১৯ আগস্ট ২০১৯

বন্যায় ৭ শিশুর মৃত্যু

চলমান বন্যা পরিস্থিতির কোনো উন্নতির লক্ষণ নেই। দেশের সব প্রধান নদ-নদীর পানি আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে পানিবন্দী মানুষের দুর্ভোগও বাড়ছে। নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়ে বিপদগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। টানা ভারী বর্ষণ ও উজানের ঢলে বিভিন্ন নদ-নদীর পানি ৬৮টি পয়েন্টে বেড়েছে। এর মধ্যে ১৪টি নদীর ২৫ পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কুড়িগ্রাম ও জামালপুরে বন্যার পানিতে ডুবে সাত শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।

এদিকে বন্যার্তদের জন্য সরকারিভাবে ত্রাণ সরবরাহ খুবই অপ্রতুল বলে অভিযোগ করছেন তারা। অনেক স্থানে সড়ক যোগাযোগ অচল হয়ে রয়েছে এক সপ্তাহ। আবহাওয়া বিভাগের পূর্বাভাসে আগামী ২৪ ঘণ্টায় কুড়িগ্রাম, জামালপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া ও সিরাজগঞ্জ জেলায় বন্যার আরো অবনতির আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

কুড়িগ্রাম সংবাদদাতা জানান, কুড়িগ্রামে সবকটি নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে পরিস্থিতির ক্রমেই অবনতি ঘটছে। ধরলা, ব্রহ্মপূত্র, দুধকুমার ও তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় জেলার ৫৫টি ইউনিয়নে বন্যা পরিস্থিতি বিরাজ করছে। প্লাবিত হয়েছে ৩৯০টি গ্রামের প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ।

সিভিল সার্জন ডা: আমিনুল ইসলাম জানান, বন্যার পানিতে ডুবে চার শিশুর মৃত্যুর সংবাদ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে উলিপুরের হাতিয়া ইউনিয়নের হাবিবুল্লাহ (৬), ফুলবাড়ীতে একজন ও চিলমারী উপজেলায় দুই শিশু বন্যার পানিতে ডুবে মারা গেছে। দুর্গম এলাকায় এ মৃত্যুর ঘটনা ঘটায় তাৎক্ষণিকভাবে তাদের নাম জানা যায়নি। এদিকে সোমবার সকালে কুড়িগ্রাম-নাগেশ্বরী মহাসড়কের চার-পাঁচ জায়গায় হাঁটুপানি প্রবাহিত হওয়ায় ভারী যান চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ফলে দূরপাল্লার যাত্রীরা চরম ভোগান্তির মধ্যে যাতায়াত করছে। নাগেশ্বরীতে নদী তীর রক্ষা বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করছে। এতে স্থানীদের চলাচলে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

জেলা প্রশাসনের কন্ট্রোল রুম সূত্রে জানা গেছে, কুড়িগ্রামে তিনটি পৌরসভাসহ ৭৬টি ইউনিয়নের মধ্যে ৫৫টি ইউনিয়নের ৩৯০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। অস্বাভাবিকভাবে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নাগেশ^রীর বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের মুড়িয়া এলাকায় দুধকুমার নদ তীররক্ষা বাঁধের একাংশ ছিঁড়ে যাওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েছে এলাকার মানুষ।

এ ছাড়াও হুমকিতে রয়েছে সদর উপজেলার বাংটুর ঘাট ও সারডোব তীররক্ষা বাঁধ। এখানে চর বড়লই বাংলাবাজার এলাকায় পাকা সড়ক ভাঙনের উপক্রম হয়েছে। কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহকারী প্রকৌশলী মো: রুমানুজ্জামান জানান, সোমবার বিকেল পর্যন্ত ধরলা নদীর পানি বেড়ে গিয়ে বিপদসীমার ১১২ সেন্টিমিটার, ব্রহ্মপূত্রের পানি চিলমারী পয়েন্টে ১০৮ ও নুনখাওয়া পয়েন্টে ৭৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তিস্তার পানি কমে গিয়ে দুই সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে।

