২৩ আগস্ট ২০১৯
মাথাপিছু ভ্রমণ ব্যয় ১ লাখ ৮২ হাজার টাকা

লাগামহীন অর্থ ব্যয়ে জনশুমারি-গৃহগণনা

লাগামহীন অর্থ ব্যয়ে জনশুমারি-গৃহগণনা - সংগৃহীত

লাগামহীন অর্থ ব্যয়ে দেশে ষষ্ঠ জনশুমারি ও গৃহগণনার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। কোনো ধরনের জরিপ-সমীক্ষা ছাড়াই দেশের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর প্রস্তাব করা হয়। এতে অর্থের অপচয় হচ্ছে। দশ বছরের ব্যবধানে ২০২১ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনায় ব্যয় বাড়ছে ১৪.৭৫ গুণ। ২০১১ সালের পঞ্চম জনশুমারিতে ব্যয় হয়েছিল ২৩৭ কোটি টাকা আর ষষ্ঠ শুমারিতে ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা, যা আকাশচুম্বী বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। আর এই অর্থের জন্য সরকার ছয়টি বিদেশী সংস্থার কাছে ধর্ণা দিচ্ছে। এ সংক্রান্ত প্রকল্পটি ইতোমধ্যে অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে দাখিল করা হয়েছে বলে বিবিএস সূত্রে জানা গেছে। কমিশন প্রকল্পের এই ব্যয়কে অযৌক্তিক ও আকাশচুম্বী বলছে। এখানে ইন্টারনেট খাতে খরচ ধরা হয়েছে ১৪ কোটি ৭৫ লাখ ২০ হাজার টাকা। সদ্য চলমান কৃষিশুমারির সাথে সামঞ্জস্য রেখে জনশুমারির ব্যয় নির্ধারণের সুপারিশ করেছে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি)। 

সংশ্লিষ্ট সূত্র ও প্রস্তাবনা থেকে জানা গেছে, প্রতি দশ বছর অন্তর বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো দেশে জনশুমারি ও গৃহগণনার কাজ করে। আগামী ২০২১ সালে ষষ্ঠবারের মতো এই শুমারির কাজ করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। প্রকল্পটি ২০১৯ সাল থেকে শুরু হওয়ার কথা। সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ধরা হয়েছে ২ হাজার ৫৬৪ কোটি ৭২ লাখ টাকা। বাকি ৯৩৫ কোটি ২৮ লাখ টাকা বিদেশী সংস্থা থেকে নেয়া হবে। আর এই সংস্থাগুলোর মধ্যে রয়েছে ইউএনএফপিএ, ডিএফআইডি, ইইউ, ইউএসএইড এবং কোইকা। অনুমোদন না পাওয়ার কারণে চলতি বছরের জানুয়ারিতে এই শুমারি প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি, যা আগামী ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে সমাপ্ত করার কথা ছিল। প্রসঙ্গত, স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম আদমশুমারি ও গৃহগণনা হয় ১৯৭৪ সালে। এরপর ১৯৮১, ১৯৯১, ২০০১ এবং সর্বশেষ ২০১১ সালে। ২০১১ সালের কাজে তিন লাখ ১০ হাজার গণনাকারী নিয়োজিত ছিল।

বিবিএসের প্রস্তাবনা অনুযায়ী, মূল শুমারি সম্পন্ন হওয়ার এক মাসের মধ্যে তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রমের ব্যাপ্তি ও মান যাচাইয়ের নিমিত্তে নমুনা এলাকা হতে গণনাপরবর্তী জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। সর্বশেষ ধাপে মূল শুমারির সম্পূরক হিসেবে বিশদ প্রশ্নপত্র ব্যবহার করে কম্পিউটারের সহায়তায় পারসোনাল ইনটারভিউর (সিএপিআই) মাধ্যমে নমুনা গণনা এলাকায় আর্থসামাজিক ও জনতাত্ত্বিক জরিপ পরিচালনা করা হবে। এই প্রকল্পে পেশাগত সেবা, সম্মানী ও বিশেষ ব্যয় খাতে সর্বোচ্চ ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ২৬৭ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। জরিপ কাজে এক হাজার ১৪১ কোটি টাকা, মুদ্রণ ও মনিহারিতে ৯০৮ কোটি ৫৬ লাখ টাকা, প্রশিক্ষণে ৪৮০ কোটি ৩৭ লাখ টাকা, প্রশাসনিক ব্যয় ৪৩৭ কোটি ৯৭ লাখ টাকা, মজুরি ও বেতনে যাবে ১১৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা। দেশের ভেতরে ভ্রমণ খরচ পাঁচ হাজার জনের জন্য ৭১ কোটি ৭৪ লাখ ৬৬ হাজার টাকা। এ ক্ষেত্রে জনপ্রতি গড় ব্যয় ৮৩ হাজার ৪৯৪ টাকা। 

