১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯
রোহিঙ্গা আশ্রয়ের দুই বছর

মিয়ানমারের কৌশলে একজন রোহিঙ্গাও ফেরেনি

মিয়ানমারের কৌশলে একজন রোহিঙ্গাও ফেরেনি - ছবি : এএফপি

বাংলাদেশে মজলুম রোহিঙ্গারা আশ্রয় গ্রহণের দুই বছর আজ। ২০১৭ সালের এই দিনে বৌদ্ধ উগ্রবাদীদের সাথে নিয়ে মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনী রাখাইনে মুসলিম সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের ওপর পরিকল্পিত নিধনযজ্ঞ চালিয়েছিল। এটিকে জাতিগত নিধনের পাঠ্যপুস্তকীয় উদারহণ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে জাতিসঙ্ঘ। 

মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের সমঝোতা অনুযায়ী চুক্তি স্বাক্ষরের দুই মাসের মধ্যে অর্থাৎ ২০১৮ সালের ২৩ জানুয়ারি থেকে প্রত্যাবাসন শুরু হওয়ার কথা ছিল কিন্তু এ পর্যন্ত কক্সবাজারে আশ্রয় নেয়া একজন রোহিঙ্গাকেও রাখাইনে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি। মিয়ানমার নানা কূটকৌশলে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় বারবার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। দুই দেশের সরকারি কর্মকর্তাদের দফায় দফায় বৈঠকের পর গত ১৫ নভেম্বর ও ২২ আগস্ট রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু হওয়ার কথা ছিল কিন্তু মিয়ানমারের নাগরিকত্ব, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, বসতবাড়ি ফেরত পাওয়ার দাবি পূরণের আগে রোহিঙ্গারা রাখাইনে ফিরে যেতে অস্বীকৃতি জানায়। আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতার জন্য বাংলাদেশের পক্ষেও রোহিঙ্গাদের জোর করে ফেরত পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। তাই প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশ শরণার্থীর জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে। কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর এটি অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। রোহিঙ্গাদের সাথে স্থানীয়দের সঙ্ঘাত বাড়ছে। বন-জঙ্গল উজাড় হয়ে পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এই অবস্থায় প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে কঠোর অবস্থানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

এ ব্যাপারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আব্দুল মোমেন প্রত্যাবাসনে বাধা দেয়ার জন্য দেশী-বিদেশী এনজিওদের দায়ী করেছেন। জাতিসঙ্ঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে বাংলাদেশের চেয়ে মিয়ানমারে কর্মতৎপরতা বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন। রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে পাঠানোসহ তাদের জীবনে আরাম কমানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ড. মোমেন বলেন, কক্সবাজারে এনজিওগুলো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তৎপর রয়েছে। বেশ কিছু দেশী ও বিদেশী এনজিও রোহিঙ্গাদের ফিরে না যাওয়ার জন্য ইন্ধন যোগাচ্ছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডে যুক্ত এনজিওগুলো তাদের কাজ করার শর্ত লঙ্ঘন করছে। এসব এনজিওর ওপর আমরা নজরদারি বাড়াব। তিনি বলেন, মাঝি হিসেবে পরিচিতি রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর অনেক নেতাই বিভিন্ন ধরনের অপকর্মে লিপ্ত রয়েছে। এ সব মাঝিদের শাস্তির আওতায় আনা হবে। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মিডিয়াগুলো বাংলাদেশে হইচই না করে মিয়ানমারের রাখাইনে গিয়ে কাজ করা উচিত, যাতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য সেখানে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গাদের বুঝিয়ে ফেরত পাঠানোর চেষ্টা সরকার অব্যাহত রেখেছে। এ জন্য রোহিঙ্গা মাঝিকে রাখাইনে নিয়ে সরেজমিন পরিস্থিতি দেখার সুযোগ দিতে মিয়ানমারকে প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। এটা প্রত্যাবাসনের জন্য রোহিঙ্গাদের আস্থা সৃষ্টিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। 

এদিকে প্রত্যাবাসনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী এনজিওদের তালিকা তৈরি করছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে ঢোকার ক্ষেত্রেও কড়াকড়ি আরোপ করা হচ্ছে। প্রত্যাবাসনের জন্য রোহিঙ্গাদের সাক্ষাৎকার নেয়ার পদ্ধতি বাদ দেয়া যায় কি না তা নিয়ে আলোচনা চলছে। রাখাইনে ফেরত পাঠাতে রোহিঙ্গাদের ওপর কার্যকর চাপ সৃষ্টির উপায় নিয়ে সরকারের ভেতর চিন্তা-ভাবনা চলছে। অপরাধে জড়িত রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে আরো কঠোর অবস্থানে যেতে চায় সরকার।
গত বৃহস্পতিবার রাতে একটি তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে একদল রোহিঙ্গার হাতে প্রাণ হারায় টেকনাফের এক যুবলীগ নেতা। এর প্রেক্ষাপটে পরদিন রাতে দুইজন রোহিঙ্গা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্রসফায়ারে নিহত হয়। এর আগে বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গা সন্ত্রাস ও মাদকদ্রব্য চোরাচালানোর সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছে। এ সব ঘটনা সরকারের কঠোর অবস্থানে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মনির বলেন, রোহিঙ্গাদের ওপর সরাসরি চাপ প্রয়োগ করে খুব একটি লাভ হবে না বরং মিয়ানমারের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থানে যেতে হবে। দ্বিপক্ষীয় প্রক্রিয়ায় এর অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারের দেয়া শর্তগুলো বাংলাদেশ মেনে নিচ্ছে। প্রত্যাবাসনের জন্য তারিখ নির্ধারণ, তালিকা প্রস্তুতÑ সবই মিয়ানমারের কথায় হয়েছে। এ অবস্থার পরিবর্তন করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক সৈয়দা রোজানা রশিদ বলেন, আন্তর্জাতিক মহলে কৌশলগত অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে খুব একটি কঠোর হতে পারবে না। প্রথমত ইস্যুটির একটি মানবিক দিক রয়েছে। দ্বিতীয়ত ইস্যুটির সাথে বাংলাদেশের ইমেজ জড়িত। তাই প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টির লক্ষ্যে বাংলাদেশকে কূটনৈতিক তৎপরতার ওপরই নির্ভর করতে হবে। 