বগুড়া অফিস জানায়, ভারতের আসাম ও মেঘালয় থেকে ধেয়ে আসা পানির তোড়ে বগুড়ায় যমুনা নদীর পানি হুহু করে বাড়ছে। ৪৮ ঘণ্টায় ৭৫ সেন্টিমিটারেরও বেশি পানি বেড়েছে। সোমবার বিকেল ৩টায় যমুনা নদীর পানি বগুড়ার সারিয়াকান্দির মথুরাপাড়া পয়েন্টে বিপদসীমার ৭৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। আকস্মিক বন্যায় ইতোমধ্যেই জেলার সোনাতলা, সারিয়াকান্দি ও ধুনট উপজেলার অর্ধ লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।

বন্যাকবলিত মানুষ স্থানীয় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে। সোমবার থেকে ত্রাণ বিতরণ শুরু করেছে স্থানীয় প্রশাসন। সোমবার বিকেলে বগুড়া জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে এক জরুরি প্রেস ব্রিফিংয়ে ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক রায়হানা ইসলাম জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির বর্ণনা দেন।

তিনি জানান, এ পর্যন্ত জেলার তিনটি উপজেলার ২৯টি ইউনিয়নের মধ্যে ১৪টি ইউনিয়ন বন্যাকবলিত হয়েছে। এসব ইউনিয়নের ৯৮টি গ্রামের ৬৬ হাজার ৮০০ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলা প্রশাসক আরো জানান, বন্যায় এই তিন উপজেলার মোট ৫৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দুইটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যাকবলিত এলাকার মানুষের চিকিৎসার জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৩২টি মেডিক্যাল টিম দুর্গত এলাকায় কাজ করছে বলেও জানান তিনি।

সারিয়াকান্দি সংবাদদাতা জানান, সারিয়াকান্দিতে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। বসতবাড়ি, ফসলি জমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাস্তা-ঘাটে বন্যার পানি ওঠায় বন্যাকবলিত এলাকার মানুষদের দুর্ভোগ বেড়েছে। উপজেলার চালুয়াবাড়ী, কাজলা, কর্নিবাড়ী, বোহাইল, হাটশেরপুর, কুতুবপুর, চন্দনবাইশা, কামালপুর সারিয়াকান্দি উপজেলার এই ৯টি ইউনিয়নের ৬৪টি গ্রামে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। বন্যাকবলিত এলাকার লোকজন বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধসহ বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিচ্ছে।

সুনামগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, সুনামগঞ্জ সদর, বিশ্বম্ভরপুর, তাহিরপুর, দোয়ারাবাজার, ছাতক, জামালগঞ্জ, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ, দিরাই শাল্লা ও ধর্মপাশা উপজেলার বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা অবনতি হয়েছে। সুরমা নদীর পানি প্রবেশ করেছে জেলা শহরের কয়েকটি এলাকায়। পাঠদান বন্ধ রয়েছে তিন শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। সরকারি হিসাবে বন্যায় জেলার ৫২টি ইউনিয়নে এক লাখ চার হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সোমবার বিকেল পর্যন্ত সুনামগঞ্জ শহরের ষোলঘর পয়েন্টে সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার ৭৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। গত ২৪ ঘণ্টায় ৮০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। তবে বৃষ্টিপাত বন্ধ হলে পানি কমবে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া বিভাগ। রাস্তাঘাট ভেঙে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় আছে অনেক এলাকা। সুনামগঞ্জ-তাহিরপুর ও সুনামগঞ্জ-ছাতক সড়কের কয়েটি স্থান পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় জেলা শহরের সাথে সরাসরি যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।

অনেক বন্যার্ত জানিয়েছে, যে পরিমাণ চাল ও নগদ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। গতকাল জামালগঞ্জ উপজেলার ভীমখালী ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় বন্যা দুর্গতদের ত্রাণ বিতরণ ও শুকনো খাবার প্যাকেট, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট ও প্রয়োজনীয় ওষুধ বিতরণ করেন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) মো: তাহমিদুল ইসলাম।

তাহিরপুর (সুনামগঞ্জ) সংবাদাতা জানান, উপজেলায় টানা বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে পানিবন্দী হয়ে পড়েছে হাজার হাজার মানুষ। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে বিশুদ্ধ পানি ও খাবার সঙ্কট দেখা দিয়েছে পরিবারগুলোতে। বন্যাকবলিত গ্রামগুলোতে মানুষজন ত্রাণের জন্য অপেক্ষায় আছে। ত্রাণ না পাওয়ায় হাহাকার বিরাজ করছে। সরকারি ত্রাণ দিচ্ছে- এমন খবর পেলেই ছুটে আসছে দলে দলে ক্ষতিগ্রস্তরা।

রাঙ্গামাটি সংবাদদাতা জানান, বৃষ্টি কমে এলেও পাহাড়ি ঢলে রাঙ্গামাটির পাঁচটি উপজেলার বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত আছে। কাপ্তাই গ্রদের পানির উচ্চতা ১০২ এম এসএলের ( মিনস সি লেভেল ) উপরে রয়েছে। পাহাড়ি ঢল অব্যাহত থাকায় বিলাইছড়ির ফারুয়া বাজার ও বরকলের কলাবুনিয়া বাজার পানিতে তলিয়ে গেছে।

এ ছাড়া বাঘাইছড়ি, লংগদু, বরকল, জুরাছড়ি ও বিলাইছড়ির নিম্নাঞ্চল এখনো পানিতে তলিয়ে আছে। কর্ণফুলীর শাখা কাচালং, মাইনী, চেঙ্গী ও রাইংক্ষিয়ং নদীতে প্রবল বেগে পাহাড়ি ঢল নেমে আসায় কাপ্তাই হ্রদের পানির উচ্চতা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। পাহাড়ি ঢলে প্রবল স্র্রোতে বাঘাইছড়ি, লংগদু, বরকল, নানিয়ারচর জুরাছড়িতে লঞ্চ চলাচল বন্ধ রয়েছে। বাঘাইছড়ি উপজেলার আটটি ইউনিয়নের শতাধিক গ্রাম ও ১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্লাবিত হয়েছে, রাস্তাঘাট তলিয়ে বন্ধ রয়েছে সড়ক যোগাযোগ। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে খোলা হয়েছে ২৪ টি আশ্রয় কেন্দ্র।

দেওয়ানগঞ্জ (জামালপুর) সংবাদদাতা জানান, দেওয়ানগঞ্জ পৌরসভাসহ ৮ ইউনিয়ন পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। গতকাল সোমবার উপজেলার বিভিন্ন স্থানে বন্যার পানিতে ডুবে তিন শিশু মারা গেছে। তারা হচ্ছে দেওয়ানগঞ্জ পৌরসভার চরকালিকাপুর গ্রামের মনিরুল হোসেনের দুই বছরের ছেলে নিয়ামুল হোসেন, একই গ্রামের জহুরুল হকের পুত্র নাইম মিয়া (৭) এবং ডাংধরা ইউনিয়নের পাথরের চর গ্রামের রাকিবুল ইসলামের ছেলে সাইমুল ইসলাম।

মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আজাদুর রহমান ভূঁইয়া জানান, ২৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আফতাব উদ্দিন জানান, বন্যার পানি উঠায় ৬৫ স্কুল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। উপজেলা পরিষদের সব বিভাগে পানি উঠায় অন্যত্র কাজ চলছে।

বকশীগঞ্জ (জামালপুর) সংবাদদাতা জানান, বকশীগঞ্জে বন্যার পানি হু হু করে বাড়ছে। নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। সাধারণ মানুষ তাদের গবাদিপশু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। বন্যার পানিতে মাছ ধরতে গিয়ে বজ্রপাতে গণি মিয়া (৩০) নামে এক যুবক মারা গেছে। বন্যার পানি অব্যাহতভাবে বৃদ্ধির ফলে সাধুরপাড়া ইউনিয়নের বিলের পাড়, ঠাণ্ডার বন, ডেরুরবিল, আচ্চা কান্দি গাজীর পাড়া, বাঙ্গালপাড়া, নয়াবাড়ি, বাচ্চাগাঁও নতুন করে প্লাবিত হয়েছে।

বন্যার কারণে সাতটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও চারটি উচ্চবিদ্যালয় এবং একটি দাখিল মাদরাসা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বন্যায় ১৫ হাজার মানুষ পানি হলেও এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে কোনো ত্রাণ বিতরণ করেনি উপজেলা প্রশাসন।

