১৯ নভেম্বর ২০১৯

সাহিত্য ও কাব্যে ভাষার ণির্মান

-

‘সমাজবদ্ধ মানুষ তার নিজস্ব অবচেতনে ভাষা সম্পর্কীয় যে উপলব্ধি গ্রাহ্য করে বা ভাব আদান-প্রদানের জন্য ভাষাব্যবস্থা মানবসমাজের ওপর ক্রিয়াশীল থাকে তাকে সস্যুর ল্যাগ বা ভাষামূল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ভাষাচিহ্ন প্রয়োগের ব্যক্তিমানুষের মনে জগৎ ও জীবন সম্পর্কীয় প্রতিক্রিয়ার প্রকাশ পায় তাকে তিনি প্যারোল বা মুখের ভাষা বলেছেন। ভাষাচিহ্নের জৈবিক সংগঠন আর প্রায়োগিক ক্রিয়া, যৌথভাবে একটি ভাষাব্যবস্থাকে মূর্ত করে। ভাষা একটি সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থার আওতায় ভাষাচিহ্ন, দ্যোতক দ্যোতিতের ক্রিয়া-বিক্রিয়া হিসেবেই উপস্থিত থাকে। ট্রাফিক সিন্যালের লাল, নীল ও হলুদ আলো অবচেতনে অবস্থিত ভাষাকাঠামোকেই ‘লাল’, ‘সবুজ’ ও ‘হলুদ’ শব্দচিহ্ন তিনটির নির্দিষ্ট দ্যোতক ও দ্যোতিতের ধারণা দেয়। উদাহরণটিতে লাল, সবুজ ও হলুদ রঙের সাথে বাস্তব অর্থে ‘থামা’, ‘যাওয়া’ কিংবা ‘অপেক্ষা করার’ কোনো সম্পর্ক নেই, বরং প্রকৃত সম্পর্ক স্থাপিত হচ্ছে রঙ সময় ও অবস্থানকেন্দ্রিক দ্যোতনা। ভাষাচিহ্ন সৃষ্ট দ্যোতক-দ্যোতনার অর্থও সবসময় স্বেচ্ছাচারী, দ্যোতক লাল শব্দটি দ্যোতিত হয়ে বোঝাতে পারে যুদ্ধ, রক্ত কিংবা সিঁদুর, দ্যোতিত সবুজের অর্থ হতে পারে যৌবন, শান্তি, বসন্ত কিংবা ফসলের ক্ষেত আর হলুদ রঙের দ্যোতিত অর্থ হতে পারে জন্ডিস রোগ কিংবা চৈত্রের রোদে পুড়ে যাওয়া কোনো এক দুঃসময়কে। লাল রঙ লাল বলে ভাবি, কারণ তা সবুজ নয়, হলুদ নয় কিংবা বেগুনি নয় আর সবুজ রঙ হলুদ, লাল, বেগুনি কিংবা বর্ণালীর অন্যান্য রঙের মতো না হওয়ার কারণে সবুজ হিসেবে অর্থবোধক। ভাষাচিহ্ন ও চিহ্ন-কাঠামোবিষয়ক বাস্তব জ্ঞান আমাদের সাহিত্য ও সৃষ্টির বাস্তব পূর্ণাঙ্গ উপলব্ধি দিতে সক্ষম’ [পাঠ মঈন চৌধুরীর প্রবন্ধ]।
‘১৯৭৪ সালে কিউবেক সরকারের নির্দেশে উত্তরাধুনিক অবস্থায় জ্ঞানের বিস্তার নিয়ে লিওতার একটি রিপোর্ট দাখিল করেন, [অমল বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্ধৃতিতে আছে কানাডা সরকারের অনুরোধে] তিনি ১৯৭৯ সালে ‘দ্য পোস্টমর্ডান কন্ডিশন : এ্যা রিপোর্ট অন নলেজ’ উপস্থাপন করেন। তিনি তাতে উল্লেখ করেছেনÑ ভাষা, ভাষার ক্ষেত্র, ভাষার বিভিন্ন থিয়োরি, যোগাযোগ ব্যবস্থা, সাইবারনেটিক, কম্পিটার, কম্পিউটারের ভাষা, ডাটা ব্যাংক, কম্পিউটারের ভাষার অনুবাদ ইত্যাদি সমস্ত ব্যাপারেই বিজ্ঞানই তার আধিপত্য