১৬ জানুয়ারি ২০১৯

আন্দোলনের আগে দল গোছানো : যেভাবে এগুতে চাচ্ছে বিএনপি

আন্দোলনের আগে দল গোছানো : যেভাবে এগুতে চাচ্ছে বিএনপি - সংগৃহীত

সদ্য অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সব মহলে একটাই আলোচনাÑ বিএনপি এখন কী করবে? কেননা হাতেগোনা কয়েকটি আসনে বিজয়ের পর সংসদে না যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে দলটি। সে জন্য বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের যে কয়েকজন এমপি নির্বাচিত হয়েছেন তারা শপথও নেননি। রাজপথেও দৃশ্যত কোনো কর্মসূচি নেই। এমতাবস্থায় সাধারণ মানুষের মধ্যে কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে যে কী করতে চলেছে বিএনপি? তবে নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতিতে বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের মতেÑ আগামী দিনে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে রাজপথে নামতে হলে সবার আগে দলকে সুসংগঠিত ও শক্তিশালী করার কোনো বিকল্প নেই। এ জন্য বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির পাশাপাশি বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন যেমন- ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, শ্রমিক দলসহ অন্যান্য অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর কমিটি পুনর্গঠন জরুরি। এ ক্ষেত্রে প্রথাগত কমিটি গঠন থেকে বেরিয়ে এসে কাউন্সিলে সরাসরি ভোটের মাধ্যমে এসব সংগঠনের নতুন নেতৃত্ব নির্ধারণের দাবি জানান তারা।

তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মতে- বেগম খালেদা জিয়া যাদেরকে বিশ্বাস করে দায়িত্ব দিয়েছেন তাদের বেশির ভাগই রাজপথের আন্দোলন কর্মসূচিতে ‘নিষ্ক্রিয়’। ফলে সংগঠনের তৃণমূলে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বিগত দিনে যেসব কর্মসূচি পালিত হয়েছে তাতে ঘুরে ফিরে চেনামুখগুলোই দেখা গেছে। বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির অন্য নেতাদেরকে চোখে পড়েনি। 

জানা গেছে, গত ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি অনেকটাই স্তিমিত। তৃণমূলের হতাশাকে দূর করতে দলের হাইকমান্ড শিগগিরই নানামুখী উদ্যোগ নেবে। দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটি আগামী দিনের করণীয় নিয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনা শুরু করেছে। বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের কমিটিগুলো দ্রুততম সময়ে কাউন্সিলের মাধ্যমে পুনর্গঠন করতে বদ্ধপরিকর। সেইসাথে দলের প্রাণশক্তি তৃণমূল নেতাকর্মীদের মনোবল চাঙ্গা করতে কেন্দ্রীয় নেতাদের জেলা সফরের পরিকল্পনা রয়েছে। দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলকে সুসংগঠিত করে এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন। ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্যরা একাধিক বৈঠক করেছেন। 

বিএনপির কেন্দ্রীয় ও তৃণমূলের নেতাদের সাথে আলাপকালে জানা যায়, সাংগঠনিকভাবে বিএনপির যথেষ্ট দুর্বলতা রয়েছে। বিএনপির ১১টি অঙ্গসংগঠনের হ-য-ব-র-ল দশা। অধিকাংশ সংগঠনের কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ। মানা হচ্ছে না চেইন অব কমান্ড। দলের মধ্যে মতবিরোধ ও অসন্তোষ বাড়ছে। এহেন পরিস্থিতিতে বিএনপির হাইকমান্ড নতুন কমিটি গঠনের চিন্তা করছে। যেমন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে ২০১৬ সালের অক্টোবরে। ৩ বছর আগে মেয়াদ শেষ হওয়া ছাত্রদলের কমিটি নির্বাচনের আগে হওয়া জরুরি ছিল। যুবদলও কেন্দ্রীয় কমিটি পূর্ণাঙ্গ করতে পারেনি। স্বেচ্ছাসেবক দলের একই অবস্থা। কৃষক দল চলছে ২০ বছরের কমিটি দিয়ে। শ্রমিক দলও জরাজীর্ণ। কেন্দ্রীয় ও পূর্ণাঙ্গ কমিটি না থাকায় সংগঠনগুলো মুখ থুবড়ে পড়েছে।

দলের নির্বাহী কমিটির কী অবস্থা : জানা যায়, ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। এর কয়েক মাস পর জাতীয় নির্বাহী কমিটি ঘোষণা দেয় বিএনপি। নির্বাহী কমিটিতে ১৯ সদস্যের স্থায়ী কমিটির ৩টি পদ শূন্য। আ স ম হান্নান শাহ, এম কে আনোয়ার ও তরিকুল ইসলাম মারা গেছেন। তাদের মধ্যে বেগম খালেদা জিয়া প্রায় ১ বছর কারাবন্দী, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনে। কয়েকজন সদস্য গুরুতর অসুস্থ। দীর্ঘদিন মামলা জটিলতায় ভারতে রয়েছেন সালাহউদ্দিন আহমেদ। অন্যরা সভা-সমাবেশে অংশ নিলেও মিছিলের অগ্রভাগে থাকেন না। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ৭৩ জন, ভাইস চেয়ারম্যান ৩৫ জন, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব একজন ও যুগ্ম মহাসচিব ৭ জন। বিভিন্ন বিষয়ে সম্পাদকীয় ১৬৩টি পদের মধ্যে ৫টি শূন্য। নতুন পুরাতন মিলে নির্বাহী কমিটির সদস্য ২৯৩ জন। বিএনপির চলমান কর্মসূচিগুলোতে এই বিশাল কমিটির অর্ধশতাধিক কেন্দ্রীয় নেতাকেই ঘুরে ফিরে দেখা যায়। 

