২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯

কুয়েত যেতে খরচ পড়ছে ৬ লাখ টাকা : পথে পথে ঘুরছে অনেকে

কুয়েত যেতে খরচ পড়ছে ৬ লাখ টাকা : পথে পথে ঘুরছে অনেকে - ছবি : সংগৃহীত

বাংলাদেশ থেকে একজন কর্মীকে কুয়েতে যেতে খরচ করতে হচ্ছে ছয় লাখ টাকা। দালালের খপ্পরে পড়লে কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরো বেশি হচ্ছে। কিন্তু দুই বছরের চুক্তিতে পাড়ি জমানো এসব কর্মী তাদের ব্যয় করা পুঁজির টাকাই তুলতে হাঁফিয়ে উঠছেন। এর পরও যেসব জনশক্তি রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান দেশটিতে উচ্চ অভিবাসন ব্যয়ে কর্মী পাঠাচ্ছেন, তাদের ব্যাপারে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে কোনো ধরনের নজরদারি বা মনিটরিং করা হচ্ছে না। যার কারণে দেশটিতে যাওয়ার পর চুক্তি মোতাবেক অনেক শ্রমিক চাকরি, বেতন-ভাতা, থাকা, খাওয়ার সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অনেকে আবার ফ্রি ভিসার নামে গিয়ে আকামা জটিলতায় পড়ে পথে পথে ঘুরছেন। যদিও ভারত ও নেপাল থেকে সোয়া লাখ টাকায় একজন শ্রমিক যেতে পারছে। তাদের দেশের দূতাবাসের কর্মকর্তাদের দায়িত্বশীল ভূমিকার কারণে কম টাকায় কর্মীরা যেতে পারছেন। যেটি বরাবরের মতো বাংলাদেশ দূতাবাস ব্যর্থ হচ্ছে বলে স্থানীয় ও জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

চলতি সপ্তাহের একাধিক দিনে কুয়েত থেকে বাংলাদেশী একাধিক টেলিভিশনের প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত থাকা সাংবাদিকেরা নাম না প্রকাশের শর্তে ‘কুয়েতের শ্রমবাজার’ নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে বলেছেন, কুয়েতে যারা শ্রমিক হিসেবে আসছে তাদের মধ্যে এখন অনেকেই বিভিন্ন সমস্যার মধ্যে আছেন। কেউ আছেন চাকরির সমস্যায়। কেউ আছেন আকামা সমস্যায়। তারা বলেন, ফ্রি ভিসার (বলদিয়া) নামে এসে আকামা না হওয়ার কারণে অনেকেই বেকার অবস্থায় পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। ঘুরছেন পথে পথে।

অনেকে আবার পুলিশের অভিযানে ধরা পড়ে কারাগারে বন্দী আছে। প্রতারিত এসব শ্রমিক কত টাকা খরচ করে কুয়েতে গেছেন জানতে চাইলে তারা বলেন, যারা দালালদের (মামা খালু) মাধ্যমে ভিসা সংগ্রহ করে রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে প্রসেসিং করে এসেছে, তাদের প্রত্যেকে ছয় লাখ টাকার কমে আসতে পারেনি। কিন্তু দেখা যাচ্ছে দুই বছরের চুক্তিতে এসে এসব শ্রমিকরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে থাকা-খাওয়া বাদ দিয়ে পুঁজির অর্ধেক টাকাও আয় করতে পারছেন না। আসার পর তারা কান্নাকাটি করেন। তখন আর তাদের কান্না শোনার লোক থাকে না।

