আলী ঢাকা মেট্রো ব-১৪-৪২৫৩, সিমেন্ট ভর্তি কাভার্ডভ্যান ঢাকা মেট্রো উ-১১-৪৮৯০, পাজেরো জিপ ঢাকা মেট্রো ঘ-১৩-২২১৮, বরিশাল জ-১১-০০৫৫ মিনিবাসসহ ২৫-৩০টি গাড়ি ভাঙচুর হয়।

বিক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা একপর্যায়ে ইউনিক ও শিমুলতলা পলমল গ্রুপ এলাকা থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে জামগড়া চৌরাস্তায় এলে পুলিশের একটি দল তাদের বাধা দেয়। বাধা পেয়ে নারী ও পুরুষ শ্রমিকেরা রাস্তায় শুয়ে পড়েন। এ সময় জলকামান গাড়ি ও পুলিশের গাড়ি এসে তাদের সরে যেতে বললে তারা তাদের ওপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যেতে বলেন। তারা বলেন, দাবি আদায় করেই তারা কর্মস্থলে ফিরে যাবেন। কিছুক্ষণ পর পুলিশ লাঠিচার্জ শুরু করলে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।

শিমুলতলা এলাকায় শ্রমিকেরা রাস্তায় বড় বড় পাথর ও ময়লার বস্তা ফেলে গাড়ি চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। সকাল থেকে ওই এলাকার সেড ফ্যাশন, উইন্ডি গ্রুপ, স্টার্লিং অ্যাপারেলস, স্টার্লিং স্টাইল, স্টার্লিং ক্রিয়েশন, সেতারা গ্রুপ, মেডলার অ্যাপারেলস, বান্দো ডিজাইন, এএম ডিজাইন, এনভয় গ্রুপ, ডিজাইনার জিন্স, দি রোজ ড্রেসেস, ডেকো গ্রুপ, হিয়ন অ্যাপারেলস, দি ড্রেস আইডিয়াস, পলমল গ্রুপসহ প্রায় ৩০টি কারখানার ২০ হাজার শ্রমিক পুলিশের সাথে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে সংঘর্ষ জড়িয়ে পড়েন।

সকাল ১০টায় স্টার্লিং অ্যাপারেলসের শ্রমিকেরা কারখানার অভ্যন্তরে কর্মকর্তাদের সাথে বাদানুবাদের একপর্যায়ে উৎপাদন কর্মকর্তাসহ কয়েকজনকে লাঞ্ছিত করেন। এ সময় কর্মকর্তাদের রক্ষায় শাহীন নামে ওই কারখানার আয়রনম্যান এগিয়ে এলে তাকে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা মারধর করেন। এতে তিনি আহত হন। তাকে স্থানীয় নারী ও শিশু স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভর্তি করা হয়েছে। এ ছাড়াও বিভিন্ন ক্লিনিকে আহত শ্রমিকদের চিকিৎসা দেয়া হয়েছে বলেও জানা গেছে।

নারী ও শিশু স্বাস্থ্য কেন্দ্রের পরিচালক রফিকুল ইসলাম জানান, তাদের চিকিৎসাকেন্দ্রে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ১৫ শ্রমিক আহতাবস্থায় এসেছেন। এদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়েছে এবং গুরুতর আহতদের ভর্তি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন আমাদের আশুলিয়া প্রতিনিধি।

জানতে চাইলে আশুলিয়া থানা ইন্সপেক্টর জাভেদ মাসুদ জানান, শ্রমিকেরা তাদের দাবি নিয়ে রাস্তায় পরিবহন চলাচলে বাধা, ভাঙচুর ও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। শান্তিপূর্ণভাবে শ্রমিকদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। ঘটনায় কাউকে আটক বা গ্রেফতার করা হয়নি। শ্রমিকদের আন্দোলন দমাতে সকাল সাড়ে ১০টায় পুলিশ ও বিজিবিকে পাশাপাশি কাজ করতে দেখা গেছে।

বিজিবি সূত্র জানায়, স্থানীয় প্রশাসনের চাহিদা অনুযায়ী সাভার, আশুলিয়া ও উত্তরায় আট প্লাটুন (প্রতি প্লাটুনে ৩০ জন) বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। তারা এলাকায় টহল দিচ্ছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত বিজিবি মোতায়েন থাকবে।