বিস্তার করছে। ফলে জ্ঞানের ক্ষেত্রের উপর এর একটা সাগ্রিক প্রতিফলন ঘটেছে। প্রযুক্তির এরকম পরিবর্তনের ফলে এমন একটা সময় আসতে পারে, যে জ্ঞান কম্পিউটারের ভাষার পরিবর্তন করা যাবে না, সে জ্ঞান হয়তো ভবিষ্যতে টিকবেই না। অর্থাৎ জ্ঞান ক্রমেই পরিমাণগত হয়ে যাবে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মানসভূমি গঠন করার সাথে জ্ঞানের অদূর ভবিষ্যতে আর কোনো সম্পর্ক থাকবে না । সংবাদ ও জ্ঞান সমার্থক হয়ে উঠবে এবং কোনো ব্যক্তির কাছে সংবাদ পাঠানো বা গচ্ছিত রাখা সম্ভব হবে না। সংবাদ ও জ্ঞান বিক্রি হবে এবং সংবাদের জন্য বিভিন্ন জাতিতে যুদ্ধও বেঁধে যেতে পারে।’ লিওতার জন্মেছেন ফ্রান্সে, লেখাপড়া আলজিরিয়া, ব্রাজিল, ক্যালিফোর্নিয়ায়, প্যারিস বিশ^বিদ্যালয়ে দর্শনের অধ্যাপক ছিলেন। উত্তরাধুনিকতার প্রবক্তাদের মধ্যে তিনি অন্যতম। [আধুনিক কবিতার ইতিহাস, প্রবন্ধপাঠ আনন্দঘোষ হাজরা, উত্তর আধুনিকতা ও বাংলার কবিতা]। মনে রাখা দরকার, এসব চিন্তার মধ্যে আমরা ইতোমধ্যে প্রবেশ করেছি এবং বড়দের লেখার মধ্যে তার উপস্থিতিও ঘটেছে।

০২.
একমাত্র কবিতায় শব্দের ভাষাচিহ্নের দ্যোতক ও দ্যোতিতের নানামাত্রিক ব্যবহার ও অর্থবোধকতা দেয়া সম্ভব। যে রকম সস্যুরের তত্ত্বানুযায়ী লাল, হলুদ, সবুজের কার্যকরণচিত্র। সাহিত্যে মতো অন্যান্য ক্ষেত্রে সম্ভবত এতটা শব্দের চলতি অর্থবোধকতাকে অতিক্রম করে নতুন মাত্রায় যোজনা কঠিন। কারণ কবিতার পঙ্ক্তি বিস্তৃতির মধ্য দিয়ে যে শব্দগুলো বক্তব্যকে নির্মাণ করে তাতে থাকে সময়কাল, স্থান, ঘটনা, আকস্মিকতা, নিস্তব্ধতা, চ্যুতি, বিপর্যয়, আবেগ ও কল্পনা, থাকে বিচ্ছিন্নতা, নানামুখী সঙ্কট ও সংবেদন এসব মিলে ভাবনার সংহতি, কিংবা এলোমেলোতার মধ্যে এককেন্দ্রিক ধাবমানতা। থাকে ছড়িয়ে যাওয়া কল্পনা, বিচ্ছিন্নতা, উলম্ফন, রাজনীতি, সমাজ, জীবন অভিজ্ঞতা, সঙ্কট, ভাঙন, বিজ্ঞান দর্শন ও ইতিহাস মনষ্কতা ওই সামান্য কয়টা পঙ্ক্তিতে কত কিছুরই না সঙ্গতি হতে পারে, যা পাঠকমনে নানা উদ্দীপনার উপকরণ হয়ে তারে তারে বাজে। যেহেতু একটি শব্দের একটিমাত্র বা কয়েকটি অর্থ অভিধানে খুঁজে পাওয়া গেলেও বা সমাজ জীবনে চলমান থাকলেও কবিতার পঙ্ক্তিতে সেই অর্থকেও কোনো কোনো সময় চিহ্নিত না করে উত্তপ্ত করে তোলে এমন এক অর্থবোধকতায় যা পঙ্ক্তির সাথে নিজেকে মিশিয়ে নেয় প্রতীকে, অলঙ্কারে, দ্যোতনায় এবং কবির দক্ষতার সাথে যুক্ত হয়ে চলমানতার পথকে অনুভবের ইমেজে রূপান্তর করে নানা অনুষঙ্গ-ব্যবহারে, ব্যবহৃত