১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯

ঋণখেলাপিদের পোয়াবারো

ঋণখেলাপিদের পোয়াবারো - সংগৃহীত

ঋণখেলাপিদের রেকর্ড বড় ধরনের ছাড় দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক । ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিলেই ১০ বছরের জন্য ঋণ নবায়নের সুযোগ পাবেন ঋণখেলাপিরা। আর সে ক্ষেত্রে ঋণের সুদহার হার হবে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ। আর সেই সাথে অনারোপিত সুদ ও স্থগিত সুদও তারা মওকুফ পাবেন। ৩১ ডিসেম্বর ২০১৮ সাল পর্যন্ত যারা ঋণখেলাপি তারাই এ সুবিধা পাবেন। 
জানা গেছে, স্বাধীনতার পর ঋণখেলাপিদের এত বড় ছাড় আর কোনো সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেয়নি। এ কারণে হয়তো ঋণখেলাপিদের পক্ষ থেকে অর্থমন্ত্রী বড় ধরনের সংবর্ধনা পেতেও পারেন। আর তা দেয়াও উচিত বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। 

তবে ঋণখেলাপিদের বড় ধরনের এ ছাড় ব্যাংকিং খাতের জন্য মোটেও সুফল বয়ে আনবে না বলে মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা। এ বিষয়ে বিশিষ্ট অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম গতকাল নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, ঋণখেলাপিদের এ ধরনের ছাড় দেশের ব্যাংকিং খাত তথা অর্থনীতির জন্য মোটেও সুফল বয়ে আনবে না। এতে যারা নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করছেন তারা আর ঋণ পরিশোধ করতে চাইবেন না। কারণ একজন ভালো ঋণগ্রহীতা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে ব্যবসা করেন। সেই ব্যবসার মুনাফা থেকে সরকারের ভ্যাট ট্যাক্স পরিশোধ করেন। একই সাথে ১৪/১৫ শতাংশ সুদে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করেন।

অপরদিকে, একজন ঋণখেলাপি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে সুদে আসলে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করেন না। দামি গাড়ি হাঁকান। ছেলেমেয়েদের বিদেশে পড়ালেখা করান। তিনি একসময় মন্দ ঋণগ্রহীতা হিসেবে চিহ্নিত হন। একপর্যায়ে তার সুদ মওকুফ করে দেয়া হলো । ৯ শতাংশ সুদে বাকি অর্থ ১০ বছরের জন্য পরিশোধের সুযোগ পেলেন। সুতরাং ঋণখেলাপিদের এ ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেয়ায় ভালো গ্রাহক ঋণ পরিশোধে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন। এতে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমবে না বরং বেড়ে যাবে। আর খেলাপি ঋণ বেড়ে গেলে ব্যাংকের ঋণ দেয়ার সক্ষমতা কমে যাবে। জনগণের আমানত ফেরত দিতে পারবে না। এভাবে অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিপদ ডেকে আনবে। 

গতকাল ঋণখেলাপিদের ছাড় দেয়ার ওপর একটি সার্কুলার জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। সার্কুলারের শিরোনাম দেয়া হয়েছে ‘ঋণ পুনঃতফসিল ও এককালীন এক্সিট সংক্রান্ত বিশেষ নীতিমালা’। তিন পৃষ্ঠার এ সার্কুলারটি জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ থেকে। গতকালই সব বাণিজ্যিক ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদেরকে এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অবহিত করা হয়েছে। 
গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে একই সাথে ‘ভালো ঋণগ্রহীতাদের প্রণোদনা প্রদান প্রসঙ্গে’ শিরোনামে আরো একটি সার্কুলার জারি করা হয়েছে। এতে ভালো গ্রাহকদের কিছু প্রণোদনা দেয়ার কথা বলা হয়েছে।

গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে জারিকৃত সার্কুলারে বলা হয়েছে, বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণবহির্ভূত কারণে ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ব্যাংকের ঋণ অনেক ক্ষেত্রেই নিয়মিতভাবে পরিশোধিত হচ্ছে না। এতে ঋণ আদায় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ কারণে স্বাভাবিক ঋণপ্রবাহ বজায় রাখার জন্য এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। 

