১০ ডিসেম্বর ২০১৯

১২ ঘণ্টার শ্বাসরুদ্ধ অভিযান মা-বাবার কোলে অপহৃত শিশু অপূর্ব

এএসপি খোরশেদের আবেগঘন স্ট্যাটাস - ছবি : সংগৃহীত

শিশু অপূর্ব। বয়স ৪ পেরিয়ে ৫ বছরে পড়ছে। প্রতিদিনের মতো গত বুধবার সকালে আরবি শিখতে যায় পাশের মক্তবে। অপূর্বের সহপাঠীরা আরবি শেখার পর বাসায় চলে এসেছে কিন্তু ফেরেনি সে। চিন্তায় পড়ে যায় অপূর্বের বাবা-মা। নারায়ণগঞ্জের বন্দরের মদনপুর কুড়িপাড়া এলাকার ওসমান গনির ছেলে অপূর্ব। সময় বাড়ে আর অপূর্বের মা-বাবার টেনশনও বাড়তে থাকে। প্রায় ৪-৫ ঘণ্টা খোঁজাখুঁজির পর ছেলেকে না পেয়ে বন্দর থানায় অভিযোগ করেন ওসমান গনি। পুলিশ এরই মধ্যে ওসমান গনির দেয়া তথ্য মোতাবেক ঘটনাস্থল তদন্ত করে জানতে পেরেছে অপূর্ব অপহরণে শিকার হয়েছে।

অপূবের্র সহপাঠীদের দেয়া তথ্যে পুলিশ জানতে পারে অপূর্বকে তার নিকটাত্মীয় শাহপরান ফুটবল কিনে দেয়ার প্রলোভনে নিয়ে গেছে। পুলিশ প্রযুক্তির মাধমে জানাতে পারে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থান করছে শাহপরান। তাকে ধরতে পারলেই পাওয়া যাবে অপূর্বের সন্ধান।

পুলিশ জানায়, শিশু অপূর্বকে জীবিত উদ্ধার করাই ছিল পুলিশের বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ মুক্তিপণের জন্য শিশু অপহরণের পর তাকে অনেক সময় জীবিত রাখে না অপহরণকারীরা। কারণ অপহরণের সাথে যারাই জড়িত থাকে মুক্তিপণ নেয়ার পরও পরিচয় প্রকাশ হওয়ার ভয়ে অপহৃতকে মেরে ফেলে। পুলিশের তেমনটি আশঙ্কা ছিল অপূর্বের ক্ষেত্রে।

পুলিশ জানায়, অপূর্বকে জীবিত উদ্ধারের প্রত্যয় নিয়ে শুরু হয় বন্দর থানা পুলিশের অভিযান। টানা ১২ ঘণ্টা শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান চলে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বাঞ্ছারামপুর থানার প্রত্যন্ত অঞ্চল। চার দিকে নদী, খাল-বিল। নেই রাস্তাঘাট। গত বুধবার গভীর রাতে প্রায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন একটা বাড়ি থেকে অপূর্বকে উদ্ধার করে পুলিশ।
অপূর্বকে উদ্ধারের পর গত বৃহস্পতিবার ফেসবুকে নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, (খ-সার্কেল) খোরশেদ আলম এক আবেগঘন স্ট্যাটাস দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ৫ বছরের একটা নিষ্পাপ শিশু অপূর্ব রাব্বী। যে বাচ্চাটা সারা দিন বাপ-মায়ের কোল, বাড়িঘর আলোকিত করে রাখত। সেই বাচ্চাটা হঠাৎ করে প্রতিদিনের মতো মক্তবে যাওয়ার পর থেকে নিখোঁজ। নিখোঁজের ২ ঘণ্টা পর সম্ভাব্য সব জায়গায় বাবা-মা খোঁজাখুঁজি করে বন্দর থানায় অভিযোগ করেন।

বাচ্চাটা অপহরণের শিকার হয়। সংবাদটা শোনার পর থেকে স্বাভাবিকভাবে আমি নিজে কোনো কিছু ভাবতে পারছিলাম না। অজানা আশঙ্কা, চিন্তার বলীরেখা আমার কপালে। বারবার মনের কোণে ভেসে উঠছিল ওয়ারির সাত বছরের শিশু সায়মার কথা। সে বিকেলে মাকে বলে বের হয়েছিল খেলতে। ফিরল লাশ হয়ে। ছোট্ট শিশুটিকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা করে ঘাতক।

তিন-চার দিন পূর্বে সুনামগঞ্জে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় শিশু তুহিনকে। প্রথম পাতায় হেডলাইন হয়ে যায় সব পত্রিকায়। শুধু মনে হচ্ছিল আমি ব্যর্থ হলে হয়তো আগামীকালকে আবার তুহিনের মতো সব পত্রিকায় হেডলাইন হবে ৫ বছর বয়সী অপূর্ব নির্মমভাবে...।
গতকাল সারাটা দিন-রাত ঘুম, বিশ্রাম, খাওয়া-দাওয়া করতে পারিনি। মাথায় বিভিন্ন ছক, প্ল্যানগুলো অপারেশন সর্বোপরি অপূর্বকে ফিরিয়ে দিতে হবে তার মা-বাবার কাছে এটাই ভাসছিল।
ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনা পেয়ে অপূর্বকে উদ্ধারে সাথে সাথে অপারেশন শুরু ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়।

তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে নিশ্চিত করি অপূর্বের সম্ভাব্য অবস্থান। একটা সুতোর জটের মতো টান দেয়ার পর অন্য একটা খুলতে থাকে। পর্যায়ক্রমে টার্গেট আইডেন্টিফিকেশন করি। গভীর রাতে ব্রাহ্মবাড়িয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলে, নদী, খাল-বিলের পাশে প্রায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন একটা বাড়ি থেকে অপূর্বকে উদ্ধার করি। হ্যাঁ অপূর্বকে সুস্থভাবে উদ্ধার করা হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পুলিশ আমাদের নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের টিমকে যথেষ্ট সহযোগিতা করে।

রাত ২টায় এসআই নাহিদের ফোন কল দেখে কিছুটা দ্বিধান্বিত, কিছুটা চিন্তিত আর আল্লাহর কাছে দোয়া করতে ছিলাম যেন দুঃসংবাদ না শুনি।
এসআই নাহিদ মাসুমকে দিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর থানার অভিযুক্ত আসামি শাহপরানের (৩৫) নিজ ঘর থেকে অপূর্ব রাব্বীকে সুস্থ স্বাভাবিক উদ্ধার করতে পেরেছি- এটাই সবচেয়ে আনন্দের সংবাদ। অপূর্বর বাবার চোখের পানি খুশিতে গড়িয়ে পড়তে থাকে। গভীর রাতে গ্রামের খাল-বিল, ডোবা, ঘরের পেছনের দরজা দিয়ে আসামি পালিয়ে যায়। তাকে ধরতে অভিযান চলছে। শিগগিরই তাকে ধরে আইনের আওতায় আনা হবে। ১২ ঘণ্টার রুদ্ধদ্বার অপারেশন সফল না করতে পারলে দেশে আজ অপূর্ব হত্যা ইস্যু ছড়িয়ে যেত মিডিয়ায়!


আরো সংবাদ