ব্যয় বিশ্লেষণে দেখা যায়, পাঁচ হাজার জনকে প্রশিক্ষণ দেয়ার জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৯ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। এখানে জনপ্রতি গড় ব্যয় ৯৮ হাজার ৯০০ টাকা। আবার পাঁচ হাজার জনের অভ্যন্তরীণ ভ্রমণ খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪১ কোটি ৭৪ লাখ ৬৬ হাজার টাকা। যেখানে মাথাপিছু গড় ব্যয় হচ্ছে ৮৩ হাজার ৪৯৪ টাকা। ২০১১ সালে ১৩০টি শুমারি জেলার বিপরীতে এবারে ১৫০টি। ২০১১ সালে তিন লাখ ১১ হাজার জন গণনাকারীর বিপরীতে এবার চার লাখ ৯২ হাজার জন। 

বিবিএসের তথ্যানুযায়ী, ষষ্ঠ জনশুমারিতে সব জনগণের পাশাপাশি বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশী নাগরিক এবং বিদেশে সাময়িকভাবে অবস্থানরত বাংলাদেশী নাগরিককে গণনার অন্তর্ভুক্ত করা হবে। একটি নির্দিষ্ট তারিখে প্রতিটি খানা ও শতভাগ জনগণকে গণনায় অন্তর্ভুক্ত করে ষষ্ঠ জনশুমারিও গৃহগণনা পরিচালনা করা হবে। সব ধরনের আর্থসামাজিক জরিপের জন্য নমুনা ফ্রেম প্রস্তুত করা এবং জেলাভিত্তিক জনসংখ্যার প্রক্ষেপণ করা। জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের সব নির্বাচনের জন্য নির্বাচনী এলাকা নির্ধারণের জন্য তথ্য সরবরাহ, জাতীয় সম্পদ বণ্টন ও কোটা নির্ধারণে তথ্য সরবরাহ করা হবে। চার ধাপে এই জনশুমারি ও গৃহগণনা-২০২১ বাস্তবায়ন করা হবে। 

প্রথম ধাপে দেশের প্রতিটি খানার তালিকা প্রণয়ন কাজ সম্পন্ন করতে হবে। খানা তালিকায় প্রবাসীসহ খানার সব সদস্যকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। প্রতিটি খানার জন্য একটি ইউনিক খানা নম্বর ব্যবহার করে একটি ডাটাবেজ তৈরি করা হবে; যা জনশুমারির ফ্রেম হিসেবে ব্যবহৃত হবে। এই ধাপের পর খানা তালিকা হালনাগাদ করা হবে। দ্বিতীয় ধাপে মূল শুমারি পরিচালনা করা হবে। এতে আইসিআর প্রশ্নপত্র, মোবাইল অ্যাপলিকেশন ও ইমেইল ব্যবহার করা হবে। মূল শুমারির মাধ্যমে ডিফেক্ট বা ডিজুর পদ্ধতিতে একটি নির্দিষ্ট রেফারেন্স তারিখের জনসংখ্যা ও খানা সংক্রান্ত সব মৌলিক তথ্যউপাত্ত সংগ্রহ করা হবে। ইউএনএফপিএ বাংলাদেশে অর্থায়নের ব্যাপারে সমন্বয় করছে। শিগগিরই উন্নয়ন সহযোগী কনসোর্টিয়াম মিটিং অনুষ্ঠিত হবে। সংশোধিত এডিপিতে বরাদ্দবিহীন প্রকল্প হিসেবে এটি অন্তর্ভুক্ত আছে। টেকসই উন্নয়ন অভিস্টের (এনডিজি) ২৩২টি সূচকের মধ্যে ১৬টি সূচকের তথ্য এই শুমারি থেকে পাওয়া যাবে। আর ৯৭টি সূচকের বিভাজক হিসেবে এর তথ্য ব্যবহার করা হবে। 

পরিকল্পনা কমিশনের পিইসি সভায় এই শুমারি ব্যয়ের আকার নিয়ে প্রশ্ন তুলে তা যৌক্তিক করার জন্য আর্থসামাজিক অবকাঠামো বিভাগ থেকে বলা হয়েছে, কাস্টমস খাতে প্রায় সাড়ে ১৩ কোটি টাকা ব্যয় অপ্রয়োজনীয় বলে তা বাদ দিতে হবে। প্রতিটি ব্যয় ২০১১ সালের শুমারি এবং চলমান কৃষি শুমারি ব্যয়ের সাথে সামঞ্জস্য বিধান করে যুক্তিযুক্ত করার জন্যও এই বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।


আরো সংবাদ