০৯ ডিসেম্বর ২০১৯

কোন দিকে হাসপাতাল

-

পাশাপাশি সিটে বসে আছি আমরা দু’জন। আমার বাম ঊরুর ওপর তার ডান হাত। তার সেই হাতটিকে আমিও ধরে আছিÑ আমার সর্বশক্তি দিয়ে। শুরু থেকেই সে ফোঁপাচ্ছিল। এখন সে মাত্রা আরো বেড়েছে। পকেটের রুমালটি অনেকক্ষণ থেকেই তার হাতে। তার বুকের ভেতরের ভাঙন- সব কিছু ঠেলে বের করে দিচ্ছে বাইরের দিকে। চোখের উপকূলে দেয়া লজ্জার বাঁধ ভেঙে গেছে। এখন ছোট্ট একটি পলকের চাপেও বেরিয়ে আসছে বুকভাঙা সেই লোনাজল। পলকের চাপ ছাড়াও বেরিয়ে আসছে। রুমালটি তার জল শোষণের ক্ষমতা হারিয়েছে। আমার পকেটে একটি রুমাল ছিল, বের করে দিলাম। রুমাল তার সমাধান নয়। আমি বুঝতে পারছি- কিন্তু কী বলে, কোন কথাতে পুনর্নির্মাণ করে দেবো তার দুই চোখের ভেঙে যাওয়া সেই উপকূলীয় বাঁধ। হাওরের বাঁধ কি পুনর্নির্মাণ হয়েছিল? সব ফুরিয়ে যাওয়ার আগে। যাক সে কথা। এ মুহূর্তে কোনো কিছুই আমার মাথায় আসছে না। আমার হাতের মাঝখান থেকে সে তার হাতটি বের করে নিলো। উল্টো সে নিজেই এবার শক্ত করে ধরল আমার একটি হাত। কোনো কথা না বলে আমিও তার সেই হাতটির ওপর তুলে দিলাম আমার আরেকটি হাত।
পুরনো মিনিবাসÑ খালি চোখে তাকে যতখানি দেখা যাচ্ছে, সবখানেই মেরামতজনিত কলঙ্কের ছাপ। দুই সিটের মাঝখানের দূরত্ব খুবই কম। তাই আমরা নিজের মধ্যেই নিজেরা জড়োসড়ো হয়ে বসে আছি। অনেকটা ডিমের ভেতর পুষ্ট মুরগির বাচ্চার মতোন। শিমুলতলা পার হয়ে এসেছি। সামনের রাস্তাটুকু খুব একটা বেশি নয়। তবে আমাদের বাসটি এগোচ্ছে পিলপিল করেÑ পিঁপড়ার পায়ে। এতে শারীরিক, মানসিক বা আর্থিক যত রকম ভোগান্তি আছেÑ তা সবই আমাদেরÑ এখানে বাস মালিকদের কোনো অসুবিধা নেই।
আবহাওয়া অফিসের খারাপ কথাগুলো বিশ্বাস করতে মন সায় দেয় না। কিন্তু তাদের এ কথাটা পুরোপুরি সত্যিÑ এ সপ্তাহে রোদের তাপ আরো বেড়েছে। গাড়ি চললে সামান্য বাতাস গায়ে লাগছিল। রোদে ভাজা সে বাতাস আমাদের তৃপ্তি না দিলেও এখনকার চেয়ে কিছুটা আরামে ছিলাম। তা এখন বুঝতে পারছি। তবে এই অনুভূতি এখন কেবলি আমার একান্ত। আমার পাশের সিটে যিনি আছেন তার ভেতরে কাজ করছে নাÑ এটা নিশ্চিত। তিনি আমার সহকর্মী। না, কথাটা এভাবে বলা ঠিক হবে না। আমি তার নতুন সহকর্মী। কারণ তিনি এই প্রতিষ্ঠানে প্রায় গোড়া থেকে আছেন। এখানে তার চাকরির বয়স এগারো বছর চলে। আর আমি জয়েন করে প্রথম মাসের বেতন পেয়েছি মাত্র। তাও কী যেন ঝামেলার কারণে ব্যাংকে টাকা যায়নি। পরে প্রিন্সিপাল স্যারের সই নিয়ে অ্যাকাউন্টস থেকে উঠিয়েছি। এ ব্যাপারে অবশ্য তিনি আমাকে খুব হেল্প করেছেন, আমাদের সম্পর্কটা মূলত সেখান থেকেই শুরু। মো: সেলিম তার একাডেমিক নাম। তবে তার একাডেমিক এই নামটি, তার পরিচিতদের