১৮ আগস্ট ২০১৯
সাত দিনে ডিএসইর মূলধনের ১৯ হাজার কোটি টাকা হাওয়া

 আস্থাহীন পুঁজিবাজারে এবার বিপর্যয়ের আতঙ্ক

 আস্থাহীন পুঁজিবাজারে এবার বিপর্যয়ের আতঙ্ক - ছবি : নয়া দিগন্ত

আস্থাহীনতায় চরমভাবে ধুঁকছিল পুঁজিবাজার। এরই মধ্যে গত সাত দিন তা আরো মারাত্মক রূপলাভ করে। বিগত সাত কর্মদিবসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচক হারিয়েছে প্রায় ৩০০ পয়েন্ট তথা ৫ শতাংশের বেশি। একই সময় বাজারটি মূলধন হারিয়েছে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা। এ যেন ২০১০ সালের বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে যাওয়া পুঁজিবাজারে আরেক বিপর্যয়ের হাতছানি। সংশ্লিষ্ট সবার মধ্যে তৈরি হয়েছে নতুন বিপর্যয়ের আতঙ্ক। 

প্রশ্ন উঠেছে মন্দায় ধুঁকতে থাকা পুঁজিবাজারে এ আবার কেমন বিপর্যয়? এমনিতেই গত কয়েক দিনে টানা পতনের মধ্য দিয়ে পার করছে পুঁজিবাজারগুলো। সংশ্লিষ্ট সবার প্রত্যাশা ছিল যেকোনো সময় ঘুরে দাঁড়াবে পুঁজিবাজার। এরই মধ্যে গতকাল সোমবার বড় ধরনের ধস নামে দেশের দুই পুঁজিবাজারে। এক দিনেই প্রায় ৯০ পয়েন্ট সূচক হারায় ডিএসই। চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ হারায় প্রধান সূচকের ২৬১ পয়েন্টের বেশি। একই দিন দুই বাজারেই মূলধনের সাত হাজার কোটি টাকা করে হাওয়া হয়ে যায়। আর গত ৪ জুন ডিএসইর তিন লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা মূলধন থাকলেও গতকাল লেনদেন শেষে তা নেমে আসে তিন লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকায়। 

পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, পুঁজিবাজারে যদি লাগামহীন ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা চলতে থাকে এর পরিণতি হিসেবে বাজারে ঝুঁকি তৈরি হয়। আর পরিণামে নেমে আসে ধস। কিন্তু যেখানে দিনের পর দিন মন্দায় পুঁজিবাজার ধুঁকছিল সেখানে হঠাৎ এ ধরনের পতন বিনিয়োগকারীদের নতুন করে আতঙ্কিত করে তুলছে। গতকাল লেনদেনের শুরু থেকে সৃষ্ট বিক্রয়চাপ ছিল এ আতঙ্কেরই বহিঃপ্রকাশ। লেনদেন শুরুর এক ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে ৬০ পয়েন্ট সূচক হারায় ডিএসই। পরবর্তীতে সাময়িক কিছুক্ষণের জন্য এ চাপ কমলেও পরবর্তী আধঘণ্টায় তা আরো মারাত্মক আকার ধারণ করে। দিন শেষে বাজারটি সূচক হারায় ৮৮ পয়েন্ট তথা ১ দশমিক ৬৯ শতাংশ। 

সোমবারের পুঁজিবাজার পরিস্থিতি নিয়ে মতামত জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. মির্জা আজিজুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, পুঁজিবাজারে এ মুহূর্তে যা ঘটছে তা চরম আস্থাহীনতার বহিঃপ্রকাশ। বিগত বেশ কিছুদিন থেকে যেভাবে বাজার চলছে তাতে মনে হয় অর্থনীতির প্রধান এ খাতটির যেন কোনো অভিভাবকই নেই। বাজেট ঘোষণার বেশ কিছু দিন আগে থেকেই বলা হচ্ছিল বাজেটে পুঁজিবাজারের জন্য অনেক প্রণোদনা থাকবে। এর ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল বাজেট ঘোষণার পর তা তাদেরকে হতাশ করে। এরই মধ্যে আবার বোনাস লভ্যাংশ ও রিজার্ভের করারোপসহ কিছু কিছু বিষয় বাজারে উল্টো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। যার প্রকাশ ঘটছে বাজারের সাম্প্রতিক আচরণে। 

