০৯ ডিসেম্বর ২০১৯

কবিতায় মানবিকতা এবং একজন রেজাউদ্দিন স্টালিন

-

যাদের আমি ভালোবাসি এবং বন্ধু বলে মানি, রেজাউদ্দিন স্টালিন তাদের অন্যতম। ওকে ভালোবাসার প্রধানতম কারণ যদি বলি ‘কবিতা’Ñ তাহলে ভুল বলা হবে। এ জন্য এর পাশাপাশি আরো অনেক কারণকে উচ্চারণ করতে হবে, একসাথে যার অন্যতম অকৃত্রিম সারল্য এবং স্পষ্ট প্রকাশভঙ্গি। ‘ও’ যখন হাসে তখন আকাশের রোদগুলো রঙধনুর মতো নীলগিরির পাহাড়ে নাচতে থাকে আর ‘ও’ যখন বলতে থাকে তখন মনে হয় ঈশপের ভেড়াগুলো ছুটছে তো ছুটছেইÑ তবে তা দিকভ্রান্তহীন নয়, নিশ্চিত একটি লক্ষ্যের দিকে। বন্ধু হিসেবে ওর কোনো জুড়ি নেই। ‘ও’ বন্ধুত্বকে শ্রদ্ধা করে, গুরুত্ব দেয়। কখনো ঈর্ষা নামক বস্তু ওকে গ্রাস করেছে, এমনটা দেখিনি। আর সে কারণেই আমাদের সম্পর্ক গাঢ় থেকে গাঢ়তর হয়েছে দিন দিন।
ভালোবাসা না থাকলে মানুষ হওয়া যায় না আর প্রকৃত মানুষ হতে না পারলে কবি হওয়া যায় না। কবিত্ব একটি বড় ধরনের অর্জন, যার জন্য প্রয়োজন বিধাতার আশীর্বাদ। কবি ফজল শাহাবুদ্দীন বলতেন, কবিরা ঈশ্বরের বরপুত্র। আমিও তাই বলি এবং সেটাকে মনেপ্রাণে গ্রহণ করিও। স্টালিনকে আমি কবি হিসেবে মান্য করি এবং এ কারণেই ওকে ঈশ্বরের বরপুত্র বলতে কার্পণ্য করি না। যে তার দুঃসময়কে আশীর্বাদ করার স্পর্ধা রাখে সে তো কবিরও কবি।
আমার সবচেয়ে শ্রদ্ধার যে দু’জন মানুষকে খুব কাছ থেকে দেখেছি, তাদের একজন কবি আল মাহমুদ, অন্যজন কবি ফজল শাহাবুদ্দীন। আল মাহমুদ বাংলা কবিতার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের অন্যতম আর ফজল শাহাবুদ্দীন শুধু ভিন্নধারার কবিই নন, একজন তুখোড় সম্পাদকও। এ দু’জন মহান ব্যক্তির মুখে স্টালিনের নাম শুনেছি একাধিকবার। আল মাহমুদ তো লিখেই স্টালিনকে স্বীকৃতি দিয়েছেন, আর ফজল ভাই ওকে শনাক্ত করেছেন আগামীর নেতৃত্বদানকারী কবি হিসেবে। অগ্রজ এই দুই কবি স্টালিন সম্পর্কে অত্যন্ত উচ্চধারণা পোষণ করতেন। আর তারা যখন ওর সম্পর্কে ইতিবাচক কিছু বলতেন আমার বুক তখন গর্বে ভরে যেত। বন্ধুর জন্য এক ধরনের গভীর মমতা বোধ করতাম অন্তরে। না কোনো ঈর্ষা নয়, এক ধরনের ভালোলাগায় ভরে যেত আমার বুকটা।
যেদিন শিব নারায়ণ রায় ওকে নিয়ে লিখলেন, সেদিন নিজেকে খুব গর্বিত বোধ করেছিলাম। মনে হয়েছিল এটা ওর নয়, আমার অর্জন। এরকম অনুভবটা তৈরি হয়েছিল ওর বাংলা একাডেমি অ্যাওয়ার্ড পাওয়ার পরেও। বন্ধুর স্বীকৃতি তো আমারই স্বীকৃতি। আমি কতজনকে যে মিষ্টি খাইয়েছিলাম বলতে পারব না।
ওর একটি বইয়ের নাম ‘সব জন্মে শত্রু ছিল যে’। আমি জানি না সে কে। তবে সব জন্মে আমি ওর বন্ধু হতে চাই এবং ঠিক এ জন্মের মতো ভালোবাসতে চাই হৃদয় উজাড় করে।