মধ্যে দুই-তিনজন জানে। সেলিম স্যার ইংরেজি, নামেই তিনি সবার কাছে পরিচিত। বাড়ির বড় ছেলে তাই সাংসারিক নানা ঝামেলা মিটিয়ে বিয়ে করতে বেশ খানিকটা দেরি হয়ে গেছে। এদিকে আবার বৌকে নিয়ে ঢাকায় থাকা-খাওয়া। সব মিটিয়ে ইদানীং ভালোই একটা দিন শুরু হয়েছিল তার। এখন আর যত টাকাই দিক, সে কারো বাসাতে পড়াতে যায় না। সে যাই হোক। তার কাছে পড়তে হলে তার বাসায়, ব্যাচে পড়তে হবে। সকালে স্কুল শুরুর আগে এক ব্যাচ আর বিকাল ও সন্ধ্যায় আরো দুই ব্যাচ সে প্রাইভেট পড়ায়। সব কিছুর পর তখন তাদের স্বামী-স্ত্রী দু’জনের একটাই প্রত্যাশাÑ এক টুকরো ঐশি আলোর। যে আলো রাঙিয়ে রাখবে তাদের ঘর সারাক্ষণ-সারাবেলা। দু’জনের ঘরটি সে আলোয় আলোকিত হতে বেশ সময় লাগে। মেয়েটির বয়স আজ সাতচল্লিশ দিন। শ্বাসকষ্ট। নিষ্ঠুর এ নগরে আমার এবং তার শ্বাসও তো আটকে আসছে। আর মেয়েটি তো সবেমাত্র বিশুদ্ধ বাতাসের বাগিচা থেকে এখানে এসেছে। আমরা দাওয়াত দিয়ে এনেছি তাকে। অথচ আমরা আমাদের এ ঘর, এ নগর কোথাও এক চিমটি জায়গা ছাড়িনি। আমি অস্থির হয়ে উঠছি। কখন যেন বাসটি গড়াতে শুরু করেছিল।
নারী ও শিশু হাসপাতালের গেট দেখা যাচ্ছে। আবারো থেমে গেছে বাসের চাকা। ড্রাইভার আমাকে নামার জন্য ইশারা দিলো। আমরা নেমে হাঁটতে শুরু করলাম। এখন তার প্রতিটি ধাপ তাকে যেন মহাপৃথিবীর সাথে মিলিয়ে দিচ্ছে। তিনতলা-চারতলার দিকে এখনো হাসপাতালটির নির্মাণকাজ চলছে। এক-দুই তলাতে সীমিত আকারে চিকিৎসার কাজ শুরু হয়েছে। ইট-বালুর ট্রাক আর অ্যাম্বুলেন্স এখানে এখনো সমান গুরুত্বপূর্ণ।
মেয়েটিকে দেখার জন্য আমরা ছুটে গেলাম। শিশু ওয়ার্ডের দরজায় দাঁড়িয়ে ছিল সেলিম স্যারের স্ত্রী। আমাদের দেখে দৌড়ে এলো। সেলিম স্যারকে উদ্দেশ করে বলল, এখানে আমার মিয়া বাঁচপি নে। এদের কাছে অক্সিজেন নেই। বাসার কাছের হাসপাতাল তাই নিয়ে এসেছি। সেলিম স্যার জিজ্ঞাসা করল, আম্মা কই? ভেতরে। আমরা ভেতরে গেলাম। মেয়েটির বুকে যেন কোনো নিঃশ্বাস নেই। নিস্তেজ পড়ে আছে। সেলিম স্যার বাইরে বেরিয়ে এলো। সাথে আমিও। আমার পেছনে তার স্ত্রী। ডাক্তারও স্বীকার করলেন, তাদের এখানে এনআইসিইউ নেই। কোথায় নেবো তাহলে? সেলিমের এমন প্রশ্নের জবাবে, ডাক্তার বললেন, এনামে নিলে ভালো হয়। পাশ থেকে একজন বলল, উনি কী করেন? আমি বললাম, একটা প্রাইভেট স্কুলের শিক্ষক। সঙ্গে সঙ্গে লোকটি পাল্টা প্রশ্ন করে বলল, তাহলে কি এনামের বিল দিতে পারবে। ওখানে অনেক বিল। তবে এনাম সাব মন্ত্রী হইছে। লোকও ভালো। তাকে বলানোর কেউ যদি আপনার পরিচিত থাকে, তাহলে কিছুটা সুবিধা হয়। সেলিম মাথা ঝাঁকাল। না এমন কেউ তার পরিচিত নেই। তার কাছে এ এলাকার ভূঁইয়া, পাটোয়ারি, শেখ, খান, চৌধুরীÑ সব পরিবারের ছেলেমেয়েরাই তো পড়তে এসেছে। এখনো আসে। কিন্তু কার বাবা অথবা কাকার সাথে মন্ত্রীর সম্পর্ক ভালো এ খোঁজ তো সে জানে না। সেলিম স্যারের দুনিয়া খুবই সংক্ষিপ্ত ও সীমিত। তার পরিচিত ক্ষমতাধর লোক বলতে সে প্রিন্সিপাল স্যারকেই চেনে। মোবাইল ফোনে কথা বলার মতো মানসিকতা তার নেই। তাই প্রিন্সিপাল স্যারের নম্বরটা ডায়াল কলে দিয়ে সে তার ফোনটি আমাকে ধরিয়ে দিলো। এর আগে কখনোই আমি প্রিন্সিপাল স্যারের সাথে কথা বলিনি। আমাকে তিনি চিনতে পারবেন এতটুকু ভরসাও আমার নেই। তবে যে নম্বর থেকে ফোন করা হচ্ছে, সেটাই ভরসা। তাই হলো। রীতিমতো ফোনের ওপ্রান্ত থেকে সালাম দিয়ে বলে উঠলেন, জি সেলিম স্যার বলেন। আমি কাচুমাচু কণ্ঠে আমার পরিচয়টি পরিষ্কার করার চেষ্টা করলাম। তিনি আমার কথা ষোলোআনা বুঝতে পারলেন বা আমার মুখটির হাই রেজুলেশনের কোন ছবি তার চোখের রাডারে ধরা দিলোÑ এটা আমি বিশ্বাস করতে পারি না। তবে তিনি কথা শুরু করলেন। যত সংক্ষেপে পারলাম আমি সমস্ত বিষয়টি ভাঙা ভাঙা বাক্যে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করলাম। তিনি অভিজ্ঞ ডাক্তারের মতো একখানা ব্যবস্থাপত্র আমার কানকে বুঝিয়ে দিলেন। ফোনটি রাখতে যাচ্ছিলাম, এর মধ্যে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, নারী ও শিশুর বিল পরিশোধ? আমি বললাম, না স্যার। বিলটা একটু পরে দেন। আমি ফোন দিচ্ছি। তারপর দেন। আর বাচ্চাকে কি আমার গাড়িতে লেওন যাইব। আমি গাড়ি পাঠাব? আমি বললাম, না স্যার। অক্সিজেন ছাড়া বাচ্চাকে নেয়া যাবে না। ওকে- শব্দটি শোনার পর আমি পরবর্তী শব্দ শোনার অপেক্ষাতে আছি। কিন্তু ওপ্রান্ত থেকে আর কোনো আওয়াজ আমার কানকে স্পর্শ করছে না। বুঝলাম, তিনি ফোন রেখে দিয়েছেন। প্রিন্সিপাল স্যারের ব্যবস্থাপত্র মোতাবেক সাভারে, রাজ্জাক প্লাজার পেছনে সুপার হসপিটাল। সেটা নাকি বাচ্চাদের জন্য ভালো। সব কিছু গুছিয়ে ওঠার আগেই তিনি আবারো ফোন করলেন। তার এই ফোনের ফল আমরা কাউন্টারে গিয়ে পেলাম। হাসপাতালের হিসাবে আমাদের বিল হয়েছে, সাত হাজার ৪০০ টাকা। তবে আমাদের কাউন্টারে জমা দিতে হলো সাড়ে চার হাজার টাকা। সব বিল পরিশোধসাপেক্ষে আমরা হাসপাতালের ছাড়পত্র হাতে পেলাম। সেলিম স্যার এখন পর্যন্ত খুব শক্ত হওয়ার ভাব দেখাচ্ছেন। কিন্তু তার স্ত্রীর বুকের ভেতর চলা সামুদ্রিক ঝড়টি যেন আরো শক্তি সঞ্চয় করেছে এবং যা পূর্ণ শক্তিতে আঘাত হানছে তার নিজেরই বুকে।
