১৬ জুলাই ২০১৮

ডলার সঙ্কট প্রকট ব্যাংকিং খাতের জন্য অশনি সঙ্কেত

ডলার সঙ্কট প্রকট ব্যাংকিং খাতের জন্য অশনি সঙ্কেত - সংগৃহীত

মার্চ মাসে রফতানি ও রেমিট্যান্স মিলে বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়েছে ৪৩৫ কোটি ডলার। কিন্তু ওই মাসে পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৪৮৪ কোটি ডলার। শুধু পণ্য আমদানিতেই ঘাটতি থাকছে প্রায় ৫০ কোটি ডলার। এর বাইরে বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশী নাগরিকদের পেছনে বেতনভাতা, বিভিন্ন সার্ভিস ও চিকিৎসাসেবা ব্যয়, বিদেশী ঋণের সুদাসলসহ পরিশোধ তো রয়েছেই। এভাবে দিন দিন চাহিদার চেয়ে ডলারের সরবরাহের পার্থক্য বেড়ে যাচ্ছে। এ পার্থক্য কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ডলার সরবরাহ করেও কুলানো যাচ্ছে না। বরং এ সঙ্কট দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে। এমনি পরিস্থিতিতে সরবরাহের ঘাটতি কমাতে না পারলে সামনে এ সঙ্কট বড় আকার ধারণ করতে পারে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ব্যাংকগুলোর আগ্রাসী ব্যাংকিংয়ের কারণে ব্যাংকিং খাতে ডলারের সঙ্কট বেড়ে যায়। দীর্ঘ দিন ধরে দেশের স্থিতিশীল বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে অস্থিরতা দেখা যায়। ডলারের চাহিদা না থাকায় এক সময় যেখানে ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ডলার বিক্রি করে, সেখানে আগ্রাসী ব্যাংকিংয়ের কারণে উল্টো ব্যাংকগুলোতে ডলারের সঙ্কটের কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে হাত পাততে হয়। গত নভেম্বর থেকে এ সঙ্কট প্রকট আকার ধারণ করে। নিরুপায় বাংলাদেশ ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল রাখতে ব্যাংকগুলোতে ডলার সরবরাহ করতে থাকে। এর পরেও ৭৯ টাকার ডলার এখন প্রায় ৮৫ টাকায় উঠে গেছে।

প্রতিনিয়তই বাংলাদেশ ব্যাংক তার রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করছে। চলতি অর্থবছরের গতকাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক প্রায় ২১০ কোটি ডলার বিক্রি করেছে ব্যাংকগুলোর কাছে। এর বিপরীতে প্রায় সাড়ে ১৭ হাজার কোটি টাকা বাজার থেকে তুলে নেয়া হয়েছে। সামনে এ চাপ অব্যাহত থাকবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত মার্চ মাসে ৪৮৪ কোটি ২০ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে। বিপরীতে পণ্য রফতানির মাধ্যমে আয় হয়েছে ৩০৫ কোটি ডলার এবং রেমিট্যান্সের মাধ্যমে এসেছে ১৩০ কোটি ডলার। ফলে ডলারের সরবরাহের চেয়ে চাহিদা বেড়ে গেছে।

জানা গেছে, মূলধনী যন্ত্রপাতি, শিল্পের কাঁচামালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি করতে বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন হয়। আমদানি দায় পরিশোধ করতে ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ডলার কেনেন গ্রাহকেরা। সাধারণত, আন্তঃব্যাংকের সাথে গ্রাহকপর্যায়ে ডলারের দামের পার্থক্য এক টাকার ওপরে হওয়ার কথা নয়। কিন্তু গতকাল এ পার্থক্য দুই টাকার কাছাকাছি চলে গেছে। আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে প্রতি ডলারের জন্য যেখানে ব্যয় হচ্ছে ৮৩ টাকা ৬০ পয়সা, যেখানে আমদানিতে কোনো কোনো ব্যাংক সাড়ে ৮৫ টাকা পর্যন্ত চার্জ করছে আমদানিকারকদের কাছ থেকে।