এক প্রশ্নের উত্তরে তারা বলেন, একজন শ্রমিক প্রতিদিন ৯ ঘণ্টা ডিউটি করলে মাসে কুয়েতি ৬০ দিনার বেতন পায়। আবার যারা ১৫-১৬ ঘণ্টার কাজের ভিসায় আসছেন তারা ৯০-১১০ দিনার বেতন পাচ্ছেন। এক দিনার সমান বাংলাদেশী ২৭৪ টাকা। ওই হিসাবে দেখা যাচ্ছে, একজন শ্রমিক মাসে ১৬ হাজার ৫০০ টাকা উপার্জন করতে পারছেন। ভাগ্য ভালো থাকলে ওভারটাইম পেয়ে যান। সবমিলিয়ে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত একজন শ্রমিক কামাই করতে পারছেন। কিন্তু সে জেনে হোক আর না জেনেই হোক মামা খালুর পাঠানো ভিসাতেই ছয় লাখ (বিমান ভাড়াসহ অন্যান্য খরচ) টাকা খরচ করেই এ দেশে আসতে হচ্ছে। এর কমে কেউ আসছে না বলে তারা দাবি করেন।

অপর এক প্রশ্নের উত্তরে তারা বলেন, এমনিতে এখন কুয়েতের সার্বিক শ্রমবাজার ভালো অবস্থার মধ্যে নেই। অনেক কোম্পানি ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যে তারা যে কোম্পানিকে কাজ করতেন সেটিও প্রায় পাঁচ মাস ধরে বন্ধ ছিল জানিয়ে বলেন, এই মুহূর্তে কুয়েতে আসা মানে কর্মীদের নিজেদের বিপদ নিজেদের ডেকে আনা! ছয় লাখ টাকায় বাংলাদেশী কর্মীরা কুয়েতে যাচ্ছেন, এটা কুয়েতে নিযুক্ত বাংলাদেশ দূতাবাস কি জানে? এমন প্রশ্নের উত্তরে স্বপন নামের একজন প্রতারিত শ্রমিক এ প্রতিবেদককে শুধু বলেন, বাংলাদেশ দূতাবাসের পক্ষ থেকে শুনেছি ভিসার দাম যাতে কম থাকে সেজন্য নানাভাবে ক্যাম্পেইন করা হয়। চেষ্টা করেছেন দালালদের চিহ্নিহ্নত করতে। কিন্তু তারা পারেননি।

ওই শ্রমিক বলেন, কুয়েতের শ্রমবাজারের সর্বশেষ অবস্থা জানিয়ে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে দূতাবাস থেকে প্রতিবেদনও পাঠানো হয় প্রায়ই। কিন্তু কোনোভাবেই ভিসা ট্রেডিং চক্রের সদস্যদের দূতাবাস ঠেকাতে পারছে না। কারণ যারা কোম্পানি থেকে ভিসা সংগ্রহ করছে, তাদের বেশির ভাগ বাংলাদেশী লেবার শ্রেণীর। তারা কোম্পানি থেকে ভিসা সংগ্রহ করে তাদের আত্মীয়স্বজনদের আনার জন্য পাঠিয়ে দেন। তবে তাদের জানা মতে, ভারত, নেপালসহ অন্যান্য দেশ থেকে যেসব শ্রমিক কুয়েতে আসছে, তাদের যেতে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা খরচ হচ্ছে। এটা কিভাবে সম্ভব হচ্ছে, জানতে চাইলে তারা বলেন, ওদের দূতাবাসের কর্মকর্তারা এই বিষয়ে সার্বক্ষণিক নজরদারি মনিটরিং করার পাশাপাশি দেশটির শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ থাকে। যার কারণে ওই সব দেশের শ্রমিকেরা কম টাকায় অনায়াশে গিয়ে ভালো বেতনে কাজ পাচ্ছেন। বিষয়টি সরেজমিন তদন্ত করলেই প্রকৃত রহস্য বেরিয়ে আসবে বলে তারা মতামত দেন।

এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে কুয়েতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আবুল কালাম আজাদ এর সাথে গতকাল সোমবার রাতে যোগাযোগ করা হলে তার বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি। জানা গেছে, প্রায় ছয় মাস ধরে বাংলাদেশ দূতাবাসের কাউন্সেলর (শ্রম) পদটি খালি পড়ে আছে। তবে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে আনিসুজ্জামান নামের একজন কর্মকর্তা লেবার কাউন্সিলর শাখার সার্বিক কার্যক্রম চালিয়ে নিচ্ছেন।


আরো সংবাদ