একজন আয়া এসে বলল, আপনাগোর অ্যাম্বুলেন্স কইছেন নাকি? আমাদের কেউই বোধহয় কোনো কথা বললাম না। উঠে দাঁড়ালাম। অ্যাম্বুলেন্সে অক্সিজেন সিলিন্ডার চেক দিয়ে লাগানো হচ্ছে। কে কোন দিকে বসবে? তার সব হিসাব মিলিয়ে আমাকে বসানো হলো ড্রাইভারের পাশে। ড্রাইভার তার দরজার বাইরে দাঁড়ানো লোকটিকে জিজ্ঞাসা করল, রাস্তার হালহকিকত কী? আশুলিয়া বাজার হয়ে বিশ মাইল দিয়ে বের হয়ে যাবো নাকি? লোকটি মাথা নাড়িয়ে বলল, বিশ মাইলের রাস্তাতে সুয়েটার ফ্যাক্টরির লোকেরা নামছে। নবীনগর দিয়ে যানÑ বলে সে আর ওখানে দাঁড়াল না। লোকটি যেতে যেতে বিড় বিড় করছে। তার মুখের এই কথাটুকু ভেসে আমার কানেও এলো, দুনিয়ার মানুষ গরমে বাঁচছে না। আর সুয়েটার বানায়! ফ্যাক্টরি বন্ধ হবে না তো কী? যাওয়ার সময় যে রাস্তা দেখে গেলাম। এখনকার চেহারা তার ঠিক উল্টো। এখন দেখে মনে হচ্ছে না, এ রাস্তাতে কোনো দিন জ্যাম লেগেছিল। আইল্যান্ডের ওপর লাগানো বকুলগাছগুলো পলকে সরে যাচ্ছে অ্যাম্বুলেন্সের জানালা থেকে।
বেলা ৪টা পেরিয়ে গেছে। একবারও আমাদের কারো মুখে দুপুরে খাওয়ার কথা ফোটেনি। অনেকক্ষণ থেকে সেলিম স্যারের স্ত্রীর চোখ জোড়া শুকনো। তার বুকের ঝড়টি হয়তো থেমেছে। সে সেলিম স্যারকে উদ্দেশ করে বলল, এই কারোই তো খাওয়া-দাওয়া কিছু হয়নি। একটা ব্যবস্থা করতে পারবে না? সেলিম স্যার বলল, নেমে দেখি। সেলিম স্যারের স্ত্রীর সাথের একজন মহিলা আর আমি দু’জনই একগলায় বলে উঠলাম, না না। এসব কথা রাখেন তো। আগে বাচ্চাকে আল্লাহ ভালো করে তুলুক। তার পর। অথচ আমাদের পেটের নাড়িভুঁড়ি সব ক্ষুধায় গোল্লা পাকিয়ে আছে। কিন্তু অ্যাম্বুলেন্স থামিয়ে দুপুরের খাওয়ার মতো মানসিকতা কারো নেই।
সুপার হসপিটালেÑ নারী ও শিশু হাসপাতালের পরীক্ষা-নিরীক্ষার রিপোর্টগুলো দেখানো হলো। এরা সেগুলো দেখলেন, তবে সেগুলোকে তারা বোধহয় বিশ্বাস করতে চাইলেন না। সুপার হসপিটালের নিজস্ব বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ও পরীক্ষাগার আছে। আবার পরীক্ষা। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আমাদের বলল, হ্যাঁ, বাচ্চাকে এনআইসিইউতে রাখতে হবে। তবে সেজন্য শুধু হাসপাতালকে প্রতি ২৪ ঘণ্টায় বিল দিতে হবে চৌদ্দ হাজার টাকা। বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের মনিটরিং এবং ফার্মেসির বিল আলাদা। সেলিম স্যার, আমাদের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ালেন। তিনি বললেন, স্যার টাকা-পয়সা যা আমার কাছে ছিল সব শেষ। গত মাসে আমার মায়ের একটা অপারেশন হয়েছে। এ মুহূর্তে আবারো এই পরিমাণ বিল দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব না। তার মুখের কথাগুলো শেষ না হতেই আমি দেখলাম, তার দুই চোখের কোণে আবার বাঁধভাঙা বান ডেকেছে। হাসপাতালের প্রশাসনিক রুম থেকে তিনি জরুরি বিভাগের দিকে টান পায়ে হাঁটতে লাগলেন। আমি তার পেছন পেছন হাঁটছি কিন্তু কুলিয়ে উঠতে পারছি না। জরুরি