স্টালিনের কবিতা দেশ কাঁপিয়ে এখন বিদেশেও আলো ছড়াচ্ছে। ওর কবিতার গভীরতা এবং ব্যাপ্তি নিয়ে আলোচনার সুযোগ নেই। ইতিহাস এবং পুরাণ থেকে রসদ সংগ্রহকারী স্টালিন নাগরিক মিথকে কাজে লাগিয়ে ক্রমশ বৈশ্বিক হয়ে উঠেছেÑ এটাই ওর বড় অর্জন। এ কারণেই কেউ কেউ ওকে শামসুর রাহমান বা শহীদ কাদরীর উত্তরসূরি বলে মনে করেন। কিন্তু আমি পুরোপুরি এ মতের সাথে যুক্ত নই। আমি ওর মধ্যে জীবনানন্দ এবং আল মাহমুদকেও খুঁজে পেয়েছি। গ্রামীণ মিথকে ধারণ না করলেও স্টালিন আমাদের শাশ্বত বাংলাকে এবং এর নদী-নালা, বাতাসকে কখনো কখনো স্পর্শ করে গেছে, হয়তো সে স্পর্শ ততটা তীব্র নয়, তবুও সে স্পর্শে যে স্পন্দন জাগ্রত হয়েছে তাকে অস্বীকার করার উপায় কী?
স্টালিন প্রেমের কবি নয়, প্রথার কবিও নয়Ñ সে ধারা ভঙ্গকারী কবি। সব ধারাকে ভেঙে একটি নতুন ধারা সৃষ্টি করে এগিয়ে যাওয়া স্টালিনের গন্তব্য যে অনেকদূর। আগুনমোড়া শহরের বাসিন্দা স্টালিন, মাহুতটুলীর খোদাই করা স্মৃতিস্তম্ভ আর নিমতলীর দাউদাউ কাসিদার গল্প শোনাতে শোনাতে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে দুঃখ নামক দৈত্যের আগমনে। বাছাই করা রাত্রির নিম্নাঙ্গে কর্পূরের তেল ঢেলে দেয়ার বর্ণনায় অন্ধকারে রেখে যাওয়া লক্ষ লক্ষ চিতার পদচিহ্ন অঙ্কন করে সে ঢলে পড়ে নিষ্ফল নীরবতায়।
স্টালিন প্রতিবাদী, প্রতিরোধী। অসঙ্গতির বিরুদ্ধে তার তীব্র দাহ জ্বলে ওঠে যেন এভাবেইÑ
“বসন্তে নীল পাতার ’পরে পতঙ্গদের উল্লাস
রাজনীতিতে বৈধ এখন শুকনো পাতার সন্ত্রাস।
সুশীল সমাজ সাদা মানুষ বিজ্ঞাপনের পণ্য
এখন শুধু অপেক্ষা সেই মহান গডোর জন্য।’’
( অসঙ্গতি)
গডোর জন্য অপেক্ষারত স্টালিনকে তাই সহজেই আমরা ভাবতে পারি মাও সেতুং, নজরুল, সুকান্ত, সুভাষ কিংবা গুয়েভারার উত্তরসূরি। প্রলিতারিয়েতদের প্রতি এক ধরনের মমতা ওকে পেঁৗঁছে দেয় এক অনন্য উচ্চতায়। স্টালিন যখন ঘোষণা দেয়Ñ
‘দাতাদের সুদ নাম পাল্টে এখন মাইক্রোক্রেডিট’
(খণ্ড বিখণ্ড)
তখন আমরা নড়েচড়ে বসি। আবার যখন সে উচ্চারণ করেÑ
‘‘ভিক্ষুকের ভয়ে সব জানালা বন্ধ
চোখে আঁধারঘন সানগ্লাস’
(খণ্ড বিখণ্ড)
তখন আনত হই শ্রদ্ধায়।
মানুষকে ভালোবাসাই কবিদের কাজ। মানবতাকে প্রতিষ্ঠাই তাদের ধর্ম। এই ধর্ম যারা অনুসরণ করে এসেছেন যুগে যুগে তারাই নমস্য হয়েছেন। বন্ধু স্টালিন সে পথেরই অনুসারীÑ এটাই আমাদের অর্জন।
স্টালিন মনে করে এ দেশে কাপুরুষ ছাড়া কোনো কর্ণ নেই, সূর্যাস্ত ছাড়া নেই কোনো প্রার্থিত লগ্ন। ওর এই মনে করার মধ্যে কোনো ভ্রান্তি নেই। সত্যিই আমরা পার করছি এক চরম দুঃসময়Ñ এখানে এখন ওরই ভাষায়, রাম ও রাবণের সখ্যতায় লজ্জায় অবনত হচ্ছেন মাইকেল মধুসূদনের আত্মা, অন্ধ হোমার পুনরায় দৃষ্টি হারাচ্ছেন একিলিস আর হেক্টরকে একই মঞ্চে নৃত্যরত দেখে। অবক্ষয়ের এই চিত্র উন্মোচন তো কবিদেরই কাজ। কবিরাই এই সমাজের নানা অসঙ্গতি তুলে ধরবেন, প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন অন্যায়, অসততা ও অসমতার বিরুদ্ধে। স্টালিন সে কাজটাই করছে বিবেকের আজ্ঞাবহ হিসেবে। এই বিবেক তার কবি-বিবেক। আর এর মধ্য দিয়েই সে নির্ণীত করে যাচ্ছে তার স্থান। তারুণ্যের কবি কিংবা দ্রোহের কবি নয়, আজ তার জন্মদিনে আমি তাকে আখ্যায়িত করতে চাই মানবতা ও সাম্যের কবি হিসেবে। প্রার্থনা করি তার পুণ্য কবিতা-জীবন।


আরো সংবাদ