যতিচিহ্নগুলোর সংশ্লিষ্টতা উৎপাদনে। একটা মুখাবয়বের মধ্যে যেমন অনেক হাসি থাকে এবং থাকে হাসির মধ্যের হাসিÑ তুষ্টির, তৃপ্তির, মুচকির, অট্ট, প্রগলভ, বাঁকা, হিংস্র, প্রতিশোধ, হাসির পেছনের হাসি, কবিতার পঙ্ক্তির মধ্যে শব্দ তেমনি নানা সুরে ফুটে ওঠে ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপ এবং একসুরে বাজে কোনো একটি অর্থবোধকতা বা অর্থপতন। তাই একটি ড্যাস চিহ্ন কেবল একটি ড্যাস হয়ে কবিতায় উপস্থিত নয় বরং আরেকটি ভাবনাকে যুক্ত করে কবিতার গোটা শরীর। ভাষার এই চিহ্নিত বা গুপ্ততা কেবল কবিতায় মিলিয়ে নিয়ে কবি তার কবিতা পাঠকের দিকে ছেড়ে দেন এবং পাঠক কবির ভাবনার বস্তুগত, অবস্তুগত ক্রিয়া-বিক্রিয়া বা সংবেদের সব সংবাদ অবগত হতে না পেরেও কাছাকাছি পৌঁছে তার আনন্দকে পূর্ণ করেন তার মতো। সাহিত্যে এ কাজটি করা যায় এবং শব্দকে বাজিয়ে তোলা যায় প্রকাশের সর্বোচ্চ মাত্রায়। এখন যদিও অনেক অধিবিদ্যক কথাই আমরা আর গ্রামাঞ্চলে শুনতে পাই না, কিন্তু একসময় গ্রামের মানুষেরা তাদের দৈনন্দিন জীবনে পারস্পরিক কথপোকথনে যে ভাষা ব্যবহার করতেন তা সংক্ষিপ্ত, উপমাযুক্ত, প্রতীকী। আঞ্চলিক ভাষাগুলোও স্থান বিশেষে বিশেষ হয়ে ওঠে এবং মানুষের ব্যবহারে তা আরো বেশি অর্থময়তাকে ধারণ করে। আল মাহমুদ ছাড়াও অনেকে কবিতায় আঞ্চলিক ভাষা শব্দকে ব্যবহার করেছেন প্রতিনিধিত্বশীল কবিরা কবিতাকে ভিন্নমাত্রা দিতে। এসব ব্যবহার কবির দক্ষতায় সচল ও সক্রিয় হয়ে কেবল ওই অঞ্চলের লোকজন নয়, ভিন্নাঞ্চলের লোকদেরও প্রিয়তার স্পর্শদেয় মনোরোখ তৈরি করে। আজও হয় তো তেমন ব্যবহার কমবেশি আছে, আর এগুলো কাব্যের মতোই ধারালো এবং চোখা। তারপরও চূড়ান্ত আনন্দ যেমন সম্পূর্ণে অসম্পূর্ণ থাকে বা ব্যক্তির অনুভবের মাত্রাফেরে হেরফের ঘটে, তেমনি উদ্দেশ্যের অর্থও অনেক সময় সবাইকে সমান ওম দেয় না। উচ্চারণে পাঠক সমান আপ্লুত হয় না। এ কারণে ভাষার গুপ্তবাহুবলের উপস্থিতি সাহিত্যে বর্তমান থাকে এবং সাহিত্য কাব্য তার স্বভাষী, স্বগোষ্ঠী, স্বসমাজে মূল্যবান ও প্রয়োজনীয়। বেদনাদায়ক হলো, শাসকরা বা বিত্তশালীরা সমাজ বা রাষ্ট্র একে পাগলামি মনে করে এবং কখনো কখনো দানখয়রাত করে বিশেষ দয়া প্রদর্শনের মাধ্যমে। সংস্কৃতির অংশ এই কাজগুলো যে অতিমূল্যবান বিত্তশালীরা, বিপ্লববাদীরা কেউ তা আমলে নেয় না, তবে এর জন্য এসব ক্ষেত্রে কবি-শিল্পীরাও কম দায়ী নন। রবীন্দ্রনাথ যেমন বিশ^মানুষ হয়েও সঙ্কীর্ণতাকে পিছু ফেলতে পারেননি [সে