রোহিঙ্গা ইস্যুতে পশ্চিমা দেশগুলোর সমর্থন পেলেও চীন, রাশিয়া ও ভারতের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সহায়তা পাচ্ছে না বাংলাদেশ। ভেটো ক্ষমতার অধিকারী চীন ও রাশিয়া জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদে রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপই নিতে দিচ্ছে না। অন্য দিকে ভারত রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে কৌশলে ভারসাম্য বজায় রেখেছে। মিয়ানমারে এই তিনটি দেশেরই জোরালো অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ রয়েছে।
এ ব্যাপারে সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেন, রোহিঙ্গারা ফিরতে চায়নি। এর কারণ মিয়ানমারের প্রতি তাদের আস্থার অভাব। এই আস্থাহীনতার পেছনে যথেষ্ট যৌক্তিক কারণও আছে। রোহিঙ্গারা যে পরিবেশে রাখাইন ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল, তা ছিল বিভীষিকাময়। সেখানে তাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে, হত্যা করা হয়েছে, ধর্ষণ করা হয়েছে।

এ ধরনের পরিস্থিতির ভেতর থেকে যারা প্রাণভয়ে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছিল, তাদের মনে আস্থা ফিরিয়ে আনা সহজ ব্যাপার নয়। ২০১৭ সালের আগস্টের সেই বিভীষিকার পর এত দিনেও মিয়ানমার এমন কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়নি, যার মাধ্যমে প্রমাণ হয়- রাখাইনে সত্যিকার অর্থেই রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে বরং সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংস্থা প্রকাশিত রিপোর্টগুলোতে দেখা যাচ্ছে, রাখাইনে এখনো ভীতির পরিবেশ দূর হয়নি। তাই রোহিঙ্গারা আস্থার সঙ্কটে ভুগছে। সেখানে ফিরে গেলে তারা নিরাপদে বসবাস করতে পারবে কি না কিংবা অন্যান্য অধিকার পাবে কি না সেটা নিয়ে তাদের মধ্যে সংশয় রয়েছে। এই আস্থার পরিবেশ সৃষ্টির দায়িত্ব মিয়ানমারের। মিয়ানমারকেই প্রমাণ করতে হবে, রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সঙ্কট দীর্ঘায়িত করার সুযোগ নেই। কারণ এ সঙ্কট অদূর ভবিষ্যতে শুধু বাংলাদেশের একার থাকবে না, এটা এ অঞ্চলের জন্য একটা বড় সমস্যায় পরিণত হবে। এ সপ্তাহে ঢাকা সফরে এসে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও এ কথা বলে গেছেন। যত সময় যাবে, এ সঙ্কট আরো জটিল হবে। তাই প্রত্যাবাসনের কাজটি দ্রুতই করতে হবে। বাংলাদেশকে আরো বেশি প্রচেষ্টা চালাতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং প্রতিবেশীদের নিয়ে সম্মিলিত প্রচেষ্টা জোরদার করতে হবে। সম্মিলিত প্রয়াস অবশ্যই রোহিঙ্গাদের মনে আস্থা ফিরিয়ে আনবে, মিয়ানমারে ফিরতে তাদের উদ্বুদ্ধ করবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ও সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডির পরিচালক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, আমি মনে করি না, প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে মিয়ানমার আন্তরিক। আগামী মাসে জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন বসছে। মিয়ানমার জানে, এ অধিবেশনে রোহিঙ্গা ইস্যুতে একটি বড় চাপ আসবে। তাই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে মিয়ানমার লোক দেখানো আন্তরিকতা দেখাচ্ছে। জাতিসঙ্ঘের সংস্থা ও এনজিওগুলোর কারণে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরছে না।

তিনি বলেন, মূল বিষয়টি হলো মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ হয়েছে। এরপর পরিস্থিতি উন্নতির কোনো খবর আমাদের জানা নেই। গণহত্যার শিকার একটি জনগোষ্ঠীকে যদি বলা হয়, প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ধীরে ধীরে তাদের অধিকার দেয়া হবে, তাহলে তো তারা বিশ্বাস করবে না। আর মিয়ানমারের কথায় তারা ফিরেও যাবে না।

অধ্যাপক ইমতিয়াজ বলেন, মিয়ানমারে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে। সেই পরিবর্তন যখন আসবে তখনই নতুন আইনের মাধ্যমে রোহিঙ্গারা সেখানে নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি পাবে। তখনই বলা যাবে যে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে আন্তরিক। আমি এখনো মনে করি না, মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে চায় বরং তারা এক ধরনের কূটনীতি খেলছে।


আরো সংবাদ