মির্জা আজিজ আরো বলেন, এ মুহূর্তে বাজারে ভালো শেয়ারের প্রচণ্ড অভাব রয়েছে। ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্তির বিষয়ে সরকার বা নিয়ন্ত্রক সংস্থার কোনো উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না। ভালো কোম্পানি না হলে কিসে মানুষ বিনিয়োগ করবে? বাজারে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করতে হবে। আর ভালো শেয়ার না পেলে কেনইবা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বড় অঙ্কের দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ করবে? আর প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ ছাড়া শুধু ব্যক্তি বিনিয়োগ দ্বারা পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতা ধরে রাখা সম্ভব নয়। 

বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে বিএসইসির সাবেক এ চেয়ারম্যান আরো বলেন, বাজারে যখন পতন ঘটে তখন একটু ধৈর্য দিয়ে তা মোকাবেলা করা উচিত। এ সময়টি শেয়ার বিক্রির নয় বরং কেনার সময়। আর কেনার সামর্থ্য না থাকলে উচিত ধৈর্য ধরে ভালো সময়ের জন্য অপেক্ষা করা। 
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ প্রফেসর আবু আহমেদ নয়া দিগন্তকে বলেন, দীর্ঘ দিন পুঁজিবাজারে মন্দা চলতে থাকায় বাজেটে পুঁজিবাজারের প্রণোদনা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের বড় ধরনের প্রত্যাশা ছিল যা বাজেট ঘোষণার পর তাদের হতাশ করে। এ ছাড়া আর্থিক খাতের একটি কোম্পানির অবসায়ন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থাহীনতার মাত্রা আরো বাড়িয়ে দেয়। পুরো ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এর ফলে টানা দরপতনের মধ্য দিয়েই পার করছে যার প্রভাব পড়ছে বাজার সূচকে। আর বাজার যখন ধারাবাহিক পতনের মধ্য দিয়ে যায় তখন বিনিয়োগকারীদের মাঝে আতঙ্ক তৈরি হয়। গতকাল এমনটিই ঘটেছে দেশের দুই পুঁজিবাজারে। 

প্রফেসর আহমেদ আরো বলেন, পুঁজিবাজারে ভালো কোম্পানির সংখ্যা এখন হাতে গোনা। দেশে কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়া বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে বাজারে আনার কোনো উদ্যোগ নেই। নেই সরকারি কোম্পানির পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তি। এ অবস্থায় বিনিয়োগের সুযোগ কই? তালিকাভুক্ত মিউচুয়াল ফান্ডগুলোও এখন অনেকটা নিষ্ক্রিয়। নেই অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের যথাযথ অংশগ্রহণ। আর ভালো শেয়ার না থাকলে দেশী হোক বা বিদেশী কোথায় বিনিয়োগ করবে। 

গড় ১৩ জুন জাতীয় সংসদে ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার পর থেকেই চলছিল পুঁজিবাজারের আস্থাহীনতা। দেশের দুই পুঁজিবাজার ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে বাজেটে পুঁজিবাজারের জন্য দেয়া প্রণোদনাকে ঐতিহাসিক বলে বর্ণনা করলেও বাজেটের পরদিনই বড় পতন ঘটে পুঁজিবাজারে। এর পর ৩০ জুন বাজেট পাসের পর থেকে পতন ধারাবাহিক রূপলাভ করে। গত সপ্তাহের শুরু থেকে তা আরো চরম রূপ নেয়। গত সাত কর্মদিবস একটানা পতনের মধ্য দিয়ে পার করছে দেশের দুই পুঁজিবাজার। এরই মধ্যে গতকাল বিনিয়োগকারীদের মনে আতঙ্কের জন্ম নেয়। এদিন দুই পুঁজিবাজারের প্রায় ৯০ শতাংশ কোম্পানি দরপতনের শিকার হয়। বরাবরের মতো রাস্তায় নেমে আসে বিনিয়োগকারীরা। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সামনে গতকাল কয়েক শ’ বিনিয়োগকারী বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। তারা পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতা আনয়নে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আশু হস্তক্ষেপ দাবি করে।


আরো সংবাদ