২১ অক্টোবর ২০১৯

সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা উদ্ধার করতে এনবিআরকে দুদকের চিঠি

বিভিন্ন কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের প্রায় চার হাজার ৩৭৮ কোটি টাকা মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট/মূসক) ফাঁকিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। একই সাথে ফাঁকির রহস্য উন্মোচন ও ফাঁকিকৃত রাজস্ব আদায়ের বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) চিঠিতে তাগিদ দিয়েছে দুর্নীতিবিরোধী রাষ্ট্রীয় সংস্থাটি। সম্প্রতি এনবিআর চেয়ারম্যান মো: মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বারবার পাঠানো চিঠিতে দ্রুত সময়ের মধ্যে বিষয়টি তদন্ত করে দুদককে অবহিত করারও অনুরোধ করা হয়েছে। দুদক সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

মূলত ২০১৮-১৯ অর্থবছর শেষে এনবিআরের বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ, ভ্যাট) ইন্টেলিজেন্স ওয়ার্ক, দাখিলপত্র যাচাই ও প্রতিষ্ঠান নিরীক্ষার মাধ্যমে মোট চার হাজার ৩৭৭ কোটি ৭৬ লাখ টাকা ভ্যাট ফাঁকি উদঘাটন করে। বিভিন্ন মাধ্যমে বিষয়টি দুদকের নজরে আসে। এ জন্য রাষ্ট্রীয় স্বার্থে দুদক থেকে পদক্ষেপ নেয়ার জন্য বলা হয়েছে।

এ বিষয়ে দুদক সচিব মুহাম্মদ দিলোয়ার বখত্ বলেন, আমরা নিয়মিত কাজের অংশ হিসেবে বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট দফতরে চিঠি দিয়ে থাকি। এটা অনেকটা রুটিন ওয়ার্ক বলতে পারেন। এ বিষয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এনবিআরের বৃহৎ করদাতা ইউনিট (ভ্যাট) দেশের মোট ভ্যাটের ৫৬ শতাংশ আহরণ করে থাকে। গত অর্থবছরে প্রায় চার হাজার ৩৭৮ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি উদঘাটন করে। এর মধ্যে আদায় করেছে ১৭৯ কোটি ৭১ লাখ টাকা। শুধু দাখিলপত্র যাচাই করেই তিন হাজার ৩৯১ কোটি টাকার ফাঁকি উদঘাটন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এ ছাড়া ৩০টি প্রতিষ্ঠান নিরীক্ষা করে উদঘাটন হয়েছে ৭৯৩ কোটি টাকার ফাঁকি। আর ফাঁকি দেয়া ওই রাজস্বের প্রায় ১৮০ কোটি টাকা আদায় হলেও বাকি টাকা আদায়ে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় পড়েছে বলে জানা গেছে।

সূত্র জানায়, মোবাইল অপারেটর, ব্যাংক, বীমা, ওষুধ, সিমেন্ট, খাদ্য ও পানীয় উৎপাদনকারী এবং বড় কর্পোরেটসহ ১৭০ প্রতিষ্ঠান এলটিইউর আওতায় রয়েছে। সর্বোচ্চ ভ্যাট প্রদান করলেও এলটিইউ প্রতিবছর বিশেষ নজরদারির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোর ফাঁকি উদঘাটন করে থাকে। কিছু প্রতিষ্ঠান ভুল স্বীকার করে রাজস্ব পরিশোধ করে। কিন্তু বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানই ভুল স্বীকার করে না। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করে রাজস্ব আদায় করা হয়। প্রতিষ্ঠানগুলো দাখিলপত্রে তথ্য গোপন করে ভ্যাট ফাঁকি দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সে জন্য এলটিইউ বিদায়ী অর্থবছরে দাখিলপত্র যাচাইয়ে বেশি নজর দিয়ে বেশ ভালো তথ্য পেয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা। তবে কৌশলগত কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম প্রকাশ করতে চায়নি এলটিইউয়ের কর্মকর্তারা।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, কিছু প্রতিষ্ঠান ইচ্ছাকৃতভাবে তথ্য গোপন করেছে, আবার কিছু প্রতিষ্ঠান না জেনে ভুল করেছে। এ ছাড়া কিছু নন কমপ্লায়েন্ট প্রতিষ্ঠানও রয়েছে; যারা সব সময় ফাঁকি দেয়ার চেষ্টা করে। এর আগে দাখিলপত্র যাচাই করে এত বিপুল পরিমাণ রাজস্ব উদঘাটন হয়নি। ফাঁকি দেয়া প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মোবাইল ফোন অপারেটর, ব্যাংক, বীমা, ওষুধ, সিরামিক এমনকি সরকারি প্রতিষ্ঠানও রয়েছে বলে জানা গেছে। এর আগে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২৯টি প্রতিষ্ঠান নিরীক্ষা করে এক হাজার ৭৯৮ কোটি টাকা ফাঁকি উদঘাটন করে ৪৬ কোটি ৪৬ লাখ টাকার রাজস্ব আদায় করতে সক্ষম হয় এলটিইউ ভ্যাট।

যেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে, তার মধ্যে মোবাইল ফোন অপারেটরের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ। নিরীক্ষায় সবচেয়ে বেশি মোবাইল অপারেটরের নাম উঠে এসেছে। এ ছাড়া পেট্রোবাংলাসহ আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিদায়ী অর্থবছরে ৩২ ইন্টেলিজেন্স ওয়ার্কের মাধ্যমে ১৯৪ কোটি তিন লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকি উদঘাটন করা হয়েছে, যা ২০১৭-১৮ অর্থবছরের তুলনায় দ্বিগুণ। এর মধ্যে আদায় হয়েছে ১১২ কোটি ৩৯ লাখ টাকা, যা ২০১৭-১৮ অর্থবছরের চেয়ে ২৮ কোটি ৫৭ লাখ টাকা বেশি। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে সাতটি ওয়ার্কের মাধ্যমে ৯৫ কোটি ৮২ লাখ টাকা উদঘাটন ও ৮৩ কোটি ৮২ লাখ টাকা আদায় হয়েছে। এ ছাড়া বিদায়ী অর্থবছরে এলটিইউ বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির (এডিআর) মাধ্যমে ১৬টি আবেদন নিষ্পত্তির মাধ্যমে ১৪২ কোটি ১২ লাখ টাকার রাজস্ব আদায় করেছে। যদিও ২০১৭-১৮ অর্থবছরে আটটি আবেদন নিষ্পত্তি করে ছয় কোটি ৫৬ লাখ টাকার রাজস্ব আদায় করেছে।


আরো সংবাদ

সকল