২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯

ব্রুনাইয়ের শ্রমবাজারে দালাল চক্রের থাবা

ব্রুনাইয়ের শ্রমবাজারে দালাল চক্রের থাবা - ছবি : সংগৃহীত

বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশ ব্রুনাই। অল্প সময়ের মধ্যে দেশটি বাংলাদেশের বড় শ্রমবাজারে পরিণত হয়ে উঠেছে। ব্রুনাইয়ে বাংলাদেশ দূতাবাস বলছে, দেশটিতে প্রায় ৩০ হাজার বাংলাদেশী রয়েছে। তবে এ সংখ্যা আরো বেশি বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

সম্প্রতি দেশটির সরকার কিছু মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এতে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশী শ্রমিকের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু দালাল চক্রের দৌরাত্ম্যের কারণে সম্ভাবনাময় শ্রমবাজারটি হারানোর আশঙ্কা করে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমদকে চিঠি দিয়েছেন ব্রুনাইয়ে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার এয়ার ভাইস মার্শাল (অব:) মাহমুদ হোসেন।

গত ৮ আগস্ট প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রীকে ব্রুনাইয়ের শ্রমবাজারের সার্বিক দিক তুলে ধরে চিঠি দেন তিনি। ব্রুনাইয়ের দুটি বড় উন্নয়ন প্রকল্পে শ্রমিকের চাহিদার কথা উল্লেখ করে চিঠিতে বলা হয়, এ উপলক্ষে বাংলাদেশী প্রায় ৪০ হাজার শ্রমিক নেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে ব্রুনাই সরকারের। বাংলাদেশী শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ থাকলেও স্থানীয়দের যোগসাজশে গড়ে ওঠা ব্রুনাই ভিত্তিক বাংলাদেশী ভিসাদালাল চক্র এবং বাংলাদেশের বিমানবন্দরে সক্রিয় কিছু ‘বডিকন্ট্রাক্ট’ দলের দৌরাত্ম্যের কারণে এ শ্রমবাজার স্থায়ীভাবে ক্ষতির মুখে পড়তে যাচ্ছে। দালাল এবং বডিকন্ট্রাক্ট চক্রের এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে ব্রুনাই সরকার এবং বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট সব দফতরকে অবহিত করা হয়েছে। কিন্তু এ দুর্বৃত্তচক্রের বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে কি না সে বিষয়ে মিশন জ্ঞাত নয়।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ‘... সাধারণত বাংলাদেশী নামসর্বস্ব কোম্পানি, যাদের কোনো উন্নয়ন প্রকল্প, অফিস, স্টাফ হাউজ কোনো কিছু নেই; তারাই মূলত এ ধরনের ভিসা ব্যবসার সাথে জড়িত। সম্প্রতি কিছু ভিসাদালাল চক্র স্থানীয় দুষ্টুচক্রের সহায়তায় ব্রুনাই ইমিগ্রেশন এবং লেবার ডিপার্টমেন্টের সিল ও সই জাল করে বাংলাদেশী কর্মীদের নামে কয়েক হাজার ভুয়া ভিসা তৈরি করেছে মর্মে ব্রুনাই সূত্রে জানা গেছে। এ ধরনের ঘটনা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক এবং দুর্বৃত্ত চক্রকে এ ধরনের কাজ থেকে নিবৃত্ত করা না গেলে এ শ্রমবাজার বাংলাদেশ স্থায়ীভাবে হারাতে পারে।’

এ দালালচক্রের দৌরাত্ম্যের কারণে গত ৪ আগস্ট ঢাকাস্থ ব্রুনাই দূতাবাস বাংলাদেশী চাকরি প্রার্থীদের আবেদন কিছু দিনের জন্য বন্ধ করে দেয়। গত ২২ আগস্ট থেকে এ নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলেও ভিসা দালাল এবং ‘বডিকন্ট্রাক্ট’ চক্রকে নির্মূল করা না গেলে শ্রমবাজারটির বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে। এমন আশঙ্কায় ব্রুনাইস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনের পক্ষ থেকে চারটি সুপারিশ করা হয়।