এ দিকে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা আকতার হোসেন সাংবাদিকদের জানান, পোশাক শ্রমিকদের বেতন কাঠামোর অসঙ্গতি দূর করার বিষয়ে মঙ্গলবার রাতেই শ্রমভবনে জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকের পর বলা হয় পোশাক কারখানার মজুরি মূল বেতন কিংবা সর্বমোট বেতন কোনো গ্রেডেই কমবে না।

ওই বৈঠকের পর শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, তৈরী পোশাক শিল্প শ্রমিকদের জন্য ঘোষিত নতুন মজুরি কাঠামোর মূল বেতন হোক কিংবা সর্বমোট বেতন হোক কোনো গ্রেডেই বেতন আগের তুলনায় কমবে না। কয়েকটি গ্রেডে বেতনে কিছুটা অসামঞ্জস্য পাওয়া গেছে। কমিটি গঠন করে চলতি মাসের মধ্যে মজুরি সমন্বয় করা হবে। বিজ্ঞপ্তিতে শ্রমিকদের কাজে যোগ দেয়ার আহ্বান জানানো হয়।

ওই বৈঠকে সংসদ সদস্য ও বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শিদী, শ্রম মন্ত্রণালয়ের সচিব আফরোজা খান, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো: মফিজুল ইসলাম, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মো: আছাদুজ্জামান মিয়া, বিজিএমইএর সভাপতি মো: সিদ্দিকুর রহমান, এফবিসিসিআইয়ের প্রেসিডেন্ট শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন, শিল্প পুলিশের মহাপরিচালক ও অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক আব্দুস সালাম, বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি মো: আতিকুল ইসলাম, জাতীয় গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি আমিরুল ইসলাম আমিন, বাংলাদেশ টেক্সটাইল গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি মো: মাহবুবুর রহমান ইসমাইল এবং মালিক-শ্রমিক প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

টঙ্গী সংবাদদাতা জানান, শিল্পশহর টঙ্গীতে পোশাক শ্রমিকেরা ব্যাপক বিক্ষোভ করেছে। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা টঙ্গী বিসিক শিল্প এলাকার বেশির ভাগ পোশাক কারখানা ভাঙচুর করেছে এবং দু’টি কারখানায় অগ্নিসংযোগ করেছে। হামলা-ভাঙচুরের ঘটনায় শতাধিক আহত হয়েছেন। ঘটনার সময় হাজার হাজার শ্রমিকের মধ্যে গুটি কয়েক পুলিশ সদস্যকে অসহায়ের মতো রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে।

সকাল ৮টায় কর্মঘণ্টা শুরুর আগেই রাস্তায় নেমে আসে কয়েক হাজার শ্রমিক। তারা অন্য সব পোশাক কারখানার শ্রমিকদের কারখানা থেকে বের করে আনে। কিছু কিছু শ্রমিক হাতে লোহার রড, লাঠি, হকিস্টিক এমনকি চাইনিজ কুড়াল নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন ও ভাঙচুর করে।

এদিকে টঙ্গী বিসিক শিল্প এলাকার নর্দান গার্মেন্ট কারখানার শ্রমিকেরা আন্দোলনে যোগ না দিয়ে বরং আন্দোলনরত শ্রমিকদের ধাওয়া দিয়ে বিসিক পানির ট্যাংকি পর্যন্ত নিয়ে যায়। এ সময় দুইপক্ষের শ্রমিকদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে টিকতে না পেরে একপর্যায়ে নর্দানের শ্রমিকেরা তাদের কারখানায় গিয়ে আশ্রয় নেয়। এ সময় বহিরাগত শ্রমিকেরা নর্দানে হামলা চালাতে গেলে সেখানকার শ্রমিকেরা কারখানার ছাদ থেকে ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও বাইরে গরম পানি ছুড়তে থাকে। সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত এভাবে দফায় দফায় সংঘর্ষের একপর্যায়ে নর্দানের শ্রমিকদের গরম পানি ও ইটপাটকেলের রসদ নিঃশেষ হয়ে গেলে তারা বিকল্প পথে কারখানা থেকে পালিয়ে যায়। এ সময় উত্তেজিত বহিরাগত শ্রমিকেরা নর্দানে ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। সেখানে দমকল বাহিনীর গাড়ি যেতেও বাধা দেয় উত্তেজিত শ্রমিকেরা।

