১০ ডিসেম্বর ২০১৯

নড়িয়ায় যৌতুকের জন্য গৃহবধূ সুমাইয়াকে হত্যার অভিযোগ 

-

যৌতুকের টাকার জন্য নড়িয়ায় সুমাইয়া আক্তার (১৯) নামে এক গৃহবধূকে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে তার পরিবার। গত ১৫ নভেম্বর রাতে শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলা কেদারপুর ইউনিয়নের পাঁচগাও গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় নড়িয়া থানা পুলিশ মামলা না নেয়ায় সুমাইয়ার মা বাদী হয়ে শরীয়তপুর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে একটি মামলা দায়ের করেছে।

সুমাইয়ার স্বামীর পরিবারের দাবী, সুমাইয়া আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে। তাকে হাসপাতালে ভর্তির পর চিকিৎসাধীন সে মারাগেছে। সুমাইয়ার বাবার পরিবার তাদের নামে মিথ্যা অভিযোগ করছে। নড়িয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বলছেন, এ ঘটনায় সুমাইয়ার পরিবারের কেউ মামলা করতে আসেনি। মামলা করতে আসলে অবশ্যই মামলা নিতাম।

মামলার এজহার ও নিহতের পারিবারিক সূত্র জানায়, ২০১৮ সালের ২ এপ্রিল উপজেলা পাঁচগাও গ্রামের আব্দুর রব শেখের মেয়ে সুমাইয়া আক্তারের সঙ্গে একই গ্রামের দুলাল মাদবরের ছেলে ইতালী প্রবাসী জুলহাস মাদবরের পারিবারিকভাবে বিবাহ হয়। বিয়ের পরে কয়েক মাস সংসার জীবন ভালই কাটছিল তাদের। এর কিছুদিন পরে জুলহাস সুমাইয়াকে তার বাবার বাড়ি থেকে ১০ লাখ টাকা যৌতুক আনতে বলে। টাকা দিতে অস্বীকার করলে স্বামী জুলহাস মাদবর ও তার পরিবারের লোকজন মিলে সুমাইয়াকে মানসিক ও শাররীক অত্যাচার শুরু করে। এর পর গত ৮ নভেম্বর স্বামী জুলহাস আবার সুমাইয়াকে যৌতুকের জন্য চাপ প্রয়োগ করে ও মারধর করে। গত ১৫ নভেম্বর শুক্রবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে টাকা দিতে অস্বীকার করলে সুমাইয়াকে তার শশুর বাড়ির লোকজন মারধর করে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে ঘরের আরার সাথে উঁচু করে বেঁধে হত্যার চেষ্টা করে। তখন তার আত্মচিৎকারে আশে পার্শ্বের লোকজন এগিয়ে আসে। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় রাত ১১টার দিকে তাকে নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে শরীয়তপুর সদর হাসপাতলে প্রেরণ করে। তখন সুমাইয়ার স্বামীর পরিবার শরীয়তপুর সদর হাসপাতলে না নিয়ে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে গত শনিবার (১৬ নভেম্বর) সকাল ১০টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সুমাইয়া মৃত্যুবরণ করে। ঢাকা মেডিকেল কলেজে ময়না তদন্ত শেষে তার স্বামীর বাড়িতে এনে জানাজা শেষে চন্ডিপুর গণ কবরস্থানে দাফন সম্পূর্ণ হয়। এ ঘটনায় সুমাইয়ার মা মাফিয়া বেগম বাদী হয়ে সুমাইয়ার স্বামী জুলহাস মাদবর, শশুর দুলাল মাদবর, শাশুড়ি সেলিনা বেগম, ননদ আলো বেগমসহ ৯জনকে আসামি করে ১৯ নভেম্বর শরীয়তপুর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে একটি মামলা দায়ের করেছে। আদালত মামলাটি গ্রহণ করে নড়িয়া থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে মামলাটি এফআইআর হিসাবে গ্রহণ করার নির্দেশ প্রদান করেন।

সুমাইয়ার মা মাফিয়া বেগম বিলাপ করতে করতে বলেন, আমার একটাই মেয়ে। মেয়েটা সুখে থাকবে বলে বিয়ে দিয়ে ছিলাম। কিন্তু জুলহাসরা এতো খারাপ জানতাম না। সুমাইয়াকে মারধর করে নড়িয়া হাসপাতালে ভর্তি করে এবং পরে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে ভর্তি করে, কিন্তু আমাকে কিছুই জানায়নি । যখন আমার মেয়ে মারা যায় তখন আমাকে জানায়, আপনার মেয়ে গলায় দড়ি দিয়ে মারা গেছে। ১০ লাখ টাকার জন্য ওরা আমার মেয়েকে মারধর করে কষ্ট দিয়ে মেরেছে। আমরা নড়িয়া থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ মামলা নেয়নি। তারা আদালতে মামলা করার পরামর্শ দেয়। তাই শরীয়তপুর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল মামলা করেছি। আমি আমার মেয়ের হত্যাকারীদের ফাঁসি চাই।

সুমাইয়ার ভাই রায়হান শেখ বলেন, দুলাভাই জুলহাসের অন্য একটি মেয়ের সাথে পরকিয়া সম্পর্ক ছিল। সেটা সুমাইয়া আপু জেনে যায়। ননদ আলো বেগম পরকিয়া করতো তাও যেনে গেছে আপু। এগুলো নিয়েও আপুকে নির্যাতন করতো তারা। তাছাড়া যৌতুকের টাকা দিতে পারি নাই তাই বোনটাকে হত্যা করলো তারা।

সুমাইয়া আক্তারের ননদ আলো বেগম বলেন, আমরা ভাবিকে হত্যা করবো কেন? সে নিজেই গলায় ওড়না পেঁচিয়ে মরতে চেয়েছে। আমরা বাঁচানোর চেষ্টা করেছি। সুমাইয়ার পরিবারের লোকজন মিথ্যা অভিযোগ করে আমাদের ফাঁসানোর চেষ্টা করছে।

নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. এসএম তৌহিদুল বাসার বলেন, সুমাইয়া হাসপাতালে ভর্তি করার সময় অজ্ঞানের মত ছিল। গলা দিয়ে গড়গড় শব্দ হচ্ছিল। গলায় হালকা দাগও ছিল। রোগির অবস্থা খারাপ দেখে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়।

নড়িয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ হাফিজুর রহমান বলেন, এ ঘটনায় সুমাইয়ার পরিবারের কেউ থানায় মামলা বা অভিযোগ করতে আসে নাই। স্থানীয় কিছু লোকজন আমাদের ইনফরমেশন দিয়েছিল যে, সুমাইয়া আত্মহত্যা করেছে। তবুও ঢাকার শাহাবাগ থানায় যোগাযোগ করেছিলাম। তবে ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পেলে এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।


আরো সংবাদ