ব্যাংকাররা জানিয়েছেন অফশোর ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে দেদার আসছে বিদেশী ঋণ। আগে শুধু রফতানিকারকেরা এ ঋণের সুবিধা পেতেন। পরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ নীতিমালা আরো শিথিল করে। এখন রফতানিকারকদের বাইরেও সার আমদানি, কৃষি প্রক্রিয়াকরণ শিল্পসহ বিভিন্ন পর্যায়ে অফশোর ব্যাংকিংয়ের সুবিধা নিচ্ছে। আমদানিকারকেরা যখন বৈদেশিক ঋণ নিয়ে পণ্য আমদানি করছে, তখন ব্যাংকগুলো রেমিট্যান্স ও রফতানি আয়ের মাধ্যমে যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আহরণ করত তা বাজারে উদ্বৃত্ত ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, ব্যাংকগুলো ইচ্ছেমাফিক নিজেদের কাছে বৈিেদশক মুদ্রা ধরে রাখতে পারে না। এ জন্য নির্ধারিত সীমা বেঁধে দেয়া হয় বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে। নীতিমালা অনুযায়ী একটি ব্যাংক দিন শেষে তার মোট মূলধনের ১৫ শতাংশ সমমূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা নিজেদের কাছে সংরক্ষণ করতে পারে। দিনশেষে নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত ডলার থাকলে বাজারে বিক্রি করতে হবে। বাজারে বিক্রি করতে না পারলে ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ডলার বিক্রি করতে হবে। এর ব্যত্যয় হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে জরিমানা গুনতে হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংক ডলারের মান ধরে রাখার জন্য গত কয়েক বছরে বাজার থেকে উদ্বৃত্ত ডলার কিনে রিজার্ভের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করেছে। কিন্তু এখন রফতানি আয় কমছে। কাক্সিক্ষত হারে বাড়ছে না রেমিট্যান্স প্রবাহ। এ দিকে, অফশোর ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ঋণ নেয়া হয় সর্বোচ্চ ছয় মাস মেয়াদে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ৯০০ কোটি ডলারের ঋণ রয়েছে অফশোর ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে। এ ঋণও ধারাবাহিকভাবে মেয়াদ শেষে পরিশোধ শুরু হয়েছে। সবমিলে এক দিকে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বেড়ে গেছে। কিন্তু এর বিপরীতে সরবরাহ না বেড়ে বরং কমে গেছে। ফলে বেশির ভাগ ব্যাংকেরই ডলারের সঙ্কট দেখা দিয়েছে।

ডলার সঙ্কটের কারণে অনেক ব্যাংক এখন পণ্য আমদানি করতে এলসি খুলতে চাচ্ছে না। দেশের দ্বিতীয় প্রজন্মের একটি ব্যাংকের তহবিল ব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, বাস্তবতা হলো, অনেক ব্যাংকেই তীব্র তারল্য সঙ্কট দেখা দিয়েছে। অনেকেই আমানতকারীদের অর্থ ফেরত না দিয়ে সুদের হার বাড়িয়ে দিচ্ছে। অনেক ব্যাংক ঋণ সংকোচন নীতি গ্রহণ করছে। ঋণ মঞ্জুর করেও তা বিনিয়োগ করতে পারছে না। এ দিকে বছর শেষ হলেই বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ আমানতের অনুপাত কমিয়ে আনার খড়গ ঝুলছে। অর্থাৎ প্রচলিত ব্যাংকগুলোকে সাড়ে ৮৩ শতাংশে এবং ইসলামী ব্যাংকগুলোকে ৮৯ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে। রাতারাতি ঋণ আদায় করা যাবে না, ফলে আমানত সংগ্রহ করেই এ অনুপাত কমিয়ে আনতে হবে। কিন্তু আমানত সরবরাহ না বাড়ার আশঙ্কাই রয়েছে। ফলে বছরের শেষ সময়ে এসে আমানত সংগ্রহ নিয়ে কাড়াকাড়ি লেগে যাবে। সবমিলে সামনে ব্যাংকিং খাতের জন্য অশনি সঙ্কেত দেখা যাচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে না রাখলে এ খাতের অস্থিরতা আরো বেড়ে যাবে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন।


আরো সংবাদ