এর আগে পাশেই প্যাটিয়ট ইকো অ্যাপারেলস নামের একটি নতুন কারখানায় ব্যাপক ভাঙচুর চালায় বহিরাগত শ্রমিকেরা। কারখানার প্রধান ফটক ভেঙে ভেতরে ঢুকে ভাঙচুরের পর সেখানে একটি মোটরসাইকেলে অগ্নিসংযোগ করা হয়। দমকল বাহিনীর কর্মীরা যেতে না পারায় অবশেষে কারখানার নিজস্ব অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। এদিকে নর্দান কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, বহিরাগত শ্রমিক হামলায় তাদের শতাধিক শ্রমিক-কর্মচারী আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে একজনকে ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়েছে। বিসিক সালামের আটারকল এলাকায় আলাউদ্দিন অ্যান্ড সন্স এবং সুমি অ্যাপারেলসসহ প্রায় প্রতিটি পোশাক কারখানায় ভাঙচুর চালিয়েছে শ্রমিকেরা। এ ঘটনায় বুধবার টঙ্গী বিসিকের সব পোশাক কারখানা বন্ধ রাখা হয়।

গাজীপুর সংবাদদাতা জানান, বেতনভাতা বৃদ্ধির দাবিতে গতকাল গাজীপুরের বিভিন্ন স্থানে বেশ কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা কর্মবিরতি, বিক্ষোভ ও ভাঙচুর করেছে। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা কারখানায় ও গাড়িতে অগ্নিসংযোগ এবং মহাসড়ক অবরোধ করে। এ সময় একাধিক পয়েন্টে আন্দোলনরত শ্রমিকদের সাথে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়েছে। এতে সাংবাদিক ও পুলিশসহ ২৮ জন আহত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ শটগানের গুলি ও টিয়ার শেল ছুড়েছে। শ্রমিক অসন্তোষের মুখে এদিনও বেশ কয়েকটি কারখানা ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। জেলার শিল্পাঞ্চলে পুলিশ ও র্যাবের পাশাপাশি চার প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।

পুলিশ ও শ্রমিকেরা জানায়, সরকার ঘোষিত মজুরি কাঠামোয় বৈষম্য দূর করে ন্যূনতম বেতনভাতা বৃদ্ধি ও বাস্তবায়নের দাবিতে গতকালও গাজীপুরের বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকেরা কর্মবিরতি ও বিক্ষোভ করেছে। এদিন ওই দাবিতে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের গাজীপুরা এলাকার হোপলোন অ্যাপারেলস, নাওজোড়ের দিগন্ত সোয়েটার, ভোগড়া, ইসলামপুর, সাইনবোর্ড ও বোর্ডবাজার এলাকার বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা সকালে কর্মবিরতি ও বিক্ষোভ করে। একপর্যায়ে সকাল ৯টার দিকে শ্রমিকেরা মিছিল নিয়ে কারখানা থেকে বেরিয়ে আসে।

বিক্ষোভকারীরা ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান নিয়ে পরিত্যক্ত বস্তা ও টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ ও গাড়ি ভাঙচুর করে। এতে মহাসড়কগুলোতে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় মহাসড়কের ওপর থেকে অবরোধকারীদের সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করলে শ্রমিকদের সাথে শিল্পপুলিশ, থানা পুলিশ ও হাইওয়ে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়।

সাভার (ঢাকা) সংবাদদাতা জানান, গতকাল বিক্ষোভ করেছেন গার্মেন্ট কারখানার শ্রমিকেরা। এ সময় শ্রমিকেরা ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে যানচলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিভিন্ন পোশাক কারখানার সামনে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে। সকালে সাভারের উলাইল এলাকায় সড়কে বিক্ষোভ করে শ্রমিকেরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা শ্রমিকদের রাস্তা থেকে সরিয়ে দিতে চাইলে শ্রমিকেরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে। এ সময় পুলিশ লাঠিচার্জ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। সকাল ৮টা থেকে শুরু করে দুপুর পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে থেমে থেমে পুলিশের সাথে শ্রমিকদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় প্রায় ১০টি কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণাসহ বেশ কয়েকটি কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

