২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯

চাল রফতানির চিন্তা করছে সরকার : কৃষিমন্ত্রী

ফণীতে ৬৩ হাজার হেক্টর জমির সাড়ে ৩৮ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি

কৃষককের জন্য সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে জানিয়ে কৃষিমন্ত্রী ড. মো: আব্দুর রাজ্জাক জানিয়েছেন, কৃষককে বাঁচাতে হবে, কৃষককে লাভবান করতে হবে। তা না হলে কেন তারা এটা করবে। তাই বোরো চাল রফতানির চিন্তা-ভাবনা করছে সরকার। কারণ এখন আমাদের চাল উদ্বৃত্ত আছে। ৫-১০ লাখ টন চাল রফতানি করলে তেমন কোনো অসুবিধা হবে না। এতে দেশের ভাবমূর্তিও বাড়বে।

কৃষিমন্ত্রী বলেন, ঘূর্ণিঝড় ফণীর প্রভাবে ৩৫ জেলার প্রায় ৬৩ হাজার ৬৩ হেক্টর জমির ধান, ভুট্টা, সবজি, পাট ও পানসহ বিভিন্ন ফসলের ৩৮ কোটি ৫৪ লাখ ২৫০০ টাকার আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এতে সার্বিকভাবে বাজারে তেমন কোনো প্রভাব পড়বে না।

আজ মঙ্গলবার সচিবালয়ে ঘূর্ণিঝড় ফণীর প্রভাবে ফসলের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি ও গৃহীত পদক্ষেপ নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানিয়ে কৃষিমন্ত্রী বলেন, বোরো ধান কাটা শেষ হলে সবার সাথে আলোচনা করে আগামী ২০ দিনের মধ্যে চাল রফতানির করা হবে কি-না সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। কৃষক বোরো ধান ঘরে তুলতে পারলে অবশ্যই উদ্বৃত্ত হবে। এই উদ্বৃত্তের কিছুটা হলেও আমরা নিজের সিকিউরিটির জন্য খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত রেখে বিদেশে রফতানি করতে পারি। এতে দেশের ভাবমূর্তিও বাড়বে।

প্রসঙ্গত, এর আগে গত ১৮ এপ্রিল দেশে চাহিদার তুলনায় চালের মজুত বেশি এমন তথ্য তুলে ধরে বাণিজ্যমন্ত্রীর কাছে চাল রফতানির প্রস্তাব দিয়েছেন চালকল মালিকরা। চাল রফতারি না করলে কৃষকরা ধানের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হবে বলেও যুক্তি দিয়েছেন তারা। তাদের এ প্রস্তাবে সম্মতি না দিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, দেশে ধান-চালের উৎপাদন ও চাহিদা সম্পর্কে কৃষি ও খাদ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানানো হবে।

এদিকে ঘূর্ণিঝড় ফণীর কারণে ৩৮ কোটি ৫৪ লাখ দুই হাজার ৫০০ টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে জানিয়েছে কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক বলেন, দেশের ৩৫ জেলার ২০৯টি উপজেলার ৬৩ হাজার হেক্টর জমির বোরো, সবজি, ভুট্টা, পাট ও পান ফসলের আংশিক ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে ৫৫ হাজার ৬০৯ হেক্টর জমির বোরো ধান, তিন হাজার ৬৬০ হেক্টরের সবজি, ৬৭৭ হেক্টর জমির ভুট্টা, ২ হাজার ৩৮২ হেক্টর জমির পাট এবং ৭৩৫ হেক্টর জমির পানের ক্ষতি হয়েছে।

তিনি বলেন, ঘূর্ণিঝড়ের কারণে ১৩ হাজার ৬৩১ জন কৃষকের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য সরকারের হাতে এসেছে। কৃষকের ক্ষতি পুষিয়ে দিতে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী প্রণোদনামূলক কর্মসূচি হাতে নেওয়া হবে।

ফণীতে আক্রান্ত ৩৫ জেলার মধ্যে রয়েছে- নারায়ণগঞ্জ, টাঙ্গাইল, মুন্সীগঞ্জ, ময়মনসিংহ, শেরপুর, জামালপুর, নেত্রকোনা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ফেনী, লক্ষ্মীপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জ, বগুড়া, জয়পুরহাট, সিরাজগঞ্জ, রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, গাইবান্ধা, খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, নড়াইল, চুয়াডাঙ্গা, ফরিদপুর, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, শরিয়তপুর, বরিশাল, বরগুনা, ভোলা, পটুয়াখালী, ঝালকাঠি ও পিরোজপুর।