ঋণখেলাপিদের যত ধরনের ছাড় : সার্কুলারে বলা হয়েছে, ট্রেডিং খাত, জাহাজ শিল্প, লৌহ ও ইস্পাত শিল্প যেখানে ব্যাংকের বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগ রয়েছে ওই সব খাতের ঋণখেলাপিরা এ সুযোগ পাবেন। বিশেষায়িত ব্যাংকের অকৃষি খাতের আমদানি-রফতানিতে সম্পৃক্ত শিল্প ঋণগ্রহীতারাও এ সুবিধা পাবেন। অন্যান্য খাতে ব্যাংক বিশেষ নিরীক্ষার মাধ্যমে চিহ্নিত প্রকৃত ব্যবসায়ী যাদের ঋণ নিয়ন্ত্রণ বহির্ভূতকারণে মন্দ বা ক্ষতিজনক মানে শ্রেণীকৃত হয়েছে তারাও এ সুবিধা পাবেন। সার্কুলারে বলা হয়েছে, এ সুবিধা পাওয়ার মেয়াদ হবে তিন মাস। তবে প্রয়োজনে এর মেয়াদ আরো বাড়ানো হতে পারে। সার্কুলার জারির ৯০ দিনের মধ্যে ঋণখেলাপিদের এ সুবিধা পাওয়ার আবেদন করতে হবে। আর ৩১ ডিসেম্বর ২০১৮ ভিত্তিক এককালীন হিসাবায়ন করে আবেদন করতে হবে। খেলাপি ঋণ সংক্রান্ত কোনো মামলা থাকলে ব্যাংক গ্রাহক সম্পর্ক ভিত্তিতে আদালতে যৌথভাবে মামলা স্থগিতের আবেদন করতে হবে। মামলা স্থগিতের আবেদন না করলে সব সুবিধা বাতিল বলে গণ্য হবে। ঋণখেলাপিদের অনারোপিত সম্পূর্ণ সুদ মাফ করা হবে। আর আরোপিত সুদের ইন্টারেস্ট সাসপেন্ডেড অর্থাৎ স্থগিত অংশও মাফ হবে। 
এই সার্কুলারের আওতায় স্বাধীনতার পর থেকে গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত সব ঋণখেলাপি মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে তাদের ঋণ পুনঃতফসিল করার সুযোগ পাবেন। ব্যাংক গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে মাসিক ভিত্তিতে অথবা তিন মাস অন্তর এ ঋণের কিস্তি পরিশোধের সুযোগ পাবেন। এ সুবিধা পাওয়ার শর্ত ভঙ্গ করলে সব সুবিধা বাতিল করা হবে বলে সার্কুলারে উল্লেখ করা হয়েছে।
অপর দিকে ভালো ঋণগ্রহীতাদের বিষয়ে অপর একটি সার্কুলারে বলা হয়েছে, ভালো গ্রাহকের আদায়কৃত সুদে অন্যূন ১০ শতাংশ রিবেট প্রদান করতে হবে। পরে প্রতি বছর গ্রাহক ভালো ঋণগ্রহীতা হিসেবে চিহ্নিত হলে একই রকম সুবিধা অব্যাহত থাকবে। 

উল্লেখ্য, এর আগে গত ২৫ মার্চ অর্থমন্ত্রী শেরেবাংলা নগরের পরিকল্পনা কমিশনে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবীরের সাথে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের কাছে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করার জন্য সুদের হার ৭ শতাংশ করার কথা বলেছিলেন। তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, দেশে দুই ধরনের ঋণগ্রহীতা রয়েছে, ভালো ও অসাধু। ভালোদের সুযোগ দেবো আর অসাধুদের জন্য শাস্তির ব্যবস্থা করব। এই লক্ষ্য সামনে রেখেই আমরা আজ বসেছিলাম। যারা ইচ্ছাকৃতভাবে খেলাপি হননি বা বেশ কিছু কিস্তি দেয়ার পর সুনির্দিষ্ট কারণে শোধ করতে না পেরে খেলাপি হয়েছেন, তাদের জন্য এ সুযোগ।’ 

ভালো ঋণগ্রহীতাদের সুদহার কমিয়ে দেয়া হচ্ছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী জানান, এককালীন ২ শতাংশ পরিশোধের পর যা বাকি থাকবে, তার ওপর সরল সুদ নেয়া হবে ৭ শতাংশ হারে। পুরো ঋণ পরিশোধে তাদের সময় দেয়া হবে ১২ বছর। ছোট বা বড় সব ঋণগ্রহীতার জন্যই তা প্রযোজ্য হবে। কেউ যদি মনে করেন যে একবারে টাকা পরিশোধ করে চলে যাবেন, সেই ব্যবস্থাও রাখা হচ্ছে।

ভালো বা অসাধু বাছাই করা হবে কিভাবে-সাংবাদিকদের এ প্রশ্নের জবাবে চাইলে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘২ বছর বা ১০ বছরের জন্য ঋণ নিলাম, এক টাকাও ফেরত দিলাম না, আমি কি ভালো? রফতানি করলাম ১০ বার, একবারের টাকাও দেশে ফেরত এলো না, আমি কি ভালো?’ 
এ দিকে, ব্যাংকের ঋণের সুদের হার বর্তমানে ১১, ১২, ১৪ শতাংশ পর্যন্ত। এখন খেলাপি সুদের হার ৭ শতাংশ করার বিষয়ে ব্যাপক সমালোচনা হলে অর্থমন্ত্রী গত মাসে বলেন, সুদের হার হবে ৯ শতাংশ । 

এর আগে ২০১৫ সালে ঋণখেলাপিদের জন্য একটি বড় সুযোগ করে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সে সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে ঋণ পুনর্গঠন নীতিমালা জারি করা হয়। তখন ১১টি শিল্প গ্রুপের ১৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ নিয়মিত করে বড় ধরনের সুবিধা দেয়া হয়। তবে সুবিধা পাওয়ার পরও দু’টি গ্রুপ ছাড়া আর কেউ টাকা পরিশোধ করছে না।
বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে দায়িত্ব নেয়ার পর দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। পরবর্তী ১১ বছর পর ২০১৮ সাল শেষে খেলাপি ঋণ বেড়ে হয় ৯৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা। এ ছাড়া অবলোপন ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৩৭ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা। ফলে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি।


আরো সংবাদ