ইসলামপুর (জামালপুর) সংবাদদাতা জানান, ইসলামপুরে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। যমুনার পানি বিপদসীমার ১২৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। যমুনা-ব্রহ্মপুত্রসহ সবগুলো নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পরিস্থিতি ভয়াবহতার দিকে যাচ্ছে। উপজেলার ১২ ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার অর্ধশতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়ে প্রায় ৭০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। সরকারি হিসাবে ইসলামপুরের সাত ইউনিয়নের ৭০ হাজার মানুষ বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। এ ছাড়া পাঁচ ইউনিয়ন ও পৌর এলাকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ইতোমধ্যে ৮২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে।

সাঘাটা (গাইবান্ধা) সংবাদদাতা জানান, নদীবেষ্টিত চরাঞ্চলসহ বন্যাকবলিত গ্রামগুলোর ৪৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। গত কয়েক দিন যমুনার পানি অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। উপজেলার চার ইউনিয়নের ২৫টি গ্রামের প্রায় ১৫ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। জানা যায়, উপজেলার বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধের পূর্বাংশে ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। সাঘাটা ইউনিয়নের উত্তর সাথালিয়া গ্রামের সোনাইল বাঁধ বন্যার স্রোতে ভেঙে গিয়ে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে।

গত শনিবার থেকেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাস্তায় পানি উঠতে শুরু করায় রোববার থেকে ক্লাস বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এ দিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো: মোখলেছুর রহমান জানান, গত ১২ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্র ও যমুনার পানি ১৮ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৮৬ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

চিলমারী (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, চিলমারীতে ব্রহ্মপুত্র নদে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে ৭৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। স্থানীয়রা জানান, উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের প্রায় ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। তলিয়ে গেছে রোপা আমনের বীজতলা। ব্রহ্মপুত্র নদের পানি হু হু করে বাড়ছে। সোমবার দুপুর ১২টায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) চিলমারী পয়েন্টের গেজ রিডার মো: মাহফুজার রহমান জানান, গত ২০ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ২৯ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ১০৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

নেত্রকোনা সংবাদদাতা জানান, এক সপ্তাহ ধরে প্রবল বর্ষণ ও উজানের ঢলে জেলার ১০ উপজেলার মধ্যে চারটি উপজেলার ২১টি ইউনিয়নের ২১০টি গ্রাম প্লাবিত হয়ে অন্তত ১৯ হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। প্রশাসন দুই শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেছে। প্রতিদিনই জেলার বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়ে পড়ছে।

সোমেশ্বরী, কংশ, মগড়া, ধনুসহ বিভিন্ন নদীর পানি এখন বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। প্রত্যন্ত এলাকার অনেক গ্রামীণ সড়ক ও রাস্তা তলিয়ে যাওয়ায় জেলা সদরের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক মো: আরিফুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, বন্যাদুর্গত এলাকায় সাতটি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। সেখানে প্রায় দুই শতাধিক পরিবার আশ্রয় নিয়েছে।

নীলফামারী সংবাদদাতা জানান, তিস্তা নদীর পানি কমলেও এখনো ডিমলা উপজেলার কয়েকটি চর ও গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দী রয়েছেন। এইসব মানুষজনের মাঝে শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাব দেখা দিয়েছে। যে চাল ও শুকনা খাবার বিতরন করা হয়েছে তা চাহিদার তুলনায় কম বলে জানিয়েছেন জনপ্রতিনিধিরা। ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সর্তকীকরণ কেন্দ্র জানায়, তিস্তা নদীর পানি ডালিয়া পয়েন্টে সোমবার বেলা ৩টায় ৫২ দশমিক ৬০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এই পয়েন্টে বিপদসীমা ৫২ দশমিক ৬০ সেন্টিমিটার। অথচ শনি ও রোববার এই পয়েন্টে তিস্তার পানি বিপদসীমার ৩৫ থেকে ৪৮ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।

পটিয়া-চন্দনাইশ (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, চন্দনাইশে ঢলের পানি কিছুটা কমলেও এখনো দুই লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। গতকাল শঙ্খ নদীর বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হতে দেখা গেছে।

অপর দিকে পাহাড়ি ঢলের কারণে গতকালও পঞ্চম দিনের মতো চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের উপর দিয়ে ঢলের পানি প্রবাহিত হওয়ায় ঝুঁকি নিয়ে যানবাহন চলাচল করতে দেখা গেছে। ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কসহ দোহাজারী সার্কেলের আওতাধীন প্রায় ১১০ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

