২৩ জুলাই ২০১৯

ব্যাংকের তহবিল ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা

টাকার সঙ্কট মেটাতে বেশির ভাগ ব্যাংক স্বল্প মেয়াদে আমানত সংগ্রহ করছে। কিন্তু বিনিয়োগ করা হচ্ছে দীর্ঘ মেয়াদে। ঋণ আমানতের এ বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণে ব্যাংকিং খাতে তহবিল ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সাধারণত দীর্ঘ মেয়াদে আমানত নিয়ে দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগ করার কথা। কিন্তু ব্যাংকগুলো করছে উল্টো। স্বল্প মেয়াদে আমানত নিয়ে দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগ করলে এক সময় আমানতকারীদের আমানত নির্ধারিত মেয়াদ শেষে ফেরত দেয়া ব্যাংকগুলোর জন্য কষ্টকর হবে। বিষয়টি এরই মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরে এসেছে। যেসব ব্যাংক এমন অবস্থান নিয়েছে তাদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে।

দেশের প্রথম প্রজন্মের একটি ব্যাংকের এমডি জানিয়েছেন, আগে গ্রাহকদের কাছ থেকে যেসব আমানত নেয়া হয়েছিল ওই সব আমানতের মেয়াদ পূর্তিতে এককালীন মুনাফাসহ পরিশোধ করতে হচ্ছে। নতুন আমানত কাক্সিক্ষত হারে আসছে না। বিপরীতে বাড়ছে ঋণপ্রবাহ। কিন্তু ব্যাংকের নগদ টাকা ও বিনিয়োগ চাহিদা পূরণ করার প্রধান মাধ্যম আমানত প্রবাহ কমে যাচ্ছে। ফলে তহবিল ব্যবস্থাপনা করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

বর্তমান অবস্থা চলতে থাকলে সামনে টাকার সঙ্কট প্রকট আকার ধারণ করতে পারে। এতে তহবিল ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে। আগাম এসব ঝুঁকি মোকাবেলায় আমানত প্রবাহ বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। অনেকেই স্বল্প মেয়াদে আমানত নিয়ে দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগ করছে। আমানত সংগ্রহের জন্য বাড়ানো হচ্ছে আমানতের মুনাফার হার। এক ব্যাংকের দেখাদেখি অন্য ব্যাংকও তার চেয়ে বেশি হারে মুনাফার হার বাড়িয়ে দিচ্ছে।

ফলে আমানত সংগ্রহে ব্যাংকিং খাতে এক ধরনের অশুভ প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। এর ফলে মুনাফার হার বাড়িয়েও আশানুরূপ ফল পাওয়া যাচ্ছে না। শুধু তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। ফলে নগদ টাকার সঙ্কটে থাকা ব্যাংকের তহবিল ব্যবস্থাপকদের উদ্বেগ দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে।

গতকাল কথাগুলো বলছিলেন দেশের দ্বিতীয় প্রজন্মের একজন তহবিল ব্যবস্থাপক। ওই কর্মকর্তার মতো আনেকেরই এখন একই অবস্থা। নতুন প্রজন্মের একটি ব্যাংকের তহবিল ব্যবস্থাপক নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, নতুন এক ব্যাংকের ঋণকেলেঙ্কারির ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর নতুন ব্যাংকগুলোর ওপর গ্রাহকদের আস্থা কমে গেছে। এই দিক থেকে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে প্রথম প্রজন্মের ব্যাংকগুলো।

নতুন প্রজন্মের ব্যাংকগুলোর কোনো কোনোটিরই আমানতের মুনাফা ১০ শতাংশের ওপরে নিয়ে গেছে। তবুও মিলছে না আমানত। করপোরেট গ্রাহকদের আস্থায় আনার জন্য দ্বারে দ্বারে তারা এখন ঘুরছেন। কাঙ্ক্ষিত সারা মিলছে না। তাই বাধ্যতামূলক নগদ জমা অর্থাৎ সিআরআর সংরক্ষণ করতে ও দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজার অর্থাৎ কলমানি মার্কেটের ওপর তারা নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। যদিও এতে ভয়াবহ ঝুঁকি বাড়ছে। তারপরও স্থায়ী সমাধানের জন্য আমানত মিলছে না। ফলে পুরনো ব্যাংকগুলোর চেয়ে নতুন ব্যাংকগুলো আছে মহাবিপাকে। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে সামনে ঋণ দেয়া তো দূরের কথা দৈনন্দিন চাহিদা মেটানোও দুষ্কর হয়ে পড়বে ব্যাংকগুলোর।