ব্যক্তির] এবং তার জমিদারিতে প্রজাপুঞ্জ যে নিগ্রহভোগ করেছে, তাতে তার অন্তরাত্মা ক্ষান্তি দেয়নি, তিনি ব্রিটিশদের বা তাদের শাসনকে অকল্যাণকর মনে করেননি, তেমনি মির্জা গালিবও স্ব-স্বার্থে ব্রিটিশবন্দনা করেছেন, মোসাহেবি করেছেন, সহানুভূতি লাভের জন্য, সম্রাটের অনুগ্রহ পেতে লিখেছেন, ইউরোপেও অনেকে তা করেছেন সেকালে আর একালে। স্বার্থ এভাবে কবি-সাহিত্যিকের গণক্ষতির কারণ করেছে। জেনেটিক্যালি ভাষা নিয়েই মানব শিশু জন্মগ্রহণ করে। লক্ষ করলে দেখা যাবে, সব মানবশিশুই প্রথম ‘ম’ মা-কেন্দ্রিক শব্দ উচ্চারণ করে, পরে বিক্ষিপ্তভাবে নানা শব্দের প্রথম অক্ষরগুলো উচ্চারণ করে এবং বিবর্তিত সময়ে সে অন্যান্য শব্দগুলো গঠন করে। শিশুর ভাষা জগতে প্রবেশকে সস্যুর প্যারোল বলেছেন। মোট কথা, শিশু লাগপর্ব অতিক্রম করে প্যারোল পর্ব অতিক্রম করে। মানুষের চিন্তা ভাষার মাধ্যমে, চিন্তা ভাষাকেন্দ্রিক, চিন্তা ছাড়া ভাষার অস্তিত্ব নেই।

০৩.
এডওয়ার্ড সপির মতে, ভাষা মানুষের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয়, বরং মানুষের সামাজিক আচার, ব্যবহার, ধ্যানধর্ম, দৈনন্দিনতা ভাষা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। ভাষার নান্দনিক দিকটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে লিখিত ও কখনো কখনো বাচনিক অভ্যাসে। ভাষা ব্যতীত সাহিত্যের আর কোনো অবলম্বন নেই [পাঠ প্রবন্ধ হায়াৎ মাহমুদ]। সাহিত্যের রূপ প্রকাশের মধ্য দিয়ে ভাষা ঝকমকে দ্যুতিময় হয়ে ওঠে, বিশেষ করে কবিতায়। ভাষা সাহিত্যে লাগ হয়ে থাকে, পাঠের মধ্য দিয়ে তা অর্থ নিয়ে নির্দেশ্য মুখটি খোলে। কিন্তু পাঠক সবসময় সে অর্থকে নাগালে যে পাবেন তার নিশ্চয়তা নেই; কারণ শিল্পে ব্যবহৃত ভাষার্থকে বুঝে নিতে ভোক্তাকে শিল্প-সাহিত্য প্রসঙ্গে আগ্রহী হওয়া দরকার [বক্তব্যটি মার্কসের]। অভ্যেস গড়ে না তুললে ভাষার গভীরের ভাষার্থকে উপলব্ধি করা এবং রস অনুভব করা যায় না। ভাষা অত্যন্ত বিভেদ-বিভ্রমী, ভঙ্গুর ও মরণশীল, জাতি-ধর্ম, শ্রেণী, লিঙ্গ সব সামাজিক এককের সাথে সম্পর্কিত অথচ স্বতন্ত্র [সংক্ষেপিত, উদয়নারায়ণ সিংহ দ্য’ সস্যুর প্রবন্ধ] লেখক বা শিল্পী তো পাঠকের সামনে থাকেন না থাকে তার সৃষ্টি, অতএব তার সৃষ্টির মধ্য দিয়েই চিনতে হয় স্রষ্টাকে।
