১২ ডিসেম্বর ২০১৯

জুয়ার টাকার জন্য বিক্রি করে দেয়া শিশু উদ্ধার, বাবা ও ক্রেতা গ্রেফতার

মায়ের কোলে উদ্ধার করা শিশু রাধিয়া ও (ডানে) গ্রেফতারকৃত পাষণ্ড বাবা - ছবি : নয়া দিগন্ত

কিশোরগঞ্জের কটিয়াদিতে জুয়ার টাকার জন্য মায়ের কাছ থেকে ১৪ দিনের এক শিশুকে তুলে নিয়ে ৭০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দিয়েছেন পাষণ্ড এক বাবা। এ ঘটনায় শিশুটির মা বাদী হয়ে থানায় মামলা দায়ের করলে পুলিশ শিশুটির বাবা মো: ফারুক ভূঞা ও শিশুটির ক্রেতা জাকিয়া আক্তারকে গ্রেফতার করেছে।

বৃহস্পতিবার বিকেলে রাধিয়া নামের ওই মেয়ে শিশুটিকে আদালতের মাধ্যমে তার মায়ের কাছে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। গ্রেফতার হওয়া বাবা ও শিশুর ক্রেতাকে পাঠানো হয়েছে জেল হাজতে।

শিশুটির বাবা কটিয়াদী উপজেলার বালিরারপাড় গ্রামের মৃত শাহাবউদ্দিনের ছেলে। শিশুর ক্রেতা জাকিয়া আক্তার উপজেলার বেতাল গ্রামের সুমন ভূঞার স্ত্রী। তারা নিঃসন্তান।

কটিয়াদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এম এ জলিল জানান, শিশুটির বাবা ফারুক ভূঞা নিয়মিত জুয়া খেলেন। জুয়ার টাকার জন্যই ১৪ দিন বয়সী শিশুকে সন্তানহীন জাকিয়ার কাছে বিক্রি করে দেন। শিশুটিকে বিক্রির ৭০ হাজার টাকা একরাতেই জুয়া খেলে হেরে যান ফারুক।

মামলার বিবরণে জানা গেছে, রাধিয়াসহ ফারুক ভূঞার তিন সন্তান। গত ৫ নভেম্বর কটিয়াদী সদরের একটি ক্লিনিকে জন্ম নেয় রাধিয়া। ১৮ নভেম্বর রাধিয়া সামান্য জ্বরে আক্রান্ত হয়। ওই দিন সকালেই স্ত্রী (রাধিয়ার মা) রিনা আক্তারের কাছ থেকে হাসপাতালে চিকিৎসা করানোর নাম করে জুয়াড়ি ফারুক ভূঞা সন্তানকে কোলে তুলে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়। ফারুক সন্তানকে নিয়ে বাড়িতে আসে না। ফারুক তার মোবাইলও বন্ধ করে দেয়। এক পর্যায়ে ফারুক নিজেই রিনা আক্তারের ছোট ভাই শফিককে ফোন করে গল্প ফাঁদে- হাসপাতালে এসে শিশু রাধিয়াকে এক নারীর কোলে দিয়ে শৌচাগারে গিয়েছিলেন তিনি। সেখান থেকে এসে দেখতে পান যে, রাধিয়াকে নিয়ে ওই নারী পালিয়ে গেছে। অনেক খোঁজাখুুঁজি করেও ওই নারীকে পাওয়া যাচ্ছে না।

এ খবরে শিশুটির মা রিনা আক্তারের মনে প্রবল সন্দেহ হয়। তিনি তার ছোট ভাই শফিককে নিয়ে উপজেলা সদরের ওই ক্লিনিকে শিশুর বাবাকে খুঁজতে থাকেন। না পেয়ে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে শিশুটির বাবার মোবাইল ফোন বন্ধ পেয়ে তার বাড়ি বালিরারপাড় গ্রামে যায়। সেখান থেকে রিনা আক্তারকে শিশুটির দাদি দুর্ব্যবহার করে তাড়িয়ে দেয়।

এক পর্যায়ে শিশুটির বাবা অন্য একটি মোবাইল ফোনে শিশুর মাকে জানায় শিশু রাধিয়াকে পেতে হলে তাকে ছয় লাখ টাকা দিতে হবে। পরবর্তীতে শিশুর মামা শফিক ও মা রিনা আক্তার জানতে পারে শিশু রাধিয়াকে তার বাবা ফারুক ভূঞা, দাদী রেহেনা খাতুন ও তাদের আত্মীয় জসিম ভূঞা ও অজ্ঞাত দুই তিন জন মিলে উপজেলার বেতাল গ্রামের সুমন ভূঞার স্ত্রী জাকিয়া আক্তারের কাছে ৭০ হাজার টাকার বিনিময়ে বিক্রি করে দিয়েছে।

বুকের ধনকে হারিয়ে অসহায় মা রিনা আক্তার ১৯ নভেম্বর কটিয়াদি মডেল থানায় অভিযোগ করলে পুলিশে তার সন্তানকে বুধবার বিকেলে উদ্ধার করে মায়ের কোলে ফিরিয়ে দেয়। গ্রেফতার করা হয় বাবা ফারুক ভূঁঞা ও শিশুর ক্রেতা জাকিয়া আক্তারকে।

পুলিশ পাষ- পিতা ফারুক ভূঞা ও শিশুর ক্রেতা জাকিয়া আক্তারকে বুধবার সন্ধ্যায় কিশোরগঞ্জ আদালতে পাঠায়। ওই দিন রাতে শিশু রাধিয়াকে মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিয়ে দুই আসামিকে জেল হাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত।

জানা গেছে, রিনা আক্তার দরিদ্র পরিবারের মেয়ে। একই উপজেলার মশুয়া ইউনিয়নের রামদী গ্রামে তাদের বাড়ি। তার বাবার ফরিদ ভূঞা বেশ কয়েক বছর আগে মারা যান। একই উপজেলার বালিরারপাড় গ্রামের মৃত শাহাবউদ্দিনের ছেলে মো: ফারুক ভূঞার সাথে ১৫ বছর আগে তার বিয়ে হয়। ইতিমধ্যে তাদের সংসারে এক ছেলে ও দুই মেয়ের জন্ম নেয়। কিন্তু সংসারে অভাব-অনটন লেগে থাকায় প্রায়ই তাদের মধ্যে ঝগড়া হতো। ফারুক নিয়মিত জুয়ার আসরে যেতো। এলাকায় তিনি জুয়াড়ি হিসেবেই পরিচিত।

দেখুন:

আরো সংবাদ