দেশের প্রথম প্রজন্মের একটি ব্যাংকের এমডি গতকাল নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, সামনে ব্যাংকিং খাতের জন্য নানামুখী সঙ্কট দেখা দেয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ, সঞ্চয়পত্রে সুদ হার বেশি হওয়ায় ব্যাংকের আমানত চেয়ে যাচ্ছে সঞ্চয়পত্রে। এতে ব্যাংকের আমানতের প্রবৃদ্ধি কমে যাচ্ছে। বিপরীতক্রমে ঋণের প্রবৃদ্ধি দিন দিন বেড়ে চলছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান মতে, গত ফেব্রুয়ারিতে ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২ দশমিক ৫৪ শতাংশ। যেখানে আমানতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৯ দশমিক ৯ শতাংশ। প্রচলিত ধারা অনুযায়ী আমানতের প্রবৃদ্ধির চেয়ে ঋণের প্রবৃদ্ধি কম হওয়ার কথা থাকলেও এটি হচ্ছে উল্টো, যা মোটেও শুভ লক্ষণ নয়। কারণ, নিয়ম অনুযায়ী যে পরিমাণ ঋণ দেয়া হচ্ছে তা উৎপাদনশীল খাতে যাচ্ছে না। ঋণের অর্থ হয় হন্ডির মাধ্যমে পাচার হচ্ছে, না হয় গ্রাহক ঋণ নিয়ে ঋণ পরিশোধ করছেন।

অর্থাৎ সঠিক কাজে ঋণের অর্থ ব্যবহার করা হচ্ছে না। ঋণ সঠিক কাজে ব্যবহার না হওয়ায় আমানতের প্রবৃদ্ধি কমে যাচ্ছে। আর আমানতের প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় ব্যাংকিং খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য কমে যাচ্ছে। গত বছরের শুরুতেও ব্যাংকিং খাতে যেখানে উদ্বৃত্ত তারল্য প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা ছিল। গত জানুয়ারিতে এসে তা ৭৯ হাজার কোটি টাকায় নেমেছে; যার বেশির ভাগই সরকারের কোষাগারে রয়েছে। এরই মধ্যে টাকার সঙ্কট দেখা দিয়েছে কোনো কোনো ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে। বেশ কয়েকটি ব্যাংক কলমানি মার্কেট নির্ভর হয়ে পড়েছে।

গতকাল একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানিয়েছেন, সুদহার তার কাছে এখন মুখ্য বিষয় নয়, তার দরকার নগদ টাকা। প্রয়োজন মেটাতে তিনি ১৫-১৬ শতাংশ হারেও তহবিল সংগ্রহ করতে রাজি আছেন। আরেক ব্যাংকের এমডি জানিয়েছেন, আগে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে জোর করে টাকা রাখা হতো, এখন তারই টাকার সঙ্কট দেখা দিয়েছে। এ কারণে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে টাকা নিয়ে আসছেন। সামনে এ পরিস্থিতি আরো প্রকট আকার দেখা দেয়ার আশঙ্কা করছেন ওই এমডি।

ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, আমানতের এই পরিস্থিতির মধ্যে নতুন করে দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে সরকারি ঋণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান মতে, গত ২ এপ্রিল পর্যন্ত সরকার এক বছরে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নিয়েছে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা। গত বছরের ২ এপ্রিলে ব্যাংক ব্যবস্থায় সরকারের ঋণের স্থিতি ছিল ৬৭ হাজার ৬২৯ কোটি টাকা।

চলতি ২ এপ্রিলে তা বেড়ে হয়েছে ৮৪ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা। ঋণ গ্রহণ বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো রাজস্ব আদায় কমে যাওয়া। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সর্বশেষ পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, গত অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৩৪ দশমিক ৩৩ শতাংশ। কিন্তু চলতি অর্থবছরের একই সময়ে রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৭ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ব্যবসায়-বাণিজ্যে মন্দা ও পণ্যমূল্য বেড়ে যাওয়ায় মানুষের আয়ের ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। বেশির ভাগ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ব্যয় কমানো হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে রাজস্ব আদায়ের ওপর। অন্য দিকে সরকারের বাজেট ঘাটতি অর্থায়নের বৈদিশক ঋণ নেয়া হয়। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী কাঙ্ক্ষিত হারে বৈদেশিক অনুদান ও ঋণ আসছে না।

যেমন, গত অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে বৈদেশিক ঋণের অবমুক্তির প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১৫৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ। কিন্তু চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা কমে নেমেছে মাত্র ৪ দশমিক ৮৯ শতাংশে।

রাজস্ব আদায় ও বৈদেশিক অনুদান কমে যাওয়ায় ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণগ্রহণ বেড়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, গত ১ জুলাই থেকে গত ২ এপ্রিল পর্যন্ত সরকার তফসিলি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে ৪ হাজার ৬৪৬ কোটি টাকা।

ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, সঞ্চয়পত্রের চেয়ে ব্যাংকের আমানতের সুদহার কম হওয়ায় ব্যাংকে আমানত প্রবাহ কমে গেছে। এদিকে বড় বড় ঋণগ্রহীতারা কাক্সিক্ষত হারে ঋণ পরিশোধ করছেন না। এতে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পাহাড় জমে গেছে। এর ওপর বড় বড় ঋণখেলাপিদের ছাড় দেয়ার ঘোষণা দেয়ায় যারা এতদিন ঋণ পরিশোধ করতেন তারা আর আগের মতো ঋণ পরিশোধ করছেন না। ফলে নগদ আদায় ব্যাপক হারে কমে গেছে। এমনি পরিস্থিতিতে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে বেশি হারে ঋণ নিলে ব্যাংকগুলোর সঙ্কট আরো বেড়ে যাবে বলে তারা মনে করছেন।


আরো সংবাদ