বিভাগের ডাক্তারেরা আমাদের ওপর ভীষণ বিরক্ত হলেন, বাচ্চাকে কেন আমরা এখনো এখানে রেখেছি। সেলিম স্যার তার বাচ্চাটির দিকে ঝিম ধরে তাকিয়ে আছেন। বাচ্চাটির চোখের কোনাতে ছোট্ট একফোঁটা জল টলমল করছে। সেলিম স্যার হাত দিয়ে সে জল মুছে দিলেন। তিনি আমাকে বললেন, স্যার প্লিজ হেল্প, চলেন আমরা বাচ্চাকে এনআইসিইউতে নিয়ে যাই। পরদিন সকালে আমরা প্রিন্সিপাল স্যারকে জানালাম, তিনি বললেন, আপনারা হাসপাতালে যান, আমি দেখি কী করা যায়! প্রিন্সিপাল স্যারের সহায়তায় সুপার হাসপাতালেও সেলিম স্যার খানিকটা আর্থিক ছাড় পেলেন। কিন্তু ছাড়প্রাপ্ত এই অর্থ পরিশোধ করতেও সেলিম স্যারের দম যায় যায় অবস্থা। আর একদিনও তারপক্ষে বাচ্চাকে এখানে রাখা সম্ভব না।
দুপুর ১২টা পর্যন্ত আমাদের সময় ছিল। আমরা সাড়ে ১১টার দিকে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে গেলাম। উদ্দেশ্য, শ্যামলীর শিশু হাসপাতাল। গতকালের থেকে বাচ্চার অবস্থা আজকে একটু ভালো। হাসছে না, তবে চোখ মেলে তাকাচ্ছে এদিক-ওদিক। তাই আর অ্যাম্বুলেন্স দরকার হলো না। পনেরশো টাকায় একটা মাইক্রো ভাড়া করা হলো। এদিকে ভালোই গেলাম। শ্যামলী সিনেমা হলের সামনে গিয়ে আমাদের মাইক্রোটি জ্যামে আটকে গেল। সব কিছু পেরিয়ে আমাদের গাড়িটি শিশু মেলার সামনে এলে সেলিম স্যার আমাকে ইশারায় দেখালেন, স্যার এটা শিশু মেলা। বাচ্চাটা ভালো হলেÑ একদিন আমরা সবাই মিলে এখানে আসব। আমি তার প্রস্তাবে সম্মতি দিলাম।
শিশু হাসপাতালে অনেক মানুষের ভিড়। রোগীর স্বজনদের বসার চেয়ারগুলোর একটাও ফাঁকা নেই। চেয়ারের বসা মানুষের পেছনে বসার আকাক্সক্ষা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আর একজন মানুষ। টিকিট কাউন্টারে পুরুষের লাইনটি দীর্ঘ দেখে সেলিম স্যারের স্ত্রীকে লাইনে দাঁড় করিয়ে দেয়া হলো। তিনি সহজেই টিকিট হাতে ফিরলেন। এবার ডাক্তার দেখানোর লাইনে আমি দাঁড়ালাম। এ লাইনটিও অনেক লম্বা। যা হোক লাইনে দাঁড়ানো লোকজনের চিৎকার-চেঁচামেচি, কারো ব্যক্তিগত প্রভাবÑ সব কিছুর শেষে আমাদের পালা এলো। তারা ভেতরে গিয়ে এত দ্রুত বেরিয়ে এলেন যে, আমার মনে হলো তারা হয়তো ডাক্তারকে পাননি। না, ধারণা ভুল। ডাক্তার বাচ্চাকে দেখেই লিখেছে তাকে দ্রুত আইসিইউতে নিতে হবে। আমরা কাউন্টারে যোগাযোগ করলাম, কিন্তু কাউন্টার থেকে আমাদের বলা হলো, আগামী দুই দিন আইসিইউর কোনো সিট ফাঁকা নেই। আমাদের জোরাজুরির কারণে কাউন্টার থেকে আমাদের বলল, আচ্ছা ঠিক আছে, ডাক্তার লিখেছে, তার কাছ থেকেই সিট নেন। তিনি তো লিখেই খালাস। এখন কী করা যাবে? বিকল্প কোনো ব্যবস্থা আছে কিনাÑ তা জানার জন্য পুনর্বার ওই লাইন বেয়ে ডাক্তারের কাছে যাওয়া সম্ভব?


আরো সংবাদ