সকাল ৮টায় সাভারের উলাইল এলাকার স্ট্যান্ডার্ড স্টিচেচ লিমিটেড কারখানার শ্রমিকেরা কাজে আসেন। এ সময় প্রতিষ্ঠানটির মূল ফটকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা সম্পর্কিত কর্তৃপক্ষের একটি নোটিশ ঝুলানো দেখতে পায়।

এ ঘটনায় বিক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা কারখানাটিতে ভাঙচুরের চেষ্টা করলে কর্তৃপক্ষের লোকজন এবং পুলিশের সাথে ধাওয়া- পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়। পরে শ্রমিকেরা ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে অবস্থান নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ লাঠিচার্জ করে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এ সময় শ্রমিক বিক্ষোভের আশঙ্কায় স্থানীয় আল-ইসলামসহ বেশ কয়েকটি কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়।
এদিকে একই দাবিতে সকাল থেকেই গেন্ডা এলাকার আল-মুসলিম গ্রুপের প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক কারখানার ভেতরে কর্মবিরতি পালন করেন। কিন্তু মালিকপক্ষ দাবির বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত না দেয়ায় সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সব শ্রমিক একযোগে কারখানা থেকে বের হয়ে যায়। এ সময় বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা ঢাকা-আরিচা মহসড়কে অবস্থান নিয়ে যানচলাচল বন্ধ হয়ে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যে সড়কটিতে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এ সময় দুই প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। পরে পুলিশ সদস্যরা শ্রমিকদের রাস্তা থেকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করলে শ্রমিকেরা ইট-পাটকেল নিক্ষেপ শুরু করে। এ সময় পুলিশ শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিচার্জ করে। শ্রমিকেরা পিছু হটলেও পরবর্তীতে গেন্ডা বাসস্ট্যান্ড গিয়ে আবারো সড়কে অবস্থান করে। খবর পেয়ে সেখানে গিয়ে পুলিশ শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে দিলে তারা সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ড গিয়ে সড়কে পুনরায় অবস্থান করে। এভাবে সকাল ৯টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত দফায় দফায় সড়ক অবরোধ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশসহ অন্তত ১০ শ্রমিক আহত হন। আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়েছে।

সিদ্ধিরগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, সিদ্ধিরগঞ্জের ওয়েস্ট নিট ওয়্যার লিমিটেড ও পিএম নিট টেক্সটাইল নামে দু’টি পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা মজুরি বৃদ্ধি এবং শ্রমিককে গার্মেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মারধরের ঘটনায় বিক্ষোভ প্রদর্শন ও সড়ক অবরোধ করে। বেলা ১১টা থেকে ১২টা পর্যন্ত আদমজীর সুমিলপাড়ার ওয়েস্ট নিট ওয়্যার লিমিটেড এবং দুপুর ১২টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত গোদনাইলের পিএম নিট টেক্সটাইল কারখানার শ্রমিকেরা বিক্ষোভ করে। খবর পেয়ে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা পুলিশ ও শিল্পাঞ্চল পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে শ্রমিকদের বুঝিয়ে রাস্তা থেকে সরিয়ে নিলে যানবাহন চলাচল শুরু হয়। পরে মালিক পক্ষের সাথে আলোচনার মাধ্যমে শ্রমিকদের সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দেয়া হলে পরিস্থিতি শান্ত হয়।

পুলিশ ও শ্রমিকেরা জানান, গতকাল বেলা ১১টায় সিদ্ধিরগঞ্জের সুমিলপাড়া এলাকার ওয়েস্ট নিট ওয়্যার কারখানার শ্রমিকরা মজুরি বৃদ্ধি ও বেতন বৈষম্য নিরসনের দাবিতে কাজ বন্ধ করে দিয়ে কারখানার ভেতরে বিক্ষোভ করতে থাকে। একপর্যায়ে ওয়েস্ট নিট অ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদ আহমেদ ভূঁইয়া এক শ্রমিককে মারধর করে। এতে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা নারায়ণগঞ্জ-শিমরাইল সড়কে এসে অবরোধ করে। শ্রমিকরা অভিযোগ করেন, তাদের প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদ আহমেদ ভূঁইয়া বেশির ভাগ সময় তাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করে থাকে।


আরো সংবাদ