‘কিছু একটা বোঝানোর জন্য কেউ কবিতা লেখে না’ তা সত্য নয়, কোনো কালেও ছিল না [এই বক্তব্য নিরপেক্ষ নয়, রবং এসব লেখক নিজেদের স্বার্থ আদায়কালে যা লিখেছেন, তাতে কিছু একটা বলার জন্যই লিখেছেন, সে কী গুরু কবি, কী মরমীয়া কবি, কী আজকের বিখ্যাত খ্যাত কবিরা]। তবুও শিল্পের ক্ষেত্রে দু’ধরনের মত সর্বদাই বিরাজমান আছে এবং ছিল। কারণ মানুষ নানাকালে যে রকম শিল্প-সাহিত্য-কাব্য বোঝতে থেকেছে সেই অভ্যাস থেকে ভিন্নতা গ্রহণে এখনো তার প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়নি। বাস্তবে প্রয়োজনীয়তা থেকেই অর্জন কামনার উৎপত্তি। যেমনÑ একসময় গোর্কির ‘মা’ নাকটকটি থেকে মানুষের মনে সমাজতন্ত্র নির্মাণাকাক্সক্ষায় কামনার সৃষ্টি হয়েছিল [যদিও কামনা শব্দটির মধ্যে যৌনতার সংযোগ থাকে ফ্রয়েড মতে]। কিংবা একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্র পাওয়ার বাসনা পশ্চিমের সমাজে ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছিল সাহিত্যের আলোক-বার্তা ছড়িয়ে দেয়ার মাধ্যমে তা ভালোভাবেই বুর্জোয়ারা কাজে লাগিয়েছে [এভাবেই জনগণের অর্জন দখল হয়ে যায়] এমনকি ধর্মও। এরা ধর্মও মানে না, তবে অভিনয়টা ভালোই করে এবং চালু রাখে ভেতরকার বিপ্লবী উপকরণগুলো বদলিয়ে বা পাশাপাশি আরো কিছু প্রসঙ্গ যোগ করে, যাতে মূলটি আকারে, ব্যবহারে অভিন্ন মনে হয়। কিন্তু সরটিকে অনুপস্থিত করে দেয়া হয়। যেভাবে আমাদের জাতীয় অর্জন ২১ বহাল আছে অনুষ্ঠানে, স্বাধীনতা সংগ্রাম মাহাত্ম্য বহাল আছে বক্তৃতায়, চীনের সমাজতন্ত্র নামটি বহাল আছে ভিন্ন মতকে দমনে, রাশিয়ায়, জার্মানিতে, পূর্ব ইউরোপে এবং একসময় বিলোপবাদিতায় তাদের হিসাবটি সক্রিয় হয়ে ওঠে, উঠেছে বা উঠবে]। কারণ কাজে লাগানোর মতো উপাদন ও ক্রিয়া তাতে ছিল। আর এভাবে প্রয়োজনীয় হয়েছে কখনো এ পক্ষের কখনো ও পক্ষের। প্রয়োজন ছাড়া মানুষের তা-ধিন তা-ধিন সৃষ্টি, সৃষ্টি নয়, তার কোনো দূরগামিতাও নেই। যদি কিছু থাকে তা তার ব্যক্তিগত প্রয়োজনের আর তা সাহিত্যিকের/কবির স্ব-স্বার্থবাহী। যেখানে আজ আমাদের সমাজের কুৎসিত তুলে এনে পুড়ে ফেলা দরকার, চেতনার বিলুপ্তির প্রান্তবিন্দু থেকে মানুষের নতুন বুদবুদ ঊর্র্ধ্বগামী করা দরকার; সেখানে ‘মরমীয়া ভাববাদিতা’ তামাশারই শামিল। সাহিত্য যদি লেখকের সৃষ্টি হয় তা হলে লেখকের বেদনা বিদ্রোহ অন্যের মধ্যের হৃৎকুণ্ডে প্রজ্জ্বলন করাই তার দায়িত্ব সৎ ও শক্ত হয়ে দৃঢ় হয়ে। এসব ক্ষেত্রে সাহিত্যের/কাব্যের/বক্তৃতার ভাষাশৈলী শাখাভেদে অভিন্ন যদিও নয় বরং সামগ্রিক; ভাষারই একটা রূপ পরিবর্তন প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে নিজ নিজ ক্ষেত্রে।

০৪.
