২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯

কাশ্মিরের স্বায়ত্তশাসন বাতিলে আঞ্চলিক শান্তি নস্যাৎ হবে

মাহবুব উল্লাহ (বাঁয়ে) ও বদরুদ্দীন উমর - ছবি : নয়া দিগন্ত

দিল্লিতে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু-কাশ্মিরের স্বায়ত্তশাসন এবং পৃথক রাজ্যের বিশেষ মর্যাদা বাতিল করায় গোটা দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে মানুষের মনে বিরাজ করছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। এর মূলে এক দিকে রয়েছে আঞ্চলিক শান্তি নস্যাতের আশঙ্কা, আরেক দিকে রয়েছে ভাগ্যবিড়ম্বিত কাশ্মিরের জনগণের ভবিষ্যৎ পরিণতির ভাবনা। অনেকের মতে ভারতের সর্বশেষ পদক্ষেপে কাশ্মির সঙ্কট কমবে না বরং বাড়বে এবং সেই সাথে বাড়বে আঞ্চলিক উত্তেজনা ও অশান্তি।

অপর দিকে দীর্ঘদিন ধরে স্বাধীনতার লড়াইরত কাশ্মিরী জনগণের সংগ্রাম আরো দীর্ঘ হবে। তীব্র হবে তাদের প্রতি দমন নির্যাতনের মাত্রা। বাড়বে তাদের দুঃখ দুর্দশা। কেউ কেউ কাশ্মিরীদের স্বাধীনতা সংগ্রাম আরো বেগবান হওয়ার কথা বললেও অনেকে মনে করেন তাদের স্বাধীনতা ও প্রতিরোধ সংগ্রাম শক্তির জোরে চিরতরে দমন করবে ভারত। কারণ বর্তমান বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিশ্বশক্তি ভারতের পক্ষেই থাকবে এবং কাশ্মিরের জনগণের মুক্তির লড়াই সুদূর পরাহতই থেকে যাবে। আর তীব্র হবে সেখানে ভারতের দমনপীড়ন। ভারত সেখানে ইচ্ছামতো তার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে যাবে এবং সে ক্ষেত্রে কারো কিছু করার থাকবে না। কাশ্মিরের জনগণ হয়তো শেষ পর্যন্ত লড়াই করে যাবে কিন্তু ভারতের হাত থেকে মুক্তির সম্ভাবনা অধরাই থেকে যেতে পারে। এভাবেই বলপ্রয়োগ করে একদিন হয়তো কাশ্মিরে প্রতিষ্ঠিত হবে ভারতের স্থায়ী দখলদারিত্ব। 

বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী বদরুদ্দীন উমর বলেন, ইসরাইল যেভাবে ফিলিস্তিন ভুখণ্ড দখল করছে ঠিক সেভাবে ভারত কাশ্মীর দখল করেছে। শুধু কাশ্মির নয় এর আগে ভারত সিকিমসহ আরো বিভিন্ন অঞ্চল দখল করেছে। কাশ্মির নিয়ে ভারত সর্বশেষ যে পদক্ষেপ নিলো তাতে কাশ্মিরে অশান্তি বাড়বে। বাড়বে কাশ্মিরী জনগণের দুঃখ দুর্দশা। ভারত সেখানে যা ইচ্ছা তাই করবে। এ ক্ষেত্রে তাকে বাধা দেয়ারও কেউ থাকবে না কারণ বিশ্বশক্তি থাকবে ভারতের পক্ষে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের সাবেক শিক্ষক প্রফেসর ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, কাশ্মিরের স্বায়ত্তশাসন ও বিশেষ মর্যাদা কেড়ে নেয়ায় আঞ্চলিক শান্তি নষ্ট হবে। কাশ্মির সঙ্কট আরো ঘণীভূত হবে। পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করবে। 

প্রফেসর মাহবুব উল্লাহ বলেন, তবে সবচেয়ে বড় কথা হলো কাশ্মিরের জনগণ। কাশ্মিরের জনগণ কখনো ভারতের পক্ষে ছিল না। এখনো নেই। দীর্ঘ দিন ধরে তারা ভারতের বিরুদ্ধে লড়াই করে আসছে। সে লড়াই চলবে। ভারতের সর্বশেষ পদক্ষেপে কাশ্মিরের স্বাধীনতার লড়াই আরো জোরদার হবে। তবে সার্বিক পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে তা নির্ভর করবে বিশ্বের অন্যান্য শক্তি কী ভূমিকা পালন করে তার ওপর। কারণ এটি শুধু ভারত ও পাকিস্তানের বিষয় নয়। এর সাথে জড়িত রয়েছে চীন। ভারত কাশ্মিরের স্বায়ত্তশাসন ও বিশেষ মর্যাদা কেড়ে নেয়ার পর গোটা পাকিস্তান ও চীনের অধীনে থাকা কাশ্মীরকেও নিজেদের বলে দাবি করেছে। যদিও এটা তাদের বাগাড়ম্বর ছাড়া আর কিছু নয় কিন্তু এর সাথে চীনকে জড়ানোয় পরিস্থিতি আরো জটিল আকার ধারণ করবে সন্দেহ নেই। 

প্রফেসর মাহবুব উল্লাহ আরো বলেন, ভারত দীর্ঘ দিন ধরে কাশ্মিরে মানবাধিকার চরমভাবে লঙ্ঘন করে আসছে, কাশ্মিরের জনগণের ওপর নির্যাতন করছে। কাশ্মির বিষয়ে সর্বশেষ পদক্ষেপে ভারত আন্তর্জাতিক বিশ্বে গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলে যে বিশেষ মর্যাদা ভোগ করত তার সুযোগ আর থাকবে না। 

কাশ্মির নিয়ে সর্বশেষ পদক্ষেপে ভারত নিজেই নিজের অশান্তি ডেকে আনল কি না এ প্রশ্নের জবাবে প্রফেসর মাহবুব উল্লাহ বলেন, কাশ্মির নিয়ে ভারত কখনো সুখে ছিল না। বর্তমান ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মির কিভাবে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হলো সে ইতিহাস প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের সময় দেশীয় রাজ্যগুলোর জন্য নিয়ম করা হয়েছিল তারা স্বাধীনভাবে ভারত বা পাকিস্তানে যোগ দিতে পারবে। তখন শুরু হয় ভারত পাকিস্তানের শক্তির খেলা। কাশ্মিরের জনগণ ছিল মুসলিম কিন্তু রাজা ছিল হিন্দু। হিন্দু রাজা ভারতে যোগ দেয়ার সাথে তখন কাশ্মিরের জনগণের কোনো সম্পর্ক ছিল না। 

এ দিকে কাশ্মির বিষয়ে ভারতের সর্বশেষ পদক্ষেপে শুধু ভারতের বাইরে নয় বরং ভারতেরও বিভিন্ন মহলে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধী বলেছেন, প্রশাসনিক ক্ষমতার এই অপব্যবহারে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তায় গভীর প্রভাব পড়বে। জম্মু-কাশ্মিরকে দুই ভাগ করে ভারতের সংহতি বাড়ানো গেল না। ভারত কয়েক খণ্ড জমি নিয়ে গঠিত নয় বরং এ জাতি গড়েছে জনগণ। 
সাধারণ মানুষও বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাশ্মির ও কাশ্মিরের সংগ্রামরত জনগণের ভবিষ্যৎ পরিণতির কথা ভেবে গভীর উদ্বেগ ব্যক্ত করে চলেছেন।


আরো সংবাদ