হাইকমিশনের প্রথম সুপারিশে বলা হয়, ব্রুনাইয়ের বিভিন্ন সংস্থায় এ দালাল চক্রের বিরুদ্ধে রিপোর্ট ও মামলা করেও কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি। এমতাবস্থায় ভিসা জালিয়াত চক্রের পাসপোর্ট বাতিল করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে প্রস্তাব দেয়া হয়। এ জন্য চিহ্নিত ২১ বাংলাদেশী দালালের পাসপোর্ট বাতিল করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা বিভাগের সচিব মো: শহিদুজ্জামানকে চিঠি দিয়েছে হাইকমিশন।

দ্বিতীয় সুপারিশে বলা হয়, বাংলাদেশের বিমানবন্দরে চলমান ‘বডিকন্ট্রাক্ট’ বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে। গত বছর ব্রুনাই হাইকমিশনের তথ্য মতে, ২০ হাজার ভিসা স্ট্যাম্পিং হলেও মাত্র পাঁচ হাজার কর্মীর ভিসা শ্রম উইং থেকে সত্যায়ন হয়েছে। তৃতীয়ত শ্রম উইংয়ের ভিসা সত্যায়নসাপেক্ষে বিএমইটির বহির্গমন কার্ড বা স্মার্টকার্ড নিয়ে ব্রুনাই গমন নিশ্চিত করতে হবে। সর্বশেষ সুপারিশ হচ্ছে, সত্যায়ন ছাড়া যাতে কোনো বাংলাদেশী কর্মী ব্রুনাই প্রবেশ করতে না পারে সে বিষয়ে নজর দিতে হবে।

জানা যায়, মালয়েশিয়ার সারওয়াক প্রদেশ ঘেরা দ্বীপ রাষ্ট্র ব্রুনাই। রাজধানী বন্দর সেরি বেগাওয়ান। দেশটির আয়তন মাত্র পাঁচ হাজার ৭৬৫ বর্গকিলোমিটার। জনসংখ্যা মাত্র সাড়ে চার লাখের মতো। তেল আর খনিজ সম্পদে ভরপুর ব্রুনাই বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশ। জনসংখ্যার বেশির ভাগই মুসলিম। জাতিগতভাবে যাদের বেশির ভাগই মালয়ী। এর বাইরে চীনসহ অন্যান্য বংশোদ্ভূত মানুষের বসবাস সেখানে। ইসলামী প্রজাতান্ত্রিক ব্রুনাই দারুসসালাম ১৯৮৪ সালে স্বাধীনতা লাভ করে।

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য মতে, মাত্র ২২৮ জন কর্মী পাঠানোর মধ্য দিয়ে ১৯৯২ সালে ব্রুনাই বাংলাদেশের শ্রমবাজারে যুক্ত হয়। এখন পর্যন্ত দেশটিতে প্রায় ৭৩ হাজার বাংলাদেশী কর্মসংস্থানের জন্য গেছে। তাদের মধ্যে কতজন দেশে ফিরেছে সে তথ্য বিএমইটিতে নেই। তবে ব্রুনাইস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের তথ্য মতে, দেশটিতে বর্তমানে ৩০ হাজারের মতো বাংলাদেশী রয়েছে। যাদের বেশির ভাগই নির্মাণ খাতে কর্মরত। তবে অন্যান্য সূত্রগুলো বলছে, এ সংখ্যা আরো বেশি হবে।

