১৮ আগস্ট ২০১৯

কাঞ্চন পৌরসভা নির্বাচনে খুনের মামলার আসামী মেয়র প্রার্থী : জনমনে আতঙ্ক

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার কাঞ্চন পৌরসভার নির্বাচন উপলক্ষে এলাকায় সন্ত্রাসীদের যাতায়াত শুরু হয়েছে। এনিয়ে ভোটারদের মধ্যে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা। একাধিক খুনের মামলার অভিযুক্ত একজন আসামীকে মেয়র পদে মনোনয়ন দেয়া নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে।

অভিযুক্ত মেয়র প্রার্থী রফিকুল ইসলাম রফিক পৌর যুবলীগের সভাপতি। তার বিরুদ্ধে থানায় দুটি হত্যা মামলাসহ আরো কয়েকটি মামলা রয়েছে। আগামী ২৫ জুলাই কাঞ্চন পৌরসভার এই নির্বাচন অনুষ্ঠানের তারিখ ঘোষিত হয়েছে। রফিকসহ মেয়র পদে ৪জন এবং ৯টি কাউন্সিলর পদে ৩৩জন এবং সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে ৬জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

২০০২ সালে চারদলীয় জোট সরকারের আমলে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মতিন চৌধুরীর প্রচেষ্টায় কাঞ্চন পৌরসভা ঘোষিত হয়। ৫৭ হাজার লোকসংখ্যার এই পৌরসভাটি বাণিজ্যিক কারণে গুরুত্বপূর্ণ। অনেক আগে থেকেই কাঞ্চন তাঁত শিল্পের জন্য বিখ্যাত। সম্প্রতি অনেকগুলো টেক্সটাইল মিল গড়ে উঠেছে এই এলাকায়। ফলে স্বাভাবিক কারণেই এখানকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর সবার দৃষ্টি রয়েছে। আগামী নির্বাচন উপলক্ষে সন্ত্রাসীদের আনাগোনা বৃদ্ধি পাওয়ায় এলাকাবাসী তাই আতঙ্কে সময় পার করছে।

রূপগঞ্জ থানার নথি অনুযায়ী অভিযুক্ত মেয়রপ্রার্থী রফিক ১৯৯৯ সালের ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে কাঞ্চন পৌরসভার কেন্দুয়ার টেক এলাকায় সংঘটিত মোক্তার হোসেন (৩৮) হত্যা মামলার প্রধান আসামী। মোক্তার হোসেন ওইদিন নবাব আশকারী জুট মিল থেকে রাতে বাড়ী ফেরার পথে কেন্দুয়ার টেক মায়ার বাড়ীর নিকটে রফিক ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা তার পথরোধ করে এবং রাম দা দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে। এ ঘটনায় রূপগঞ্জ থানায় রফিকসহ অভিযুক্ত অন্যান্যদের নামে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। মামলা নং ১৯/১।

রফিকের বিরুদ্ধে কাঞ্চন পৌরসভার মোঃ রাসেল হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। রাসেলকে ২০১২ সালের ৬ আগস্ট রূপগঞ্জ থানার কাঞ্চন পূর্বপাড়ার নিজ বাড়ীতে তার মায়ের সামনে নৃশংসভাবে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করা হয়।

নিহত রাসেলের মা সামসুন্নাহার নীলা ওই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় রূপগঞ্জ থানায় যে এজাহার দায়ের করেন তা থেকে জানা যায়, ঘটনার দিন রফিক ও তার ভাই শফিক রাত ১০টার দিকে বিভিন্ন অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে তাদের বাড়ীতে যায়। বাড়ীর কলাপসিবল গেট ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন রফিক ও তার ভাইয়েরা। এরপর তারা রাম দা, চাপাতি, হকিস্টিক, পিস্তলসহ দেশীয় ও অগ্নেয়াস্ত্রসহ বিভিন্ন ধারালো অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে হামলা চালায়। ছেলেকে বাঁচাতে এগিয়ে গেলে সন্ত্রাসীরা নীলা বেগমকেও কুপিয়ে জখম করে। তাদের এলোপাথাড়ী হামলা ও গুলিতে রাসেল নিহত হয়। এ ব্যাপারে রূপগঞ্জ থানায় দায়েরকৃত মামলা নং ২০। তারিখ ০৭-০৮-২০১২।