বাস্তবে যে সঙ্ঘাত লেখক-শিল্পী তার বাইরে আমি আর ভেতরে আমির মধ্যে যে অবদমন চলছে, প্রতিদিন একজন লেখককে তা উগরে ফেলতে হয় প্রথম এবং নিশ্চিত হতে হয় সৃষ্টির লগ্নভাষাটি কেমন হবে। নৌকা দিয়ে সমুদ্রগামী হওয়া যায় না, সমুদ্রযাত্রায় লাগবে উপযোগী জলযান। আর তখনই তিনি সংগ্রহ করবেন উপযুক্ত উপাত্ত, মানে উপযুক্ত ভাষা যার বহুমাত্রিকতা লাগবে এবং নির্মাণের মধ্যেই তাকে ধনুকের ছিলায় যোজনা দিতে হবে। এভাবেই ব্যবহৃত ভাষা মগজের সহজবোধ পেরিয়ে মগজকে উদ্দীপ্ত করবে, পাঠককে ভাবাবে এবং নতুন সংবেদ তৈরি করে তার বাসনাকে রুচি ও বোধের সাথে মিলিয়ে দেবে। তবে এ কাজে নির্মাণকৌশল, শাস্ত্রজ্ঞানের প্রয়োগ প্রয়োজন-অপ্রয়োজনীয় নয়। শিল্পরূপ তো কতগুলো শব্দের সমাহার নয়, শব্দের ঘনরূপ অর্থে ও ব্যঞ্জনায়। যেমন ধরা যাক ‘পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি’ পঙ্ক্তিটিতে ব্যবহৃত সব শব্দই চেনা, তার বিচ্ছিন্ন অর্থও অগম্য নয়, কিন্তু তার অন্তর্গত অর্থটি একেবারেই বদলে গেছে উপমায়। চাঁদ আর সাদামাটা চাঁদ থাকেনি, অর্থও চাঁদের গতানুগততায় রুদ্ধ হয়ে নেই, এর গোলাকার দৃশ্যমানতা, নিটলতা, শুভ্রতা, দৃষ্টিনন্দনতা প্রকৃতির শিল্প হয়ে উঠেছে মানব মন থেকে নির্গত, উপস্থাপিত, এক বিস্ময়কর চাঁদ এক বিরূপতার মধ্যে আকাক্সক্ষার বস্তুটি, ক্ষুধার নিবৃতি নিয়ে সৃষ্ট হেল্যুসিনেশন। অর্থাৎ অর্থ ব্যবহার্য অর্থের পথ থেকে সরে নতুন অর্থ তৈরি করে দিলো এর রং পাওয়া গেল, এর অবয়ব পাওয়া গেল, এর প্রতিরূপ পাওয়া গেল রুটি আকারে, ক্ষুধার রাজ্যের এক উপমা হয়ে। আর চাঁদ যে রুটি হতে পারে না তবু সত্য হয়ে গেল কবির প্রকাশে। ‘অনেক কথা যাও যে বলে কোনো কথা না বলি’ এই পঙ্ক্তিটিতে সাধারণ অনুভূতি রয়েছে প্রেমের, ধারণা করি তার চেয়েও বেশি কিছু রয়েছে এর অন্তরসত্যে। প্রকৃতির প্রত্যেকটি অনুষঙ্গের উপস্থিতি, সরবতা এবং ভাষার উপলব্ধ থেকে প্রকাশে বিস্তৃত, কিন্তু কেউ কিছুই বলছে না,বলছে মানুষ, এই বলাটা অনুভব করছে কবি তার অন্তরশক্তির উপলব্ধির মধ্য দিয়ে। এখানেই তার কল্পনার বিস্তার শব্দ হয়ে উঠছে মগ্ন চৈতন্যে। এরকম পরিস্থিতিতে ভোক্তাকেই যেতে হবে সাহিত্যক/কবি/শিল্পীর কাছে তার সৃষ্টির মধ্য দিয়ে বোধের অনুশীলন করে। হ


আরো সংবাদ

সৎ ছেলের কোপে হাত হারানো সেই মাকে ঘর তুলে দিলেন পুলিশ কর্মকর্তা মা-বোনেরা যদি নির্যাতিত হয় তাহলে এই রেমিট্যান্সের মূল্য নাই : প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির জন্য সরকারকে জবাব দিতে হবে : মঈন খান বাড়ির সামনেই ইয়াসমিনকে পিষে দিয়ে গেল মাইক্রোবাস হল চালাবে প্রশাসন, ছাত্রলীগ কেন : ডাকসু ভিপি বাংলাদেশ এখন ‘উদ্বৃত্ত ঝুলি’ : খন্দকার মোশাররফ ক্ষুদে জাদুকরের নাকের ডগায় ফুটবল সম্রাটের যত রেকর্ড বাবরি মসজিদ ফেরত চাই- ওয়াইসির টুইটে অনলাইন-ঝড় ঠাকুরগাঁওয়ে লবণকাণ্ড : ৩ ব্যবসায়ীকে কারাদণ্ড, ২ জনকে অর্থদণ্ড পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন না বশেমুরবিপ্রবির দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী নবীনগরে ইউএনও'র সহযোগিতায় মাথা গোজার ঠাঁই পেল অসহায় পরিবার

সকল