বাংলাদেশ হাইকমিশনসহ বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক হিসেবে গিয়ে ব্রুনাইতে নামে-বেনামে কোম্পানি খুলে বসেছে এক শ্রেণীর প্রবাসী বাংলাদেশী। এ সংখ্যা তিন হাজারের মতো হবে। যারা স্থানীয় (বিশেষ করে চাইনিজ) কিছু অসৎ লোকের সাথে আঁতাত করে সাবকন্ট্রাক্টে শ্রমিক ভিসা বের করে বাংলাদেশ থেকে ভালো বেতনের লোভ দেখিয়ে লোক নিয়ে যাচ্ছে। তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকায় ভালো কাজ ও বেতনের কথা বলে শ্রমিক নিয়ে গেলেও তাদের বেশির ভাগই কাজ-কর্ম পাচ্ছে না। নিজের কোম্পানির নামে শ্রমিক নিয়ে অন্যের কাছে ভাড়া দিচ্ছে এই চক্র। বিনিময়ে প্রতি শ্রমিকের বিপরীতে তারা মাসে ৫০ থেকে ৭০ ডলার আয় করছে। দূতাবাসের সত্যায়ন ছাড়া শ্রমিক পাঠানোর সুযোগ না থাকলেও ব্রুনাই এবং বাংলাদেশে গড়ে ওঠা বাংলাদেশী দালাল চক্র ‘বিমানবন্দর কন্ট্রাক্ট’ করে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে হাইকশিনের শ্রম উইংয়ের কর্মকর্তাদের সিল ও স্বাক্ষর জাল করে বিএমইটির স্মার্টকার্ড তৈরি করে শ্রমিক ব্রুনাই নিয়ে যাচ্ছে। বিষয়গুলো দীর্ঘ দিন ধরে চলে আসছে।
প্রতারণার শিকার শ্রমিকরা পরে দূতাবাসের শ্রম উইংয়ের সহযোগিতা চাইলে দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে গিয়েও নানা হুমকি-ধামকির শিকার হচ্ছেন কর্মকর্তারা। স্থানীয়দের নিয়ে বাংলাদেশী দালাল চক্র এতটা শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে যে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দূতাবাস তাদের সাথে পেরে উঠছে না। ব্রুনাই সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতর এবং বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ, পররাষ্ট্র এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেও বারবার এ বিষয়ে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ হাইকমিশন। কিন্তু কিছুতেই দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা যায়নি।

এ বিষয়ে ব্রুনাইস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনে নিযুক্ত প্রথম সচিব (শ্রম) জিলাল হোসেন দালালদের দৌরাত্ম্যের কথা স্বীকার করে এ প্রতিবেদককে বলেন, বৈধভাবে যারা ব্রুনাইতে এসেছে তাদের বেশির ভাগ ভালো আছে। কিন্তু অবৈধভাবে যারা এসেছে তারা চরম দুরবস্থায় রয়েছে। তারা রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়, খাবার সংগ্রহের জন্য মসজিদে মসজিদে ঘোরে। আবার এমন অনেকেও আছে, যাদেরকে মালিকপক্ষ দীর্ঘ দিন ধরে বেতন-ভাতা দেয় না। এক বছরে এ রকম বাংলাদেশীদের প্রায় চার কোটি টাকা আমরা আদায় করে দিয়েছি।

ব্রুনাইয়ে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার এয়ার ভাইস মার্শাল (অব:) মাহমুদ হোসেন এ প্রতিবেদককে বলেন, দালাল চক্রের দৌরাত্ম্যের কারণে ব্রুনাই সরকার আপাতত শ্রমিক আনা সাময়িক বন্ধ রেখেছিল। যদিও এটা খুলে দিয়েছে কিন্তু এসব দুষ্কৃতকারীকে কঠোর হস্তে দমন করতে না পারলে শ্রমবাজার ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি বলেন, আমরা ব্রুনাই সরকারের সাথেও কথা বলছি। কাজ ছাড়া, হাইকমিশনের সত্যায়ন ছাড়া যাতে অন্য কোনোভাবে একটি লোকও আসতে না পারে সেটি নিশ্চিত করতে হবে।

গত ২৫ আগস্ট এ বিষয়ে কথা হয় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব রৌনক জাহানের সাথে। ব্রুনাইয়ের শ্রমবাজার প্রসঙ্গে কথা বলতে চাইলে তিনি ব্যস্ত আছেন বলে জানান। এ ব্যাপারে পরে যোগাযোগের কথা বলেন। বর্তমানে তিনি জাপান সফরে আছেন।


আরো সংবাদ