১৮ জুলাই ২০১৯
ঢিমেতালে সিটি গভর্ন্যান্স প্রকল্প

মহাসড়ক তৈরির চেয়ে পানি নিষ্কাশনে ৪ গুণ বেশি খরচ

উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর অগ্রগতির চাকা চলছে ঢিমেতালে। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ প্রান্তে এলেও বাস্তবায়ন নিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারছে না পরিকল্পনা কমিশন। আবার প্রকল্পের অঙ্গভিত্তিক ব্যয়ের অঙ্ক নিয়েও বেশ প্রশ্ন রয়েছে। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়ন হওয়া নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে পরিকল্পনা কমিশনের আইএমইডি। সিটি গভর্ন্যান্স প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনায় এসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে। প্রকল্পটির বাস্তবায়নের লক্ষ্যমাত্রায় গত মার্চ পর্যন্ত ঘাটতি ছিল ৪১.৫৯ শতাংশ। এতে প্রতি কিলোমিটার সড়ক ও মহাসড়ক নির্মাণে যেখানে ব্যয় হবে ১.৪০ কোটি টাকা, সেখানে পানি নিষ্কাশন অবকাঠামোতে খরচ ৫.২৪ কোটি টাকা।

স্থানীয় সরকার বিভাগের তথ্যানুযায়ী, স্বাধীনতার পর থেকে নগরায়ণের হার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিকূল আর্থ-সামাজিক ও পরিবেশগত অবস্থান জাতীয় উন্নয়নে বাংলাদেশের শহর ও নগরগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বাংলাদেশে বার্ষিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১.১ শতাংশ। সেখানে শহরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ৩.১ শতাংশ। শহরের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের প্রায় তিন গুণ। মাইগ্রেশন ও কর্মসংস্থানের কারণে এই সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

নগরের অবকাঠামো উন্নয়ন ও মৌলিক নাগরিক সেবাগুলো পর্যাপ্ত নয়। তাই নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, রংপুর এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসনিক দক্ষতা, মৌলিক নাগরিক সেবার উন্নয়ন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে সুযোগ সুবিধা সৃষ্টির জন্য সিটি গভর্ন্যান্স প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয় ২০১৪ সালে। জাইকার ঋণসহায়তায় দু’হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পটি ২০২০ সালের জুনে সমাপ্ত করার কথা।

প্রকল্পের আওতায় ৮টি স্কুল-কাম-সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ, ১০টি কমিউনিটি রিসোর্স সেন্টার নির্মাণ, ২৩৭ কিলোমিটার পানি সরবরাহ অবকাঠামো তৈরি, ৫৮৯ কিলোমিটার সড়ক ও মহাসড়কের উন্নয়ন, ৫৭টি নলকূপ স্থাপন, ১১.১৭ কিলোমিটার বৈদ্যুতিক স্থাপনা নির্মাণসহ বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পাদন করার কথা।

আইএমইডির পর্যালোচনা প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, প্রকল্পের শুরু থেকে ২০১৯ সালের মার্চ পর্যন্ত ভৌত অগ্রগতি মাত্র ৪৬.০৭ শতাংশ। আর আর্থিক অগ্রগতি ৪৩.৫৯ শতাংশ। অর্থাৎ গত মার্চ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে এক হাজার ২২৯ কোটি ৩২ লাখ ৯০ হাজার টাকা। কিন্তু প্রকল্পের প্রস্তাবনা অনুসারে মার্চ পর্যন্ত বাস্তবায়ন অগ্রগতি ৮৪.৮২ শতাংশ হওয়ার কথা।

এখানে প্রকল্পটি অগ্রগতিতে তার লক্ষ্যমাত্রা থেকে ৪১.২৩ শতাংশ পিছিয়ে আছে। ঠিকাদারের অবহেলা, জমি অধিগ্রহণ না করা এবং গাছকাটাসহ বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা দূর করতে না পারাকে এ জন্য দায়ী করা হয়। ফলে অনুমোদিত মেয়াদে সব অঙ্গ বাস্তবায়ন কাজ সমাপ্ত না হওয়ার আশঙ্কা ব্যক্ত করেছে বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সম্প্রতি প্রকাশিত সরেজমিন প্রতিবেদনে।

ব্যয় বিশ্লেষণে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে ব্যয় চলমান অন্যান্য প্রকল্পের চেয়ে অনেক বেশি। রোহিঙ্গাদের জন্য কক্সবাজারে ২৩টি সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ করা হচ্ছে, যার ব্যয় প্রতিটিতে ৪ কোটি টাকা। আর সিটি গভর্ন্যান্স প্রকল্পে প্রতিটি স্কুল-কাম-সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণে ব্যয় হবে ১৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা। এখানে ৮টি স্কুল-কাম-সাইক্লোন শেল্টারের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১১৪ কোটি ৪৫ লাখ ৪৭ হাজার টাকা।

আর ৫৮৯ কিলোমিটার সড়ক ও মহাসড়কের জন্য ৮২৬ কোটি ৬৬ লাখ ৪৭ হাজার টাকা ধরা হয়েছে। যেখানে প্রতি কিলোমিটারে খরচ হবে ১ কোটি ৪০ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। অন্য দিকে, প্রতি কিলোমিটার পানি নিষ্কাশন অবকাঠামোতে ব্যয় হবে ৫ কোটি ২৪ লাখ ১০ হাজার টাকা। ৯৯ কিলোমিটার অবকাঠামো নির্মাণে ৫১৮ কোটি ৮৬ লাখ ৩ হাজার টাকা ব্যয় হবে। প্রকল্পের আওতায় ৭০৬ মিটার সেতু নির্মাণ করতে খরচ ধরা হয়েছে ২৬০ কোটি ৪৬ লাখ ৭০ হাজার টাকা। এখানে প্রতি মিটারে ব্যয় হবে ৩৭ লাখ টাকা। প্রতি কিলোমিটার বৈদ্যুতিক স্থাপনা নির্মাণে ব্যয় হবে ৮ কোটি ৭১ লাখ ৫৪ হাজার টাকা।

বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ৫টি সিটি করপোরেশনের মধ্যে আর্থিক ও ভৌত অগ্রগতিতে নারায়ণগঞ্জ সিটি ভৌত ৭৭ শতাংশ এবং আর্থিক ৭০ শতাংশ করেছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম ভৌত ৭৬ শতাংশ এবং আর্থিক ৬৯ শতাংশ, রংপুর সিটি ভৌত ৬৯ শতাংশ এবং আর্থিক ৬৩ শতাংশ, গাজীপুর সিটি ভৌত ৫৯ শতাংশ এবং আর্থিক ৫১ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছে গত পাঁচ বছরে।

আইএমইডি বলছে, প্রকল্পের বাকি কাজ আগামী ২০২০ সালের জুনের মধ্যে সম্পন্ন করার জন্য বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ ও তা অনুসরণ করে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ এবং সিটি করপোরেশনকে সচেষ্ট হতে হবে। নতুনভাবে কোনো দরপত্র আহ্বান করলে প্রকল্পের সময়সীমা বিবেচনায় রাখতে হবে। চুক্তিপত্র স্বাক্ষরের আগে দরদাতা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে দাখিলকৃত নথিপত্র বিশেষ করে ব্যাংক গ্যারান্টি এবং লিড দরদাতার কাজের সাথে সম্পৃক্ততা ইত্যাদি ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করতে হবে।


আরো সংবাদ