টাকার অংকে তা ৪৭ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার কথা বললেন সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী জাহিদ হোসেন। গতকাল দেখা যায়, চন্দনাইশ পৌরসভার ৯টি ও দোহাজারী পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ড ছাড়াও উপজেলার সাতবাড়িয়া, বৈলতলী, বরমা, বরকল, জোয়ারা, হাশিমপুর ও কাঞ্চনাবাদ ইউনিয়নের সর্বত্রই ঢলের পানিতে থইথই করছে। চন্দনাইশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আ ন ম বদরুদ্দোজা বলেন, উপজেলার অন্তত দুই লাখ মানুষ পানিবন্দী অবস্থায় রয়েছে।

সাতকানিয়া (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, সাতকানিয়ায় গত রোববার রাত থেকে বন্যার পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। পানি কিছুটা কমলেও ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট এখনো তিন-চার ফুট পানির নিচে তলিয়ে আছে। উপজেলার কয়েক লাখ মানুষ এখনো পানিবন্দী হয়ে রয়েছে। কেরানীহাট-বান্দরবান সড়কের বেশ কিছু এলাকা থেকে পানি নেমে গেলেও বাইতুল ইজ্জতের সত্য পীরের দরগাহ ও বাজালিয়ার বড়দুয়ার এলাকায় সড়ক তির-চার ফুট পানির নিচে তলিয়ে আছে। বান্দরবানের সাথে এক সপ্তাহ ধরে সারা দেশের সড়ক যোগাযোগ এখনো বন্ধ রয়েছে।

এ ছাড়া উপজেলা সদরসহ পুরো সাতকানিয়ার বিভিন্ন ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ সড়কগুলো এখনো প্রায় তিন-চার ফুট পানির নিচে তলিয়ে আছে। গত ছয় দিনের ব্যবধানে শঙ্খনদীর ভাঙনে সাতকানিয়ার আমিলাইশ, চরতি, নলুয়া ও বাজালিয়া এলাকায় ৩০টির অধিক বসতঘর নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ও বসতঘর হারানো পরিবারের লোকজন এখন মানবেতর দিনযাপন করছেন।

রানীনগর (নওগাঁ) সংবাদদাতা জানান, নওগাঁর রানীনগর ও আত্রাই উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ছোট যমুনা নদীর পানি বাড়ছে। পানি ঠেকাতে আশির দশকে ওই এলাকায় নদীর তীরে বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল। এরপর থেকে কোনো দপ্তর সংস্কার করেনি। বর্তমানে এই বাঁধটি দুই উপজেলার মানুষের গলার কাঁটায় পরিণত হয়েছে।

বর্তমানে দু’টি উপজেলার বাঁধের প্রায় চার কিলোমিটার এলাকা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। নান্দাইবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা ইসমাইল হোসেন, গফুর মিয়াসহ অনেকেই অভিযোগ করে বলেন, বর্ষার সময় আমাদের নির্ঘুম রাত কাটে। প্রায় ৩০ বছর পার হলেও কোনো দপ্তর বাঁধটির বিন্দুমাত্র সংস্কারকাজ করেনি। রানীনগর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন হেলাল বলেন, বাঁধটি এখন খুবই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। কিন্তু বাঁধটি কোন দফতরের তা কেউ স্বীকার করছেন না।

জগন্নাথপুর (সুনামগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, জগন্নাথপুর পৌরসভাসহ আটটি ইউনিয়নে বন্যার পানি হু হু করে বৃদ্ধি পাচ্ছে। পানিবন্দী লোকজন আত্মীয়স্বজনের বাড়িঘরসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিয়েছেন। রোববার ঝড়ের কবলে পড়ে নিখোঁজ জেলে উপজেলার রানীগঞ্জ ইউনিয়নের নারিকেলতলা গ্রামের মৃত আবদুল লতিফের ছেলে কওছর মিয়াকে (২৫) এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। পৌর শহরের রাস্তাঘাট ও উপজেলার কলকলিয়া, চিলাউড়া হলদিপুর, রানীগঞ্জ, সৈয়দপুর, পাইলগাঁও ও আশারকান্দি ইউনিয়নের অধিকাংশ রাস্তা ঘাট পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় জনসাধারন ঘর থেকে বের হতে পারছে না।


আরো সংবাদ