রফিকের বিরুদ্ধে শুধু খুন নয় মানুষকে কুপিয়ে জখম, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কার্যকলাপের ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে। পুলিশের খাতায় তিনি একজন চিহ্নিত সন্ত্রাসী। তার বিরুদ্ধে রূপগঞ্জ থানায় দায়েরকৃত ২০০৯ সালের ১৮ আগস্টের একটি এজাহার থেকে জানা যায়, একটি মামলায় হাইকোর্ট থেকে জামিন লাভের পর রফিক ও তার অনুসারীরা আনোয়ার হোসেন নামে একজন বাদীর বাড়ীতে গিয়ে হুমকি প্রদান করেন। তাকে মামলা প্রত্যাহার না করা হলে হত্যারও হুমকি দেয়া হয়। আনোয়ার হোসেন থানায় এ বিষয়ে জিডি করেন। যার নং ৯৩৬। রফিকের বিরুদ্ধে রূপগঞ্জ থানায় যে মামলা দায়ের করা হয় তার নং ৩৫। তারিখ ২৫-০৯-২০০৯। এ মামলায় রফিকের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্টভাবে আনোয়ার হোসেনকে হত্যা প্রচেষ্টার অভিযোগ আনা হয়।

২০০৩ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর রূপগঞ্জ থানায় দায়েরকৃত এজাহার থেকে জানা যায়, ১২ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে রফিকের ভাই মোগল রাতের আঁধারে একদল সন্ত্রাসীকে সাথে নিয়ে কাঞ্চনের সলিমুদ্দীন চৌধুরী ডিগ্রী কলেজের নৈশ প্রহরী আবদুল মালেককে মারধর করেন। তারা কলেজ অধ্যক্ষের রুমে প্রবেশ করেন এবং অসবাবপত্র ভাংচুর ও জিনিসপত্র চুরি করে নিয়ে যায়। এ ব্যাপারে রূপগঞ্জ থানায় এজাহার দায়ের করা হয় যার নং-২০। এ এছাড়াও তার বিরুদ্ধে থানায় মৌখিক ও লিখিতভাবে বহু অভিযোগ রয়েছে।

রফিকের পুরো নাম রফিকুল ইসলাম রফিক। তার পিতার নাম মোহাম্মদ হারুন। কাঞ্চন পৌর মহল্লার কেন্দুয়ারটেক রিফিউজি পাড়ার বাসিন্দা তিনি। তিনি একজন শ্রমিক ছিলেন। জীবনের শুরুতে রফিকও তার শিল্পের শ্রমিক হিসাবে কাজ করতেন। রফিকেরা ৫ ভাই। শফিক, মোগল, নজরুল, সাইফুল নামে তার আরো চার ভাইসহ একটি বিরাট সংঘবদ্ধ চক্র স্থানীয় মানুষজনের কাছে মূর্তিমান আতঙ্ক হিসাবে চিহ্নিত হয়ে আছেন। এদের প্রধান পেশা চাঁদাবাজি।

‘ফাইভ স্টার‘ সিন্ডিকেট চক্র নামে পরিচিত এই সন্ত্রাসী গ্রুপের প্রধান রফিক। এলাকায় সংঘবদ্ধ অপরাধ কর্মে এই ‘ফাইভ স্টার‘ সিন্ডিকেট এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে তাদের হুকুম ছাড়া কেউ কোন কাজই করতে পারে না। রফিকের ভাইদের বিরুদ্ধেও রূপগঞ্জ থানায় একাধিক মামলা রয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মেয়রপ্রার্থী রফিক তার বিরুদ্ধে হত্যা মামলা থাকার বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে এসব মামলা দলীয় গ্রুপিংয়ের কারণেই হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তিনি এসব মামলা থেকে বেকসুর খালাস পাবেন বলে আশা করছেন। একই সাথে বলেন, এবারের নির্বাচনে তিনি বিজয়ী হবেন মনে করে তার প্রতিপক্ষের লোকজন ষড়যন্ত্র করছে।


আরো সংবাদ