কী বলছে তৃণমূল : বিএনপির তৃণমূল ও কেন্দ্রীয় নেতারা আলাপকালে জানান, দলের হাইকমান্ডের উচিত হবে সরকারের কোনো পাতানো ফাঁদে পা না দিয়ে কৌশল অবলম্বন করা। আগামী দিনে আন্দোলনে সিনিয়র ও কেন্দ্রীয় নেতাদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা। কঠোর কর্মসূচির মাধ্যমে বেগম জিয়ার মুক্তি নিশ্চিত করা। 

মাদারীপুরের শিবচর উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ইয়াজ্জেম হোসেন রোমান বলেন, আমরা তৃণমূলের পক্ষে দলের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অতীতেও ছিলাম, এখনো আছি। কিন্তু বিএনপির হাইকমান্ড তৃণমূলকে কখনোই মূল্যায়ন করেনি। তারা শুধু মুখে মুখেই তৃণমূলের কথা বলে। তারা সত্যিকারার্থে তৃণমূলকে মূল্যায়ন করলে দলের এই করুণ অবস্থা আজকে হতো না। যার প্রমাণ আমার জেলার নেতৃবৃন্দকে নিয়ে সম্মেলনের মাধ্যমে উপজেলার কমিটি করি। কিন্তু কাউকে না জানিয়ে কেন্দ্র থেকে অচেনা অজানা লোককে আরেকটি কমিটি দেয়া হয়। অথচ তাদের সাথে কারো যোগাযোগই নেই। ইউপি নির্বাচনে আমার এলাকায় খালেদা জিয়ার হত্যাচেষ্টা মামলার আসামি এবং এবারের সংসদ নির্বাচনে অর্বাচীন একজনকে মনোনয়ন দেয়া হয়। এভাবে দলকে একটি গোষ্ঠী জিম্মি করে ফেলছে। কেন্দ্রীয় নেতারা যেন দেবতা সেজে বসে থাকেন ভোগের আশায়! ফলে তাদের কাছে ঢাকায় ধরনা দিতেই আমাদের রাজনীতি শেষ। এলাকায় রাজনীতি করার সুযোগটাও বন্ধ হয়ে যায়। বিতর্ক এড়াতে সম্মেলনের মাধ্যমে সব ধরনের কমিটি গঠন করা জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেন। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বায়েজীদ আরেফিন বলেন, হাজার হাজার নেতাকর্মীর ঘাম, শ্রম, ত্যাগ আর রক্তের বিনিময়ে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল প্রতিষ্ঠিত। যার যা ইচ্ছা তাই করার জন্য কিন্তু এ সংগঠন না। অবশ্যই সম্মেলনের মাধ্যমে কমিটি করা সময়ের দাবি। 

বগুড়া জেলা বিএনপির সভাপতি ভিপি সাইফুল ইসলাম বলেন, দল করি, করে যাচ্ছি। আমার তেমন কিছু বলার নেই। হাইকমান্ডের নির্দেশের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। নেত্রকোনা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ডা: আনোয়ারুল হক বলেন, তৃণমূল সবসময়ই দলের কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থেকে কর্মসূচি সফল করেছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের তৎপরতা আরো বেশি হওয়া উচিত। কেন্দ্রীয় সিনিয়র নেতারা মিছিল-সমাবেশের অগ্রভাগে থাকলে তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকেরা আরো উজ্জীবিত হন।

জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু নয়া দিগন্তকে বলেন, সম্প্রতি যে নির্বাচন হয়েছে তাতে এটা প্রমাণিত যে বাংলাদেশে নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের ব্যবস্থা উঠে গেছে। সাধারণত নির্বাচন ও গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমেই গণতান্ত্রিক দেশে সরকার পরিবর্তন হয়। কিন্তু প্রথমটি অকেজো হওয়ায় এখন গণ-অভ্যুত্থান ঘটাতে হলে বিএনপির সব অঙ্গসংগঠন বা ফ্রন্টকে শক্তিশালী করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কাউন্সিলের মাধ্যমে কমিটি গঠন ও গঠনতন্ত্র অনুসরণ করতে হবে। মতামতের ভিত্তিতে নেতা নির্বাচন করতে হবে। চুপ থাকলে চলবে না, বরং এগিয়ে যেতে হবে।


আরো সংবাদ