ক্ষতির ধরন ও শতকরা হার তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, অধিকাংশ বোরো ধান হার্ড ডাফ ও পরিপক্ব অবস্থায় বাতাসে হেলে পড়েছে। যার দুই শতাংশ ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে। সবজির ক্ষেত্রে মাচা ভেঙে ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া বাতাসের কারণে শাক-সবজি ক্ষতি হয়েছে যার ৯ শতাংশ ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে।

কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক বলেন, অধিকাংশ ভুট্টা মোচা অবস্থায় বাতাসে হেলে পড়েছে, এর ১৫ শতাংশ ক্ষতি হতে পারে। দমকা বাতাসে পাট হেলে বা ভেঙে পড়েছে। যা শতকরা হারে পাঁচ শতাংশ ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া দমকা বাতাসে পানের বরজ ভেঙে পড়েছে। যার এক শতাংশ ক্ষতি হতে পারে।

ফণী চলে যাওয়ার পর বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরে তিনি বলেন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অঞ্চল, জেলা, উপজেলা ও ব্লক পর্যায় থেকে আক্রান্ত ফসলি জমির তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে প্রাথমিক প্রতিবেদন তৈরি করে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে অবহিত করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী সময়ে যাতে আটকে যাওয়া পানি জমি থেকে দ্রুত নেমে যায় সে জন্য প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের সাথে সমন্বয় করে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। শতকরা ৮০ ভাগ পরিপক্ব অবস্থায় আছে এমন ধান কেটে ফেলা ও হেলে পড়া ধান দ্রুত কেটে ফেলার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

জলাবদ্ধতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত আউস ক্ষেতে গ্যাপ পূরণের জন্য ঘন গোছা থেকে চারা উত্তোলন করে ফাঁকা জায়গায় রোপণ, পানের বরজের বেড়া নির্মাণ এবং লতা কাঠিতে তুলে দেয়া, সবজি ক্ষেতের জমে থাকা পানি দ্রুত নিষ্কাশনের পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

সবজি ক্ষেতের চালা বা মাচা মেরামতের পরামর্শ দেয়া হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, প্রযোজনে সবজি বিষ কেনার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। নষ্ট হওয়া গাছের গোড়ায় নতুন চারা লাগিয়ে শূন্যস্থান পূরণের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে কর্মরত উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগের মাধ্যমে পরামর্শগুলো বাস্তবায়নের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

ঘূর্ণিঝড় ফণী আসার আগে ও চলাকালীন কৃষি মন্ত্রণালয় ও অধীন সংস্থাগুলোর কার্যক্রম তুলে ধরে ড. রাজ্জাক বলেন, কৃষকের ক্ষতি পুষিয়ে দিতে দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপের অংশ হিসেবে এসব এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করে পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় বীজ, সার ও আর্থিক সহায়তা দেয়া হবে। এর অংশ হিসেবে কৃষকদের মধ্যে ২০১৯-১০ খরিপ মৌসুমে (এপ্রিল থেকে নভেম্বর) রোপা আমন ধানের বীজ ও চারা চারা উৎপাদন ও বিতরণ এবং মাসকালাই বীজ বিতরণ করা হবে। পাশাপাশি ২০১৯-২০ রবি মৌসুমে (নভেম্বর থেকে মার্চ) বিনামূল্যে বোরো ধান, গম, ভুট্টা, সরিষা, চিনাবাদাম ও মুগ চাষের জন্য বীজ ও সার দেয়া হবে। এছাড়া শীতকালীন সবজি চাষের জন্য পারিবারিক পুষ্টির অংশ হিসেবে বিনামূলে বিভিন্ন সবজি বীজ বিতরণ কর্মসূচি হাতে নেয়া হবে।

প্রসঙ্গত, বোরো মৌসুমে ফসল কাটার সময় গত শনিবার বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল দিয়ে ঢুকে মধ্যাঞ্চলের উপর দিয়ে বয়ে যায় ঘূর্ণিঝড় ফণী। ভারতের ওড়িষ্যা উপকূলে ঘণ্টায় প্রায় ২০০ কিলোমিটার ঝড়ো বাতাস নিয়ে আঘাত হানলেও বাংলাদেশে ঢোকার সময় এর গতি ৮০ কিলোমিটারে নেমে এসেছিল। ফলে দেশে ফসলের ক্ষতি ‘ততটা হয়নি’ বলে দুদিন আগে জানিয়েছিলেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর।


আরো সংবাদ